কিশোর কবিতা যে কারণে কাব্যছড়া

জগলুল হায়দার

প্রকাশ : ০৩ অক্টোবর ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

শূন্য দশকের মাঝামাঝি সময়ের কথা। সে সময় প্রায় যুগান্তরে যাই। আড্ডা জমতো পিনটু ভাইয়ের (শিশুসাহিত্যিক আশরাফুল আলম পিনটু) ওইখানে। একদিন টেলিফোনে কোন সাহিত্য কাগজের সম্পাদকের সঙ্গে কথা শেষ কইরাই বললেন— কিশোর কবিতা দিতে পারবেন? ব্যাপারটা আমার কাছে দিতে পারার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। তবুও বিনয়ের সঙ্গে বললাম— কিশোর কবিতা লেখি না তো। পিনটু ভাই ভালোবাসেন তাই ভালোবাসার অধিকারে একটু শক্ত গলায়ই বললেন— এত সুন্দর ছড়া লেখেন, কিশোর কবিতা লেখেন না ক্যান? সেদিন তাকে আর কিছু বলি নাই। কি বলব, আসলে কিশোর কবিতা পদব্যাচ্যটাই আমি মানতে পারতাম না। তাই অই জাতীয় কবিতা টুকটাক লেখলেও আমি ছড়ার বাইরে ওইসবের আলাদা কোনো পরিচয়ও দিতাম না। আমার কাছে ওইগুলা ছড়াই।

যাক পিনটু ভাইয়ের সেই পরামর্শ আমারে কিশোর কবিতা নিয়া ভাবার অবকাশ তৈরি কইরা দিল। তিন চান আমি এ ধারার লেখা বেশি কইরাই লেখি। আমিও মনস্থির করলাম লেখতে হইব। তবে এই নামে লেখব না। কারণ নামটা আমার যৌক্তিক মনে হয় না। কি নামে লেখব তাইলে? এই ধারার কবিতা লেখায় অই সময় জোর একটু বাইরাও গেল। তবে তখনও লেখাগুলোর শিরোনাম ঠিক করতে পারি নাই। এই অবস্থায় কথিত কিশোর কবিতা আর তার ইতিহাস সম্পর্কে খোঁজখবর একটু বাড়াইলাম।

দেখলাম এসবের অস্তিত্ব রবীন্দ্রনাথেও ছিল নজরুলেও ছিল। ছিল জসীমউদ্দিনসহ আরও অনেকের মধ্যেই। কিন্তু সে যুগের কোথাও কিশোর কবিতা নামের সন্ধান পাইলাম না। এরপর ৪৭ উত্তর সময়ে সৈয়দ আলী আহসান, আবু হেনা মোস্তফা কামাল থেকে আহসান হাবীবসহ আরও অনেকেই এই ধারায় চিহ্নিত করা হয়, এমন অনেক সার্থক কবিতা লেখছেন। কিন্তু সেখানেও এগুলোকে আলাদা কোন ধারা হিসাবে উল্লেখ করে নাই কেউ।

বলা যায় ৭০-এর দশকে আইসা এ নামের আওয়াজ উঠছে। আর সম্ভবত এর আমদানি হইছে পশ্চিমবঙ্গ থেকে। আর একশ্রেণির লেখক এইসব কবিতা চর্চায় যতোটা না মন দিছেন তার চাইতে ঢের দিয়েছেন এর নাম কীর্তনে। নাম কীর্তনের পাশাপাশি কেউ আবার এগুলোকে নিজের দখলের বিষয় হিসাবে দেখাইবার অপচেষ্টাও করছেন।

যেহেতু নাম ছিল না। তাই এই প্রবন্ধে এগুলারে আমরা কিশোর কবিতা না বইলা কিশোর কবিতা হিসাবে চিহ্নিত কবিতাই বলব। এই ধারার কবিতার মেজাজ আর মর্ম বোঝার জন্য কিছু উদাহরণ দেখা যাক।

 

সোম মঙ্গল বুধ এরা সব/আসে তাড়াতাড়ি

এদের ঘরে আছে বুঝি/ মস্ত হাওয়া গাড়ি?

রবিবার সে কেন মাগো,/এমন দেরী করে?

ধীরে ধীরে পৌঁছায় সে/সকল বারের পরে

আকাশ পাড়ে তার বাড়িটি/দূর কি সবার চেয়ে?

সে বুঝি, মা তোমার মতো/গরিব ঘরের মেয়ে।

 

মনে করো, যেন বিদেশ ঘুরে/ মাকে নিয়ে যাচ্ছি অনেক দূরে

তুমি যাচ্ছ পালকিতে মা চড়ে /দরজা দুটো একটুকু ফাঁক করে

আমি যাচ্ছি রাঙা ঘোড়ার পরে /টগবগিয়ে তোমার পাশে, পাশে।

(রোববার ও বীরপুরুষ, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর)।

আমি হব সকাল বেলার পাখি /সবার আগে কুসুম বাগে উঠব আমি ডাকি

সূর্যিমামা জাগার আগে উঠব আমি জেগে /'হয়নি সকাল ঘুমো এখন' মা-বলবেন রেগে।

কাঠবেরালি! কাঠবেরালি পেয়ারা তুমি খাও? /গুঁড় মুড়ি খাও? দুধভাত খাও?

বাতাবি লেবু? লাউ? বেড়াল-বাচ্চা? কুকুর ছানা? তাও? /ডাইনি তুমি হোৎকা পেটুক?

খাও একা পাও যেথায় যেটুক!

(খোকার সাধ ও খুকি ও কাঠবিড়ালি, কাজী নজরুল ইসলাম)

 

ধনধান্য পুষ্প ভরা আমাদের এই বসুন্ধরা

তাহার মাঝে আছে দেশ এক সকল দেশের সেরা

ও সে স্বপ্ন দিয়ে তৈরি সে দেশ স্মৃতি দিয়ে ঘেরা

এমন দেশটি কোথাও খুঁজে পাবে নাকো তুমি

ও সকল দেশের রাণী সে যে আমার জন্মভূমি

সে যে আমার জন্মভূমি, সে যে আমার জন্মভূমি॥

(ধন ধান্যে পুষ্পে ভরা, দিজেন্দ্রলাল রায়)।

 

গোপালটা কি হিংসুটে মা! খাবার দিলেম ভাগ করে

বল্লে নাকো মুখেও কিছু, ফেল্লে ছুঁড়ে রাগ করে

জ্যাঠাইমা যে মিঠাই দিলেন 'দুই ভায়েতে খাও' বলে-

দশটি ছিল একটি তাহার চাখতে দিলাম 'ফাও' বলে..

তাও মানে না শুধু কাঁদে স্বার্থপরের শয়তানী

শেষটা আমায় মিঠাইগুলো খেতেই হল সবখানি ( নিঃস্বার্থ, সুকুমার রায়)

এইখানে তোর দাদীর কবর ডালিম গাছের তলে,

তিরিশ বছর ভিজায়ে রেখেছি দুই নয়নের জলে।

এতটুকু তারে ঘরে এনেছিনু সোনার মতন মুখ,

পুতুলের বিয়ে ভেঙে গেল বলে কেঁদে ভাসাইত বুক।

এখানে ওখানে ঘুরিয়া ফিরিতে ভেবে হইতাম সারা,

সারা বাড়ি ভরি এত সোনা মোর ছড়াইয়া দিল কারা।

(কবর, জসীমউদ্দীন)।

 

করিতে পারি না কাজ /সদা ভয় সদা লাজ

সংশয়ে সংকল্প সদা টলে— পাছে লোকে কিছু বলে।

(পাছে লোকে কিছু বলে, কামিনী রায়)।

 

বাঁশবাগানের মাথার ওপর চাঁদ উঠেছে ওই

মাগো, আমার শোলক-বলা কাজলা দিদি কই?

পুকুর ধারে, নেবুর তলে থোকায় থোকায় জোনাই জ্বলে,

ফুলের গন্ধে ঘুম আসে না, একলা জেগে রই;

মাগো, আমার কোলের কাছে কাজলা দিদি কই?

(কাজলা দিদি, যতীন্দ্রমোহন বাগচী)।

 

বিশ্বজোড়া পাঠশালা মোর,/সবার আমি ছাত্র,

নানান ভাবে নতুন জিনি /শিখছি দিবারাত্র।

এই পৃথিবীর বিরাট খাতায়/পাঠ্য যেসব পাতায় পাতায়

শিখছি সে সব কৌতূহলে/ নেই দ্বিধা লেশমাত্র।

(সবার আমি ছাত্র, সুনির্মল বসু)।

আলোর পাখি নাম জোনাকি/ জাগি রাতের বেলা

নিজকে জ্বেলে এই আমাদের/ ভালোবাসার খেলা।

(জোনাকিরা, আহসান হাবীব)।

 

ট্রেন যায় হিশ হিশ/ বায়ু যায় ফিশ ফিশ/ ট্রাক যায় ধুপ ধাপ/

গরিবের দিন যায়/কী কর/ কী করে/ কী করে/

জানবার সাধ হলে/হাত দাও শিকড়ে/ শিকড়ে/ শিকড়ে।

(শিকড়ে, আসাদ চৌধুরী)।

উদাহরণের ভার আর বাড়াইতে চাই না। তবে এরকম আরও অনেক আছে।

এবার একদম নির্ভেজাল কিছু ছড়ার উদাহরণ দেখা যাক।

আগডুম বাগডুম ঘোড়াডুম সাজে / ঢাক-ঢোল ঝাঁঝর বাজে

বাজতে বাজতে চলল ঢুলি /ঢুলি গেল কমলাফুলি

কমলাফুলির টিয়েটা /সুর্যি মামার বিয়েটা।

(লোকছড়া)

 

আজগুবি নয়, আজগুবি নয়, সত্যিকারের কথা—

ছায়ার সাথে কুস্তি করে গাত্রে হল ব্যাথা।

ছায়া ধরার ব্যবসা করি, তাও জান না বুঝি?

রোদের ছায়া, চাঁদের ছায়া, হরেক রকম পুঁজি!

শিশির ভেজা সদ্য ছায়া, সকাল বেলায় তাজা,

গ্রীষ্মকালে শুকনো ছায়া ভীষণ রোদে ভাজা।

(ছায়াবাজি, সুকুমার রায়)।

সফদার ডাক্তার/মাথা ভরা টাক তার

খিদে পেলেপানি খায় চিবিয়ে।

চেয়ারেতে রাত দিন /বসে গুনে দুই তিন

পড়ে বই আলোটারে নিভিয়ে।

(সফদার ডাক্তার, হোসনে আরা