গল্প
শীতল সড়ক
মেহেদী উল্লাহ
প্রকাশ : ০১ আগস্ট ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

সরু পিচঢালা রাস্তাটি যেন গ্রামের ধমনী। দুই ধারে ছড়িয়ে আছে চা-বাগানের শ্রমিকঘেরা ছোট ছোট টিনের ঘর, প্রতিটি ঘরের কেউ না কেউ চা পাতা তোলে- নারী-পুরুষ সবাই। পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়া উপজেলার শালবন হাট। এই পিচঢালা রাস্তার বুক জুড়ে শুকানো হয় ভুট্টা, ধান ও লঙ্কা।
মে মাসের শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে গ্রামটা। এই ঋতুতে ফসল ওঠে, রোদ গনগনে, কিন্তু আকস্মিকভাবে আকাশে মেঘ আসে আজ। দুপুর গড়িয়ে বিকাল হতেই ঘন মেঘ এসে ঢেকে ফেলে সূর্য। অল্প পরেই নামে গুড়িগুড়ি বৃষ্টি।
গ্রামের মানুষ ব্যস্ত হয়ে ওঠে। যে যার মতো দৌঁড়ে আসে নিজের শুকাতে দেওয়া ফসল তুলতে। রাস্তার ওপর বিছানো ধান-লঙ্কা-ভুট্টা কেউ তুলে নেয় ঝুড়িতে, কেউ বস্তায়।
তরিকাও বসে পড়ে। লাল মরিচগুলো হাতের জোরে জমিয়ে গুটিয়ে নেয়। বয়স ত্রিশ হলেও মুখের রেখাগুলো যেন পঞ্চাশের ঘর ছুঁয়ে গেছে অনেক আগেই। ফ্যাকাসে গায়ের রঙ, কালি জমা চোখের কোণে ক্লান্তি- অথচ কর্মঠ নারীর চেহারা।
রাস্তা যতটা উত্তপ্ত ছিল বৃষ্টির আগে, ততটাই শীতল হয়ে ওঠে ফোঁটাগুলো পড়তেই। তরিকাও ভিজে যায়- তার ঘামে ভেজা নাকফুলটার ঘাম ধুয়ে দেয় ফোঁটা, গড়িয়ে নামে গালে।
কেউ কেউ ভাবে, এই বৃষ্টি বুঝি চলেই যাবে, রোদ উঠবে আবার। ফসল বিছানো যাবে। তরিকাও চেয়ে থাকে আকাশের দিকে। কিন্তু মন বলে, এ বৃষ্টি ফুরোবে না সহজে।
তার পাশে হামাগুড়ি দিচ্ছে দুই বছরের সন্তান। একদিকে মরিচের গোটানো বস্তা, অন্যদিকে সন্তান, মাঝখানে সিক্ত পিচঢালা রাস্তাটা যেন তার আয়না। এই গ্রামে এসেছে তিন বছর হলো। এর আগেও ঘর করেছে দুটি গ্রামে। প্রথম বিয়ে হয়েছিল মাত্র চৌদ্দ বছর বয়সে। সেই স্বামী হুট করে হারিয়ে গিয়েছিল। দ্বিতীয় বিয়ের স্বামীও হঠাৎই উধাও। তিনটি সন্তান- এখন এতিমখানায়।
প্রথম বিয়েকালীন সে ঠিকমতো নিজের গায়ের ঘাম আর চোখের পানি আলাদা করে চিনত না! গ্রামের এক চা শ্রমিকের সঙ্গে বিয়ে দিয়ে দেওয়া হয় তাকে। সেই ঘরেই শুরু হয় গৃহস্থালির বোঝা টানা। স্বামী ছিল সন্দেহপ্রবণ, খিটখিটে মেজাজের। কথায় কথায় হাতে তুলত বাঁশের কঞ্চি। তরিকা ভয় পেত না, তবে বোবা হয়ে গিয়েছিল। পাল্লা দিয়ে আসত শাশুড়ির অপমান, ‘এত খায়, তবু মুখ শুকনা গরুর মতো।’ তরিকার মুখ শুকিয়ে থাকত ঠিকই, কিন্তু চোখের কোণ সবসময় ভিজে থাকত। সেই ঘরে এক বছরের মাথায় গর্ভে এসেছিল এক সন্তান। তখনই স্বামী রাতের আঁধারে গলা চেপে বলেছিল, ‘এই বাচ্চা কার?’ এক বাক্যে সংসারের মূল ভিত্তিটা ভেঙে পড়ে। কয়েকদিন পর এক সকালে উঠে দেখে, স্বামী নেই, তার জমানো একশো টাকাও নেই। শুধু পেছনে ফেলে যাওয়া একটা পুরনো গামছা জানলায় দুলছিল বাতাসে। তরিকাকে ফিরিয়ে নেয়নি তার নিজের বাবার বাড়িও। গর্ভে সন্তান, গলায় লোকলজ্জার কাঁটা। বাধ্য হয়ে চলে যায় অন্য গ্রামে, আরেক জীবন বাঁচাতে।
পাঁচ বছর পরে, আবার একটি নতুন ঘরে বিয়ের সাজে তরিকা। তখন সে ঊনিশ। ভেবেছিল, এবার হয়ত একটু ভরসা পাবে। দ্বিতীয় স্বামী ছিল কথায় মিষ্টি, আচরণে মধু। শুরুতে খেয়াল রাখত, পায়ের ফাটা পর্যন্ত মলম দিয়ে দিত। কিন্তু বিয়ের ছয় মাসের মাথায় সেই মানুষটাও পাল্টে গেল। একদিন কাজ থেকে ফিরে দেখে ঘরে এক অচেনা নারী বসে। পরে জানতে পারে তিন বছর আগেই বিয়ে করা স্ত্রী। তরিকাকে বলা হয়েছিল, সে একমাত্র স্ত্রী। বাস্তবে, সে ছিল দ্বিতীয়। আসলে গোপনে তৃতীয়। শুরু হলো মানসিক ভাঙচুর। এসব হতে হতেই আরও দুটি সন্তানের মা হলো তরিকা। এরপর স্ত্রীরা অপেক্ষা করে, স্বামী আর ফেরে না।
এবার আর ফিরে যাওয়ার মতো ঘর ছিল না, অপেক্ষা করার মতো মানুষও ছিল না। সন্তানেরা একে একে ঠাঁই নেয় এতিমখানায়। আর তরিকা ভাসতে ভাসতে চলে আসে শালবন হাটে, তৃতীয়বারের মতো ঘর বাঁধে এক সীমান্তঘেঁষা লোকের সঙ্গে, যার ছায়াটাও অনেক সময় অপরিচিত মনে হয়।
বর্তমানে যার সঙ্গে সংসার, সে সীমান্তে চোরাচালানে জড়িত। তরিকা কিছু জানে না। আর বুঝতেও চায় না। কিছু বললেই সেই পুুরুষ গলা তুলে ওঠে, কখনও হাতে তোলে লাঠি, কখনও তালাকের ত্রাস! তালাকের ডর করে না আর তরিকার। অভ্যাস হয়ে গেছে।
সারাদিনের খাঁটুনি শেষে সন্ধ্যার পর চৌকির ওপর শরীর ফেললেই সে হয়ে যায় রাস্তার মতো সোজা, নিস্তেজ, অসাড়। ছোট্ট ফ্যানটা মাথার উপর ঘুরতে ঘুরতে সশব্দে হাঁপায়, আর তরিকাও ঘুমিয়ে পড়ে ক্লান্ত দেহে। স্বামীটার অসৎ সঙ্গ, সেইসূত্রে রাত বিরাতে গভীর অন্ধকারে অচেনা-অজানা শরীরের সঙ্গে নারকীয় সঙ্গমের ছাপ সকালেই মুছে ফেলতে বাধ্য তরিকা। মনে মনে ভাবে, এই শীতল রাস্তাটার সঙ্গে তার অনেক মিল। যার যেমন খুশি ভুট্টা, ধান, লংকা শুকাতে দেওয়া জীবনটায় হঠাৎ গুড়িগুড়ি বৃষ্টি এলে সেই সুযোগে তরিকা শীতল হয়ে সটান শুয়ে থাকতে চায় একটুখানি।
