লোকসাহিত্যের বিবিধ সংস্কৃতি

রাখাল বিশ্বাস

প্রকাশ : ০৩ অক্টোবর ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

বাংলা সাহিত্যের বড় অংশজুড়ে রয়েছে লোকসাহিত্য। যে লোকসাহিত্য মানুষের মুখে মুখে ফেরা-অল্প, স্বল্প-অর্ধ বা স্বশিক্ষিত সাধারণ মানুষের সৃষ্টি সাহিত্যকর্ম। এ সাহিত্যকর্ম থেকে উৎপন্ন হয়েছে বহু কৃষ্টি। যে কৃষ্টির-ঐতিহ্য জগতজুড়ে ছড়িয়ে দিয়েছে অন্ধকারের বিরুদ্ধে স্বআলোকময় জ্যোতি। সেই জ্যোতির দ্যুতি থেকে বিশ্বসাহিত্য পেয়েছে নতুন এক বাংলাকে-বাংলা সাহিত্যকে। এমন লোকসাহিত্যকর্মের সেনাপতি নেত্রকোনার কেন্দুয়ার আইথর গ্রামের চন্দ্রকুমার দে এবং এমন চন্দ্রকুমার দে'দের মতো গ্রাম বাংলায় ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা অতি সাধারণ মানুষরা। তারা ভাণ্ডারময় ঐতিহ্যের গাকে স্বরূপমণ্ডিত করে আরও ফলবতি বৃক্ষের ন্যায় সুবেশিত করেছে বাংলা সাহিত্যকে।

লোকসাহিত্যকে বলা হয় সাহিত্যের প্রাণ। প্রাণ এ জন্যেই যে, গ্রামীণ লোকজীবনে প্রতিনিয়ত যা ঘটেছে বা ঘটে চলেছে— সেই হাসি কান্না, আনন্দ- বেদনা, উচ্ছাস-উদ্যমতা এবং বাংলার সুধাঁমাখা মাটি হতে উদগীরিত সরলপ্রাণ মানুষের আবেগ-অনূভূতি ও নির্মল আনন্দকে উৎস করে বৈদিক যুগ হতে যে সাহিত্য জাগরিত হয়ে ছিল তার স্পন্ধিত নাদ সমাজবৃক্ষের শাখায় শাখায় মঞ্জুরিত হয়ে আজ সর্বত্র অনন্য উচ্চতায় সমাধৃত। শুধু তাই নয়, এ সাহিত্যবৃক্ষ তার পত্রপল্লব বিস্তার করেছে সারা বিশ্বের সাহিত্যাকাশে। তাই লোকসাহিত্য বাংলাসাহিত্যের বৃক্ষ শাখায় মঞ্জুরিত হওয়া প্রাণ সঞ্চারক মহৌষধ।

সেই কবেকার কে কখন, কীভাবে মুখে মুখে রচনা করেছিলেন গ্রামীণ শিশু-কিশোর-কিশোরীদের খেলাধুলার ডাক বা ছড়া। যে ছড়ায় লুকিয়ে আছে অদভূত এক অমিয় শক্তি!

কিশোরীরা যখন খেলাধূলায় মিলিত হয়ে সুর দিয়ে বলে উঠে—

'লুন্তা বলো রে, এক্কা হলো রে,

দুক্কা বলো রে লুন্তা চলো রে।

কিংবা— 'ডাক ডাক বেলী, এসো ভাই খেলি।

চোখ পলান্তি সারো কে পালাইতে পারো।

আমরা বলো কে কি জাত, ঘিদে খাই পান্তা ভাত।

আমরা করি হুমালি, বেইন্যা বিয়াল লাই খেলি।

চিত্তরানী গেলো কই, ঐ দেখা যায় তৈ তৈ।

বউ লইয়া পলান্তি, ব্যাঙ ভাজা খাওয়্যন্তি।

বেইল চৈইল্য গেইল চট্টুইল।

ছৈল বৈল বরাম্বইল ঘুট্টুইল।

 

ইত্যাদি ছাড়াও লোকসাহিত্যের বিবিধ সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য গ্রামীণ সমাজ জীবনকে বিশ্ব দরবারে এক অনন্য উচ্চতায় আশীন করেছে যা তাবৎ বিশ্বখ্যাত মহাজনরাও উচ্চারণ করতে বাধ্য।

আমাদের দেশের প্রায় সকল অঞ্চলই গ্রামের গণ্ডি দিয়ে ঘেরা। এখানের ধূলো-কাদা থেকে উৎসরিত সংস্কৃতি রসদ বিশ্ব পরিমণ্ডলে যেমন দ্যুতি বিলিয়েছে তেমনি এর সুঘ্রানে মতুয়ারা ছিলেন রোঁমা রোলার মত বিখ্যাত সব লোকসাহিত্য গবেষকগণ। বাংলার কৃষ্টি ঐতিহ্য, লোকাচার, লোকসংস্কৃতি, লোকসঙ্গীত ইত্যাদি যে আমাদের সাহিত্যের রত্নখনি তা জগদ্বিখ্যাত দ্বীজমণিদের মুখে অকার্পন্যেই উচ্চারিত হচ্ছে। তারা স্বীকার করেছেন— বাঙালিই এ রত্নখনির ধারক, বাহক, লালনকারি ও মালিক।

এ দেশের কৃষক-শ্রমিক, মাঝি-মাল্লা, সাধক-দরবেশ, পীর-ফকির, শিক্ষিত-অশিক্ষিত, স্বল্প শিক্ষিত-স্বশিক্ষিত কিংবা সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষসহ বিভিন্ন শ্রেণি পেশার মানুষের মাঝে সাহিত্য সংস্কৃতির যে স্ফুরণ লক্ষ্য করা যায় তা বাঙালি ছাড়া খুব কম জাতির মাঝেই পরিলক্ষিত হয়।

আমাদের বাংলার জারি সারি, ভাটিয়ালী, বাউলগান, উড়িগান, কবিগান, কিসসাপালা, গাজিরগীত, গাইনেরগীত, চৈতাল, ধামাইল, যাত্রাগান, পালাগান, ঘাটুগান, ঢপযাত্রা, তামসাগান, বিয়ারগীত, তমিছাল, সিমিস্যা, কির্তন, ব্রতকথা, বৈঠকগান, বৈষ্ণবগান, হালকা, ছডি, হাইট্যারা, হিরালী, জিকির, পূজা-পার্বন, মেলা, থলা, আসর, বৈঠক, মেমানদারি বা মেজবানি ইত্যাদি সামাজিক কৃষ্টি আচার মন ও মনের সুগভীরে প্রোথিত হয়ে আছে সভ্যতার সূচনালগ্ন থেকে আজ অব্দি।

অঞ্চল ভেদে আঞ্চলিক শব্দমালার বৈচিত্রপূর্ণ শব্দচয়ন সাধারণের মুখে উচ্চারিত হয়ে লোকসাহিত্যে অন্যরকম এক ইমেজের যে স্বাতন্ত্র ইন্দ্রধনূ তৈরি করেছে তাকে বলাই যেতে পারে বাংলাসাহিত্যের প্রাণ সঞ্চারকারি অনন্য উপাদান। আর এই উপাদান বাংলাসাহিত্যানুরাগিদের আসরে শোভাবর্ধন করছে নিঃসন্দেহে।

তাই তো বাংলা নাট্যে-কাব্যে, সঙ্গীতে-গল্পে, প্রবন্ধে-ছন্দে- ছড়ায়, নৃত্যে-যাত্রায়, ভাষানে-উপন্যাসে কবিতায় খুবই সমবৃদ্ধ আঞ্চলিক শব্দমালা। গ্রামের একজন সাধারণ নারী, বধূ, গৃহিনী কিংবা কিশোরীও অতি সহজে ছড়া-ছন্দ, তমিছাল, গীত-গান, উপকথা, সিমিস্যা ইত্যাদি নির্দিধায় আবৃতি করতে পারেন। পারেন সন্তানকে ঘুমপাড়ানোর গান গেয়ে ঘুমপাড়াতে। আবার সংসারের প্রয়োজনে হালের লাঙ্গল ধরতেও পারেন। এমন মা বোনেরা কি বাহবা পাওয়ার যোগ্য নয়?

গ্রামীণ জীবনাচারে দৈনন্দিন ক্রিয়াকর্মের পর অবসর সময়ে সাধারণ মানুষ বিশ্রাম করেন বৈঠকখানায়, গাছতলার শীতলতম স্থানে অথবা বাড়ির উঠানে সামিয়ানা টানিয়ে ঢোল-খোল, ডুগডুগি-চইট্ট্যা, নানা বাদ্যযন্ত্র নিয়ে লোকসংস্কৃতি, লোকসঙ্গীত, লোকগান, লোকাচারের বিভিন্ন পরিবেশনা দিয়ে। তারা একে অপরের সুখ-দুঃখের অংশিদার হন, আনন্দ-বেদনা ভাগাভাগি করে নেন। তারা সৌহার্দতার সেতু বন্ধন তৈরি করেন। একে অপরের মাঝে মিনিময় করেন প্রেম-ভালবাসার বিশুদ্ধ বিনোদন। তাদের আন্তরিকতায় প্রতিদিন বির্ণিমিত হয় সম্প্রীতি ও সংস্কৃতির আলোকবর্তিকার স্বর্ণমঞ্জিল। যে মঞ্জিলে ধ্বনিত হয়— 'মানুষ থুইয়া খোদা ভজো, এ মন্ত্রনা কে দিয়াছে/ মানুষ ভজো কোরান খোঁজ পাতায় পাতায় সাক্ষী আছে।