তুরস্ক কী ধরনের অস্ত্র উৎপাদন করে বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ অস্ত্র রপ্তানিকারক দেশ
প্রকাশ : ২৯ ডিসেম্বর ২০২০, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

মাত্র ২ দশক আগে ১৯৯৯ সালেও তুরস্ক ছিল বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম অস্ত্র আমদানিকারক দেশ, আর সেই দেশটিই ২০১৮ সালে এসে বিশ্বের ১৪তম বৃহত্তম অস্ত্র রপ্তানিকারক দেশে পরিণত হয়েছে।
সম্প্রতি ঢাকায় এসে দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী মেভলিত শাভিসলু বলেছেন, তাদের অস্ত্র আমদানিকারকদের তালিকায় এখন বাংলাদেশকেও পেতে চাইছেন তারা। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আবদুল মোমেনের সঙ্গে সাক্ষাতের পর তিনি জানান, তুরস্কের প্রতিরক্ষা পণ্যের গুণগত মান ভালো, দামে সুলভ এবং বিক্রির ক্ষেত্রে কোনো আগাম শর্ত তারা দেন না।
অতীতে বিশ্বের পরাশক্তিগুলোর কাছ থেকে প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম কিনতে গিয়ে সমস্যায় পড়ে তুরস্ক নিজেই অস্ত্র উৎপাদন শুরু করে, এ কথা জানিয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, তুরস্ক প্রযুক্তি হস্তান্তর ও বাংলাদেশের সঙ্গে যৌথ উৎপাদনে যেতেও রাজি আছে।
বাংলাদেশের দিক থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে এ প্রস্তাবে রাজি হওয়ার বিষয়ে সরাসরি কোনো ঘোষণা না এলেও বিশ্লেষকরা মনে করছেন যে, প্রস্তাবটি বাংলাদেশ বিবেচনা করতে পারে। তবে তুরস্ক ঠিক কী ধরনের অস্ত্র উৎপাদন করে এবং বাংলাদেশে কোন ধরনের অস্ত্র তারা রপ্তানি করতে চাইছে, তার বিস্তারিত তথ্য কোনো পক্ষ থেকেই প্রকাশ করা হয়নি।
অস্ত্র উৎপাদন ও রপ্তানিতে তুরস্কের সক্ষমতা
তুরস্কের সরকারি তথ্য বলছে, ২০১৮ সালে তারা ছিল বিশ্বের ১৪তম বৃহত্তম অস্ত্র রপ্তানিকারক দেশ। তবে রপ্তানি বিষয়ে তুরস্কের সরকারি সংস্থা টার্কিশ এক্সপোর্টার্স অ্যাসেম্বলির প্রকাশ করা তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছর জানুয়ারি থেকে আগস্ট সময়কালে তুরস্কের প্রতিরক্ষা রপ্তানি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে।
গত বছর একই সময়ের তুলনায় এবার এই সময়ে রপ্তানি কমেছে প্রায় ২৬ শতাংশ। তবে এটিও ঠিক, একদিকে করোনাভাইরাস মহামারি, অন্যদিকে অর্থনৈতিক মন্দার কারণে তুরস্কের মুদ্রার অবনমন হয়েছে, পাশাপাশি দেশটিতে বেড়েছে মুদ্রাস্ফীতি এবং বেকারত্বের হার। এর আগের বছরগুলোতে অবশ্য ক্রমেই বাড়ছিল তুরস্কের প্রতিরক্ষাসামগ্রী রপ্তানি।
গত বছরের অক্টোবরে সিরিয়ায় কুর্দি মিলিশিয়াদের ওপর হামলার পর থেকে ফ্রান্স, ফিনল্যান্ড, সুইডেন, চেক প্রজাতন্ত্র, নেদারল্যান্ডস, স্পেন এবং জার্মানিসহ অনেক দেশ তুরস্কের ওপর অস্ত্র নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছিল। এর আগেই ২০১৮ সালে দেশটির সব রপ্তানি খাতের মধ্যে প্রতিরক্ষা সামগ্রীর রপ্তানির প্রবৃদ্ধিই ছিল সবচেয়ে বেশি। ওই বছরই প্রথমবারের মতো দেশটি ২০০ কোটি মার্কিন ডলারের প্রতিরক্ষা সামগ্রী রপ্তানি করতে সক্ষম হয়। এরপর তুরস্ক ২০১৯-২৩ সময়ের জন্য কৌশলগত পরিকল্পনা করে, যাতে ২০২৩ সাল নাগাদ প্রতিরক্ষা সামগ্রীর রপ্তানি ১ হাজার কোটি ডলারে উন্নীত করার কথা বলা হয়। একই সঙ্গে চাহিদার ৭৫ ভাগ দেশেই উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়।
গত আগস্টে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ডিফেন্স নিউজ ম্যাগাজিন তাদের টপ গ্লোবাল ফার্মের তালিকায় স্থান দিয়েছিল তুরস্কের সাতটি প্রতিরক্ষাসামগ্রী উৎপাদক প্রতিষ্ঠানকে। আবার সুইডেনভিত্তিক ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউট বা সিপরির তথ্য অনুযায়ী, সামরিক খাতে তুরস্ক গত বছর ব্যয় করেছে ২ হাজার কোটি ডলারের বেশি। তুরস্কের প্রতিরক্ষা খাত নিয়ন্ত্রণ করে মূলত টার্কিশ আর্মড ফোর্সেস ফাউন্ডেশন, যার মূল কর্তৃত্ব প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোগানের হাতে।
কী ধরনের অস্ত্র উৎপাদন করে তুরস্ক
সামরিক বিষয়ের একজন বিশ্লেষক এবং বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট ফর পিস অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের প্রেসিডেন্ট অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল আ ন ম মুনীরুজ্জামান জানান, তুরস্কের ডিফেন্স ইন্ডাস্ট্রি একটি পূর্ণাঙ্গ শিল্প খাত। ‘সেনা, নৌ ও বিমানবাহিনীর দরকারÑ এমন সব কিছুই তারা এখন তৈরি করে। বাংলাদেশ আগেও সমরাস্ত্র আমদানি করেছে তাদের কাছ থেকে। তাদের প্রযুক্তিও আধুনিক।’
তিনি আরও জানান, স্থলবাহিনীর জন্য ট্যাংক, কামানসহ যুদ্ধাস্ত্র, আর্টিলারি ইকুইপমেন্ট, গোয়েন্দা কার্যক্রম বা নজরদারিতে ব্যবহৃত যন্ত্রপাতি, বিমানবাহিনীর যুদ্ধবিমান থেকে শুরু করে সব এবং নৌবাহিনীর যুদ্ধজাহাজ থেকে সব কিছুই এখন তুরস্ক তৈরি করছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে শুধু অস্ত্র নয়, বরং অস্ত্র কেনার পর দীর্ঘ সময় ধরে ক্ষুদ্রাংশ সরবরাহ এবং ব্যাকআপ সার্ভিস দিতে পারে তুরস্ক। এছাড়া, সামরিক কোনো বিষয়ে প্রশিক্ষণের দরকার হলে, সে ব্যাপারে প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়া ক্ষেত্রেও তুরস্কের সক্ষমতা তৈরি হয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
ওদিকে প্রতিরক্ষা বিষয় বিভিন্ন জার্নাল কিংবা তুরস্কের প্রতিরক্ষাবিষয়ক বিভিন্ন রিপোর্ট থেকে যে ধারণা পাওয়া যায়, তা হলো দেশটি শটগান, রাইফেল, স্নাইপার রাইফেল, লাইট মেশিন গান, হেভি মেশিনগান, ল্যান্ডমাইন, হ্যান্ড গ্রেনেড, রকেট, সেল্ফ প্রপেল্ড গ্রেনেড, অ্যান্টি এয়ারক্রাফট গানসহ নানা ধরনের অস্ত্র ও সেন্সর তৈরি করে।
আবার নিজেদের তৈরি করা ল্যান্ডমাইন ডিটেক্টর ব্যবহার করে সিরিয়ায় সাফল্য পাওয়ার দাবি করেন দেশটির সামরিক বিশ্লেষকরা। তাছাড়া তুরস্কের একটি কোম্পানি এন্টি ড্রোন ইলেক্ট্রোম্যাগনেটিক গান তৈরি করেছে, যা কম উচ্চতায় থাকা ড্রোনকে ভূপাতিত করতে সক্ষম বলে জানানো হয়েছে। তবে যেটি নিয়ে এখন সবচেয়ে বেশি আলোচনা হচ্ছে সেটি হলো, তুরস্কে বানানো ড্রোন। দেশটির চারটি কোম্পানি ড্রোন উৎপাদন করে থাকে। এগুলোর মধ্যে মেশিনগান এবং গ্রেনেড বহনকারী ড্রোনও রয়েছে।
আন্তর্জাতিক বিভিন্ন গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে, আজারবাইজান সাম্প্রতিক যুদ্ধে আরমেনিয়ার বিরুদ্ধে তুরস্কের তৈরি ড্রোন ব্যবহার করে ব্যাপক সাফল্য পায়।
এছাড়া, নিজস্ব স্যাটেলাইট এবং ভালো মানের রাডার আছে তুরস্কের। এখন তারা ক্রুজ মিসাইল তৈরির কাজ করছে বলে জানা যাচ্ছে। এর পাশাপাশি নৌবাহিনীর জন্য তারা যেসব যুদ্ধ সরঞ্জাম তৈরি করছে, তার মধ্যে রয়েছে অ্যান্টি শিপ মিসাইল, লাইটওয়েট টর্পেডো এবং সোনার সিস্টেম। তারা আন্ডারওয়াটার অ্যাটাক ড্রোন তৈরি নিয়েও কাজ করছে। একই সঙ্গে যুদ্ধজাহাজের ইঞ্জিন তৈরি করা শুরু করেছে ২ বছর আগে।
সুইডেনভিত্তিক সিপরির দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ এখনই তুরস্ক থেকে কিছু সামরিক সরঞ্জাম আমদানি করছে। এর বাইরে বাংলাদেশ যেসব দেশ থেকে অস্ত্র এবং সামরিক সরঞ্জাম আমদানি করে, সেসব দেশের তালিকায় রয়েছেÑ চীন, ইতালি, রাশিয়া, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, সার্বিয়া, ইউক্রেন, যুক্তরাষ্ট্র এবং জার্মানি। তবে তুরস্ক এখন চাইছে বাংলাদেশ আরও বেশি পরিমাণ সামরিক সরঞ্জাম তাদের কাছ থেকে সংগ্রহ করুক এবং দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী তার সাম্প্রতিক সফরে সে প্রস্তাবই দিয়েছেন।
হ সূত্র : বিবিসি বাংলা
