রমজানে ইরানের যত প্রথা
মহিমান্বিত মাস রমজান। এ মাস ঘিরে নানা অনুষ্ঠান আর রীতি-রেওয়াজ রয়েছে। রোজা রাখা, ইফতারের পর তারাবির নামাজ পড়া ইত্যাদি ছাড়াও আনন্দ-উৎসবের মাধ্যমে সবার মাঝে ছড়িয়ে দেওয়া হয় খুশির আমেজ। ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের চেয়েও এসব রীতি সাংস্কৃতিক উদযাপন হিসেবে বেশ জনপ্রিয়। মুসলিম অধ্যুষিত দেশ ইরান। সেখানকার মুসলমানরা কীভাবে রমজান পালন করেন, তেহরান টাইমসের সূত্রে সে বিষয়ে জানাচ্ছেন- মুনশি মুহাম্মদ উবাইদুল্লাহ
প্রকাশ : ১০ মার্চ ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

রমজান মোবারক বলে অভিনন্দন : ইরানিদের ঐতিহ্য, রীতিনীতিতে রমজান একটি ব্যতিক্রমী ভূমিকা পালন করে। রমজান এলেই ইরানের অনেক লোক তাদের দোকান বা গলি আলো ও ফুল দিয়ে সাজায়। লোকেরা একে অপরকে ‘রমজান মোবারক’ (বরকতময় রমজান) বলে অভিনন্দন জানায়।
সাহরির সময় নির্ধারণ : ইরানে সাহরির সময় নির্ধারণের ধারণাটি অতীতে অনেকটা বাংলাদেশের প্রাচীন রীতিনীতির মতোই ছিল। ঘড়ি না থাকায় লোকেরা নিজেদের অভিজ্ঞতা দিয়ে সাহরির সময় সম্পর্কে অবহিত হতেন। কেউ কেউ আকাশের তারকারাজির ওপর নির্ভর করতেন। তারা দোবে আকবর (The Big Dipper or The Seven Stars or Seven Brothers), মিজান (এক ধরনের সময় পরিমাপক যন্ত্র) ও পারভিন বা সোরাইয়া (The Pleiades or Seven Sisters) তারকা দেখে সাহরির সময় নির্ধারণ করতেন। সময় নির্ধারণ ও সাহরির রীতিনীতির আরেকটি মাধ্যম ছিল মোরগের ডাক। ইরানের প্রত্যন্ত অঞ্চলের লোকজন বিশ্বাস করত, মোরগ রাতের দীর্ঘ পরিসরে তিনবার ডাক দেয়। প্রথমবার অর্ধ রাতে, দ্বিতীয়বার অর্ধ রাত পার হওয়ার পর ও সর্বশেষ ভোরবেলা। এ কারণেই নিজেদের বাড়িতে মোরগ রাখা কল্যাণ ও বরকতের প্রতীক মনে করত। সাধারণ লোকজন বিশ্বাস করত, আরশে এলাহিতে বৃহৎ ও সাদা রঙের একটি মোরগ আছে। যেটা ভোরে নিজের ডানা ঝাঁপটায় এবং উচ্চ স্বরে আজান দেয়। এ আজানের ধ্বনি পৃথিবীতে অবস্থানকারী সব মোরগের কানে পৌঁছে যায়। তারা এ আজানের অনুকরণে নিজেরাও আজান দিত এবং লোকজনকে ভোর সম্পর্কে অবহিত করত।
সাহরিতে জাগানোর নানান রীতি : অতীতে একটি দল মহল্লায় ঢোল ও গজল গেয়ে সাহরিতে জাগাত। সিরজান অঞ্চলে এ দলটি লোকদের বাড়ির দরজায় টোকা দিত। বাড়ির মালিককে সম্ভাষণ করে কবিতা আবৃত্তি করত। রমজান মাস যদি গ্রীষ্মকালে হতো, তাহলে বলত- ‘ওহে বয়োজ্যেষ্ঠ! উঠুন, সাহরি খাই/ খাই বরফ, চিনিমিশ্রিত ফালুদা; আর তো সময় নাই!’ শীতকালে হলে বলত- ‘ওহে বয়োজ্যেষ্ঠ! উঠুন, সাহরি খাই/ খাই মধুমিশ্রিত মাখন-তেল; সময় তো আর নাই!’ এ গোষ্ঠীটি রমজানের শেষ দিনগুলোতে লোকদের কাছ থেকে উপহার বা ঈদি গ্রহণ করত। এ অঞ্চলের অনেকে আবার ঘুমের আগে আঙুল দিয়ে মাটিতে আঘাত করে বলত, ‘হে মাটি! আমার পাপ তোমার ঘাড়ে। সাহরির সময় আমাকে জাগ্রত করো।’ কোনো কোনো এলাকায় তারইয়াক টানা (এক ধরনের আফিম বা গাঁজা জাতীয় জিনিস)-এর প্রচলন ছিল। প্রযুক্তির উৎকর্ষে এগুলো প্রায় বিলীন হয়ে গেছে। বর্তমানে কিছু অঞ্চল ছাড়া শুধু বেতার, টেলিভিশন ও মসজিদে ঘোষণা দিয়ে ধর্মপ্রাণ মুসল্লিদের সতর্ক করা হয়।
প্রতিবেশীদের সঙ্গে ইফতার : রমজান মাসে ইরানিরা ভোরে উঠে সাহরি খায়। খাবারটি সাধারণত হালকা হয়। আগে তৈরি করা থাকে। তবে ইফতারে বাহারি খাবারের আয়োজন থাকে। সম্ভব হলে পরিবারের ঘনিষ্ঠ সদস্য, বন্ধুবান্ধব ও প্রতিবেশীদের সঙ্গে ইফতার করা হয়। মসজিদে কিংবা আত্মীয়-স্বজন, পাড়া-প্রতিবেশীর বাড়িতে ইফতারি দেওয়ার রেওয়াজ রয়েছে ইরানে। মাশহাদে ইমাম রেজার মাজারে প্রতিদিন অন্তত ১২ হাজার মানুষের ইফতারির জোগান দেওয়া হয়।
ইফতারে দুর্লভ খাবার : পবিত্র রমজান মাসে ইরানের মসজিদে খাবার ও ইফতার বিতরণ করা হয়। তাতে মিষ্টি, তাজা খেজুর, ঐতিহ্যবাহী আজারি পনিরসহ শাক-সবজি এবং বাদাম থাকে। যদিও ইফতারের জন্য নির্দিষ্ট খাবার নেই, তবু ইরানিদের কিছু অনন্য রান্না রয়েছে; যা বছরের অন্যান্য মাসে পাওয়া যায় না। সুস্বাদু সিরায় গভীর ভাজা ময়দার তৈরি জুলবিয়া বামিহ, হালিম, ঐতিহ্যবাহী অ্যাশ রেশতেহ, শাকসবজি, ভাজা পেঁয়াজ, মাংস, বাদাম, মটরশুটি, পার্সিয়ান নুডলস এবং অন্যান্য অনেক কিছুর একটি ভারী মিশেল থাকে। হালিম নামে একটি খাবারও ইফতারিতে খাওয়া হয়। তবে এই হালিমের স্বাদ বাংলাদেশের হালিমের মতো নয়। ছোট চাল, চিনি আর জাফরান দিয়ে রান্না হয় এক ধরনের ক্ষির বা পায়েশ, যার ইরানি নাম ‘শোলে জার্দ’। এটিও ইফতারির একটি নামিদামি উপাদান।
ধর্ম পালন ব্যক্তির ওপর নির্ভরশীল : ইরানে ধর্মপ্রাণ মানুষ রোজা রাখে, নামাজ পড়ে। তবে রাষ্ট্রীয়ভাবে এ নিয়ে তেমন কোনো কড়াকড়ি বা বাধ্যবাধকতা নেই। ধর্মপালন একেবারেই ব্যক্তির ওপর নির্ভর করে; রাষ্ট্রীয় হস্তক্ষেপ নেই তাতে। অবশ্য ধর্মপালন বা ধর্মীয় আচার-আচরণ কোথাও কোথাও প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষেত্রে গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হয়। ইফতারি শেষে ইরানে শিয়া মুসলমানদের মধ্যে নেই তারাবির ব্যস্ততা। কারণ, শিয়া মাজহাবে তারাবি নামাজের বিশেষ গুরুত্ব নেই।
মসজিদে মসজিদে এতেকাফ : মাহে রমজান এলেই কোরআন তেলাওয়াতের হিড়িক পড়ে যায় ইরানে। ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব এবং স্কলারগণ এ মাসে নানা বিষয়ে বয়ান-বক্তৃতা করে থাকেন। রমজানের শেষ দশকে বিশেষ গুরুত্বের সঙ্গে লাইলাতুল কদর পালিত হয়। দলে দলে মসজিদে মসজিদে এতেকাফ করতে দেখা যায়। যা ঈদের চাঁদের মাধ্যমে শেষ হয়। ইরানজুড়ে সব মসজিদ ও মাজারে এতেকাফে অংশ নিতে ইচ্ছুক লোকদের আমন্ত্রণ জানানো হয়। তাদের সাহরি ও ইফতারের ব্যবস্থা করা হয়। অনেকে তাদের ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান পালনের জন্য মাসব্যাপী এতেকাফ করে থাকেন।
রমজান উপলক্ষে বিশেষ অনুষ্ঠান : শিয়া সম্প্রদায়ের অষ্টম ইমাম রেজা (রহ.)-এর মাজারে প্রতিদিন একজন আন্তর্জাতিক কারি পবিত্র কোরআন থেকে এক পারা করে তেলাওয়াত করেন। তার সঙ্গে হাজার হাজার মানুষ উপস্থিত হয়ে কণ্ঠ মেলান। ইরানের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচার সংস্থা এটি সরাসরি সম্প্রচার করে থাকে। এ ছাড়া এখানকার বেতার ও টেলিভিশন চ্যানেলগুলো পবিত্র রমজান উপলক্ষে বিশেষ অনুষ্ঠান প্রচার করে থাকে।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ : রমজান মাসে ইরানের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধ থাকে। তবে এ মাসটিতে ছাত্র-শিক্ষকরা বিশেষ দায়িত্ব পালন করেন। তারা দেশটির প্রত্যন্ত অঞ্চলে ঘুরে ঘুরে সাধারণ মানুষকে শরিয়ত এবং আধ্যাত্মিক বিষয়ে তালিম দেন। এ মহৎ কাজের জন্য তারা কোনো সম্মানী গ্রহণ করেন না। ইরানের ফকিহদের মতে, কোনো ব্যক্তি মাত্র ১৭ কিলোমিটার ভ্রমণ করলেই মুসাফির হিসেবে গণ্য হবে। আর মুসাফিরদের জন্য রোজা রাখা ইরানি আলেমদের মতে হারাম।
রমজান বাজার স্বাভাবিক : রোজা শুরুর আগে ইরানের লোকজনের মধ্যে এক ধরনের সাড়া পড়ে যায়। তবে বাংলাদেশে যেমন পণ্যমূল্য বৃদ্ধির ভয়ে লোকজন আগেই বড় আকারের কেনাকাটা করে রাখার চেষ্টা করে, ইরানে তেমনটা দেখা যায় না। রমজানের বাজারে পণ্য সরবরাহ আর দশটা মাসের মতোই স্বাভাবিক থাকে। খেজুর বা গোশতের দাম সামান্য বাড়ে। কিন্তু সরকারি বাজারগুলোতে রমজান উপলক্ষে দাম ও মানের দিকটি বিশেষভাবে লক্ষ্য রাখা হয়।
পণ্যমূল্যে সরকারের ভর্তুকি : রোজার সময় সাধারণ মানুষের ওপর যাতে বাড়তি চাপ না পড়ে, সে দিকটি বিবেচনা করে সরকারের পক্ষ থেকে সরকারি বাজারে কখনও কখনও পণ্যমূল্যে কিছুটা ভর্তুকি দেওয়া হয়। সরকারি বাজার ও পাড়া-মহল্লার দোকানগুলোতে সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন রকমের দুধ, দই ও দুগ্ধজাত পণ্যের প্রচুর সরবরাহ থাকে।
তেহরানের রাস্তা ফাঁকা : রোজা উপলক্ষে ইরানে অফিস-আদালতের সময় পরিবর্তিত হয়। শেষ বিকেলে রাজধানী তেহরানের রাস্তাগুলো তুলনামূলক ফাঁকা থাকে। তবে বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকা বা অন্য শহরগুলোতে যেমন দুপুরের পরপরই ইফতারির বিশাল আয়োজন শুরু হয়, রাস্তা বা ফুটপাতে যত্রতত্র ইফতারি বিক্রি হয়, তেহরানে ঠিক তেমন নয়। রোজায় রেস্টুরেন্টগুলোর সামনে পর্দা টেনে দেওয়া হয় বটে, তবে রুটির দোকানগুলো খোলা থাকে। কারণ, এগুলোর ওপর সাধারণ মানুষ নির্ভরশীল। রোজার সময় যেসব শিশু, বৃদ্ধ কিংবা অসুস্থ নারী-পুরুষ রোজা রাখতে পারেন না, তাদের খাবারের জোগান আসে এই রুটির দোকান থেকে।
লাইলাতুল কদর পালন : শিয়া মুসলমানের দেশ ইরান। এখানে বিভিন্ন আয়োজনের মাধ্যমে পালিত হয় মাহে রমজান। এ মাসেই শহিদ হয়েছিলেন ইসলামের চতুর্থ খলিফা আলী (রা.)। ১৯ রমজানে তিনি ছুরিকাঘাতে আহত হয়েছিলেন। এ ঘটনার দুদিন পর ২১ রমজান তিনি শাহাদত বরণ করেন। এই স্মৃতিকে ধরে রাখার জন্য নানা আয়োজনের মাধ্যমে তিনদিন শোক পালন করে ইরানিরা। অনেকে এ তিনদিনকে ‘লাইলাতুল কদর’ হিসেবে পালন করেন। কেউ কেউ প্রকাশ্যেও শোক কর্মসূচি পালন করে থাকেন। বিশেষ করে, এ রাতে লোকজন জওশন কাবির নামে একটি প্রসিদ্ধ দোয়া পাঠ করেন। দোয়ায় পুরুষরা উচ্চ স্বরে বলেন, ‘আল গাউস, আল গাউস, খাল্লাসনা মিনান নার ইয়া রব ইয়া রব!’ এ রাতে অনেক ধর্মীয় গোষ্ঠী আলী (রা.)-এর প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে এবং তার নৃশংস হত্যাকাণ্ডে শোক জানাতে তাদের স্মৃতিচারণ অনুষ্ঠান শুরু করে। লোকেরা সারারাত জেগে বিশেষ প্রার্থনা করে। কখনও কখনও নামাজের সময় তাদের মাথায় কোরআন ধারণ করেন।
কুলে মারজান উৎসব : আলী (রা.)-এর হত্যাকারী ইবনে মুলজাম মোরাদিকে ২৭ রমজান হত্যা করা হয়। সে কারণে এ দিনে ইরানি জনগণ আনন্দোৎসব পালন করে থাকেন। মারকাজি প্রদেশের খোমেইন শহরের ফারনাক ও খোমেইন শহরের পাহাড়ের পাদদেশের লোকজন ইবনে মুলজামের প্রতি ভর্ৎসনা দিবস পালন করে থাকেন।
আন্তর্জাতিক কুদস দিবস : ইসরায়েলি শাসকদের দখলদারিত্ব থেকে ফিলিস্তিনের মুক্তির জন্য এবং ইসরায়েলের নৃশংসতার নিন্দা জানানোর জন্য তাদের আহ্বান পুনর্ব্যক্ত করার লক্ষ্যে বিশ্বব্যাপী মানুষের সঙ্গে ইরানিরা আন্তর্জাতিক কুদস দিবস পালন করে। আন্তর্জাতিক কুদস দিবস যা রমজানের শেষ শুক্রবারে পড়ে। ইসলামিক প্রজাতন্ত্রের প্রয়াত প্রতিষ্ঠাতা ইমাম খোমেনির উত্তরাধিকার, যিনি ফিলিস্তিনিদের সঙ্গে সংহতি প্রকাশ করে দিনটিকে মনোনীত করেছিলেন। ১৯৭৯ সালে ইরানে ইসলামি বিপ্লবের পর থেকে আন্তর্জাতিক কুদস দিবস বিশ্বব্যাপী অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে।
খোদা হাফেজ মাহে রমজান : রমজান মাসের শেষ রাতগুলোতে ‘খোদা হাফেজ মাহে রমজান’ নামে একটি অনুষ্ঠানও এখানকার বিভিন্ন শহরে প্রচলিত রয়েছে। অনুষ্ঠানটি কোনো কোনো শহরে ২৭ রমজান, আবার কোনো কোনো শহরে রমজান মাসের শেষের দিকের সাহরির পরপর, আবার কোথাও কোথাও মাগরিব ও এশার নামাজের পর অনুষ্ঠিত হয়। লোকেরা মসজিদে অথবা ওই এলাকার প্রসিদ্ধ একজনের বাড়িতে জড়ো হন এবং বিদায় নামক প্রসিদ্ধ কবিতা পাঠ করে রমজানকে বিদায় জানান।
