কবি ও কবিতা
মুহাম্মদ ফরিদ হাসান
প্রকাশ : ৩১ অক্টোবর ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

আমাদের অনুভূতির জগৎ বিস্তৃত। একেক রকম অনুভূতি থেকে একেক রকম কবিতার জন্ম হয়। তাই সুনির্দিষ্ট বিষয় বা অনুভূতি এখানে মুখ্য নয়। আমি কবিতা লেখাকে সহজাত প্রবণতার অংশ মনে করি। আমরা যেটাকে বলি, কবি তৈরি হয় না, কবির জন্ম হয়। হয়তো রক্তের ভেতর, বোধের ভেতর, আচ্ছন্নতার ভেতর কবিতা বাসা বাঁধে। তারপর তা শব্দে বাক্যে কবিতার শরীরে রূপ নেয়। এ সহজাত অনুভব আমাকে কবিতা লিখতে প্রতিনিয়ত তাড়িত ও প্রাণিত করে।
সময়ের সঙ্গে চিন্তার পরিবর্তন হয়। প্রথম দিকে, কিশোরকালে দেশপ্রেম ও মা বিষয়ক কবিতা লিখেছি প্রচুর। পরে প্রেম, বেদনার, সন্তাপ, চেতনার নানা রূপ হয়েছে কবিতার বিষয়। গত কয়েক বছর ধরে কবিতায় মিথ, লোকজ অনুষঙ্গ, উত্তরাধুনিকতাকে ধারণ এবং অনুল্লিখিত যাপনের গল্প বলার চেষ্টা করেছি। আমি সরলভাবে দার্শনিক উপলব্ধি-সম্পন্ন কবিতা লিখতে স্বাচ্ছন্নবোধ করি। এসব লিখতে কখনও কখনও কবিতায় বেহুলা-লখিন্দর-চাঁদ সওদাগরের মতো লোকগল্পের চরিত্রগুলো এসে হাজির হন। মূলত আনন্দ নিয়ে এ ধরনের চরিত্রগুলোকে বিনির্মাণ করি। গ্রামবাংলার পরিচিত শব্দাবলি, মিথের চরিত্র, উত্তরাধুনিক যাপনের সঙ্গে সম্পৃক্ত শব্দসমূহ আমার খুব প্রিয়। এগুলো আমি কবিতায় ব্যবহার করি। উদ্দেশ্য, অধিকাংশ পাঠক যেন সহজে কবিতার বক্তব্যটুকু বুঝতে পারেন। কবিতার বোধের সঙ্গে পাঠকের একাত্ম হতে যেন সময় না লাগে। কবিতার শেষে পাঠকের জন্য হাহাকার, বেদনা কিংবা চমক রাখতে চাই। বর্তমানে উত্তরাধুনিক শৈলী ও চেতনাকে ধারণের চেষ্টা করছি।
'হারানো ছুরির নিচে' আমার দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ। এটি এ মাসে প্রকাশ হওয়ার কথা রয়েছে। প্রথম কাব্যগ্রন্থ মিথ্যুক আবশ্যক (২০২৩) পাঠকদের ভালোবাসা পেয়েছিল।
কবিতা চিরকালের। চিরকালকে ধারণ করার প্রয়াস আজীবন থাকবে।
ঘুণপোকার পোস্টমর্টেম
প্রস্তরযুগ তাড়া করছে মানুষ
দেয়ালে রক্তগাথা
সেলফোনে বৃষ্টি নামে হরহম
রাবণ ঘুমায়, খুনি কোলাহল!
কারো নিউরন গোপন সক্রেটিস
ঠোঁটে সত্য, হাতে হেমলক
ইরাবতী নদীর ধারে একসকালে
পাওয়া যাবে তারও লাশ!
পর্ণকুটির ভরা কীটপতঙ্গ
বারোমাসি গালি শেখায় কানা-পাঠশালা
জরুরি ফোনকলে উপচে পড়ে শহর
বাজে সাইরেন, নদী-মাটি-জল বিপদসীমা।
প্রতিটি মীন-জাতক প্রলয় ডাকে
রক্তের অক্ষর মোছে নামলিপি
কাদম্বরী মরে, পৃথিবী দীর্ঘ কফিন
ডোমঘরে জেগে ওঠে ঘুণধরা সময়।
নিখোঁজ মানুষের স্মৃতি
ভুল কাফেলা পৌঁছে গেছে বন্দরে
পেছনে ছাইভস্ম, গোলাপী আতর
বুকের ভেতর ছুরি নিয়ে ঘোরে চেঙ্গিস খান
তখন বারান্দায় রোদের আলখেল্লা জাগে
শতরঞ্জি বোনে একদল ডাকাত
শস্য-মাঠে ঘুমায় মেঘবালিকা সকল।
ফুলের জাহাজ দিনভর রূপকথা
রাত্রি হলে বাজে ঘুঙুর, নর্তকী
আলাদীনও নাচে এবং চল্লিশ চোর
জোয়ার দিয়ে যায় বেহুলার চিৎকার
উল্কা জানে, সবাই রাখে না মনে শবদাহ।
কাফেলার পথ অনন্ত
মাটি—জঙ্গল—জলের চোরা টান
মানুষ মরে, শূন্যে হারায় নীহারিকা
নতুন দস্যু আসে নগর-চৌহদ্দি
স্মৃতি ধুয়ে বেঁচে থাকে অনাগত নারী।
