আল মাহমুদ : জীবন ও কবিতা

মজিদ মাহমুদ

প্রকাশ : ১৮ জুলাই ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

আল মাহমুদ বাংলা সাহিত্যের এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ সময়ের কবি- যখন বাঙালি তথা পূর্ববঙ্গের মানুষের আত্ম-পরিচয়ের প্রয়োজন হয়ে পড়েছিল। যখন ‘অতীতকে বাদ দিলে আজ তার কোনো কিছু নেই।’ তখন ‘শ্রীজ্ঞানের জন্মভূমি এই শীলভদ্র নিয়েছিল নিঃশ্বাসের প্রথম বাতাস।’ পাকিস্তান পর্বে যে বাঙালি জাতীয়তাবাদী চেতনা- যে চেতনা সংগঠিত হয়েছিল প্রথমত বণিক ও শিক্ষিত মধ্যবিত্ত এলিট শ্রেণি দ্বারা- সেই আন্দোলনকে মাটি-সংলগ্ন করার জন্য তার বিশাল গ্রামীণ জীবনের পটভূমিকার প্রয়োজন দেখা দিয়েছিল; আল মাহমুদ ‘সোনালী কাবিন’-এ সেই নির্মিতির কাজটি করেছিলেন।

একজন চারণ কবির মতো প্রেরণাকে ভর করে একের পর এক বয়ান করলেন- তার স্বদেশ ও স্বজাতির কথা। জর্জ ডারওয়েন্ট টমসনের ‘মার্কসিজম এন্ড পয়েট’ অনুসারে বলতে হয়, ‘যুবকেরা তার চারিদিকে ভিড় করে দাঁড়ালো। তাদের তিনি বীরগাঁথা শোনাতে বাধ্য হলেন। তার গান ছিল গলার জোর আরোপ করে বের করা সুর, গানের চেয়ে বরং ঘর্ঘর শব্দের মতোই। কিন্তু যতই সে উত্তেজিত হয়ে উঠতে থাকলো ততই তার টোকাগুলো হয়ে উঠল চঞ্চল। বর্ণিত যুদ্ধ যতই তীব্র হয়ে উঠতে থাকল, গায়ক ও তার যুবক শ্রোতাদের আবেগও তত তীক্ষèতর হয়ে উঠতে লাগলো।’

আল মাহমুদ তখন তার তরুণ যোদ্ধাদের সমর কৌশল আর সৈন্য মোতায়েনের কথা জানিয়ে দিলেন। বললেন- ‘আমাদের সঙ্গে এক বাউলের বিধবা যাবেন/ উষ্ণ বয়সিনী এই বঙ্গ নাম্নী বৈষ্ণবীটি ছাড়া/ তৃষ্ণার রাস্তায় আর অন্য কোনো যুবতী যাবে না।’ এমন নিস্কাম বাক্য এমন উপায়ে এর আগে আর কে বলেছিলেন! এমন কামময় জীবনে দেশ প্রেমের জান্তব বাণী- ‘বঙ্গ’ নাম্নী বৈষ্ণবী ছাড়া আর কোনো যুবতী যাবে না। কেবল চর্যার কাহ্নপার- ‘আলো ডোম্বি তোএ সম করিবে ম সাঙ্গ’-এর সঙ্গে শুধু তুলনা হতে পারে। আল মাহমুদ তার স্বদেশ চেতনাকে দেখেছেন- হাজার বছর ধরে গ্রামীণ জীবনের উৎপাদক শ্রেণিকুল যেমন তার নারীকে, ভূমি ও কৃষি উৎপাদনকে, সন্তান ও গবাদি পশুকে যেমন জীবনের অবিচ্ছেদ্যতার মধ্যে দেখেছেন- তেমন করে।

আল মাহমুদের বিষয় বর্ণনার ক্ষেত্রে অতিমাত্রায় কামজ চেতনা আধুনিক রুচির কাছে প্রশ্নের উদ্রেক করতে পারে; কিন্তু তার জন্য কবি দায়ী নন। কৃষিভিত্তিক সমাজের ভাষা ও প্রকাশের সঙ্গে নগর কেন্দ্রিক সভ্যতার দূরত্ব এর জন্য দায়ী। ‘মাৎ?স্যন্যায়ে সায় নেই, আমি কৌম সমাজের লোক/ সরল সাম্যের ধ্বনি তুলি নারী তোমার নগরে।’

আল মাহমুদ যে সব কারণে বাংলা কবিতায় গুরুত্বপূর্ণ- এ আলোচনায় তার দু’একটি ইঙ্গিত দেওয়া যেতে পারে। হাজার বছরে বাঙালির কাব্যপাঠের যে অভিজ্ঞতা তাতে আল মাহমুদণ্ডই ব্যাপকভাবে কবিতায় শহর ও নগর জীবনের পার্থক্য ঘুচিয়ে দিয়েছেন। তার কাব্য নির্মাণের পথে কোনো প্রবল পূর্বসূরি ছিল না। বিষয়-মাহাত্ম্যের ক্ষেত্রে জীবনানন্দ কখনও কখনও তাকে আলোড়িত করেন, তার মহাপৃথিবীর পথে তিনি হাঁটেন। কিন্তু ভাষা নির্মাণের ক্ষেত্রে পঞ্চাশ বা ষাট দশকের অনেক শক্তিশালী কবির মতো জীবনানন্দ দাশ বা তিরিশের কবিতার অনুগামী নন তিনি।

তিনি নাগরিক জনরুচির কাছে তুলে ধরেছেন গ্রামীণ নিম্নবর্গীয় শ্রমিক-শ্রেণির মানুষের জীবন যাপনের প্রণালী। তাদের প্রেম-কাম-শ্রম ও ঘামের গন্ধ- কথিত নাগরিকদের ড্রয়িং রুম পর্যন্ত পৌঁছে দিতে পেরেছেন। তার কবিতার প্রতিটি শব্দ শব্দশ্রমিকের মতো সজীব কর্মতৎপর ও বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত। বাঙালি জাতির যে ধারণাটি আমরা বয়ে নিয়ে বেড়াচ্ছি তা নিঃসন্দেহে ভাষা কেন্দ্রিক; আর ভাষার সামগ্রিক অস্তিত্ব শুধু সমকালীন নয়।

একটি ভাষাগোষ্ঠী বিলুপ্ত হলেও সেই ভাষার রচনাবলী ও কবিতা থেকে সেই জাতির পরিচয় পুনর্নির্মাণ করা যায়। জৈব-জীবনের মধ্যে মানুষের জীবন সীমাবদ্ধ; কিন্তু ভাষার জীবন সেই ভাষাগোষ্ঠীর সমান বয়সী। আজকে বিশেষ করে মানব জাতির ইতিহাস নির্মাণের যে কৌশল- কেন্দ্রের অফিসিয়াল ভাষ্যের বাইরে থেকে তার ভাষা ও সাহিত্যের উপাদান থেকে কর্মময় মানুষের কোলাহল তৈরি করা।

আল মাহমুদের কাব্যভাষায় একটি জাতির হাজার বছরের ক্রিয়াভিত্তিক শব্দরাজি পরম সফলতার সঙ্গে ধরা দিয়েছে- যা থেকে হাজার বছরের বাংলাদেশের বাঙালির একটি ইতিহাস পুনর্গঠিত করা যায়।

আল মাহমুদের কবিতা ভবিষ্যতে সাবঅলটার্ন ইতিহাস রচয়িতার কাছে অতিব মূল্যবান হবে- সে কথা এখন বলা যায়। তাছাড়া আল মাহমুদের কবিতার আরেকটি গুরুত্বের দিক- গ্রাম ও নগরের মিথস্ক্রিয়ার ফলে উদ্ভূত মানসিক সংকট কালে- গ্রাম ও শহরের- উভয় অংশের মানুষের যোগাযোগের ক্ষমতাণ্ডসম্পন্ন ভাষ্য তৈরি করা। শহর যখন গ্রামের মধ্যে ঢুকে যাচ্ছিল- শহরে আগত তরুণদের পিতামাতা তখনো গ্রামে বাস করছিল, কিংবা পিতার কবর জেগে ওঠা চরের পিঠের মতো আশ্রয় নিয়ে জেগে ছিল- তখন আল মাহমুদের কবিতা যোগাযোগের মাধ্যম হিসাবে দারুণ কাজ করেছিল। পূর্ব পুরুষের পেশা ও ভাষার লজ্জা থেকে তারা মুক্তি পেয়েছিল।

আজকে রাজধানী কেন্দ্রিক সংস্কৃতির যে ধারা পরিপুষ্ট হচ্ছে- তার গ্রামীণ উত্তরাধিকার হারিয়ে যাচ্ছে। যদিও বাংলাদেশের কৃষিভিত্তিক সমাজের কাঠামো খুব অল্প-ই পরিবর্তন হয়েছে। কারণ, রাজধানীর পরিপূর্ণ জনঘনত্ব- গ্রাম থেকে সহজে কাউকে আসতে দিচ্ছে না। আসলেও তারা মারাত্মক সংখ্যালঘু। আর রাজধানীতে যে সব তরুণ বেড়ে উঠছে- তাদের গন্তব্য অন্য দেশের রাজধানী। যৌবনে আল মাহমুদ গ্রামের কালো কৃষকদের এনে রাজধানী অবরোধ করতে চেয়েছিলেন। আল মাহমুদ নিজেও সে চিন্তার জায়গা থেকে হয়তো বেরিয়ে এসেছিলেন। নোঙ্গর করতে চেয়েছিলেন ইতিহাসের কালের সময় চেতনার মধ্যে দেশীয় সংস্কৃতি ও ধর্মের মধ্যে যে বাঙালি জাতি তার আশ্রয় খুঁজেছে।

সাহিত্যের নির্মম ইতিহাসের পাতায় হাতে গোনা যে ক’জন কবির নাম উৎকীর্ণ হয়ে থাকবে বলে যে অনুমান করা যায়- আল মাহমুদ তাদের অন্যতম প্রধান। সব দেশে সব কালে গরীব, নির্যাতিত, প্রান্তিক, সংখ্যালঘু ও দুর্বল জনগোষ্ঠীর কথা কবি ছাড়া আর কে বলবেন? আল মাহমুদের চেয়ে এ কথা বাংলা কবিতায় আর কে-ই বা ভালো করে জানতেন! আর কে-ই বা এমন লিখেছিলেন-

‘পূর্ব পুরুষেরা কবে ছিল কোন সম্রাটের দাস

বিবেক বিক্রয় করে বানাতেন বাক্যের খোয়াড়,

সেই অপবাদে আজো ফুঁসে ওঠে বঙ্গের বাতাস।’

আল মাহমুদ সাহিত্য প্রায় রবীন্দ্রনাথের মতো বৈচিত্র্যময় ও ব্যাপক। তার সাহিত্য-কর্ম একক কোনো রচনায় ধরা সম্ভব নয়। এ আলোচনা মূলত তার কাব্য-সাহিত্যের অবস্থান ও গুরুত্বের প্রতি আলোকপাত করা হয়েছে। কবির জীবনের নানা সংকট, দেশের রাজনৈতিক সমর্থনের অভাব, অস্থির সিদ্ধান্ত, চিন্তার অস্থিরতা জাতীয় চেতনার প্রেক্ষণবিন্দু থেকে নানা সময়ে দূরে থাকতে হয়েছে তাকে। দেশের গুরুত্বপূর্ণ কবি হয়েও তাকে অনেক ক্ষেত্রে অগুরুত্বপূর্ণ জীবনযাপন করতে হয়েছে।

মাঝে মাঝে এ ভাবনা অস্বাভাবিক নয়, আল মাহমুদের কবিতাগুলো আল মাহমুদ না লিখে যদি একটি রোবট লিখত তাহলে কত ভালোই না হতো! তাতে অন্তত আমাদের মতো রক্ত মাংসের কবিদের আরেকজন রক্ত-মাংসের কবির প্রতি ঈর্ষান্বিত হওয়ার কারণ ঘটত না! আল মাহমুদও অপরাপর শরীরধারী কবির মতো রাগ ক্ষোভ ও প্রতিবাদের সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন। মুক্তিযুদ্ধ থেকে শুরু করে মুক্তিযুদ্ধোত্তর সময়ে তার নিজের উপায়ে উত্তম প্রতিবাদ করেছেন। রাজনৈতিক ভাস্যের নানা বৈপরীত্যে তিনি নিজের চিন্তাকে নমনীয় না করে এক জাতীয় স্বপ্নযাত্রার ভাস্য তৈরি করতে চেয়েছেন।

একই সঙ্গে আমাদের বস্তু ও ধারণার জগতে বসবাস করতে হয়। আল মাহমুদ শিল্পজগতের লোক হয়েও আমাদের বস্তু জগতের মানুষদের সংকীর্ণতা বারবার স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন যে, তার জগতের মানুষেরা আপত তার চেতনার বিপরীত দাবি করেও তারচে নিচুতা মোচন কমই করতে পেরেছেন।

তার কবিতা সর্বদা স্বপ্ন দেখাতে উদ্যত ছিল। তিনি মনে করতেন কবির কাজ জাতিকে স্বপ্ন দেখানো। এদেশের রাজনীতি সবকিছুকেই নষ্ট করে দিতে চায়, সব কিছুকেই দলীয় অর্জনে রূপান্তর করতে চায়। আল মাহমুদ বড় কবি হলেও রাজনীতিকে নিজের মতো প্রবাহিত করতে পারেনি। কবির রাজনৈতিক প্রয়োজনীয়তা অচিরেই ফুরিয়ে যাবে, কিন্তু কবিতাণ্ডসাহিত্যের প্রয়োজনে আল মাহমুদ দিনে দিনে আরও উজ্জ্বল হয়ে উঠবেন।