পুনশ্চ বনলতা সেন পাঠ ও প্রতিপাঠ

খোন্দকার কাওসার আহমেদ

প্রকাশ : ০৭ নভেম্বর ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

'আমি ক্লান্ত প্রাণ এক, চারিদিকে জীবনের সমুদ্র সফেন'— এটি জীবনানন্দ দাশের বিখ্যাত কবিতা 'বনলতা সেন'-এর অনন্য এক পঙক্তি। 'আমি ক্লান্ত প্রাণ এক'— এ অংশটি শুধু কাব্যিক ভাষায় বিন্যস্ত, এখানে শক্ত কোনো আলঙ্কারিক প্রয়োগ ঘটেনি; তাই বুঝে নিতে তেমন কষ্ট হয় না— এর ভাব অনায়াসে অনুভবে ধরা দেয়। আমরা অনুভব করতে পারি যে, কবি অতিশয় 'ক্লান্ত'— কিন্তু কেন? এ কেনোর উত্তরেই লুকিয়ে আছে নিদারুণ এক 'কবিত্ব' শক্তি— প্রগাঢ় অনুভবের ব্যাপার, যা হতে পারে নানাভাবেই চর্চিত।

অপর অংশটি, অর্থাৎ 'চারিদিকে জীবনের সমুদ্র সফেন'— চটজলদি অনুভবে ধরা দেয় না, কারণ তা অলঙ্কৃত; ফলে তার অন্তর্গত ভাবটি ধরার জন্য অলঙ্কারের অবগুণ্ঠন উন্মোচনের প্রয়োজন।

'চারিদিকে জীবনের...' এটুকু বলে থেমে গেলে আরও কিছু শোনার আকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়, কারণ কথাটা অসম্পূর্ণ। এবং অনিবার্য এক জিজ্ঞাসা তৈরি হয়— চারিদিকে জীবনের কী? কবির উত্তর: 'সমুদ্র সফেন'। কবি সরাসরি বললেন না যে চারিদিকে জীবনের দুঃখ, কষ্ট, বেদনা, হতাশা, ব্যর্থতা, না-পাওয়ার গ্লানি ইত্যাদি— যা কবিকে নিরন্তর 'ক্লান্ত' করে থাকে। বললেন সমুদ্র সফেনের কথা— অর্থাৎ কবি তার অনুভূতিকে সঞ্চারিত করলেন জাগতিক বস্তুগত জিনিসের মধ্যে—'সমুদ্র সফেন'।

ব্যক্তি যখন তার অনুভূতিকে সরাসরি প্রকাশ না করে বস্তু বা কোনো ঘটনার মাধ্যমে প্রকাশ করে, তখন তাকে বলা হয় 'অবজেক্টিভ কোরেলেটিভ'— কাব্যজগতে এ ধারণার প্রবর্তন করেন টি. এস. এলিয়ট। সাইকোলজির ভাষায় একে 'প্রজেকশন' বা 'প্রক্ষেপণ' বলা হয়ে থাকে। কবিতায় নানাভাবেই অবজেক্টিভ কোরেলেটিভ কিংবা প্রজেকশনের প্রয়োগ হতে পারে। যেমন, এখানে আমরা 'অ্যালেগোরি' ও 'মেটাফোর'-এর কথা বলতে পারি— যদিও দুটোই রূপক।

জীবনানন্দ দাশের 'বনলতা সেন' কবিতার আলোচ্য পঙক্তিতে প্রযুক্ত 'সমুদ্র সফেন' একটি মেটাফোর— চূড়ান্ত বিচারে রূপক অলংকার। রূপকটির অবগুণ্ঠন আস্তে করে সরিয়ে নিলে পঙক্তিটির মূলভাব স্পষ্ট হতে পারে। 'সফেন' শব্দের অর্থ ফেনাময়, অসংখ্য বুদ্বুদ। আক্ষরিক দিক থেকে 'সমুদ্র সফেন' কথাটির অর্থ হচ্ছে: 'সমুদ্রের অজস্র ফেনা'— সেটাই কি কবি তার জীবনের চারিদিকে দেখেছেন? না, তা কিন্তু নয়। তাহলে কী?

সাগরে বিপুল একটা ঢেউ উত্থিত হয়, তারপর তা বাতাসের প্রবাহে প্রচণ্ড বেগে আছড়ে পড়ে সাগরের তীরে। এরপর ঢেউটা সাগরের ঢাল, বাতাসের প্রবাহ ও মাধ্যাকর্ষণের প্রভাবে তীর থেকে তীব্র গতিতে সাগরের দিকে যেতে থাকে— ইতিমধ্যে সাগরে উত্থিত আরেকটা ঢেউ প্রচণ্ড গতিতে তীরের দিকে আসতে থাকে। দুই দিক থেকে ছুটে আসা তীব্র গতির দুই ঢেউ সাগরের মাঝে কোনো একখানে পরস্পর মুখোমুখি প্রচণ্ড রকম ধাক্কা খায়, ফলে উথলে ওঠা পানিতে বাতাসের প্রভাবে তৈরি হয় অৎস্র ফেনা বা বুদ্বুদ— যেগুলো কবির ভাষায় 'সমুদ্র সফেন'।

'মেটাফোর' বা রূপকের উক্ত ব্যবচ্ছেদের ফলে আমরা অনুধাবন করতে পারি যে, তীরে ধাক্কা খেয়ে ফিরে যাওয়া ঢেউটি কবির অন্তর্দ্বন্দ্ব; আর সাগর থেকে উঠে আসা ঢেউটি বহির্দ্বন্দ্ব— দুই দ্বন্দ্বে আচ্ছন্ন কবির যেসব জীবনযন্ত্রণা, তা-ই হতে পারে 'সমুদ্র সফেন'— যা কবিকে করেছে অশেষ 'ক্লান্ত'।

চতুর্দিকের সে সমস্ত জীবনযন্ত্রণা, যার দরুন এ অশেষ ক্লান্তি—তা-ই হতে পারে জীবনানন্দ দাশের কাব্যিক ভাষ্য: 'আমি ক্লান্ত প্রাণ এক, চারিদিকে জীবনের সমুদ্র সফেন।'

দুই.

সম্প্রতি আমার এক ছাত্র ফ্রান্স-প্রবাসী পিনাকী ভট্টাচার্যের একটি ভিডিও পাঠিয়েছে। মনোযোগ সহকারে দেখলাম ও শুনলাম। বুঝলাম, পিনাকী ভট্টাচার্য বেশ কসরত করেই ভিডিওটা বানিয়েছেন।

'আমি ক্লান্ত প্রাণ এক, চারিদিকে জীবনের সমুদ্র সফেন'— এ পঙক্তি নিয়ে আলোচনার কথা বললেও পিনাকী আটকে ছিলেন 'ক্লান্ত' শব্দটিতে। 'চারিদিকে জীবনের সমুদ্র সফেন' নিয়ে কোনো কথা ছিল না। আর 'ক্লান্ত' শব্দের ব্যঞ্জনা প্রকাশ করতে গিয়ে তিনি যেভাবে হোমার, বোদলেয়ার, ভরতিহরি, কামু, গৌতম, এলিয়েট, গিলগামিশ, সিসিফাস, দেমোদোকাস, ভার্জিল, টেনিসন, জয়েস প্রমুখের কথা বলে গেলেন; শেষমেশ তার আলোচনার সারনির্যাস মনোযোগ সহকারে শোনার পরও মনে রাখতে ব্যর্থ হলাম— মাথার ওপর দিয়ে চলে গেল! স্বীকার করছি আমার ব্যর্থতা।

সাহিত্য সমালোচনার নানা পদ্ধতি আছে। পদ্ধতিগত দিক থেকে পিনাকী ভট্টাচার্যের 'বনলতা সেন' কবিতার ভিডিওটিকে বলা যেতে পারে তুলনামূলক সমালোচনা। কিন্তু তাতে ঘটেছে অতিমাত্রায় ইন্টেলেকচুয়ালাইজেশন।

আমাদের দেশে তুলনামূলক সাহিত্য সমালোচনার কিছু বিপত্তি আছে, যেমন : এ ধরনের আলোচনা শিক্ষিত অপাঠক (!) শ্রেণির মাথার ওপর দিয়ে চলে যেতে পারে; এবং সুচতুর কোনো আলোচক ভুলভাল তথ্য দিয়ে বিস্তর পাণ্ডিত্য ফলাতে পারেন।

কবি কাজী নজরুল ইসলাম সংক্রান্ত এক আলোচনা সভায় জনৈক আলোচক টি. এস. এলিয়টের কালজয়ী সৃষ্টি 'দ্য ওয়েস্ট ল্যান্ড' কবিতার প্রসঙ্গ আনলেন। বললেন যে, এই কবিতার ন্যারেটর বা কথক হচ্ছেন 'টাইরেসিয়াস'— এরই সূত্র ধরে তিনি নজরুলের বিখ্যাত 'বিদ্রোহী' কবিতার ন্যারেটর বানালেন শিবকে; যা অযৌক্তিক ও অশোভনীয়। এরপর তিনি যে মারাত্মক ভুলভাল তথ্য দিলেন, তা হলো: গ্রিক মিথলজির অন্যতম নাটকীয় ও রহস্যময় চরিত্র টাইরেসিয়াস নাকি অর্ধেক মানব ও অর্ধেক মুরগি বিশিষ্ট! মজার বিষয় হলো, আয়োজনে উপস্থিত দর্শক-শ্রোতারা তার আলোচনা নির্বিবাদে শুনে গেলেন!

প্রসঙ্গত বলে রাখি, ওপরের '০১' নম্বর অনুচ্ছেদে 'বনলতা সেন' কবিতার 'আমি ক্লান্ত প্রাণ এক, চারিদিকে জীবনের সমুদ্র সফেন' পঙক্তি নিয়ে যে আলোচনা করা হয়েছে; তা রূপাশ্রয়ী সমালোচনা। এ ধরনের সমালোচনা ব্যক্তিগতভাবে আমার পছন্দ।

তিন.

আমার কাছে মনে হয়, 'কবিতা' একটি রঙিন ঘুড়ির মতো। যে-ই কবিতার ভূমিতে অবতীর্ণ হয়, তার হাতেই ঘুড়ির লাটাই চলে যায়— আর সে মহানন্দে ঘুড়ি ওড়াতে থাকে। ভাবের সুতা ছিঁড়ে গেলেও ক্ষতি নেই, কারণ তখন সেই সুতা-কাটা ঘুড়ির পেছনে দৌড়ানোর মাঝেই রয়েছে অন্যরকম এক আনন্দ।

হাতের লাটাই আর উড়ন্ত ঘুড়ির মাঝে স্বাভাবিক নিয়মের যে সুতাটা থাকে, তার সাথে নতুন আরেকটা সুতা যুক্ত করা যেমন অসম্ভব কারবার; তেমনি কাউকে লাইন ধরে ধরে কবিতার ভাব বোঝানোটাও অবান্তর।

কবিতার ভাব চাপিয়ে দেওয়ার বিষয় নয়; পাঠক তার স্বকীয় মহিমায় কবিতার ভাব আস্বাদন করবে। তাই কবিতার কাঠখোট্টা আলোচনার চেয়ে আগে স্বকীয় মহিমার স্বাধীন ও মননশীল পাঠক তৈরির আলোচনাই সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন। দেশে আজকাল কবিতার চেয়ে প্রকৃত কবিতা পাঠকের আকালই বেশি।