গল্প

শূন্যতা

আনোয়ার রশীদ সাগর

প্রকাশ : ১৫ আগস্ট ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

ঝম-ঝমা-ঝম, ঝরে ঝরঝর বৃষ্টি। আকাশটা যেন ফুটো হয়ে গেছে, বৃষ্টি পড়ছে তো পড়ছেই। নদীর পানি, গাছের পাতা, কিশোর-কিশোরীর চুল- সব ভিজে একাকার। এ বৃষ্টি আনন্দ বেদনারও। কুমার নদীর পাড়। জলিল জাল ফেলছে। পেটানো শরীর, গায়ে লুঙ্গি, কাঁধে গামছা। জাল পানিতে পড়তেই ‘ছপাৎ’ শব্দ। তারপর টেনে তোলা। মাছ ধরেই জীবনযাপন করে।

জাল ঝেড়ে ডাঙায় ফেলার সাথে সাথেই রুপালি বিদ্যুৎ। চিংড়ি পুঁটি, ভ্যাদা, দাড়কি মাছ ছটফট করছে। ‘ধর ধর সুকিনা!’ জলিল হাঁকে মেয়েকে বলে। সুকিনা ৯ বছরের। গায়ে জামা ভিজে গায়ের সাথে লেপ্টে আছে। দুই হাতে মাছ ধরছে আর খিলখিল করে হাসছে। ছোট ভাই কাবিল ৬ বছর বয়স। সেও কচি হাতে মাছ ধরে ঝাপিতে মাছ তুলছে এবং খিলখিল করে হাসছে।

বৃষ্টি পড়ছে ঝুমাঝুম। সুকিনা দুই হাতে বৃষ্টির পানি ধরে মুখে মাখে। তারপর কাবিলের গালেও লেপে দেয়। ‘দ্যাখ, বৃষ্টির শরবত খা।’ কাবিল নাচে, ঘোরে, দুহাত আকাশের দিকে উঁচু করে বৃষ্টি ধরে। তরু-লতা নাচে তা থৈথৈ। নদীর স্রোত গান গায়। গাছের পাতা তাল দেয়, মৃদু বাতাসে হেলেদুলে দোল খায়। সুকিনার মনটাও দোলে। যেন বৃষ্টির প্রতিটা ফোঁটা তার বুকের ভেতর টাপুরটুপুর বাজে।

জলিল জাল গোটাতে গোটাতে ভাবে- এই মাছ, এই নদী, এই বৃষ্টিই তার সংসার। মনে মনে খুশী হয়, আল্লাহ কতো বড়ো ক্যারসমতি জানে। কাউকে না খাওয়িয়ে রাখে না। ছন্দের তালে তালে জলিলের জীবনটাও ঘূর্ণায়মান। দিন যায় রাত আসে, রাত যায় দিন আসে। বদলায়, সমাজ রাষ্ট্র জীবন এবং প্রকৃতি। সময়ের স্রোত কারও জন্য থেমে থাকে না।

মাঠে ফসল ভালো করার জন্য সার, কীটনাশক আসে। কৃষক অধিক ফলনের আশায় মাঠে মাঠে ব্যবহার করে। বর্ষায় সেই বিষ বৃষ্টির পানির সাথে ঢলে নেমে নদীতে মিশে যায়। মাছের ডিম ফোটার আগেই মরে যায়। আর আগের মতো পোনা জন্মায় না।

কুমার নদীর পানি কমতে থাকে। সবাই বলে ফারাক্কার কারণে পানি নিচে নেমে যাচ্ছে। মাটি নাব্যতা হারাচ্ছে। শুকচ্ছে মাঠঘাট। জলিল এসব না বুঝলেও, চায়ের দোকানে, বাজারে লোকমুখে শোনে। বৃদ্ধের গায়ের মতো চামড়া কুঁচকে যায়। কুঁচকে যায় জীবন সংসার।

খাল-বিলে পানি কম, কাদা। কাদায় মাছ নাই। জলিল জাল নদীতে গিয়ে, খালি হাতে ফিরে আসে প্রায় দিনই। দিনে ১০ টাকার মাছও হয় না।

সংসারে টান পড়তে থাকে। চালের পাতিলে চাল ওঠে না। হাড়িতে ভাত সিদ্ধ হয় না। পানি গরম হয়। সুকিনা বুঝতে পেরে বাবাকে কিছু বলে না। নীরবে নিজেকে বলে, ‘স্কুলের বেতন লাগবে,ভর্তি হতে হবে! দরকার নেই লেখাপড়ার’। জলিল আকাশের দিকে তাকিয়ে বলে, মা, নদী শুকাইলে জেলেদের কপাল পোড়ে, সংসারে ভাত জোটে না।

উপায়-অন্তর না দেখে, জলিল বের হয়,কাজের আশায়। পাঁচ মাইল দূরে রেলস্টেশনে যায়। প্রতিদিন ভোরে পাঁচ মাইল হেঁটে হেঁটে রেল স্টেশনে যাওয়া শুরু করে। মুটিগিরি করে। বস্তা মাথায় নিয়ে টানে, ট্রেনে আসা মানুষের ব্যাগ হাতে কাঁধে নিয়ে পৌঁছে দেয় গন্তব্যের দিকে।

সকাল থেকে সন্ধ্যা। কাঁধে দাগ। হাতে ফোস্কা। যা ৫০০-৭০০ টাকা হয়, তা দিয়ে চাল-আটা-ডাল কিনে বাড়ি ফেরে রাত ৯টায়। ঘরে ঢুকে দেখে সুকিনার দিকে তাকায়। মেয়েটি দৌড়ে এসে বাবার হাত থেকে বাজারগুলো নেয়। জলিল মেয়ের দিকে তাকিয়ে থাকে, মেয়েটা বড় হয়ে যাচ্ছে। প্রাইমারি পাস করে বাড়িতে থাকে। মাধ্যমিকে ভর্তি করানোর টাকা ছিল না।

সুকিনা এখন ঘরেই থাকে। জানালা দিয়ে নদীর দিকে তাকায়। দূরে মাঠের দিকে অথবা নদীর দিকে তাকিয়ে থাকে। সব যেন বদলিয়ে যাচ্ছে। মাঠঘাট প্রান্তর সবুজ মায়াবী ছায়া ছেড়ে ঘরবাড়ি, ইটপাথরে ভরে যাচ্ছে। দেখা যায় দূর-দূরান্তের গাছগাছালি কমে যাচ্ছে, পানির সেই স্রোত ঘরবাড়িতে ঢেকে যাচ্ছে। নদীর পানিও তলায় চলে গেছে।

জলিল বাড়ির সামনে বেড়া দিয়ে ছোটো একটা দোকান দেয়। টিনের চালা দিয়ে বেঁধে দেয়। বিস্কুট, চানাচুর, সাবান, তেল, চকলেট রাখে। দোকানে বসে সুকিনা। মাঝেমধ্যে মা আকিদাও বসে। কাবিল সকালে স্কুলে যায়। বিকেলে বাড়ি ফেরে।

আস্তে আস্তে দোকানটায় বেচাকেনা শুরু হয়। গ্রামের মানুষ আসে। উঠতি বয়সি সুকিনা মিষ্টি করে কথা বলে। ‘চাচা, চা খাবেন? বিস্কুট দেই?’ সুকিনার ব্যবহারে সবাই খুশিও হয়। দোকানের সামনে একটা মাচা। সেখানে বিকেলে বসে পূর্বপাড়ার নাজির।

পূর্ব পাড়ার ছেলেকে দেখে, সন্দেহ করতে থাকে রবিন। নাজির ভ্যান চালায়। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত ঘাম ঝরায়। বিকেলে এসে, দোকানের পাশে ভ্যান রেখে, মাচায় বসে। সুকিনার দিকে তাকায়, একটা সিগারেট ধরায়।

‘সুকিনা, একটা চা দে-তো।’ সুকিনা চা দেয়। চোখ নামিয়ে মৃদু ঠোঁট কুঁচিয়ে হাসে। নাজির রোজকার টাকার অর্ধেক খরচ করে ফেলে দোকানে। ‘এই নে, ১০ টাকার চানাচুর। ৫ টাকার বিস্কুট। এক প্যাকেট সিগারেট দে’।

গ্রামের লোকজন সন্দেহ করে । ফিসফিস করে। ‘জলিলের মেয়ে কী নাজিরের...’ সুকিনার বুকের ভেতর প্রথম প্রেমের কুমার নদী বয়। নীরবে নিভৃতে নির্জনে, স্রোত চলে।

একদিন বিকেল। নাজির মাচায় বসে সিগারেট টানছে। পশ্চিম পাড়ার রবিন আসে। মাথা গরম।

‘এই নাজির, তুই রোজ এখানে কি করতি আসিস? এপাড়ার মেিেয় দেখতি আসিস?’ কথা কাটাকাটি শুরু হয়। তারপর রবিন নাজিরকে ধরে দু’চার ঘুষি মেরে দেয়। সাথে লাথি। সুকিনা চিৎকার করে, ও-মা; দেখো রবিন ভাই নাজিরকে মারছে। দৌড়ে আসে সবাই। ঠেকায়ে দেয়। রবিন উচ্চস্বরে বলে, এই পাড়ায় আর যেনি না দেকি। নাজির ভ্যানে ওঠে। চলে যায় পূর্ব পাড়ায়, নিজ ঠিকানায়।

খবর ছড়ায়। পূর্ব পাড়া বনাম পশ্চিমপাড়া। লাঠি, ঢাল, শড়কি নিয়ে দুই দল মুখোমুখি।? ইটপাটকেল ছুঁড়তে থাকে দুদলই। তিন ঘণ্টা। পুলিশ এসে থামাশ। কিন্তু দুই পাড়ার মধ্যে দেয়াল উঠে যায়। দুপাড়ায় দুটো মসজিদ, দুটো স্কুলে খাড়া হয়ে যায়। কেউ কোনো পাড়ায় যাবে না। জলিল সেদিন থেকে দোকান বন্ধ করে দেয়। ‘সুকিনা, তুই আর বাইরে যাবি না।’

দোকান বন্ধ থাকলে সংসার চলে না। তিন দিন পর আবার খোলে। পাড়ার মুরুব্বিরাও খুলতে বলে। কিন্তু সুকিনার মুখে হাসি নাই। সে জানালা দিয়ে পূর্ব পাড়ার রাস্তার দিকে চেয়ে থাকে।

নাজির আর আসে না। ভয়ে। রাতে সুকিনা ঘুমায় না। বালিশ ভিজে যায়। কী হয়েছে বুঝতে পারে না। শুধু কষ্ট হয়। কাবিল মাকে বলে, ‘বুবুর কি হয়েছে?’ আকিদা দীর্ঘশ্বাস ফেলে। ‘বড় হয়েছে। মা,মেয়ের মন বোঝে।’

জলিল রাতে ঘুমাতে পারে না। ভাবে- মেয়েকে বিয়ে দেবে কিভাবে? টাকা নাই। আবার নাজিরকে নিজ পাড়ার লোকেরা মানবে না। তাছাড়া আর্থিক অবস্থাও ভালো না। ভ্যান চালক।

আষাঢ় মাস। রাত আঁধার ঘন। ফিসফিস বৃষ্টি পড়ছে। সবাই ঘুমে বিভোর। সুকিনা আস্তে করে দরজা খোলে। ব্যাগে দুইটা জামা, কিছু টাকা নেয়। পা বাড়ায় আঁধারে। নদীর পাড়ে নাজির দাঁড়িয়ে। ভ্যান নাই। পায়ে হেঁটে এসেছে। এক মাইল দূরে ভ্যান রেখে এসেছে। বলে, ‘সুকিনা, চলো।’ সুকিনা একবার পেছন ফিরে তাকাই। ভাবে, ঘর মা-বাবা-ভাই। বৃষ্টিতে ভেজা উঠোন। তারপর শক্ত করে নাজিরের হাত ধরে। দুইজন অন্ধকারে মিশে যায়।

ভোরে জলিল উঠে দেখে- মেয়ে নাই। দোকানের তালা খোলা। বিছানা খালি। জলিলের বুকের ভেতরটা ধসে যায়। যেমন নদীর পাড় ভাঙে। তেমন ভাঙতে থাকে ভেতরে ভেতরে।

বেশ কয়েকদিন পর খবর আসে। সুকিনা নাজিরের সাথে শহরে আছে। একটা বস্তিতে। জলিল স্টেশনে মুটিগিরি করতে যায় না। কিছু মুখে ওঠে না। বসে থাকে উদাসীন। আমার জাল ছিঁড়ে গেল-রে আল্লাহ। - বিড়বিড় করে। গ্রামের লোক বলে, ‘মেয়ে নষ্ট হয়ে গেছে।’ আকিদা কারও সাথে কথা বলে না। শুধু কাঁদে। বারবার আঁচলে চোখ মোছে।

কাবিল স্কুলে যায়। ছেলেরা খোঁচা দেয়, তোর বোন পালাইছে।’ সুকিনার দোকানটা এখন তালা দেওয়া। বেড়ায় ফাটল ধরেছে। ভেতরে আরশোলা ছুটাছুটি করে। এক বছর পর। আবার আষাঢ় আসে। আবার ঝমঝমা বৃষ্টি পড়ে। জলিল একা নদীর পাড়ে গেছে। হাতে পুরোনো জাল। জাল ফেলে নদীতে। টেনে তোলে। খালি জাল। মাছ শূন্য, নদীও শূন্য।

বৃষ্টির পানি গাল বেয়ে পড়তে থাকে। বোঝা যায় না- ওটা বৃষ্টি নাকি চোখের পানি। নদীর ধারেউ পূর্বপাড়া। ওখানে নাজির আর সুকিনা থাকে, শুনেছে লোকমুখে। একটা বাচ্চাও হয়েছে ওদের। জলিল জালটা নদীতে ছুঁড়ে ফেলে দেয়। ‘যা, তুইও নদীর মতো শুকিয়ে যা।’

সে উঠে দাঁড়ায়। পেছনে কুমার নদী। সামনে শূন্য মাঠ। আকাশে মেঘ ডাকে। বৃষ্টি পড়ে। কিন্তু সেই টাপুরটুপুর আনন্দ আর নাই। সুকিনার হাসি আর নাই। নদীতেও আগের মতো মাছ আর নাই। শুধু আছে এক বাপের ভাঙা বুক, আর একটা শূন্য ঘর।