ঢাকা শনিবার, ০১ আগস্ট ২০২৬, ১৭ শ্রাবণ ১৪৩৩ | বেটা ভার্সন

রবীন্দ্রনাথের সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক বহুত্ববাদ

শাহেদ কায়েস
রবীন্দ্রনাথের সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক বহুত্ববাদ

বিশ্বজুড়ে যখন ধর্মীয় বিভাজন, জাতিগত সংঘাত, ভাষাগত বিদ্বেষ এবং সাংস্কৃতিক অসহিষ্ণুতা ক্রমশ তীব্র হচ্ছে, তখন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সাহিত্য নতুন তাৎপর্য নিয়ে আমাদের সামনে ফিরে আসে। তার রচনায় নান্দনিক সৌন্দর্যের পাশাপাশি মানুষের পারস্পরিক সম্পর্ক, বৈচিত্র্যের প্রতি শ্রদ্ধা এবং মুক্তচিন্তার গভীর দর্শনও সমানভাবে প্রবাহিত। মানুষের পরিচয়কে তিনি কখনও একক কোনো ধর্ম, ভাষা, জাতি কিংবা ভূখণ্ডের সীমায় আবদ্ধ করেননি। মানুষের মধ্যে যে বহুমাত্রিক সত্তা, যে মিলন প্রবণতা, যে সৃজনশীল শক্তি, সেটিকেই তিনি সাহিত্যের কেন্দ্রে স্থাপন করেছেন।

আজকের পৃথিবীতে সাংস্কৃতিক বহুত্ববাদ নিয়ে যত আলোচনা, তার অনেক আগেই রবীন্দ্রনাথ নিজের সাহিত্য, সংগীত, নাটক, প্রবন্ধ এবং শিক্ষা-চিন্তার মাধ্যমে এমন এক মানবিক সমাজের স্বপ্ন এঁকেছেন, যেখানে ভিন্নতা সৌন্দর্যের উৎস। তার কাছে বৈচিত্র্য ছিল সভ্যতার প্রাণশক্তি। একরূপতা মানুষকে যান্ত্রিক করে, আর বহুত্ব মানুষের কল্পনাশক্তিকে প্রসারিত করে।

রবীন্দ্রনাথের সাহিত্য পাঠ করলে স্পষ্ট বোঝা যায়, তিনি সংস্কৃতিকে কোনো স্থির ধারণা হিসেবে ভাবেননি। নদীর মতো সংস্কৃতিও চলমান। নানা অঞ্চল, নানা জাতি, নানা ভাষা এবং নানা অভিজ্ঞতার সংযোগে তার বিকাশ ঘটে। সেই কারণেই তিনি ভারতীয় ঐতিহ্যকে ভালোবেসেছেন, আবার পাশ্চাত্যের জ্ঞান, বিজ্ঞান ও সাহিত্য থেকেও গ্রহণ করেছেন উন্মুক্ত মনে। তার চিন্তায় গ্রহণ ও বিনিময় ছিল সভ্যতার স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। এ ভাবনারই কাব্যিক প্রকাশ ঘটেছে তার বিখ্যাত কবিতা ‘চিত্ত যেথা ভয়শূন্য’-এ

‘চিত্ত যেথা ভয়শূন্য, উচ্চ যেথা শির,

জ্ঞান যেথা মুক্ত, যেথা গৃহের প্রাচীর

আপন প্রাঙ্গণতলে দিবসশর্বরী

বসুধারে রাখে নাই খণ্ড ক্ষুদ্র করি।’

কবিতার এ কয়েকটি পংক্তি শুধু স্বাধীনতার আকাঙ্খক্ষা প্রকাশ করে না; মানুষের মানসিক মুক্তি, সংকীর্ণতার অবসান এবং বিশ্বজনীনতার আহ্বানও বহন করে। ‘গৃহের প্রাচীর’ এখানে শুধু ইট-পাথরের দেয়ালকে নির্দেশ করে না; ধর্মান্ধতা, বর্ণবিদ্বেষ, সংকীর্ণ জাতীয়তাবাদ এবং সাংস্কৃতিক অহংকারেরও প্রতীক হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে।

রবীন্দ্রনাথ বিশ্বাস করতেন, মানুষের পরিচয়ের সবচেয়ে বড় ভিত্তি তার মানবিকতা। জন্ম পরিচয়, ভাষা কিংবা ধর্ম মানুষের জীবনের অংশ, কিন্তু মানুষের সম্পূর্ণ পরিচয় না। সেই কারণেই তার সাহিত্যে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষ একই মানবিক বৃত্তের ভেতর স্থান পেয়েছে। কোথাও মুসলমান কৃষক, কোথাও ব্রাহ্মণ, কোথাও বাউল, কোথাও সাঁওতাল, কোথাও রাজা, কোথাও আবার পথের ভিখারি। সামাজিক অবস্থান আলাদা হলেও মানুষের অনুভূতি, আনন্দ, বেদনা এবং ভালোবাসা একই সুতোয় গাঁথা।

‘কাবুলিওয়ালা’ গল্পে আফগান বণিক রহমত এবং ছোট্ট মিনির সম্পর্ক জাতীয়তার সীমা অতিক্রম করে পিতৃত্বের সার্বজনীন অনুভূতিকে সামনে নিয়ে আসে। দুই ভিন্ন সংস্কৃতির মানুষ পরস্পরের মধ্যে আত্মীয়তা খুঁজে পায়। সেখানে রাজনৈতিক পরিচয়ের চেয়ে

মানবিক সম্পর্ক বড় হয়ে ওঠে।

আবার ‘গোরা’ উপন্যাসে রবীন্দ্রনাথ ধর্মীয় পরিচয়, জাতপাত এবং জাতীয়তাবাদের সংকীর্ণ ধারণাকে গভীরভাবে বিশ্লেষণ করেছেন। গোরা নিজের জন্ম পরিচয় জানার পর উপলব্ধি করে, মানুষের পরিচয় কোনো একক ধর্মীয় কাঠামোর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না। মানুষের প্রতি ভালোবাসাই তার বৃহত্তম পরিচয়। উপন্যাসের এ দার্শনিক গভীরতা আজও সমান প্রাসঙ্গিক। পৃথিবীর নানা প্রান্তে যখন ধর্মের পরিচয়কে রাজনৈতিক অস্ত্রে পরিণত করা হচ্ছে, তখন রবীন্দ্রনাথ মানুষের আত্মণ্ডপরিচয়কে আরও বিস্তৃত পরিসরে দেখতে আহ্বান জানান।

রবীন্দ্রনাথের গানেও সাংস্কৃতিক বহুত্ববাদের গভীর প্রকাশ রয়েছে। ভারতীয় রাগসংগীত, বাউল, কীর্তন, ভাটিয়ালি, পাশ্চাত্য সুর ও লোক-ঐতিহ্যের নানা উপাদান মিলিয়ে তিনি এক স্বতন্ত্র সংগীতধারা নির্মাণ করেছেন। ‘আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি’ গান মাতৃভূমির প্রতি গভীর ভালোবাসার পাশাপাশি অন্য সংস্কৃতির প্রতিও সম্মানবোধের দৃষ্টান্ত তুলে ধরে। আবার ‘যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে তবে একলা চলো রে’ গানটি সত্য, মানবিকতা ও উদার মূল্যবোধের পক্ষে সাহসের সঙ্গে দাঁড়ানোর আহ্বান জানায়, যা বহুত্ববাদী সমাজ গঠনের জন্য অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।

লোকসংস্কৃতির প্রতিও রবীন্দ্রনাথের আকর্ষণ ছিল গভীর। লালন ফকিরের গান তাকে বিশেষভাবে অনুপ্রাণিত করেছিল। বাউল দর্শনের অন্তর্নিহিত মানবতাবাদ তার চিন্তাকে সমৃদ্ধ করেছে। মানুষের অন্তর্জগতকে আবিষ্কারের এ আকাঙ্খা ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতার বাইরে গিয়ে আত্মিক স্বাধীনতার পথ খুলে দেয়। তিনি কখনও সংস্কৃতিকে শহুরে অভিজাত সমাজের সম্পত্তি হিসেবে ভাবেননি। গ্রামীণ জীবন, লোকবিশ্বাস, কৃষকের উৎসব, ঋতুচক্র এবং সাধারণ মানুষের সৃজনশীলতাকে তিনি সাহিত্যিক মর্যাদা দিয়েছেন। ফলে বাংলা সাহিত্য নতুন প্রাণশক্তি লাভ করেছে। ‘আমার মাথা নত করে দাও হে তোমার চরণ ধুলার তলে’ গানটির বিনয় ব্যক্তিগত ভক্তির প্রকাশ হলেও তার মধ্যে এক গভীর মানবিক শিক্ষা লুকিয়ে আছে। মানুষ যখন অন্যকে সম্মান করতে শেখে, তখন সাংস্কৃতিক সহাবস্থানও সহজ হয়ে ওঠে। বহুত্ববাদের অন্যতম শর্ত বিনয়। নিজের সংস্কৃতিকে শ্রেষ্ঠ মনে করার প্রবণতা সংঘাত সৃষ্টি করে, আর পারস্পরিক সম্মান শান্তির পথ খুলে দেয়।

শিক্ষা নিয়ে রবীন্দ্রনাথের ভাবনাতেও বহুত্ববাদের সুস্পষ্ট উপস্থিতি রয়েছে। শান্তিনিকেতন প্রতিষ্ঠার মূল উদ্দেশ্য ছিল এমন এক শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলা, যেখানে প্রকৃতি, শিল্প, বিজ্ঞান এবং বিশ্ব-সংস্কৃতির মিলন ঘটবে। মুখস্থনির্ভর শিক্ষার পরিবর্তে তিনি কৌতূহল, সৃজনশীলতা এবং আন্তঃসাংস্কৃতিক সংলাপকে গুরুত্ব দিয়েছেন। পরে বিশ্বভারতী প্রতিষ্ঠার সময় তিনি লিখেছিলেন, ‘যত্র বিশ্ব ভবত্যেক নীড়ম্।’ অর্থাৎ সমগ্র বিশ্ব যেন এক নীড়ে পরিণত হয়। এ ভাবনা কোনো রাজনৈতিক বিশ্বায়নের ধারণা ছিল না; মানুষের জ্ঞান, সংস্কৃতি এবং মানবিকতার মিলনক্ষেত্র নির্মাণের স্বপ্ন ছিল।

নাট্যসাহিত্যে রবীন্দ্রনাথ বারবার ব্যক্তি-স্বাধীনতা এবং সামাজিক বৈচিত্র্যের প্রশ্ন তুলেছেন। ‘রক্তকরবী’ নাটকে যন্ত্রসভ্যতার বিরুদ্ধে মানুষের সৃজনশীল শক্তির জয়গান উচ্চারিত হয়েছে। ‘মুক্তধারা’ ক্ষমতার কেন্দ্রীভূত রূপের বিরুদ্ধে মানুষের স্বাধীন চেতনার পক্ষে দাঁড়ায়। সেখানে মানুষকে একরকম করে গড়ে তোলার প্রবণতার সমালোচনা স্পষ্ট। রবীন্দ্রনাথের ভাবনায় বহুত্ববাদ মানে বিভিন্ন সংস্কৃতির সহাবস্থানের পাশাপাশি সমান মর্যাদার ভিত্তিতে পারস্পরিক সম্পর্ক গড়ে তোলা। তাই শুধু সহনশীল হলেই চলে না; অন্যের অস্তিত্বের প্রতি আন্তরিক সম্মানও অপরিহার্য।

আজকের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের যুগে এ শিক্ষা আরও গুরুত্বপূর্ণ। অ্যালগরিদম অনেক সময় মানুষকে ভিন্নমত থেকে দূরে সরিয়ে দেয়।

মানুষ নিজের মতো মানুষের সঙ্গেই সীমাবদ্ধ থাকে। ফলে বিভাজন বাড়ে। রবীন্দ্রনাথের সাহিত্য সেই সংকীর্ণ বৃত্ত ভেঙে অপরের অভিজ্ঞতার সঙ্গে পরিচিত হতে আহ্বান জানায়। সাহিত্য মানুষের কল্পনাশক্তিকে প্রসারিত করে বলেই সে অন্যের জীবনও অনুভব করতে পারে। ধর্মীয় সহিষ্ণুতার প্রশ্নেও রবীন্দ্রনাথের অবস্থান ছিল স্পষ্ট। তিনি ধর্মের আধ্যাত্মিক শক্তিকে শ্রদ্ধা করেছেন, কিন্তু ধর্মান্ধতার বিরোধিতা করেছেন দৃঢ়ভাবে। তার কাছে ধর্ম ছিল মানুষের আত্মিক বিকাশের পথ, ক্ষমতা বা বিভাজনের অস্ত্র নয়।

তার প্রবন্ধ ‘সভ্যতার সংকট’ পড়লে বোঝা যায়, যুদ্ধ, সাম্রাজ্যবাদ এবং জাতিগত অহংকার নিয়ে তিনি কত গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন। ইউরোপীয় সভ্যতার বৈজ্ঞানিক অগ্রগতি তাকে মুগ্ধ করলেও মানবিক মূল্যবোধের অবক্ষয় তাকে ব্যথিত করেছিল। সেই কারণেই তিনি সভ্যতার মূল ভিত্তি হিসেবে মানুষকেই সামনে এনেছেন। রবীন্দ্রনাথের কবিতায় প্রকৃতি বহুত্বের এক অনন্য প্রতীক। নদী, বন, পাখি, ফুল, মেঘ ও ঋতুচক্রের বৈচিত্র্যের মধ্যেই তিনি জীবনের সৌন্দর্য খুঁজে পেয়েছেন। বলাকা কাব্যে গতি ও পরিবর্তনের মাধ্যমে সংস্কৃতির চলমান বিকাশের ধারণা প্রকাশিত হয়েছে। আজকের সংঘাতপূর্ণ বিশ্বে তার সাহিত্য আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়, ভিন্নতার মধ্যেই মানবসভ্যতার শক্তি এবং মানুষের মর্যাদা কোনো সীমান্তে সীমাবদ্ধ নয়।

বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক বাস্তবতাতেও রবীন্দ্রনাথের এ দৃষ্টিভঙ্গি বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। বাংলা ভাষা, লোক ঐতিহ্য, বৈচিত্র্যময় ধর্মীয় ও জাতিগত পরিচয়, পাহাড় ও সমতলের সংস্কৃতি, গ্রাম ও শহরের জীবনধারা- সব মিলিয়েই আমাদের সামগ্রিক সাংস্কৃতিক পরিচয় গড়ে উঠেছে। বৈচিত্র্য সংরক্ষণ একই সঙ্গে ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতা বজায় রাখে এবং মানবিক সমাজ নির্মাণের পথকে আরও দৃঢ় করে। রবীন্দ্রনাথ আমাদের বুঝিয়েছেন, সংস্কৃতির শক্তি মানুষের হৃদয়ে। রাষ্ট্র আইন তৈরি করতে পারে, প্রতিষ্ঠান কাঠামো গড়তে পারে, কিন্তু মানুষের মধ্যে পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সহমর্মিতা এবং সৌন্দর্যবোধ জাগিয়ে তোলার কাজ সাহিত্য ও শিল্পই দীর্ঘকাল ধরে করে এসেছে। তার সাহিত্য তাই আজও আমাদের সামনে এক বিস্তৃত মানবিক দিগন্ত উন্মোচন করে। সেখানে ভিন্ন ধর্মের মানুষ পাশাপাশি হাঁটে, ভিন্ন ভাষার মানুষ পরস্পরের কথা শোনে, ভিন্ন সংস্কৃতির মানুষ একে অপরের সৃষ্টিকে সম্মান করে। বৈচিত্র্যের মধ্যেই সভ্যতার সৌন্দর্য, আর সেই সৌন্দর্যের সবচেয়ে উজ্জ্বল শিল্পরূপগুলোর একটি রবীন্দ্রনাথের সমগ্র সাহিত্য।

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত