প্রিন্ট সংস্করণ
০০:০০, ০৩ মার্চ, ২০২৬
তুর্কমেনিস্তান : সাদা মার্বেলের স্থাপত্যে গড়া এক অনন্য নগরী আশগাবাত। চোখ যতদূর যায়, সাদা রঙের আধিপত্য। ভবন, ইমারত, দালানকোঠা- সবই সুশোভিত সাদা মার্বেলে। এ বৈশিষ্ট্যের কারণে শহরটি গিনেস বিশ্ব রেকর্ডে স্থান পেয়েছে। আশগাবাত তুর্কমেনিস্তানের রাজধানী। মধ্য এশিয়ার দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে অবস্থিত এ প্রজাতান্ত্রিক রাষ্ট্রে প্রায় ৯৩ শতাংশ মানুষ মুসলিম। ধর্মীয় পরিচয় এখানকার সামাজিক কাঠামোর সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। রমজান এলে সেই পরিচয় আরও উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। রমজান বরণে তুর্কমেনদের নিজস্ব কৃষ্টি ও সংস্কৃতি রয়েছে। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে এ অঞ্চলের মানুষ ইসলাম অনুসরণ করে আসছে। দীর্ঘ ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতায় রমজানকে ঘিরে গড়ে উঠেছে বিশেষ সামাজিক রীতি। আল-মিসরিল ইয়াওমি পত্রিকার তথ্যমতে, রমজান উপলক্ষে বিশেষ বাজার করা তাদের বড় প্রস্তুতি। মসজিদ, খানকা ও ঘরবাড়ি পরিষ্কার করা হয় যত্নের সঙ্গে। রমজান এলে আত্মীয়স্বজন একত্রিত হয়। একসঙ্গে রোজা রাখা ও ইফতার করা তাদের ঐতিহ্যের অংশ। এতে পারিবারিক বন্ধন দৃঢ় হয়। তুর্কমেন নারীরা নান্দনিকতায় আগ্রহী। রমজানের আগে তারা ঘর ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সাজাতে উদ্যোগী হন। নতুন কার্পেট বোনা হয়। কারুকাজখচিত কাপড় তৈরি করা হয়। মসজিদ ও খানকার শোভা বাড়াতে সজ্জাসামগ্রী ব্যবহৃত হয়। প্রস্তুতিপর্বে সামাজিক অংশগ্রহণ স্পষ্ট। রমজানকে তারা উৎসব ও ইবাদতের সম্মিলিত সময় হিসেবে দেখে। রমজান শুরু হলে জোহরের নামাজের পর থেকেই মসজিদকেন্দ্রিক কর্মসূচি শুরু হয়। কোরআন ও হাদিসের মজলিস অনুষ্ঠিত হয়। পাশাপাশি বিভিন্ন প্রতিযোগিতার আয়োজন থাকে। বিষয়বস্তু সাধারণত ইসলাম, কোরআন ও ইসলামি ইতিহাস। শিশু ও কিশোর-কিশোরীরা সক্রিয়ভাবে অংশ নেয়। জ্ঞানচর্চা ও ধর্মীয় অনুরাগ একই পরিসরে যুক্ত হয়। দান-সদকায়ও প্রতিযোগিতামূলক মনোভাব দেখা যায়। সামাজিক সহমর্মিতা এভাবে জোরদার হয়। ইফতার আয়োজন বৈচিত্র্যময়। দাগরামা, সামোচা ও তুর্কমেনীয় পানীয় টেবিলে স্থান পায়। খেজুর ও বিভিন্ন শাকসবজিও পরিবেশিত হয়। উট ও ভেড়ার গোশতের তৈরি নানা পদ ইফতার ও সেহরিতে অন্তর্ভুক্ত থাকে। অঞ্চলভেদে মশলার ব্যবহারে ভিন্নতা দেখা যায়। উটের দুধের চা ইফতারের অপরিহার্য অংশ। শীতপ্রধান আবহাওয়ার কারণে চায়ের কদর সারা বছরই রয়েছে। খাদ্যসংস্কৃতিতে স্থানীয় ঐতিহ্য ও পরিবেশগত প্রভাব স্পষ্ট। ইবাদতের ক্ষেত্রেও তুর্কমেনিস্তানের চর্চা স্বতন্ত্র। তারাবি দীর্ঘ সময় ধরে আদায় করা হয়। ইশার নামাজ বিলম্বিত করা হয় অনেক ক্ষেত্রে। কখনও ফজর পর্যন্ত দীর্ঘ কিয়াম চলে। এটি তাদের বিশেষ ধর্মীয় কৃষ্টি হিসেবে বিবেচিত। অধিকাংশ মসজিদে অন্তত এক খতম কোরআনের প্রচলন রয়েছে। কোথাও একাধিক খতমও সম্পন্ন হয়। কদরের রাত উপলক্ষে বাড়তি ইবাদতের প্রস্তুতি নেওয়া হয়। আধ্যাত্মিক মনোনিবেশ তখন তীব্র হয়। সামগ্রিকভাবে তুর্কমেনিস্তানে রমজান শুধু উপবাসের সময় নয়। এটি ঐতিহ্য, নান্দনিকতা ও সমবায়ী ধর্মচর্চার সম্মিলিত রূপ। সাদা মার্বেলের শহর যেমন স্থাপত্যে স্বতন্ত্র, তেমনি রমজান পালনেও তাদের নিজস্ব স্বাক্ষর স্পষ্ট।
উজবেকিস্তান : মধ্য এশিয়ার ভূরাজনৈতিক পরিসরে উজবেকিস্তান একটি গুরুত্বপূর্ণ মুসলিম রাষ্ট্র। স্বাধীন এ দেশ ইতিহাস ও ঐতিহ্যের গভীরতায় সমৃদ্ধ। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যও এর পরিচয়ের অংশ। বিশ্ববিখ্যাত বহু মুসলিম মনীষীর জন্মভূমি এটি। ইমাম বোখারি ও ইমাম তিরমিজি রহ.-এর মতো মহাপণ্ডিতদের স্মৃতি এখানে সংরক্ষিত। ফলে ইসলাম দেশটির সাংস্কৃতিক গঠনে প্রোথিত। ধর্মীয় ঐতিহ্য সামাজিক জীবনের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে যুক্ত। রমজান আগমনে সেই ঐতিহ্য আরও দৃশ্যমান হয়ে ওঠে। সমগ্র দেশজুড়ে সৃষ্টি হয় ধর্মীয় উচ্ছ্বাস। রমজান শুরু হলে মসজিদগুলোকে নতুনভাবে প্রস্তুত করা হয়। ধোয়া-মোছা সম্পন্ন করা হয় যত্নের সঙ্গে। অভ্যন্তরীণ সাজসজ্জায় যুক্ত হয় নতুন কাপড়। বিছানো হয় বাহারি রঙের কার্পেট। দেয়ালে স্থান পায় নান্দনিক ক্যালিগ্রাফি। সুগন্ধি আতরের সুবাস ছড়িয়ে পড়ে প্রার্থনাকক্ষে। পরিবেশ হয়ে ওঠে সুশোভিত ও পবিত্রতামণ্ডিত। আধ্যাত্মিক আবহ স্পষ্টভাবে অনুভূত হয়। তারাবির ক্ষেত্রে উজবেক সমাজে খতমে তারাবির বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। সাধারণত বড় শহর ও প্রধান মসজিদগুলোতে পূর্ণ খতমে তারাবির আয়োজন করা হয়। তুলনামূলক ছোট মসজিদ ও বাসা-বাড়িতে সুরা তারাবির প্রচলনও রয়েছে। কোথাও কোথাও একাধিক খতমের ব্যবস্থাও দেখা যায়। দুই বা তিন খতমে তারাবি আদায়ের নজিরও বিদ্যমান। এর মাধ্যমে কোরআন তেলাওয়াতের প্রতি বিশেষ অনুরাগ প্রতিফলিত হয়। ইফতার আয়োজনে উজবেক সমাজে এক বিশেষ সাংস্কৃতিক মাত্রা ধারণ করে। এ নিয়ে নীরব এক প্রতিযোগিতা লক্ষ্য করা যায়। কে কত সুন্দরভাবে দস্তরখান সাজাবে, তা নিয়ে সামাজিক আগ্রহ কাজ করে। ইফতার কখনও ঘরোয়া পরিসরে অনুষ্ঠিত হয়, কখনও তা রাস্তায় বা উন্মুক্ত স্থানে সম্মিলিত আয়োজনের রূপ নেয়। ইফতারের মুহূর্তকে তারা উৎসবের অংশ হিসেবে বিবেচনা করে। বাজার, মসজিদ, খানকা ও জনপদ- সবখানেই প্রস্তুতির ব্যস্ততা দেখা যায়। খাবারের বৈচিত্র্য উজবেক ইফতারের একটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য। ‘সুনসাহ’ ও ‘নাসতু’ নামের খাবার বিশেষভাবে পরিবেশিত হয়। সুনসাহ প্রস্তুত হয় গোশত ও পেঁয়াজ দিয়ে। পরে তা খোলা আগুনে ভেজে নেওয়া হয়। নাসতু এক ধরনের সুপসদৃশ পদ। এটি চাল ও গোশতের সমন্বয়ে রান্না করা হয়। সঙ্গে থাকে বিভিন্ন ফলমূল। ইফতার টেবিলে বাতির রুটি, সামসা পেস্ট, নিসালদা হালুয়া, নাশপাতি, সিলবিলাদ, কমলা, বেদানা ও গিলাফ উজবেকি পরিবেশন সাধারণ ঘটনা। খাবারের বিন্যাসে থাকে নান্দনিকতা। ঘরোয়া ইফতারে পরিবারের সব সদস্য উপস্থিত থাকেন। নির্ধারিত সময়ে ইফতার শুরু করা একটি ঐতিহ্য। পরিবারের প্রধান ব্যক্তি ইফতার সূচনা করেন। এটি প্রজন্মান্তরে বহমান সাংস্কৃতিক রীতি। পাশাপাশি প্রতিবেশীদের ঘরেও ইফতার পাঠানো হয়। প্রতিদিনই কোনো না কোনো বাড়িতে খাদ্য পৌঁছে দেওয়া হয়। শিশুদের অংশগ্রহণ এখানে বিশেষভাবে লক্ষণীয়। তারা দরজায় কড়া নাড়ে। ‘ইয়া রমাদান! ইয়া রমাদান!’ শিরোনামের একটি নাশিদ গেয়ে আনন্দ প্রকাশ করে। তুর্কি একটি ওয়েবসাইটের তথ্যানুসারে, ‘তাশাক তাশাক’ নামের একটি খাদ্যও এ মাসে প্রস্তুত করা হয়। এটি মূলত তাতারি হালুয়া। সেহরিতেও উজবেক ঐতিহ্যের প্রতিফলন স্পষ্ট। প্রধান খাদ্য হিসেবে ব্যবহৃত হয় বোখারি চাল। স্থানীয়ভাবে এটি ‘আশ’ বা ‘বালুফ’ নামে পরিচিত। তরকারিতে থাকে ভেড়ার বিশেষ ধরনের গোশত। তা তেল, পেঁয়াজ, গাজর, স্কোয়াশ, কিসমিস ও জিরাসহ বিভিন্ন মশলায় রান্না করা হয়। সঙ্গে পরিবেশিত হয় ভাজা গোশত ও কোয়েল পাখির ডিম। খাদ্যসংস্কৃতি ও ইবাদতের সমন্বয়ে উজবেকরা রমজান অতিবাহিত করেন। আধ্যাত্মিকতা ও সামাজিকতার এক সমবায় রূপ এখানে প্রতিফলিত হয়।
কাজাখস্তান : মধ্য এশিয়ার বিস্তীর্ণ ভূখণ্ডজুড়ে অবস্থিত কাজাখস্তান। আয়তনের বিচারে এটি বিশ্বের নবম বৃহত্তম দেশ। জনসংখ্যার প্রায় সত্তর শতাংশ মুসলমান। একদিকে চীন, অন্যদিকে রাশিয়া- এ দুই পরাশক্তির মধ্যবর্তী ভৌগোলিক অবস্থান দেশটির ইতিহাসকে প্রভাবিত করেছে। হাজার বছরের যাযাবর জীবনধারা থেকে আধুনিক রাষ্ট্রে উত্তরণ ঘটেছে কাজাখদের। সামাজিক কাঠামো বদলেছে। জীবনযাত্রা পরিবর্তিত হয়েছে। তবু রমজান এলে ধর্মীয় চর্চার ঐতিহ্য অটুট থাকে। ইফতার, সেহরি, তারাবি ও কোরআন তেলাওয়াতে সেই পুরোনো জৌলুশ স্পষ্ট হয়। ধর্ম ও সংস্কৃতির সংমিশ্রণে রমজান এখানে উৎসবমুখর মাসে রূপ নেয়।
রমজানকে স্বাগত জানানোর ক্ষেত্রে ব্যবসায়ীরাও অংশ নেয়। অনেক দোকানি এ মাসে অ্যালকোহল বিক্রি বন্ধ রাখেন। এটি সামাজিক সংবেদনশীলতার বহিঃপ্রকাশ। নামাজি মুসল্লিরা মসজিদ ও নামাজের স্থান পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করেন। ধোয়া-মোছার মাধ্যমে প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়। শিশু-কিশোরদের অংশগ্রহণ বিশেষভাবে লক্ষণীয়। তারা রাস্তায় নেমে রমজানকে স্বাগত জানায়। বিভিন্ন আরবি সংগীত পরিবেশন করে আনন্দ প্রকাশ করে। সামগ্রিকভাবে এক ধরনের ধর্মীয় আবহ গড়ে ওঠে সর্বত্র। আত্মীয়তার বন্ধন সুদৃঢ় করাও কাজাখদের রমজান সংস্কৃতির অংশ। এ মাসে আত্মীয়স্বজনদের দাওয়াত দেওয়া হয়। উপহার ও উপঢৌকন পাঠানো হয় নিয়মিত। পারিবারিক বিরোধ থাকলে তা মিটিয়ে ফেলার চেষ্টা করা হয় রমজানের আগেই। অন্তরের হিংসা ও বিদ্বেষ দূর করার প্রয়াস দেখা যায়। লক্ষ্য একটিই- ভালোবাসা ও সৌহার্দ্যরে পরিবেশে রমজানকে বরণ করা। সামাজিক পুনর্মিলনের সুযোগ হিসেবে রমজানকে দেখা হয়। কাজাখ রান্নাশৈলী বিশ্বব্যাপী পরিচিত। বৈচিত্র্যময় খাদ্যতালিকা পর্যটকদের আকর্ষণ করে। রমজান এলে সেই বৈচিত্র্য আরও প্রসারিত হয়। যাযাবর ঐতিহ্যের প্রভাব ইফতার আয়োজনেও দৃশ্যমান। উট, ভেড়া ও ঘোড়ার গোশত দিয়ে বিভিন্ন পদ প্রস্তুত করা হয়। উট ও ভেড়ার দুধ থেকেও তৈরি হয় নানা খাদ্যদ্রব্য। ইফতারের প্রধান পানীয় হিসেবে কুমিস ও শুবাত বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। কুমিস প্রস্তুত হয় ঘোড়ার দুধ থেকে। শুবাত তৈরি হয় উটের দুধ দিয়ে। ফলমূল ও শরবতও পরিবেশিত হয়। তবে শীতপ্রধান আবহাওয়ার কারণে চায়ের চাহিদা শরবতের তুলনায় বেশি। খাদ্যসংস্কৃতিতে ঐতিহ্য ও পরিবেশগত বাস্তবতার সমন্বয় স্পষ্ট। কাজাখস্তানে প্রায় দুই হাজার বড় মসজিদ রয়েছে। রমজানকালে এসব মসজিদে রোজাদারদের জন্য উন্মুক্ত আপ্যায়নের ব্যবস্থা থাকে। এ ব্যবস্থাকে বলা হয় ‘মাতাইমুর রহমাহ’, অর্থাৎ আল্লাহর রেস্তোরাঁ। এখানে যে কেউ ইফতার করতে পারেন। পরিচালনার জন্য উন্মুক্ত দানের সুযোগ রাখা হয়। সামর্থ্যবান ব্যক্তিরা এতে অংশগ্রহণ করেন। এটি ধর্মীয় সহমর্মিতার প্রাতিষ্ঠানিক রূপ। তারাবির ক্ষেত্রেও খতমের প্রতি কাজাখদের আগ্রহ প্রবল। অধিকাংশ মুসল্লি খতমে তারাবি আদায়ে সচেষ্ট থাকেন। মসজিদকেন্দ্রিক জামাতে অংশ নেওয়াই তাদের পছন্দ। একাকী তারাবি পড়ার প্রবণতা তুলনামূলক কম। শহরাঞ্চলের মসজিদগুলোতে একটি বিশেষ দৃশ্য দেখা যায়। তারাবি শেষে গাড়িচালক বা গাড়ির মালিকেরা মুসল্লিদের জন্য অপেক্ষা করেন। পরে তাদের নিজ নিজ বাসায় পৌঁছে দেন। এ সেবার জন্য কোনো ভাড়া নেওয়া হয় না। এর মাধ্যমে তারা অতিরিক্ত নেকি অর্জনের প্রত্যাশা করেন। কোরআন তেলাওয়াতেও কাজাখদের উৎসাহ লক্ষণীয়। ব্যক্তি ও সামষ্টিক উভয় পরিসরেই তেলাওয়াতের চর্চা বৃদ্ধি পায়। ইবাদত, আতিথ্য ও সামাজিক সম্প্রীতির মধ্য দিয়ে রমজান অতিবাহিত হয়। শেষে একই আবেগ নিয়ে মাসটিকে বিদায় জানানো হয়। আধ্যাত্মিক সাধনা ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের সমন্বয়ে কাজাখস্তানে রমজান একটি পূর্ণাঙ্গ সামাজিক অভিজ্ঞতায় রূপ নেয়।
সোমালিয়া : উত্তর-পূর্ব আফ্রিকার ভূখণ্ডে অবস্থিত সোমালিয়া। আফ্রিকা মহাদেশের দীর্ঘতম সমুদ্রতটরেখা এ দেশটিরই। ভৌগোলিক বিস্তৃতি থাকলেও অর্থনৈতিক বাস্তবতা কঠিন। দীর্ঘদিনের দারিদ্র্য ও সংকট দেশটির সামাজিক কাঠামোকে প্রভাবিত করেছে। শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক অবকাঠামো তুলনামূলক দুর্বল। তবু রমজান এলে সেই বাস্তবতার ভেতরেই প্রাণ ফিরে পায় ধর্মীয় জীবন। ইফতার, সেহরি ও তারাবিকে ঘিরে সৃষ্টি হয় আলাদা ব্যস্ততা। সীমিত সামর্থ্য সত্ত্বেও তারা রমজানকে মর্যাদার সঙ্গে গ্রহণ করে। শাবান মাসের ২৯ বা ৩০ তারিখে চাঁদ দেখার আয়োজন বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। লোকজন দলবদ্ধভাবে খোলা স্থানে সমবেত হয়। পরিবেশ হয়ে ওঠে উচ্ছ্বাসমুখর। স্থানীয় নিয়মানুসারে প্রতিটি এলাকা নিজ নিজভাবে চাঁদ দেখার চেষ্টা করে। অন্য অঞ্চলের ঘোষণার ওপর নির্ভর করার রীতি নেই। এ প্রক্রিয়া তাদের স্বাতন্ত্র্যবোধকে প্রতিফলিত করে। প্রতিদিন মাগরিবের পর উচ্চস্বরে পরদিনের রোজার নিয়ত করা হয়। এটি তারা আনন্দের সঙ্গে সম্পন্ন করে। ধর্মীয় অনুভূতির প্রকাশ এতে স্পষ্ট। অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতা থাকা সত্ত্বেও রমজানে সোমালিয়ানরা আভিজাত্যের আবহ বজায় রাখতে চায়। ইফতার ও সেহরির আয়োজনে যত্ন দেখা যায়। ইফতারের পর তারা সাধারণত অতিরিক্ত খাবার গ্রহণ করে না। ইফতারের টেবিলে উটের গোশত ও উটের দুধ থেকে প্রস্তুতকৃত বিভিন্ন পদ থাকে। খেজুর, সমুচা ও শরবতও পরিবেশিত হয়। ‘ওটকা’ নামের একটি জনপ্রিয় খাবার রয়েছে। এটি উটের গোশতের শুটকি। এটিও ইফতারের অংশ। খাদ্যতালিকায় স্থানীয় ঐতিহ্যের ছাপ সুস্পষ্ট। রাতের মূল খাবার গ্রহণ করা হয় ইশা ও তারাবির পর। মসজিদ থেকে ফিরে পরিবার একত্রিত হয়। সেই খাবারের কেন্দ্রীয় পদ হলো ‘আনবোলা’। এটি প্রাচীন সোমালিয়ান ঐতিহ্যের অংশ। ইতিহাস ও সংস্কৃতির সঙ্গে এর নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে। প্রস্তুত প্রক্রিয়াও সময়সাপেক্ষ। মাখন, চিনি, চাল ও মটরশুটি একত্রে রান্না করা হয়। তিন থেকে পাঁচ ঘণ্টা আগুনে রেখে স্বাদ ও ঘ্রাণ আনা হয়। পরে নামিয়ে তার ওপর চালের গুঁড়া, মাখন ও চিনি ছিটিয়ে পরিবেশন করা হয়। এ ছাড়া চালভিত্তিক আরও নানা খাবার তৈরি করা হয়। চালের খামিরে মশলা ও ভেষজ মিশিয়ে বিশেষ পদ প্রস্তুত করা হয়। কখনও তাতে গোশত বা মাছ যুক্ত করা হয়। খাদ্যসংস্কৃতিতে সৃজনশীলতা লক্ষ্য করা যায়। সেহরিতে ‘আনবোলা’ অনেকের প্রথম পছন্দ। কারও কারও কাছে রুটি প্রিয়। এলাচ ও দুধে প্রস্তুত ‘জিলাতিয়া হালুয়া’ রুটির সঙ্গে খাওয়ার প্রচলন রয়েছে। বিভিন্ন ধরনের হালুয়া তৈরি করা হয় এ মাসে। দক্ষিণাঞ্চলে ‘এক্সালুছুমালি’ বিশেষ জনপ্রিয়। এটি বিভিন্ন বাদাম ও তেল দিয়ে প্রস্তুত করা হয়। আঞ্চলিক বৈচিত্র্য খাদ্যতালিকাকে সমৃদ্ধ করেছে। রমজানজুড়ে মসজিদকেন্দ্রিক দীনি কার্যক্রম অব্যাহত থাকে। কোথাও হাদিসের পাঠদান হয়, কোথাও কোরআনের তাফসির শেখানো হয়, কোথাও মাসআলা-মাসায়েলের আলোচনা চলে। কিছু মসজিদে তারাবির আগে এসব হয়, কোথাও আবার তারাবির পর। স্থানীয় আলেমরা এসব পরিচালনা করেন। ইফতারের পর ঘরে অবস্থান করার প্রবণতা কম। নারী-পুরুষ, তরুণ-বৃদ্ধ- সবাই তারাবির প্রস্তুতি নেয়। অধিকাংশ মসজিদে খতমে তারাবির ব্যবস্থা থাকে। ব্যক্তিগত আয়োজন ছাড়া সুরা তারাবি সচরাচর দেখা যায় না। সাধারণ শিক্ষার হার কম হলেও কোরআনের হাফেজ রয়েছে বহু ঘরে। তাদের অনেকেই সাতাশতম তারাবিতে খতম সম্পন্ন করেন। দারিদ্র্য ও সীমাবদ্ধতার ভেতর দিয়েও সোমালিয়া রমজানকে আত্মমর্যাদার সঙ্গে ধারণ করে। ধর্মীয় অনুশাসন, ঐতিহ্য ও সামাজিক অংশগ্রহণ মিলিয়ে মাসটি সেখানে এক বিশেষ আধ্যাত্মিক সময়পর্বে পরিণত হয়।
আফগানিস্তান : আফগানিস্তান দীর্ঘদিনের সংঘাতবিধ্বস্ত একটি রাষ্ট্র। চারদিক পাহাড়বেষ্টিত এ দেশ ভৌগোলিকভাবে স্থলবেষ্টিত। এর সীমান্ত ঘিরে রয়েছে ইরান, পাকিস্তান, চীন, তাজিকিস্তান, উজবেকিস্তান ও তুর্কমেনিস্তান। জনসংখ্যার প্রায় নিরানব্বই শতাংশ ইসলাম ধর্মের অনুসারী। বহির্বিশ্বে আফগানিস্তানকে যুদ্ধ ও দারিদ্র্যের প্রেক্ষাপটে দেখা হয়। খরা ও অর্থনৈতিক সংকটও বাস্তবতা। কিন্তু রমজান এলে চিত্র ভিন্ন হয়ে ওঠে। দুর্দশার মধ্যেও ধর্মীয় ঐতিহ্যে তারা দৃঢ়। রমজানকে কেন্দ্র করে সামাজিক আভিজাত্য ধরে রাখতে তাদের বিশেষ আগ্রহ দেখা যায়। রাষ্ট্রীয়ভাবেও রমজানকে স্বাগত জানানো হয়। প্রথম রমজান সরকারি ছুটি হিসেবে পালিত হয়।
রমজান বরণে আফগান সমাজের নিজস্ব সংস্কৃতি রয়েছে। তারা এ মাসকে বরকতের সময় হিসেবে বিবেচনা করে। মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক আরবি পত্রিকা আশ-শারকুল আওসাত-এ উল্লেখ রয়েছে, রমজানের আগেই তারা ঘরবাড়ি সাজিয়ে তোলে। নতুন কাপড়, কার্পেট ও বিছানায় ঘর সজ্জিত করা হয়। যাদের আর্থিক সামর্থ্য সীমিত, তারা বিদ্যমান সামগ্রী ধুয়ে পরিষ্কার করে। তাতে সুগন্ধ যুক্ত করা হয়। রমজান উপস্থিত হলে আনন্দ প্রকাশ্যে রূপ নেয়। তারা এ মাসকে ‘আল্লাহর মেহমানদারির মাস’ নামে অভিহিত করে। নামকরণেই তাদের ধর্মীয় আবেগ প্রতিফলিত। আফগানিস্তানে রোজার সময়কাল প্রায় সতের ঘণ্টা। দীর্ঘ সময়ের সংযমের পর ইফতার আয়োজন করা হয়। তাদের ইফতার-সংস্কৃতি স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য বহন করে। অপচয়ের প্রবণতা তুলনামূলক কম। সরলতা এখানে মূল্যবোধ। খেজুর দিয়ে ইফতার শুরু হয়। পাশাপাশি পুঁইশাক, আলু ও অন্যান্য সবজি পরিবেশিত হয়। ‘বুলানি’ একটি বিশেষ খাবার। এটি ইফতার ও সেহরিতে সমান জনপ্রিয়। রুটিসদৃশ এ খাবারের ভেতরে আলু, পেঁয়াজ, বাদাম ও সবজি ব্যবহার করা হয়। কোথাও ভেড়ার শুকনো গোশত বা কলিজাও দেওয়া হয়। ধনী-গরিব নির্বিশেষে এর চাহিদা রয়েছে। ইফতার টেবিলে ‘সুরওয়া’ নামে এক ধরনের স্যুপ থাকে। সঙ্গে পরিবেশিত হয় রুটি ও বিভিন্ন গোশতের পদ। ভেড়ার দোপেয়াজু, মুরগির কাবাব ও খাসির কাবাব উল্লেখযোগ্য। মিষ্টান্ন হিসেবে থাকে শিরনি ও পায়েসজাতীয় খাবার। সমগ্র আফগানিস্তানে কাবুলি পোলাও ঐতিহ্যের অংশ। এটি প্রায় সর্বত্র দেখা যায়। পানীয় হিসেবে স্থানীয়ভাবে প্রস্তুত শরবত পরিবেশন করা হয়, যা আমাদের পরিচিত রুহ আফজার অনুরূপ। পাকোড়া ও ‘আমানতু আশ’ ইফতারের অন্যান্য পদ। পাকোড়া প্রস্তুত হয় মুরগির গোশত, আলু ও ঘি দিয়ে। খাদ্যতালিকায় ঐতিহ্য ও স্বাদ দুটিই গুরুত্ব পায়। ইফতারের পর মসজিদমুখী হয় মানুষ। দলবদ্ধভাবে তারা তারাবির উদ্দেশ্যে রওনা দেয়। মসজিদগুলোতেও ইফতারের আয়োজন থাকে। ধর্মীয় উদ্দীপনায় তারাবি আদায় করা হয়। মাজহাবের ক্ষেত্রে অধিকাংশ আফগান হানাফি। ফলে মসজিদগুলোতে বিশ রাকাত তারাবি অনুষ্ঠিত হয়। কোরআন তেলাওয়াত ও জামাতকেন্দ্রিক ইবাদতে অংশগ্রহণ ব্যাপক। সংগ্রাম ও অনিশ্চয়তার মধ্যেও আফগান সমাজ রমজানকে মর্যাদা দেয়। ধর্মীয় অনুশাসন, সামাজিক ঐতিহ্য ও আত্মিক আবেগ মিলিয়ে মাসটি সেখানে বিশেষ তাৎপর্য লাভ করে। দারিদ্র্য তাদের চেহারা নির্ধারণ করলেও রমজান তাদের আত্মপরিচয় উজ্জ্বল করে তোলে।