বৈশাখের প্রত্যাশা

আবু তাকরিম

প্রকাশ : ১৪ এপ্রিল ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

খুশির ধুম পড়েছে চারদিক। নতুন জামা-শাড়ি কিনেছে তরুণ-তরুণীরা। পিঠাণ্ডপুলি তৈরিতে ব্যস্ত ঘরের মা-বোনেরা। বাজারে জাতীয় মাছের মূল্য বেড়েছে। অন্য সময়ের তুলনায় বিক্রিও হচ্ছে প্রচুর। অফিসের নিয়মিত বেতনে যোগ হলো বখশিশ। কিশোর-কিশোরীদের মুখে ফুটেছে অনাবিল হাসি। যেন তারা ভাসছে নতুন কোনো আনন্দের জোয়ারে। এর মানে খুশির দিন এসেছে। ফিরেছে আবার বাংলার নববর্ষ। নতুন বার্তায় বাঙালিকে সুসংহত রাখতে যার জুড়ি নেই। ফিরে এসেছে চিরচেনা সেই বৈশাখ। মনের আকুল-আবেদন এ সময়ই বেরিয়ে আসে অকপটে। হাসি-কান্না ভাগাভাগি করা হয় নানা উৎসব-আয়োজনে। ‘এসো হে বৈশাখ, এসো এসো...’ স্লোগানের রব রব সাড়া পড়ছে এ সময়ে। বাঙালির সংস্কৃতি ধরে রাখতে প্রতিবছরের মতো এবারও এ বৈশাখী দিনে হবে অনেক ফূর্তি-আয়াজন; করা হবে নামে-বেনামে বিভিন্ন সংগঠনের ব্যানারে নান্দনিক অনুষ্ঠান; থাকবে টিভি চ্যানেলসহ জাতীয় দৈনিকের বিশেষ আয়োজন।বাংলার প্রতিটা অঞ্চলে চৈত্রের তাপদাহ বিরাজমান এখনও। ফুরোতে হয়তো বা বেশি দেরি নেই। সময়ের আবর্তে বদলে যায় চারপাশ। রয়ে যায় ভালোমন্দের হালখাতা। পরিণামে যা হবার, তা-ই হয় শেষফল। তেমনি আমাদের মধ্য থেকে ইতি হতে চলল আরেকটি বছরের। পুরোনো বছরের ফলাফলে আমাদের সুফলের সংখ্যা কেমন? আর অন্যায়ের সংখ্যাই-বা কত মাত্রার? তা আমরা কেউ খুঁজে দেখি না তেমন। বরং এ দিনকে উপলক্ষ করে নানা উৎসব-আয়োজনে মেতে উঠি; যার অনেকটা হয়তো বা আবার নিজেদের সংস্কৃতির গালে চপেটাঘাত করে- পহেলা বৈশাখের ভোরবেলায় লোকজনের এদিক-ওদিক ছোটাছুটির দৃশ্য চোখে পড়ে। বিশেষ করে, নগরীর বৈশাখী জামা পরুয়া উঠতি তরুণদল এবং বাহারি শাড়িতে নিজেদের জড়িয়ে রাখা তরুণীদের। এরা একে অপরের হাতে হাত রেখে পথচলে রমনার বটমূলে কিংবা অন্য কোনো আয়োজনে। সারাদিন রিকশায় চড়া ছেলেবন্ধু আর মেয়েবন্ধুর অনৈতিক দৃশ্যও নজর এড়ায় না কখনো বা। দিনশেষে এসব তরুণ-তরুণীরাই আবার মেতে ওঠে নিত্যদিনকার অভ্যাসে। সন্ধ্যা ঘনাতেই হিন্দি গান-বাদ্যের আসরে মেলে ধরে নিজেদের। বাসায় ফিরে ওদের বাবা-মাকে নিত্যদিনকার মতো বিজাতীয় ভাষায় ‘মাম্মি-ডাডি’র অভিবাদন সত্যিই সংস্কৃতির সঙ্গে বড় বিশ্বাসঘাতকতা। অথচ উচিত ছিল, এ দিনে অতীত ভুলের কথা স্মরণ করে নীরবে অনুতপ্ত হওয়া। দেশ-জাতির কপালে যেন আর কোনো রাজনৈতিক দৈন্য-দশার চিত্র না ঘটে, যেন আগামীর পথচলা শুভ ও সুখকর হয় এবং ভয়ে ভয়ে যেন আর রাত কাটাতে না হয় শহরের একাকী বসবাসকারীকে, শান্তি-শৃঙ্খলা যেন আবার ফিরে আসে, নিঃস্বার্থ যেন হয় নিজেদের দৈনন্দিন কর্মকাণ্ড, শুভসংঘের চেতনায় উজ্জীবিত হয় যেন প্রতিটা বাঙালি, মনুষ্যত্ববোধ জাগে যেন সবার মাঝে- সেজন্য স্রষ্টার কাছে প্রার্থনা করা। আমাদের কাছে বৈশাখের এটাই প্রত্যাশা। বৈশাখ মানে অনর্থক চাপাবাজি-গলাবাজি আর বক্তৃতাণ্ডসেমিনারের নাম নয়; যা কেবল এ দিনকে উপলক্ষ করেই করা হয়। পরে আর সেসব বাস্তবায়িত হয় না নিজেদের কর্মকাণ্ডে। কচুপাতা কিংবা লোহা পেটালে যা হয়, ঠিক সেরকম যেন না হয় এবারের পহেলা বৈশাখের অঙ্গীকার। এবার যেন আমাদের বৈশাখী উৎসব হয় একটু অন্যরকম। জেগে উঠি যেন সবাই স্বকীয় চেতনায়। ভিন্ন আবহে যেন কাটে আমাদের পহেলা বৈশাখ। শান্তি-শৃঙ্খলার দিন ফিরে আসে যেন আমাদের প্রতিটা জীবনে- প্রতিবারের মতো এবারের বৈশাখও যেন এ বার্তাই দিয়ে যায় আমাদের।