পাঠ প্রতিক্রিয়া

অনার্য বৃক্ষযুগল এর পাঠ প্রতিক্রিয়া

শাবানা ইসলাম বন্যা

প্রকাশ : ১০ জানুয়ারি ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

নুসরাত সুলতানার উপন্যাস ‘অনার্য বৃক্ষযুগল’ বর্তমান সময়ের সামাজিক অবক্ষয়ের বিপরীতে এক উজ্জ্বল জীবনবোধের প্রতিচ্ছবি। উপন্যাসটি পড়তে গিয়ে পাঠক যেমন তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট খুঁজে পায়, তেমনি গ্রামীণ জনপদে দেশপ্রেম ও মমত্ববোধের সতেজ অস্তিত্বও অনুভব করে।

উপন্যাসের প্রধান দুই চরিত্র আরিফুল ও খেয়া। আরিফুল রাজনীতি সচেতন এক লড়াকু যুবক, যার হৃদয়ে ছিল নিজ গ্রাম ‘স্বপ্নডাঙা’ নিয়ে বড় স্বপ্ন। বরিশাল অঞ্চলের আঞ্চলিক ভাষার সার্থক প্রয়োগে লেখক চরিত্রগুলোকে জীবন্ত করে তুলেছেন। ১৯৬২-এর শিক্ষা আন্দোলন থেকে শুরু করে ৬৬-এর ছয় দফা, ’৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান এবং ’৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ- আরিফুলের রাজনৈতিক বিবর্তন এবং জাতির ইতিহাসের বাঁকগুলো লেখক অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে চিত্রায়িত করেছেন।

রাজনৈতিক প্রজ্ঞার পাশাপাশি উপন্যাসে ফুটে উঠেছে পারিবারিক দায়বদ্ধতা। অসুস্থ বাবার প্রতি আরিফুলের সেবা এবং স্ত্রী খেয়ার সঙ্গে তার ভারসাম্যপূর্ণ সংসার জীবন পাঠককে মুগ্ধ করে। খেয়া কেবল একজন শিক্ষিকা নন, তিনি যেন এক ‘অপরাজিতা’ নারী, যিনি প্রেম ও ত্যাগের মাধ্যমে সংসারের নৌকোটি প্রতিকূলতার মাঝেও সচল রেখেছেন। লেখক দেখিয়েছেন, প্রেম ও সংসার কোনো একার বিষয় নয়; এটি একটি যৌথ লড়াই।

উপন্যাসের ভাষা শৈলী ও পর্বভিত্তিক নামকরণ (যেমন: ‘নান্দনিক ইটের ভাটা’, ‘আমি তোমারও সঙ্গে বেঁধেছি আমারও প্রাণ’) বর্ণনাকে আরও নান্দনিক করেছে। কিছু ক্ষেত্রে অতি-রগরগে বর্ণনার অভাববোধ থাকলেও সামগ্রিকভাবে একাত্তরকে নিজের ভেতরে ধারণ করে লেখক যে রাজনৈতিক ও সামাজিক বিশ্লেষণ করেছেন, তা অনবদ্য।

‘অনার্য বৃক্ষযুগল’ শুধু একটি প্রেমের গল্প নয়, বরং এটি একটি জাতির বেড়ে ওঠা এবং এক লড়াকু দম্পতির বৃক্ষের মতো ডালপালা ছড়িয়ে টিকে থাকার সার্থক চিত্রায়ণ। আরিফুল ও খেয়ার সন্তানদের এতিম করে বিদায় নেওয়ার মধ্য দিয়ে যে ‘বিষণ্ণ সুন্দর’ সমাপ্তি লেখক টেনেছেন, তা দীর্ঘক্ষণ পাঠকের মনে দাগ কেটে থাকে। এক কথায়, এটি ইতিহাস, রাজনীতি ও শাশ্বত জীবনের এক চমৎকার সংমিশ্রণ।