প্রবন্ধ
সৈয়দ গোলাম কিবরিয়া ও তার ছোটগল্প
মো. মনিরুল ইসলাম
প্রকাশ : ০৭ মার্চ ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

ছোটগল্প ছোট একটিমাত্র ঘটনা বা ভাবকে কেন্দ্র করে আবেগ ও কৌতূহল জাগিয়ে তোলে। এতে থাকে অল্প চরিত্র ও স্বল্প পটভূমি যা একটি নির্দিষ্ট অথচ অপূর্ণ অনুভূতি রেশ সৃষ্টি করে। ছোট গল্পের আস্বাদনে থাকে অন্তহীন জিজ্ঞাসা এবং অতৃপ্ত পিপসা। ছোটগল্প ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বাংলা সহিত্যের সবচেয়ে সার্থক ছোটগল্পকার রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘বর্ষা যাপন’ কবিতাটি প্রায়শই উদ্ধৃত হয়ে থাকে-
‘ছোট প্রাণ, ছোট ব্যথা, ছোট ছোট দুঃখ কথা
নিতান্তই সহজ সরল,
সহস্র বিস্মৃতিরাশি প্রত্যহ যেতেছে ভাসি
তারি দু-চারিটি অশ্রুজল।
নাহি বর্ণনার ছটা, ঘটনার ঘনঘটা,
নাহি তত্ত্ব নাহি উপদেশ।
অন্তরে অতৃপ্তি রবে, সাঙ্গ করি মনে হবে
শেষ হইয়াও হইল না শেষ।’
এই ‘শেষ হইয়াও হইল না শেষ’-এ যে রেশ থেকে যায়, সেখানেই ছোটগল্পের সার্থকতা।
ছোটগল্পের জন্ম সাহিত্যের ছোটকালেই। সাহিত্য আকারে প্রকারে বড় হয়েছে অনেক, কিন্তু ছোটগল্প আকারে ছোট থেকেও সাহিত্যের বড়সংখ্যক পাঠককে সেই শুরুর কাল থেকে আজ অব্দিঅতৃপ্ত আকাঙ্ক্ষায় রেখেছে। প্রবাহমান পৃথিবীর ছোট ছোট অভিজ্ঞতায় ছোটগল্পের জন্ম হতেই থাকে। একই অভিজ্ঞতার দ্যোতনা নানাজনের কাছে নানাভাবে প্রতিভাত হয়। সুতরাং ছোটগল্প নিরবচ্ছিন্নভাবে চলমান থাকে সমকালীন সাহিত্যের সঙ্গে।
বাংলা ছোটগল্প সাহিত্যরূপ পেয়েছে আধুনিক যুগের শুরুতেই। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, প্রভাত কুমার মুখোপাধ্যায়, শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়, বনফুল সবাই অধুনিক কালেরই গল্পকার। বাংলা সাহিত্যের ছোটগল্পে একটি আশ্চর্যজনক সৈয়দকাল লক্ষ্যনীয়। সৈয়দবংশীয় বেশ কিছু সাহিত্যিক প্রায় কাছাকাছি সময়ে বাংলা ছোটগল্পকে সমৃদ্ধ করেছেন বলে এই কালটিকে সৈয়দ কাল বলছি।। মধ্যযুগের সৈয়দ সুলতানকে বাদ দিলে আধুনিক যুগের সৈয়দ ইসমাইল হোসেন সিরাজী (১৮৮০-১৯৩১), সৈয়দ মুজতবা আলী (১৯০৪-১৯৭৪), সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ (১৯২২-১৯৭১), সৈয়দ আলী আহসান (১৯২২-২০০২), আব্দুল মান্নান সৈয়দ (১৯৪৩-২০১০), সৈয়দ শামসুল হক (১৯৩৫-২০১৬) এরা সবাই প্রায় সমকালীন। বাংলা সাহিত্যের এই সৈয়দকালের আরেকজন ‘সৈয়দ’ ছিলেন সৈয়দ গোলাম কিবরিয়া (১৯২০-১৯৯৫)। সাহিত্যভূবনে তার পরিচিতি অন্য সৈয়দদের চেয়ে কম হলেও রচনার নির্মাণশৈলীতে কমতি ছিল না। তার স্বল্প-পরিচিতির অবশ্য দু’টো কারণ ছিল- প্রথমত, তিনি লিখতেন ছদ্মনামে এবং দ্বিতীয়ত, তার পাণ্ডুলিপির বেশিরভাগই হাত বদলাতে বদলাতে এখনও অপ্রকাশিত, অগ্রন্থিত।
সৈয়দ গোলাম কিবরিয়ার ছোটগল্প পড়ার আগে সৈয়দ গোলাম কিবরিয়াকেই একবার পড়ে নেওয়া ভালো। তাতে তার অভিজ্ঞতার বয়ান ও গল্পের রস ও রসদ বুঝতে সহায়ক হবে।
সৈয়দ কিবরিয়ার পূর্বপুরুষরা ইরাক থেকে এদেশে এসেছিলেন। তার জন্ম দিনাজপুরে মাতুলালয়ে, নানা ছিলেন দিনাজপুরের প্রথম এমবিবিএস ডাক্তার। কিন্তু পৈত্রিক নিবাস চাঁদপুরের হাজীগঞ্জে; হাজীগঞ্জের সম্ভ্রান্ত ও শিক্ষানুরাগী সৈয়দ আব্দুল মজিদ ছিলেন তার দাদা। বাবা সৈয়দ সিরাজুল হক ছিলেন ঢাকা কলেজের আরবি, ফার্সি ও ইংরেজির অধ্যাপক। বাবা-মায়ের উদারমনস্ক সাংস্কৃতিক জীবনদর্শন ও সাহিত্যানুরাগ তাকে লেখালেখির প্রতি এক অমোঘ টানে আবদ্ধ করেছিল।
গোলাম কিবরিয়ার শৈশব কেটেছিল ঢাকার জগন্নাথ কলেজের বিস্তৃত সবুজ প্রাঙ্গণে। বাল্যকাল থেকেই খেলাধুলায় তিনি ছিলেন অদ্বিতীয়। শিকারেও তার ছিল নির্ভুল নিশানা। ভ্রমণ ছিল তার নেশা। সাহসী কৈশোরেই তিনি পেরিয়েছেন বেঙ্গালুর, আসাম আর দার্জেলিং এর পাহাড় পর্বত। মনের খোরাকে ঘুরেছেন এক দেশ থেকে অন্য দেশ।
মঞ্চে অভিনয় করেছেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের একজন সক্রিয় সৈনিক হয়ে লড়েছিলেন ব্রিটিশদের পক্ষে। করেছেন ব্যবসা- সাঙ্গুভ্যালী টিম্বার ইন্ডাস্ট্রি ছিল তার হাতে গড়া প্রতিষ্ঠান। তিনি ইস্পাহানি সাহেবের ব্যবসায়িক পার্টনার ছিলেন। শৈশবেই হয়েছিল তার লেখালেখির হাতেখড়ি। একটি সাহিত্যানুরাগ প্রতিবেশে তিনি বেড়ে উঠেছিলেন, পেয়েছিলেন লেখালেখির খোরাক আর পৃষ্টপোষকতা। তার প্রথম প্রকাশিত লেখা ছিল স্কুল ম্যাগাজিনে। তারপর বিভিন্ন সাময়িকী, পত্র-পত্রিকা, রেডিও-টেলিভিশনে প্রকাশ ও প্রচার। আশৈশব ডায়রি লেখার অভ্যাস ছিল তার। আগেই উল্লেখ করেছি স্বনামে না লিখে তিনি লিখতেন ছদ্মনামে। ‘বিবক্ষু’ ছিল তার ছদ্মনাম। ছদ্মনামে প্রেক্ষাপট বর্ণনায় তিনি লিখেছেন- ‘ছোটবেলায় বেশি কথা বলে মজলিশ জমাতাম। বাবা ধমক দিতেন, বলতেন- সারাদিন বক্ বক্, এখন চুপ্ র্ক। বক্ বক্ করে যে তারই নামান্তর আমি, বিবক্ষু।’
স্বাতন্ত্রিক ধাচে লেখা তার ছোটগল্পে সমসাময়িক সামাজিক হতাশা আরপ্রত্যাশার অনুরণন রয়েছে। প্রাঞ্জল গল্পগুলোর চরিত্রে রয়েছে সরলতা অথচ মুগ্ধকর দৃঢ়তা। জীবনের নানা চড়াই-উতরাই, নানা অভিজ্ঞতায় ত্রিভুজের তিন বিষমবাহুর অসম কিছু গল্প তিনি জমিয়ে রেখেছিলেন। তার নিজ জীবনটিও ছিল-‘নদী ভরা ঢেউ, জানে নাতো কেউ’- এর মতো। হয়তো জীবন-গল্পের সেই রূপময় বিন্যাসে কখনও তার চোখ হয়েছিল উদাসী, কখনও উৎসাহী। সেই উৎসাহ আর উদাস চাহনিতে যে গল্পমালার সৃষ্টি হয়েছিল তার মধ্যে অন্যতম দু’টি গল্পগ্রন্থ হচ্ছে- ‘দু’এ দু’এ পাঁচ’ এবং ‘ম্যাগনোলিয়া’। ‘দু’এ দু’এ পাঁচ’ যেন অসম বাহুর এক জটিল রেখাচিত্র যেখানে সংহার আর উপসংহারের পারস্পরিক কাটাকাটি। আর ‘ম্যাগনোলিয়া’ যেন উল্টো- যেখানে শুভ্র ও স্নিগ্ধ ক’টা পাপড়ির একই বৃন্তে জড়িয়ে থাকবার বাসনা।
দুই আর দুই মিলে পাঁচ হওয়ার সুযোগ না আছে পাটিগণিত-বীজগণিতে, না আছে সম্পাদ্য-উপপাদ্যে। কোনো গাণিতিক সমীকরণেই দু’এ দু’এ পাঁচের হিসেব মেলে না। মূলত সমাজ জীবনের রাফখাতায় না মেলা গল্পগুলোর বয়ানই দু’এ দু’এ পাঁচ। দু’এ দু’এ পাঁচ গল্পগ্রন্থে যোগ-বিয়োগের মোট এগারটি গল্প রয়েছে। বইটি প্রথম প্রকাশিত হয় ১৯৭৪ সালে।
তবে বইয়ের গল্পগুলো ত্রিকালদর্শী। ত্রিকাল এই অর্থে যে- ব্রিটিশকালের দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর গল্পালাপ‘শেঠ্জী’, পাকিস্তানকালের ‘পালোয়ানের প্রেম’ অথবা বাংলাদেশ কালের ‘মানসী’ সব এক মলাটে বন্দি।
‘দু’এ দুু’এ পাঁচ’এইবইয়ের নামগল্প। এ-গল্পটি নানা কারণে গুরুত্বপূর্ণ। বিলেত থেকে ফিরে ডাক্তার সাহেব বিপুল প্রত্যাশায় হাকিম সাহেবের খোদেজা মঞ্জিলে পৌঁছেছে। সময়ের ব্যবধানে গোধুলির ধুলোয় তখন প্রত্যাশাগুলো কেমন জানি বিবর্ণ হয়ে উঠেছে। বাড়ির দেয়ালে নতুন রঙ, জানালায় নতুন পর্দা অথচ ডাক্তার সাহেব কিংকর্তব্যবিমূঢ় পাথরের মূর্তি হয়ে গেছে কয়েকটি অপ্রত্যাশিত মৃত্যুর সংবাদে। তিনি কোন সূত্রেই জীবনের হিসেব মেলাতে পারছেন না। জীবনের জটিল অংকে দুইকে দুই দিয়ে গুণ করে চার বানাতে পারেননি, পারেননি দুইকে দুই দিয়ে যোগ করেও চার বানাতে।
গাণিতিক সূত্রে হিসেব না মেলা আরেকটি গল্প ‘শেঠ্জী’।গল্পটি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরপরই ভারতবর্ষের নৈতিক দুর্বলতার একটি যথার্থ প্রতিফলন। দার্জেলিং মেলের পার্ব্বতীপুর জংসনে গল্পের শুরু আর গল্পের শেষ কলকাতার শেষ স্টেশনে এসে। ‘গাবা এক মাড়োয়ারী- হতে ঘটী, কাঁধে কম্বল’ওয়ালা এক শেঠ্জীর শঠতা এবং রেল টিটিরদের একের পর এক শঠতার ক্রমে ব্যতিক্রম এক ঘটনাপ্রবাহ নিয়ে ‘শেঠ্জী’ রচিত। শঠতায় শঠতায় পাঁচ টাকার টিকিট শেষ পর্যন্ত একান্ন টাকা বারো আনায় গিয়ে ঠেকেছে।
‘দু’এ দুু’এ পাঁচ’-এর গল্পগুলোয় হিসেবের গরমিল থাকলেও রোমান্টিসিজমের কিছু মিল অবশ্য রয়েছে। এই বইয়ের অন্যতম রোমান্টিক গল্প হচ্ছে ‘গ্রহ বিপাক’। গ্রহ বিপাকেও শেঠ্জীর সেই রেলওয়ের ঝকঝকানি। প্রাক্তন প্রেয়সীর গোপন আহ্বানে সে ছিল এক অভিসারযাত্রা। সিলেট জংসন থেকে রশিদপুর স্টেশনের পথ। কিন্তু প্রেমিক আবেগের আতিশয্যে স্টেশনের সমীকরণ মেলাতে পারেনি; ভুল করে নেমে পড়েন রশিদপুরের আগের স্টেশন সাতগাঁওয়ে। ভুল দরজায় টোকা দিয়ে প্রেমের উপসংহারে পেঁছাবার আগেই তার জীবনসংহারে পৌঁছাবার উপক্রম।গলপগ্রন্থের ‘রাজপথ’, ‘মতি ডাক্তার’, বেয়াই সাহেব’, হীরের হার’, ‘নটবর’, বা ‘বিচার’- সবগুলোই ভিন্ন ভিন্ন রস-রসদে ভরা। গল্পগুলোর বুননে হঠাৎ হঠাৎ অপ্রত্যাশিত বাঁক। গল্পগুলো শেষ হয় বটে, কিন্তু পাঠকের অতৃপ্ত আকাঙ্ক্ষায় থেকে যায় রবীন্দ্রনাথের সেই ‘শেষ হইয়াও হইলো না শেষ’।এগারোটি গল্পের মধ্যে তুলনামূলক কোনটা কম ভালো লেগেছে সেটা বুঝতে চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়েছি।
সৈয়দ গোলাম কিবরিয়ার যে ক’টা গল্পের সঙ্গে পরিচিত হওয়া গেছে- অধিকাংশগুলোই গত শতাব্দীর মধ্য দশকের। আমরা আরেকটি শতাব্দীর মধ্য দশকে উপনীত। কিন্তু তার গত শতাব্দীর গল্পগুলোর প্রাসাঙ্গিকতায় ধুলো জমেনি আজও। সুতরাং সময়ের প্রাসাঙ্গিক প্রয়োজনেই সৈয়দ গোলাম কিবরিয়ার হারিয়ে যাওয়া গল্পগুলোকে উদ্ধার করা প্রয়োজন, তার পাণ্ডুলিপিগুলোর সন্ধান-অনুসন্ধান করা প্রয়োজন। না হলে সৈয়দকালের এক উপেক্ষিত সৈয়দের সাহিত্যরস থেকে বাঙালি পাঠক বঞ্চিত হবে, অভূক্ত রবে।
সৈয়দ গোলাম কিবরিয়া ৩১ বছর আগে ১৯৯৫ সালের ৩১ মার্চ পরলোকগমন করেন। বাংলা সাহিত্যের অনাবিষ্কৃত এই গল্পকারের পরলোকগমনের মাসে তার স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানাই। প্রত্যাশা করি অবহেলার পাঁচিলে গজিয়ে ওঠা আগাছা-লতায় অথবা সময়ের অগোছালোতায় বলি হওয়া তার সমস্ত রচনাবলী উদ্ধার করা সম্ভব হবে।
