নজরুলের গানে মানসমুক্তির পথ
আরিফুল হাসান
প্রকাশ : ২১ মে ২০২২, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

জীবন চলার পথে মানবমানসে আঘাত লাগে, দুঃখে-আনন্দে ভাসে মানব মন। আপাত আনন্দে মন থেকে কালোমেঘ সরে গেলেও, মনের গহিনে সেসব ক্ষত কালিমার আস্তরণ তৈরি করে। তাই নিজের অজান্তে কখনও কখনও হু-হু করে কেঁদে ওঠে মন। এই যে হৃদয়ের বিলাপ, এর কোনো কারণ খুঁজে পাওয়া যায় না। এই যে অন্তর্দাহ সংলাপ, এর কোনো সঠিক ব্যাখ্যা পাওয়া যায় না। যেন কাঁদার জন্যই কাঁদা, কোনো কারণ ছাড়া কাঁদা, এমনি এমনি কাঁদা। এ কান্নার ভেতরে রোনাজারি, গোপন কোনো অভিস্পার ক্ষত হৃদয়পটে মুছে যাওয়া স্মৃতির বিস্মৃতি হতে হতেও মুছে যায় না- একপশলা দাগ টেনে যায়। সেই দাগ যখন ব্যাঞ্জনবর্ণে, স্বরবর্ণে আমাদের সামনে প্রতিস্থাপিত হয়, তখন আমরা তাকে গান বলি, গীত বলি কিংবা গীতিকবিতা বলি। কবি কিটস মনে করতেন, ‘যন্ত্রণাকাতর মনের জন্য সংগীত ওষুধের কাজ করে।’
কাজী নজরুল ইসলাম বাংলা সাহিত্যের সর্বগ্রাসী প্রতিভা। কবিতা, গল্প, প্রবন্ধ উপন্যাস কি না লিখেছেন তিনি। সাহিত্যের সাংগীতিক ভাষাকে তিনি ঋদ্ধ করেছেন বহুতর সংগীতের মাধ্যমে। এ ক্ষেত্রে নজরুল শুধু বাংলা ভাষাতেই নয়, পৃথিবীর অপরাপর ভাষার কোনো কবিই একজীবনে এক হাতে এত বেশি গানের পসরা সাজাতে পারেননি। তার এক হাতে রণতূর্যের সঙ্গে আরেক হাতে বাঁকা বাঁশের বাঁশরির দোলা। এই দোলা হৃদয়জ, এই দোলা গীতিবাগিচার বুলবুলস্বর, যা থাকে চিরায়ত পথের প্রতিটি ধুলার গোপন প্রাণে। কাজী নজরুল ইসলাম সেই অন্তরকাহনের বিচিত্র চেরিপথ তৈরি করে দিয়েছেন অবারিতভাতে। আর তাই এ প্রাণের রোদন দেশ-কাল-পাত্র ভেদে চিরায়ত, চিরকালের মুকুটশোভিত করে কবিকে। কবিও যেন তার সীমাহীন প্রেমের নিবিড়ভক্তি প্রকাশিতে চান সুরের সঙ্গে সঙ্গে। তাই তার ভাষায়, ‘অঞ্জলী লহ মোর সংগীতে/প্রদীপ-শিখা সম কাঁপিছে প্রাণ মম/তোমারে সুন্দর, বন্দিতে সংগীতে।’
কর্মক্ষম জীবনের সীমাবদ্ধতায় কাজী নজরুল ইসলাম ৫ হাজার ৬০০-এরও বেশি গান রচনা করেছেন। এসবের বেশিরভাগে আবার তিনি নিজেই সুরারোপ করেছেন। তিনি ছিলেন সুরের সাধক। নিবিড় রাগরাগিণীকে তিনি ধ্বনিবন্ধে নিজের করে নিয়েছেন একান্ত পারঙ্গমতায়। আর তা কবিহৃদয় ছাপিয়ে সাধারণ্যের ভেতর-বাহির আলোড়িত করে চলছে আজও। কাজী নজরুল ইসলাম কলকাতা বেতার কেন্দ্রের সঙ্গে আনুষ্ঠানিকভাবে যুক্ত হন ১৯৩৮ সালে। সে সময় তিনি ‘হারামণি’, ‘নবরাগমালিকা’, ও ‘গীতিবিচিত্রার’ জন্য প্রচুর গান লিখেছেন। ‘হারামণি’ অনুষ্ঠানে কাজী নজরুল ইসলাম কম প্রচলিত ও বিলুপ্ত রাগরাগিণীর গান পরিবেশন করতেন। অনুষ্ঠানের শুরুতে তিনি হারিয়ে যাওয়া রাগের উল্লেখ করে সে রাগে নিজের লেখা নতুন গানটি পরিবেশন করতেন। এসব লুপ্তপ্রায় রাগের ওপর তিনি চল্লিশটিরও বেশি গান করেছিলেন।
আলোচ্য লেখায় নজরুল ইসলামের রচনার ব্যাপ্তি আলোচনা করা অভিপ্রায় নয়। কিংবা তার সব্যসাচী প্রতিভাকে মূল্যায়ন করাও লক্ষ্য নয়। আলোচনায় আমরা জানার চেষ্টা করব কাজী নজরুল ইসলামের গানে কীভাবে মানব-মানসের মুক্তির পথ নিহিত আছে। কীভাবে তিনি চিরায়ত দুঃখবোধকে ধারণ করার নান্দনিক সৌন্দর্য প্রকটিক করেছেন সেগুলো আমরা দেখার চেষ্টা করব। কাজী নজরুল ইসলাম মূলত ব্যক্তিজীবনেও ছিলেন দুঃখের ফেরিওয়ালা, তাই অন্তর্রোদন তিনি স্বযত্নে আঁখিজলে সাজিয়েছেন। আমরা সেই অশ্রুর বর্ণমালাগুলো পড়ব এবং বুঝার চেষ্টা করব তার উত্তরণজাত পথের কনট্যুর ম্যাপ।
‘বুলবুল’ সংগীত গ্রন্থে কবি দুই নং গানে লেখেন- ‘আমারে চোখ ইশারায় ডাক দিলে হায় কে গো দরদী/খুলে দাও রঙ-মহলার তিমির দুয়ার ডাকিলে যদি।’ এই যে অন্তরপর্বের ডাক, এ চিরায়ত মনের আহ্বান, সেই আহ্বানে কবি বিভোর হয়ে যান। খুঁজে পেতে চান তিমিরবিনাশী আলোর পথ। কবির সঙ্গে সঙ্গে সেই আকাক্সক্ষা হয়ে ওঠে চিরন্তন ও চিরমানুষের অভিস্পার সম্পদ। কবির মতো আমরাও যেন হৃদয়ের তিমির পথে আলোর বাসনা নিয়ে আকুতি জানাই। আবার আরেকটি গানে কবি লেখেন-
কেন কাঁদে পরান কী বেদনায় কারে কহি?
সদা কাঁপে ভীরু হিয়া রহি রহি।
সে থাকে নীল নভে আমি নয়ন-জল-সায়রে
সাতাশ তারার সতিন-সাথে সে যে ঘুরে মরে,
কেমনে ধরি সে চাঁদে রাহু নহি।।
কাজল করে যারে রাখি গো আঁখি-পাতে
স্বপনে যায় সে ধুয়ে গোপন অশ্রু-সাথে!
এভাবে কবি তার চিরবিরহী মনের, মনের মানুষের গোপন কান্নার কথা তুলে ধরেছেন। তিনি প্রেমের মাঝে এক অতিপ্রাকৃত প্রেমের সুর গেঁথে দিয়েছেন শব্দসুসমায়। আর তাই এ রোদন-সংগীতে বিরহী মানেই, প্রেমিক মানেই তার নিজের ভেতরের যন্ত্রণার সাক্ষাৎ খুঁজে পেতে পারে। যেমনিভাবে কবি তার গোপন অশ্রুর সঙ্গে কাজল করে রাখা প্রেমিকপ্রবরের স্মৃতিচিহ্ন ধুয়ে যেতে দেখে, তেমনি আমরাও দেখি আরাধনার অভীষ্ট কীভাবে স্থিতপ্রজ্ঞ হয়েও আমাদের থেকে দূরে দূরে সরে যায়, বহুদূরে লীন হয়ে যায়।
‘এতো জল ও-কাজল-চোখে/পাষাণী, আনলে বলো কে।/ টলমল জল-মোতির মালা/দুলিছে ঝালর-পলকে।’ এমনি কোনো বিষাদের সোপান আমাদের চোখে যখন অশ্রুর বন্য বইয়ে দিয়ে যায় কবি তখন বলেন, এত জলের রহস্য কী? পাষাণ-পাথর চোখে যখন অশ্রুর বন্যা বয়ে যায় তখন যুগপৎ বিস্মিত কবি ও পাঠক। এ অশ্রুজলই কিন্তু হৃদয় দহনের মুক্তির শিরোনামা। এ চোখের জল দিয়েই ধুয়ে দেয়া যায় অন্তকরণের দুঃখণ্ডকালিমা আর চোখ হয়ে উঠে হননকারী কিংবা বাঁচানোর মল্লিক। তাই কবি অন্য একটি গানে লেখেন-
চেয়ো না সুনয়না
আর চেয়ো না এ নয়ন পানে।
জানিতে নাইকো বাকি
সই ও আছখি কী জাদু জানে।
একে ঐ চাওনি বাঁকা
সুর্মা-আকা, তার ডাগর আঁখিভ
বধিতে তায় কেন সাধ
যে মরেছে ঐ আঁখি-বাণে।
তেমনি আবার ‘পরাণ-প্রিয়! কেন এলে অবেলায়/শীতল হিমেল কায়ে ফুল ঝরে যায়।’ এমনি দুঃখের পঙ্ক্তি দিয়ে সাজিয়েছেন গানের পসরা। কবি তার নিবিড় মনোঘরের সবটুকু সুষমা, সবটুকু অনুরাগ যেন ঢেলে দিয়েছেন তার সংগীতের মধ্যে। তিনি গানকে করেছেন রোদনের ভাষা, ব্যথার দান। আর এ ঐশ্বর্যে সমৃদ্ধ করে গেছেন আমাদের সুরের ভুবন। শুধু সুরের ভুবনই নয়, এর বাসিন্দাদেরকেও দেখিয়েছেন আলোর খোরাক, হৃদয়দহনের মুক্তির পথ।
সাধক মনোমোহন দত্ত বলেছিলেন, ‘চোখের জল আর প্রাণেরি টান/তাই বিনে কী মন্ত্র গো আছে?/প্রাণের প্রাণ কাছে.../ একবার আঁখিনীরে টাইনা গো আনো/প্রাণের প্রাণ কাছে।’ সেই চোখের জলের ব্যাকরণ কবি কাজী নজরুল ইসলাম অত্যন্ত প্রাণ¥য়ভাষায়, হৃদয়কাঁপানো সুরে তার সংগীতের ভুবনে রেখে গেছেন। তিনি মনে করেন, একমাত্র অশ্রুপাতের মাধ্যমেই তার পরমকে পাওয়া সম্ভব, যা থেকে মানস যন্ত্রণার লাঘব হয়ে মনোমুক্তির পথ উন্মোচিত হতে পারে।
গানের মালা গ্রন্থে নজরুল ৯৫টি গান সংযুক্ত করেছেন। এটি প্রকাশ হয় ১৯৩৪ খ্রিষ্টাব্ধে। এর উল্লেখযোগ্য গানগুলো হলো- ‘প্রিয় এমন রাত যেনো যায় না বৃথায়’, ‘চম্পা পারুল যূথী টগর চামেলা’, ‘দূর দ্বীপ-বাসিনী’, ‘আধখানা চাঁদ হাসিছে আকাশে’ ইত্যাদি। ‘গীতি শতদল’ বইটি প্রকাশিত হয় ১৯৩৪ সালের এপ্রিলে। এই গ্রন্থে সর্বমোট ১০১টি গান ছিল। জনপ্রিয় গানগুলো হলো- ‘শুকনো পাতার নূপুর পায়ে’, ‘চমকে চমকে ধীর ভীরু পায়’, ‘জাগো জাগো রে মুসাফির’ ইত্যাদি। ‘বুলবুল’ প্রকাশ হয় ১৯২৮ সালে, এতে ৪৯টি গান স্থান পায়। এছাড়া বুলবুল দ্বিতীয় খণ্ড, গুলবাগিচা, চন্দ্রবিন্দু, চোখের চাতক, মহুয়ার গান, রাঙা-জবা, সুরমুকুর, সুরসাকী, নজরুল গীতিকা, সন্ধ্যা ও বনগীতি তার অমর সংগীত গ্রন্থ। নজরুলের গানে আমাদের মানসমুক্তির পথ উন্মোচিত হোক।
