হুমায়ূন আহমেদ
বাংলা সাহিত্যের স্থায়ী সম্পদ
সাঈদ বারী
প্রকাশ : ১৭ অক্টোবর ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

একজন লেখক মারা যাওয়ার পর ধীরে ধীরে তার বইয়ের চাহিদা কমে যাবে, এটাই স্বাভাবিক। নতুন লেখক আসবেন, নতুন বই প্রকাশ হবে, পাঠকের আগ্রহও বদলে যাবে। কিন্তু সব লেখকের ক্ষেত্রে এ নিয়ম খাটে না। কিছু মানুষ আছেন, যাদের সৃষ্টি সময়কে অতিক্রম করে বেঁচে থাকে। বাংলা সাহিত্যে হুমায়ূন আহমেদ সেই বিরল লেখকদের একজন।
আমাদের সাহিত্য অঙ্গনের সাম্প্রতিক একটি খবর হলো, মৃত্যুর এক যুগ পরেও দেশের বইয়ের বাজারে বিক্রির শীর্ষে রয়েছে হুমায়ূন আহমেদের বই। খবরটি অবাক করার মতো হলেও খুব একটা অপ্রত্যাশিত নয়। কারণ, গত এক যুগ ধরে প্রায় প্রতি বছরই বইমেলা কিংবা বইয়ের বাজারে একই চিত্র দেখা যায়। নতুন বইয়ের ভিড়েও পাঠকের হাতে থাকে নন্দিত নরকে, শঙ্খনীল কারাগার, কোথাও কেউ নেই, দেবী, জোছনা ও জননীর গল্প, মধ্যাহ্ন, দেয়াল, বাদশা নামদার কিংবা হিমু ও মিসির আলীর বই।
প্রশ্ন হলো, কেন এমন হচ্ছে? একজন লেখকের মৃত্যু হয়েছে এত বছর আগে, অথচ তার বই এখনো এত বেশি বিক্রি হয় কেন? এর সবচেয়ে সহজ উত্তর হলো, হুমায়ূন আহমেদ মানুষের মন বুঝতেন। তিনি জানতেন, মানুষ কী পড়তে ভালোবাসে। তিনি এমন গল্প লিখতেন, যেখানে পাঠক নিজের জীবনকে খুঁজে পেতেন। তার গল্পে ছিল আমাদের ঘরের মানুষ, পাশের বাসার মানুষ, গ্রামের মানুষ, শহরের মানুষ। ছিল হাসি, কান্না, প্রেম, অভিমান, একাকিত্ব, স্বপ্ন আর ছোট ছোট সুখের গল্প।
হুমায়ূন আহমেদের সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল তার ভাষা। তিনি কঠিন শব্দ দিয়ে পাঠককে মুগ্ধ করার চেষ্টা করেননি। বরং এমন সহজ ভাষায় লিখেছেন, যা পড়তে গিয়ে কখনোই মনে হয় না সাহিত্য পড়ছি। মনে হয়, খুব কাছের একজন মানুষ বসে গল্প শোনাচ্ছেন। এ সহজ ভাষার ভেতরেই লুকিয়ে ছিল গভীর জীবনবোধ। বাংলাদেশে এমন অসংখ্য পাঠক আছেন, যাদের বই পড়ার অভ্যাসই শুরু হয়েছে হুমায়ূন আহমেদের বই দিয়ে। কেউ প্রথম উপন্যাস হিসেবে পড়েছেন এইসব দিনরাত্রি, কেউ দেবী, কেউ আবার হিমুর কোনো বই। এরপর ধীরে ধীরে তারা অন্য লেখকদেরও পড়েছেন। অর্থাৎ হুমায়ূন আহমেদ শুধু নিজের পাঠকই তৈরি করেননি, তিনি পুরো বাংলা সাহিত্যের জন্য নতুন পাঠক তৈরি করেছেন।
আরেকটি বড় বিষয় হলো তার চরিত্র সৃষ্টি। বাংলা সাহিত্যে এমন চরিত্র খুব কমই আছে, যাদের নাম শুনলেই আলাদা একটা ছবি চোখের সামনে ভেসে ওঠে। হিমু, মিসির আলী, শুভ্র, কিংবা রূপা এখন আর শুধু উপন্যাসের চরিত্র নয়; তারা আমাদের সংস্কৃতির অংশ। নতুন প্রজন্মও এই চরিত্রগুলোর সঙ্গে পরিচিত হচ্ছে। কেউ বই পড়ে, কেউ নাটক দেখে, কেউ আবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভিন্ন উদ্ধৃতি দেখে আগ্রহী হচ্ছে।
হুমায়ূন আহমেদ শুধু উপন্যাস লিখে জনপ্রিয় হননি। তার নাটকও মানুষের জীবনে গভীর ছাপ ফেলেছে। নব্বইয়ের দশকে টেলিভিশনের সামনে পুরো পরিবার একসঙ্গে বসে তার নাটক দেখত। সেই নাটকের সংলাপ আজও মানুষ মনে রেখেছে। ইউটিউব ও বিভিন্ন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে এখনো তার নাটক লাখ লাখ মানুষ দেখেন। ফলে যারা বই পড়েন না, তারাও কোনো না কোনোভাবে তার গল্পের সঙ্গে পরিচিত হয়ে যান।
তার লেখার আরেকটি বড় বৈশিষ্ট্য ছিল মানবিকতা। তিনি মানুষের দুর্বলতাকে ছোট করে দেখেননি। বরং দেখিয়েছেন, ভুল করেও মানুষ ভালো থাকতে পারে, ভালোবাসতে পারে, আবার নতুন করে শুরু করতে পারে। তার চরিত্রগুলো আমাদের মতোই সাধারণ। এ সাধারণ মানুষগুলোর মধ্যেই তিনি অসাধারণ গল্প খুঁজে পেয়েছেন।
সমালোচকেরা অনেক সময় বলেছেন, তার লেখা খুব সহজ। কিন্তু এ সহজ লেখাটাই যে কত কঠিন, তা একজন লেখকই সবচেয়ে ভালো জানেন। সহজ ভাষায় এমন গল্প লেখা, যা এক বসায় শেষ করতে ইচ্ছা করে, সেটি খুব কম লেখকের পক্ষেই সম্ভব। হুমায়ূন আহমেদ সেই বিরল ক্ষমতার অধিকারী ছিলেন।
আজকের পৃথিবী আগের চেয়ে অনেক বদলে গেছে। এখন মানুষের হাতে স্মার্টফোন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, ওটিটি প্ল্যাটফর্ম, ছোট ছোট ভিডিও- বিনোদনের অসংখ্য মাধ্যম। বইয়ের সঙ্গে এসবের প্রতিযোগিতা সহজ নয়। তবু এই সময়ে যদি একজন লেখকের বই সবচেয়ে বেশি বিক্রি হয়, তাহলে বুঝতে হবে তার লেখার ভেতরে এমন কিছু আছে, যা সময়ের সঙ্গে পুরোনো হয় না।
আরও একটি বিষয় লক্ষ করার মতো। হুমায়ূন আহমেদের নতুন কোনো বই আর প্রকাশিত হওয়ার সুযোগ নেই।
তারপরও তার পুরোনো বইয়ের নতুন নতুন সংস্করণ বের হচ্ছে। প্রকাশকেরা নিয়মিত পুনর্মুদ্রণ করছেন। কারণ, পাঠকের চাহিদা এখনো শেষ হয়নি। অনেকেই পুরোনো বই হারিয়ে ফেললে আবার কিনছেন। নতুন প্রজন্ম প্রথমবারের মতো কিনছে। কেউ সংগ্রহের জন্য কিনছে, কেউ উপহার দিচ্ছে।
একজন লেখকের প্রকৃত জনপ্রিয়তা বোঝা যায় তার অনুপস্থিতিতে। তিনি না থাকলেও যদি মানুষ তাকে মনে রাখে, তার লেখা খুঁজে পড়ে, তার চরিত্র নিয়ে আলোচনা করে, তাহলে বুঝতে হবে তিনি সময়কে জয় করেছেন। হুমায়ূন আহমেদ সেই পরীক্ষায় সফল হয়েছেন।
রবীন্দ্রনাথ, শরৎচন্দ্র, বিভূতিভূষণ কিংবা নজরুলের মতো বাংলা সাহিত্যের কালজয়ী লেখকদের বই যেমন প্রজন্মের পর প্রজন্ম পড়ে আসছে, তেমনি সমকালীন বাংলা সাহিত্যে হুমায়ূন আহমেদও ধীরে ধীরে সেই অবস্থানেই পৌঁছে গেছেন। তিনি আর শুধু একটি সময়ের জনপ্রিয় লেখক নন; তিনি বাংলা সাহিত্যের স্থায়ী সম্পদ।
সাম্প্রতিক সংবাদে তার বই বিক্রির শীর্ষে থাকার তথ্য আসলে একটি সংখ্যার খবর নয়। এটি কোটি পাঠকের ভালোবাসার খবর। এটি প্রমাণ করে, একজন লেখক সত্যিকার অর্থে তখনই অমর হন, যখন তার লেখা মানুষের জীবনের অংশ হয়ে যায়। হুমায়ূন আহমেদের ক্ষেত্রে ঠিক সেটিই ঘটেছে।
তিনি নেই, কিন্তু তার বই আছে। তার গল্প আছে। তার চরিত্রগুলো আছে। আর সবচেয়ে বড় কথা, তার পাঠকেরা আছেন। যতদিন মানুষ গল্প পড়ে নিজের জীবনকে নতুন করে আবিষ্কার করতে চাইবে, ততদিন হুমায়ূন আহমেদের বই হাতে তুলে নেওয়ার মানুষও থাকবে। এ কারণেই মৃত্যুর এক যুগ পরেও তিনি শুধু বিক্রির শীর্ষে নন, পাঠকের হৃদয়েরও শীর্ষে আছেন।
