নোবেল কমিটির একটি গুরুতর ভুল

মজিদ মাহমুদ

প্রকাশ : ১০ অক্টোবর ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার ঘোষণার পর আমার এক কানাডীয় লেখকবন্ধু বেশ ক্ষুব্ধ হয়ে লিখেছেন— Heard only Anne Carson’s name today from the Swedish Academy spokesperson’s mouth. Mozid Mahmud’s name was missing. What is going on?

বন্ধুর উদ্বেগ যথার্থ। সুইডিশ একাডেমির মুখপাত্রের মুখে শুধু অ্যান কারসনের নাম শোনা গেল, আমার নামটি কোথায় গেল— এ প্রশ্নের জবাব তো তাদেরই দেওয়া উচিত! অবশ্য আমার ধারণা, নোবেল কমিটির সদস্যরা বাংলা সাহিত্য পড়তে গিয়ে এখনও আমার নাম পর্যন্ত পৌঁছাতে পারেননি। কিংবা পৌঁছেছেন, কিন্তু উচ্চারণের ঝামেলা এড়াতে আপাতত নামটি বাদ রেখেছেন। বাংলা ভাষার কবিদের নাম উচ্চারণ করতে গিয়ে বিদেশিদের যে দুরবস্থা হয়, তাতে এমন সিদ্ধান্তকে একেবারে অযৌক্তিকও বলা যায় না।

যা-ই হোক, বন্ধুকে আশ্বস্ত করেছি— এ নিয়ে সুইডিশ একাডেমির ওপর চাপ সৃষ্টি করার প্রয়োজন নেই। নোবেল পাওয়ার চেয়ে নোবেল না পাওয়ার কিছু সুবিধাও আছে। অন্তত পুরস্কারের টাকা কীভাবে খরচ করব, তা নিয়ে স্ত্রীর সঙ্গে কোনো বিরোধে জড়াতে হচ্ছে না! অবশ্য আমার নোবেল পাওয়ার সম্ভাবনা একেবারে উড়িয়ে দেওয়াও যায় না। বছর দুই আগে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমার উপন্যাস মেমোরিয়াল ক্লাব-এর ইংরেজি সংস্করণ প্রকাশিত হওয়ার পর থেকে অনেকে সম্ভবত সেই দুঃসংবাদ শোনার আশঙ্কায় আছেন। বিশেষ করে দেশের সাহিত্যাঙ্গনের কোনো কোনো বন্ধুর জন্য সংবাদটি যে সুখকর হবে না, তা অনুমান করতে বিশেষ কল্পনাশক্তির প্রয়োজন নেই।

প্রায় এক দশক আগের কথা। জাতীয় প্রেসক্লাবে বসে আছি। এক অপরিচিতা মহিলা এসে জানালেন, নোবেল পুরস্কার যদি তার হাতে থাকত, তাহলে কবেই আমাকে দিয়ে দিতেন। মাহফুজামঙ্গলসহ আমার অনেক কবিতার বই নাকি তিনি বালিশের পাশে রাখেন। এমন কথা অবশ্য জীবনে একাধিকবার শুনতে হয়েছে। তখন বিশেষ গুরুত্ব দিইনি। এখন মনে হয়, নোবেল কমিটির লোকেরা হয়তো আমার পাঠকদের বালিশ পর্যন্ত পৌঁছাতে পারছেন না। বিশ্বসাহিত্যের বিচার করতে গিয়ে বালিশের নিচের সাহিত্য উপেক্ষা করা নিশ্চয়ই একটি গুরুতর পদ্ধতিগত ত্রুটি।

আরেকবার ফেসবুকে একজন প্রশ্ন তুলেছিলেন, বাংলাদেশের কোনো লেখকের পক্ষে কি নোবেল পুরস্কার পাওয়া সম্ভব? সীমান্ত হেলাল নামের এক কবি মন্তব্য করেছিলেন, তার ধারণা, বাংলাদেশের কেউ যদি নোবেল পান, তবে তিনি হবেন মজিদ মাহমুদ। পরে অবশ্য সেই কবির সঙ্গে আমার দেখা হয়েছিল। তার ভবিষ্যদ্বাণীর জন্য তাকে ধন্যবাদ জানিয়েছি কি না, মনে নেই। তবে ভবিষ্যদ্বক্তাদের একটি সুবিধা আছে— তাদের কথা সত্য প্রমাণিত হওয়ার জন্য নির্দিষ্ট কোনো সময়সীমা থাকে না।

চার দশক আগে লেখালেখি শুরুর দিকে নিজেও ভাবতাম, একদিন হয়তো নোবেল পুরস্কার পাব। তখন বয়স কম ছিল, সামনে অনন্ত সময়। সাহিত্যের পৃথিবীটাকেও মনে হতো অনেক বেশি সুবিচারপূর্ণ। এখন বয়স বেড়েছে, সময়ের হিসাব বদলেছে। মাঝে মাঝে ভাবি, মৃতদের তো আর নোবেল দেওয়া হয় না। ফলে সুইডিশ একাডেমির হাতে সময় খুব বেশি আছে বলে মনে হয় না। অবশ্য নোবেল নিয়ে এত কথা বলছি, অথচ দেশেরই কোনো উল্লেখযোগ্য রাষ্ট্রীয় সাহিত্য পুরস্কার আমার ভাগ্যে জোটেনি। এ নিয়ে আমার চেয়ে অন্যদের বিস্ময়ই বেশি।

বাংলা একাডেমির সাবেক মহাপরিচালক কবি মুহম্মদ নূরুল হুদা প্রায়ই বলতেন, 'তোমার জন্য আন্তর্জাতিক কোনো বড় পুরস্কার পাওয়া যত সহজ, দেশে পুরস্কার পাওয়া তত কঠিন।'

কথাটি তিনি কেন বলতেন, তা তারই ভালো জানার কথা। তবে আমার অভিজ্ঞতা থেকে মনে হয়েছে, আন্তর্জাতিক পুরস্কার পেতে হলে সাহিত্য লিখতে হয়; দেশের কোনো কোনো পুরস্কার পেতে হলে সাহিত্য লেখার পাশাপাশি আরও কিছু যোগ্যতা লাগে। সেসব যোগ্যতা অর্জনের জন্য আমার তেমন প্রস্তুতি ছিল না।

নূরুল হুদার আগের মহাপরিচালক কবি হাবীবুল্লাহ সিরাজী একবার আমাকে বাংলা একাডেমিতে বক্তৃতা দিতে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। তাতেই আওয়ামীপন্থী লেখক মহলে রীতিমতো সুনামি বয়ে গিয়েছিল। একটি বক্তৃতার আমন্ত্রণে এত বড় প্রাকৃতিক দুর্যোগ ঘটতে পারে, তা আগে আমার জানা ছিল না। সিরাজী ভাইয়ের সাহসের প্রশংসা করতে হয়। তিনি অন্তত ঝড়ের পূর্বাভাস জেনেও আমন্ত্রণ প্রত্যাহার করেননি।

আরেক মহাপরিচালক শামসুজ্জামান খান আমার সাহিত্যচিন্তা ও বিকল্পভাবনা বইটি পড়ে মুগ্ধ হয়ে একবার ডেকেছিলেন। পরে শুনেছি, এ কারণে নাকি তার চাকরি যাওয়ার উপক্রম হয়েছিল। ঘটনাটি সত্যি হলে বলতে হয়, বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে আমার বইয়ের এটি এক বিরল সাফল্য— একটি বই পড়ে পাঠকের চাকরি বিপন্ন হওয়ার নজির খুব বেশি নেই। তবে তার সঙ্গে আমার সাক্ষাতের একটি স্মৃতি আজও অমলিন। আমার সামনেই তিনি টেবিলের ড্রয়ার থেকে বইটি বের করে অধ্যাপক ড. পবিত্র সরকারের হাতে তুলে দিয়েছিলেন। বলেছিলেন, এটি তার পড়া অন্যতম সেরা বই। এটাই আমার কাছে বড় পুরস্কার।

একজন প্রকৃত পাঠক যখন কোনো বইয়ের মূল্য উপলব্ধি করেন, তখন পুরস্কারের ধাতব স্মারক কিংবা অর্থমূল্যের প্রয়োজন হয় না। অন্তত আমার নিজের মনকে এভাবেই সান্ত্বনা দিয়ে এসেছি।

বিগত ১০ বছরে আমাদের দেশে অন্তত ১০০ জন লেখক রাষ্ট্রীয় পুরস্কার পেয়েছেন। তাদের সবাইকে অভিনন্দন। তাদের মধ্যে নিশ্চয়ই অনেক যোগ্য লেখক আছেন। কারও প্রাপ্তিকে ছোট করার ইচ্ছা আমার নেই। পুরস্কারপ্রাপ্তির সঙ্গে সাহিত্যিক যোগ্যতার সম্পর্ক যেমন আছে, তেমনি কখনো কখনো সম্পর্ক না থাকারও নজির আছে। এ নিয়ে বিস্তর গবেষণা হতে পারে। তবে যারা এসব পুরস্কার দিয়েছেন, তাদের জন্য আমার একটি বিশেষ শাস্তির প্রস্তাব আছে। তাদের প্রত্যেককে আমার বইগুলো পড়তে দেওয়া হোক। অন্তত একবার। তারপর তারা নিজেরাই সিদ্ধান্ত নেবেন, শাস্তিটি তাদের জন্য, না আমার জন্য।

পুরস্কার নিয়ে আমার অভিজ্ঞতা অবশ্য একেবারে নেই, এমনও নয়। ২০০৭ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত আমি এশিয়াখ্যাত র‍্যামন ম্যাগসাইসাই পুরস্কারের জুরি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছি। অন্যদের পুরস্কার পাওয়ার যোগ্যতা বিচার করার সুযোগ হয়েছে; কিন্তু নিজে পুরস্কার পাওয়ার সুযোগ হয়নি। মাঝেমধ্যে ভাবি, তারা আমাকে পুরস্কার না দিয়ে জুরি বানালেন কেন! সম্ভবত ভেবেছিলেন, পুরস্কার দিলে একজন লেখক উপকৃত হবেন; আর জুরি বানালে অন্তত কয়েকজন পুরস্কার পাওয়ার সুযোগ পাবেন।

তবে পুরস্কার বিচার করার অভিজ্ঞতা থেকে একটি বিষয় বুঝেছি, পুরস্কার পাওয়া এবং পুরস্কার পাওয়ার যোগ্য হওয়া সব সময় একই ব্যাপার নয়। আবার পুরস্কার না পাওয়াও যোগ্যতার চূড়ান্ত প্রমাণ নয়। পৃথিবীর বড় বড় লেখকদের অনেকেই নোবেল পাননি। তলস্তয় পাননি, গোর্কি পাননি। আরও অনেকে পাননি। এদের সঙ্গে নিজের নাম যুক্ত করার লোভ অবশ্য আমার নেই। কিন্তু নোবেল না পাওয়ার সুবাদে অন্তত তাদের সঙ্গে একটি বিষয়ে আমার মিল আছে। সাহিত্যিক তুলনার ক্ষেত্রে এটুকু সুবিধা গ্রহণ করা নিশ্চয়ই অপরাধ নয়।

 

নোবেল পুরস্কার নিয়ে আমার আরেকটি আপত্তি আছে। পুরস্কারটি জীবিত লেখকদের দেওয়া হয়। অথচ লেখকের প্রকৃত বিচার অনেক সময় তার মৃত্যুর পরেই শুরু হয়। জীবিত অবস্থায় যাকে সহ্য করা যায় না, মৃত্যুর পর তার স্মরণসভায় বক্তৃতা দেওয়ার জন্য মঞ্চে জায়গা পাওয়া যায় না। যার বই জীবদ্দশায় কেউ পড়তে চাননি, তার মৃত্যুর পর তাকে নিয়ে স্মারকগ্রন্থ প্রকাশের প্রতিযোগিতা শুরু হয়।

সাহিত্যের ইতিহাসে এ এক আশ্চর্য ব্যবস্থা। জীবিত লেখকের চেয়ে মৃত লেখক অনেক বেশি নিরাপদ। তিনি কারও পুরস্কারের প্রতিদ্বন্দ্বী নন, কারও পদ-পদবির দাবিদার নন, কারও সমালোচনার জবাবও দিতে পারবেন না। ফলে মৃত্যুর পর তার মহত্ত্ব স্বীকার করতে আর বিশেষ অসুবিধা থাকে না।

আমার আশঙ্কা, নোবেল কমিটিও হয়তো এই সুবিধাজনক সময়ের অপেক্ষায় আছে। কিন্তু তাদের দুর্ভাগ্য, মৃত্যুর পরে নোবেল দেওয়ার বিধান নেই। ফলে আমার সঙ্গে তাদের একটি ঐতিহাসিক ভুল বোঝাবুঝি থেকেই যাবে।

আমি অবশ্য নিশ্চিত, আমাকে নোবেল না দেওয়ার জন্য দুশ বছর পরে হলেও নোবেল কমিটির সদস্যরা আমার কবরের ঘাসের কাছে এসে ক্ষমা চাইবেন। তখন হয়তো আমার কবরের অবস্থান খুঁজে পেতেও তাদের কিছুটা অসুবিধা হবে। তাতে আমার কোনো ক্ষতি নেই। ক্ষমা চাওয়ার সময় আমি উপস্থিত থাকতে পারব না বলে তাদের বিব্রত হওয়ারও কারণ থাকবে না।

তবে নোবেল পাওয়ার ব্যাপারটি যে একেবারেই আমার কল্পনার বাইরে, তা নয়। বরং কল্পনায় একবার পুরস্কারটি পেয়েও গেছি। সেই অভিজ্ঞতা নিয়ে একটি কবিতাও লিখেছিলাম। সেখানে নোবেল পাওয়ার পরের দিনের কোনো মহিমান্বিত দৃশ্য নেই। আছে বৌয়ের গুতো, কোষ্ঠকাঠিন্য, বুয়ার বকেয়া বেতন, অসুখবিসুখ এবং আমাদের চিরপরিচিত সাহিত্যিক সমাজ।

কবিতাটি এখানে তুলে দিচ্ছি। নোবেল কমিটি যদি কোনোদিন আমার কবিতা পড়ার সিদ্ধান্ত নেয়, তাহলে এটি দিয়েই শুরু করতে পারে। অন্তত এতে তারা বুঝতে পারবে, পুরস্কার পাওয়ার পর আমার জীবনযাত্রায় খুব বড় কোনো পরিবর্তন ঘটার সম্ভাবনা নেই।

 

নোবেল

 

যেদিন আমি নোবেল পেয়েছিলাম,

সেদিনও বৌয়ের গুতো খেয়ে ভেঙেছিল ঘুম।

অনেকক্ষণ বসে ছিলাম প্যানে, কোষ্ঠকাঠিন্যে।

বকেয়ার খাতা নিয়ে এসেছিল বাড়ির দারোয়ান।

কদিন আগে গেছে মাস— দেওয়া হয়নি বুয়ার বেতন।

পত্রিকার অফিস থেকে তরুণ সম্পাদক এসে

দু-একটা ডিক্টেশন নিয়েছিল বসের আদেশে।

 

বায়ান্নে গিয়েছিলেন ঠাকুর লন্ডনে অর্শ কাটাতে,

তিপান্নে তাঁর নোবেল এসেছিল হাতে।

আমিও ভুগছিলাম প্রোস্টেট আর হাঁপানির অসুখে,

হতে পারে প্রশমিত নোবেলের সুখে।

 

যদিও অক্টোবর এলে বিষণ্ণ হয় অনেকের মন।

চেকোস্লাভাকিয়া থেকে এসেছিলেন কুণ্ডেরা,

আচেবে চলে গেছেন, এখনও অপেক্ষায় থিয়োংগা।

আমারও দৃষ্টি হয়ে গেছে ক্ষীণ,

আমারও এসে গেছে মরিবার দিন।

 

অটোগ্রাফ নিতে হাজির তরুণ পাঠিকারা,

অল্প বয়সে অনেকে হয়েছে স্বামীহারা।

আমার সম্মানে আনন্দিত তারা,

যদিও আমায় দেশ থেকে দিয়েছিল তাড়া।

 

কটাক্ষ করে তারা—

বলে, কী প্রকারে আমার নোবেল হয়!

তাদের যুক্তি— যেহেতু পাননি গোর্কি, তলস্তয়।