স্বাগত সংলাপের কবি মনসুর আজিজ
রেজাউদ্দিন স্টালিন
প্রকাশ : ১৫ আগস্ট ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

মনসুর আজিজ নব্বই দশকের একজন শক্তিমান কবি। তার কবিতায় দেশ, সমাজ, মানুষ সদা জাগ্রত। ঔপনিবেশিক দাসত্বের বিরুদ্ধে নজরুলের বিপ্লবী চেতনার সার্থক বাহক তিনি। স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে বাংলা কবিতায় যে আবেগের মহোৎসব ছিল, সেখানে মনসুর আজিজ বুদ্ধিবৃত্তিক নান্দনিকতার জলছবি তৈরি করেন। জীবন ও জগতের অন্ধি-সন্ধি অকপট প্রকাশে মনসুর আজিজ নির্ভার। মার্কসীয় ধারার বৃত্তাবদ্ধ বিপ্লবের বাইরে কবিতার অজস্র বিষয় মনসুর আজিজ স্পর্শ করতে চেয়েছেন। একটা ঐতিহ্যের শ্যামল বুনট, বিবেকের আন্দোলন, নৈতিক রোমান্টিকতা তার শব্দবন্ধে স্বোপার্জিত। তার কাব্যগ্রন্থগুলোর শিরোনাম থেকে আমরা বুঝে নিই, তিনি নতুন ঐতিহ্য নির্মাণে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ। ‘অতলান্ত নীলচোখ’; ‘অনন্ত আকাশের জ্যোতির্ময় নক্ষত্র’; ‘মনুষ্যত্বের ল্যাম্পপোস্ট’; ‘শব্দের বেনারসি’; ‘জোড়াপাখি ফুলের রুমাল’; ‘জল ও জোয়ারের কাব্য’; ‘আঁধারের নাকফুল’; ‘সুনির্বাচিত কবিতা’; ‘আত্মধ্যানের আসন’; ‘নিমগ্ন সন্ধ্যর আলো’ ইত্যাদি। শিশুকিশোর ছড়া-কবিতার বই ‘নীল গালিচার স্বপ্ন’; ‘হৃদয়পুরের রাজা’; ‘মেঘের খোপায় পালক ভরে’; ‘নতুন ভোরে হীরের কুচি’; ‘সবুজ পাতা আঁকতে জানি’- এসব গ্রন্থের শিরোনামের মধ্যে কবির মনোজগৎ উঁকি দেয়। রক্ত সাগরে সাঁতারের মহড়া, এই কবিতাটির কয়েকটি লাইন উল্লেখ করতে চাই-
কিছু পড়ো
না পড়লে ছিঁড়ে ফেলো কবিতার পাণ্ডুলিপি
ছুঁঁড়ে দাও অনন্তের দিকে
কখনো আকাশে কান্নার গ্রহণ লেগে ছিল
তারারা ঝরে ছিল অশ্রুফোঁটার মতো
আমার দুহাত বাড়িয়ে দিয়েছি ঝরা তারাদের পানে
হাত দুটো ঝলমল করে উঠেছে
(রক্ত সাগরে সাঁতারের মহড়া/ শব্দের বেনারসি)
মনসুর আজিজ পূর্ববর্তী আশির দশক এবং সত্তর দশকের কবিদের থেকে যে উত্তরাধিকার লাভ করেছেন, তা অস্বীকার করতে চান না। ‘অবিনাশির প্রতি প্রার্থনা’ কবিতায় তিনি যখন বলেন-
নিজেকে চিনেছি আঁধারের রাতে বন্ধুতায় প্রতিদিন
সঁপেছি জীবন শোধেছি মরণ সাত জামানার ঋণ
খয়রাতি করে সদাগর হব বাসনা ছিল না মনে
প্রতিরোধ করে প্রতিশোধ নেয়া কাজ নয় ক্ষণে ক্ষণে।(ঐ)
প্রতিশোধের চেয়ে নিজেকে সংবরণ করা, জাতির ঐতিহ্য নির্মাণ করা বরং তার কাছে গুরুত্বপূর্ণ। প্রেম, প্রকৃতি, নর-নারীর সম্পর্ক- সবকিছু এক সহজাতসূত্রে গাঁথা। তা নান্দনিকতার সঙ্গে আবিষ্কার করাই কবির কাজ। ব্রাডলি যেমন বলেন, কবিতা হচ্ছে- আমরা যা ভুলে গিয়েছি তার স্মরণীয়তা। আর বোর্হেস বলেন, কবিতা হচ্ছে পাঠকের সঙ্গে কবিতার মুখোমুখি সংঘর্ষ। মনসুর আজিজের কবিতা পড়ে এসব উক্তির প্রতিভাস মেলে-
মনের গহীনে মন ঢুকে গেলে ক্ষণ কাঁপে থিরথির
আতশি মনের পিঠ বেয়ে নামে সুখস্মৃতি তিরতির
স্বপ্নের গেলাস চুমুকে উজাড় তৃপ্তিতে ফেলে শ্বাস
দুটি মন আজ এক হয়ে গেছে শাশ্বত বিশ্বাস।’
(স্বপ্ন গেলাসের সুখস্মৃতি/ শব্দের বেনারসি)
আমি বিশ্বাস করি কবিতা হচ্ছে জলের স্বাদের মতো, বাতাসের স্পর্শের মতো, ফলের আস্বাদের মতো, সমুদ্রকে দেখার মতো অনুভবের উপলব্ধির মতো। মনসুর আজিজের অনুভবের প্রজাপতিগুলো লাল, নীল ফ্রক পরে ডানা মেলে উড়ছে। কিন্তুু সেই আনন্দ রাজনীতির দোলাচলে ছিন্নভিন্ন। সুতীব্র যন্ত্রণায় বিষাদ আক্রান্ত কবি কালো মেঘের নীল কষ্ট বুকে নিয়ে অনন্তের দিকে চেয়ে থাকেন। দুটি প্রাসঙ্গিক লাইন উল্লেখ করছি-
কবিতার অক্ষরে সাহসের গাছ
বোধের ভূমিতে দেখি নয়া উদ্ভাস।
(বোধের ভূমিতে/ শব্দের বেনারসি)
বাংলা কবিতায় মরমী চিন্তার সংশ্লেষ প্রায় দুইশো বছরের। আধুনিককালেও কবিরা মরমী কবিতার চিরায়ত প্রতীক শরাব সাকিকে নতুন মাত্রায় উপস্থাপন করতে চেয়েছেন। মনসুর আজিজের ‘বিরহী অশোক’ কবিতায় এরকম পঙ্ক্তির সন্ধান পাওয়া যায়-
কতোটুকু পথ হেঁটে গেলে তুমি কতোটুকু পথ বাকি
সরাইখানায় কিসের আশায় দাঁড়ায়ে রয়েছো সাকি।
পরিবেশনে উপবেশনে কত রাত গেছে কেটে
শরীরের এই শিলপাটাতে কতজন গেছে বেটে
আজও তবু আমি পাইনি কোথাও প্রেমময় দুটি চোখ
কাতর বৃক্ষের বাকল ছিঁড়িয়া বোঝেনি অশোক শোক।
(বিরহী অশোক/ জল ও জোয়ারের কাব্য)
সভ্যতার উত্থানে নগরের সৃষ্টি হয়েছে, কিন্তু নগরজীবন আজও স্বমহিমায় প্রশ্নবিদ্ধ। কারণ নগরজীবন হয়তো বা জীবিকার সন্ধান দিয়েছে, কিন্তু মানুষের প্রত্যাশিত জীবনে চাঞ্চল্য এনে দিতে পারেনি। নানান ধারাপাতের হিসাব কষে সেই জীবন আজ জর্জরিত। তাই কবি মনসুর আজিজ নাগরিক বেদনায় ব্যথাদীর্ণ হয়ে ‘নাগরিক ডল’ কবিতায় বলে ওঠেন-
কে তুমি বানাও বলো নাগরিক ডল
চাহনির ধারাপাত বয় অবিরল
কামের আগুন তুমি রাঙা দুই ঠোঁট
বুকের গহীন কোণে লাগে ফের চোট।
(ঐ)
কিংবা ‘নাগরিক প্রেম চিবুক স্পর্শ করার আগেই দেখে নেয় মানিব্যাগের পুরুত্ব’ যখন তিনি বলেন তখন সভ্যতার গালে চপেটাঘাতই করে যায়। তদ্রুপ আবার স্বার্থের রেষারেষি খেলায় অমানবিক পৃথিবীতে মানবিক উপাখ্যান সাজিয়ে ‘বিবেকের বেলুন’ কবিতায় বলে ওঠেন-
স্বার্থবাদী বেলুনটি ফুটো করব ভাবছি
কে দিবে আমাকে একটি মানবিক আলপিন?
এমন বললে আরও হাজারো পঙ্ক্তি পাওয়া যাবে কবি মনসুর আজিজের কবিতায়। যেসব উপাখ্যান সভ্যতার কথা বলে, মানুষের কথা বলে, বলে উঠে মানুষের গহীন বেদনার সুর, আনন্দের গান। অগ্রজ কবি হিসেবে বলতে পারি কবি মনসুর আজিজের কথা বলার সুর কবিতায় তার আত্মবোধের সুরে বেজে উঠুক।
