কবিতা হচ্ছে নতুন চিন্তার ছবি
রাসেল মাহ্মুদ
প্রকাশ : ১৫ আগস্ট ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

যা কিছু নান্দনিক, তাই কবিতা। তবে কবিতার উচ্চাঙ্গের রূপ হচ্ছে শব্দের পাশে শব্দ, বাক্যের নিচে বাক্য যখন দাঁড়ায় গিয়ে স্থির। ওই স্থিরতাও নৃত্যের মতো ছন্দময়, বর্ণিল, মনোলোভা হয়ে ওঠে আসমানী ইশারায়। যেন নাজেল হলো আল্লাহর আরশ থেকে! সেখান থেকে না এলে এমন যুৎসই শব্দ কীভাবে খুঁজে পাবে আরেকটি শব্দকে, বাক্য কীভাবে গিয়ে ধরবে অন্য বাক্যের হাত?
যা কিছু ভালোলাগে, তাকেই কবিতা বলি আমি। কোনো বিশুদ্ধ বেদনাকে, কোনো রহস্যময় ধ্বনিকে, কোনো ঘ্রাণ, যা চেতনাকে জাগিয়ে দেয়, কিংবা জাগ্রত আমাকে দেয় ঘুম পাড়িয়ে। পরিপাটি নারী, ছিমছাম বাড়ি, দুঃখভারে নুয়ে পড়া বৃদ্ধের মুচকি হাসিকেও কবিতাই বলা যায়।
যখন থেকে শব্দের পরে শব্দ বসাতে শুরু করেছি, কবিতাকে মেনেছি ঐশী বাণী। কি অপরূপ ছবি আঁকা যায় শব্দ দিয়ে! কালো কালিও কত রঙিন করে তুলতে পারে সাদা কাগজের জমিনকে, ভেবে হতাম বিস্মিত। কত অপরূপ ভঙ্গিতে ছোট্ট করে বলে ফেলা যেত হাজার ভাবের কথা। কিংবা গোপন বেদনাকে মমি করে রাখা যেত মনখারাপের খাতায়। এমনকি কারো বুকে কম্পন তোলা যেত বুলেটের ক্ষিপ্রতায়, মাত্র কয়েকটি ছত্রে। পূর্বসূরিরা ছন্দে লিখে রাখতেন দিনযাপনের শোলক, আঁকতেন অনুভূতির ছবি। তাদের হরফ ছিল যেন পবিত্র আত্মার প্রতীক।
সাদা কাগজের বুকে কলম দিয়ে লিখলে একসময় মায়ের কোলে শুয়ে থাকার আরাম পাওয়া যেত। কম্পিউটারের অধরা কাগজে কিবোর্ড দিয়ে টাইপ করাও যেন ছিল প্রেমিকাকে চুমু খাওয়ার মতো রোমাঞ্চকর! কিন্তু কী যেন হয়ে গেল আমার এক সুবহে-সাদিকে! দেখলাম, হরফের বদলে হাওয়ায়, জলে, আলোয়, গাছের শাখায় আর ফুলে কবিতা লিখে যাচ্ছে প্রকৃতিমাতা, নীরবে। সেই নিরবতার কাছে হরফ ভীষণ দুর্বল।
বাংলাদেশের কবিতায় দুর্দশা নেমেছে অনুকরণে। পূর্বসূরির পথ ধরে এগুতে চাওয়ার প্রবণতার কারণে। নতুন ভাষাভঙ্গি, নতুন ছন্দ ও চিন্তার নতুন ছবি আঁকতে পারছে না নতুনরা। তাই নেই নতুন কবিতা! হরফ দিয়ে অন্তরে ভিজ্যুয়াল তৈরির বদলে চোখের সামনে ধরা পর্দার ভিজ্যুয়ালে ঝুঁকছে তারা। কবি না, হতে চাইছে ক্যামেরাওয়ালা। ক্রমে গুরুত্ব হারাচ্ছে হরফচর্চা। প্রজন্ম ভুলে যাচ্ছে, কবি হচ্ছেন দার্শনিকের পিতা। নবী যে ক্যাফেটেরিয়ায় ডিনার করেন, কবি সেখানে কদাচিৎ নাশতা করেন। মাতালের পানশালার পাশেই তার দুঃখের দরবার, বিষণ্ণতার কারবার।
