
এই দেশ আসলে কার? আজকের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন এটিই। দেশ কি শুধু ওইসব গোঁড়া গোষ্ঠীর তালুকদারি, যারা সাম্প্রদায়িক বিভাজনের অগ্নিকু- জ্বালিয়ে রেখেছে, নাকি শত শত বছর যাবত বসবাস করা নানা ধর্মের শান্তিকামী নাগরিকেরও দেশের ওপর অধিকার আছে? বিজেপি ক্ষমতায় আরোহনের পর থেকে এই ‘হুজুগ’ সৃষ্টির অপচেষ্টা চলছে, ‘ভারত শুধু হিন্দুদের!’ এখানেই শেষ নয়, বরং এটাও বলা হচ্ছে, নরেন্দ্র মোদি মসনদ দখলের পর হিন্দুরা ‘সত্যিকার’ মর্যাদা ফিরে পেয়েছে, মাথা উঁচু করে চলার স্বাধীনতা লাভ করেছে! স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ সম্প্রতি বলেছেন, ‘২০১৪ সালে মোদি ক্ষমতায় আসার পর হিন্দুরা লাঞ্ছনা থেকে মুক্তি পেয়েছে, তখন থেকে হিন্দুরা নিজেদের নিরাপদ ভাবতে শিখেছে!’ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কথার অর্থ দাঁড়াল, মোদির ক্ষমতারোহনের আগে এই দেশের হিন্দুরা নিরাপত্তাহীন ও লাঞ্ছিত ছিল! অথচ হিন্দু লাঞ্ছনার কোনো ‘ঘটনা’ অমিতজি উল্লেখ করতে সক্ষম হননি!
কোনো সন্দেহ নেই, বিজেপি ক্ষমতায় আসার পর থেকে ‘হিন্দুত্ববাদই’ দেশের সব উত্তেজনার মেরুদ-ে পরিণত হয়েছে! ফলে সেক্যুলার হিসেবে পরিচিত দলও এখন হিন্দুত্ববাদকে প্রোমোট করছে। সবচেয়ে বড় সেক্যুলার দল কংগ্রেসের শীর্ষ নেতা রাহুল গান্ধীও সেক্যুলারপন্থাকে রক্ষা করার পরিবর্তে স্বয়ং নিজেকে ‘হিন্দু’ পরিচয়ে পরিচিত করতে জরুরি মনে করছেন! তিনি বলেছেন, ‘এই দেশ হিন্দুদের, আর আমি একজন হিন্দু।’ তিনি ‘হিন্দুত্ব’ ও ‘হিন্দুর’ যে ব্যাখ্যা করেছেন, সেটাকে বিজেপির অনুসরণমূলক বক্তব্য হিসেবেই দেখা হচ্ছে।
ওই বক্তব্য যদি মোহন ভগবত, নরেন্দ্র মোদি বা অমিত শাহ দিতেন, আমাদের কোনো অভিযোগ থাকত না। কারণ, তাদের রাজনীতির মেরুদ-ই হলো ‘হিন্দুত্ববাদ, হিন্দু ও হিন্দুস্তান।’ যেহেতু বক্তব্যটি এমন একটি দলের নেতা দিয়েছেন, যে দল ভারতের স্বাধীনতাযুদ্ধে নেতৃত্ব দিয়েছে, যে দলের নেতৃত্বভার হাকিম আজমল খান, মাওলানা আবুল কালাম আজাদ, মাওলানা মুহাম্মদ আলি জওহারের মতো বিখ্যাত মনীষীরা পালন করেছেন। ফলে বর্তমান নেতার এমন বক্তব্যের কী অর্থ হতে পারে?
বিশ্বাস করুন, রাহুল গান্ধীর বক্তব্য প্রকাশ্যে আসার পর বিশেষভাবে ওইসব লোক পেরেশানিতে ডুবে গেছেন, যারা কংগ্রেসকে দেশের সবচেয়ে বড় সেক্যুলার দল মনে করতেন, যারা আরএসএসের ‘ভারতের প্রতিটি বাসিন্দা হিন্দু’ এই সেøাগান পরিত্যাগ করেছেন। অতীতেও কংগ্রেস সেক্যুলারপন্থাকে পিঠ দেখিয়েছে, কিন্তু বর্তমানে সেক্যুলারপন্থা মারাত্মক হুমকির মুখে থাকাবস্থায় কংগ্রেসের পক্ষে এমন বক্তব্য আমাদের বোধগম্য নয়।
রাহুল গান্ধী যেদিন ওই বক্তব্য দিয়েছেন, তার আগের দিন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বারানসির কাশি বিশ্বনাথ করিডোরে আগের পরিকল্পনা শুরু করেছেন। তাকে ‘নেতার’ চেয়ে ‘দেবতার’ বেশে জনসম্মুখে আত্মপ্রকাশ করতে বেশি আগ্রহী দেখা গেছে। সন্ন্যাসীর পোশাকে গঙ্গার ঠান্ডা পানিতে ডুবিয়েছেন! রাম মন্দির ভিত্তি স্থাপন সময়ের মতো এখানেও মোদির এসব ‘দৃশ্য’ মিডিয়াতে ব্যাপক কভারেজ পেয়েছে। মোদি ওই অনুষ্ঠানে ফের বেনারসের জ্ঞানবাপি মসজিদের বিরুদ্ধে উত্তেজনা সৃষ্টির চেষ্টা করেছেন। এদিকে উত্তরপ্রদেশের উপমুখ্যমন্ত্রী মথুরার ঈদগাহকে বিতর্কিত করার কাজ আগেই শুরু করে দিয়েছেন। অযোধ্যার পর উগ্রবাদীদের টার্গেট কাশি ও মথুরা।
সবাই জানে, এখন উত্তরপ্রদেশের অ্যাসেম্বলি নির্বাচনের ডামাডোল চলছে। নির্বাচনে জেতার জন্য উন্নয়নের গীত গাওয়ার পরিবর্তে নিজেকে ‘বড় হিন্দু’ প্রমাণ করা বেশি প্রয়োজন! প্রধানমন্ত্রী নিজেকে ‘হিন্দু’ প্রমাণে ভরপুর বক্তব্য দিয়েছেন। একটি ‘সেক্যুলার দেশের’ প্রধানমন্ত্রীর চেয়ে নিজেকে ‘হিন্দু রাষ্ট্রের’ প্রধানমন্ত্রী প্রমাণিত করার মরিয়া চেষ্টা করেছেন। মনে হচ্ছে, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধীর মাঝে ‘বড় হিন্দু’ প্রমাণের প্রতিযোগিতা চলছে!
রাহুল গান্ধী বলেছেন, ‘অধুনা রাজনীতিতে দুটি শব্দের উদ্দেশ্য ভিন্ন ভিন্ন। আমি হিন্দু কিন্তু হিন্দুত্ববাদী নই। মহাত্মা গান্ধী হিন্দু ছিলেন, আর খুনি নথুরাম গডসে হিন্দুত্ববাদী ছিলেন।’ রাহুল গান্ধী আরও বলেছেন, ‘এই দেশ হিন্দুদের, হিন্দুত্ববাদীদের নয়।’ রাহুল গান্ধী যে দলের নেতা, সে দল কখনোই তাকে ‘এই দেশ হিন্দুদের’ বক্তব্য দেওয়ার অনুমতি দিতে পারে না। তার বলা আবশ্যক ছিল, ‘এই দেশ হিন্দু, মুসলিম, শিখ, খ্রিস্টান সবার। সবাই মিলেই দেশকে ইংরেজদের দখল থেকে স্বাধীন করেছে। এই দেশের ওপর সবার সমান অধিকার। যারা ‘দেশ শুধু হিন্দুদের’ সাব্যস্ত করতে চায়, তারা দেশের প্রাণে আঘাত করতে চায়। আমি এসব লোককে সতর্ক করতে চাই, তারা যেন দেশের সেক্যুলার আইনের ওপর হামলা না করে।’
কিন্তু এভাবে বলা বর্তমান পরিস্থিতিতে ক্ষমতার রাজনীতির জন্য সুবিধাজনক নয়, এজন্য রাহুল গান্ধী নিজেকে ‘হিন্দু’ ঘোষণা দিয়েছেন। কিন্তু তিনি ভুলে গেছেন, তার বাবা-দাদারা কখনোই এমন ঘোষণা প্রয়োজনীয় গণ্য করেননি। কারণ, তারা এই বাস্তবতা জানতেন, ধর্ম মানুষের নিজস্ব ব্যাপার। আর এ দেশের আইন সেক্যুলার। ফলে দেশের প্রত্যেক নাগরিকের অধিকার সমান। সংখ্যাগরিষ্ঠ ধর্মাবলম্বীদের আলাদা কোনো সুবিধা নেই। বরং তাদের ধর্মও অন্যান্য ধর্মের মতো একটি ধর্মমাত্র।
সবাই জানে, বিজেপি ক্ষমতা গ্রহণের পর থেকে দেশের রাজনীতি ‘একমুখী’ হয়ে গেছে। ‘সংখ্যাগরিষ্ঠ গোষ্ঠীর’ চাহিদা মাফিক সবকিছু আবর্তিত হচ্ছে। অপরদিকে মুসলমানরা বর্তমানে দেশের সবচেয়ে বড় ‘উচ্ছিষ্ট’ সম্প্রদায়ে পরিণত হয়েছে। তাদের রাজনৈতিকভাবে ‘অচ্ছুৎ’ বানিয়ে রাখা হয়েছে। এখন সেসব রাজনৈতিক দলও মুসলমানদের নাম উচ্চারণ করতে ভয় পায়, যারা নিজেদের সব শক্তি অর্জন করেছে মুসলমানদের ভোটে! মুসলমানদের বড় দুঃখ, সেক্যুলার সাইনবোর্ড দেখে তারা যে রাজনৈতিক দলের জন্য জান-প্রাণ উৎসর্গ করেছেন, তারাই এখন পূর্ণোদ্যমে ‘হিন্দুত্ববাদের’ রাজনীতি করছে! অর্থাৎ ‘হিন্দুত্বই’ এখন রাজনীতির মূলমন্ত্র!
বিজেপি দাবার চালে এমন পরিস্থিতি তৈরি করেছে, ‘পাকিস্তান-জিন্নাহ’কে মুসলমান শব্দের সমর্থক করে দেওয়া হয়েছে! ফলে মুসলমানদের ‘দেশশত্রু’ সাব্যস্ত করা সহজ হয়ে গেছে। অতীতে রাজনৈতিক দলগুলো মুসলমানদের সুবিধা-অসুবিধা নিয়ে আলোচনা করত। কিন্তু এখন কেউ মুসলমানদের নাম নিতে চায় না! ফলে মুসলমানরা এখন ‘নিজের রাজনীতি, নিজের নেতৃত্ব’ সেøাগান দিতে শুরু করেছে। যেটাকে বিচক্ষণ ব্যক্তিরা মুসলমানদের জন্য ক্ষতিকর মনে করছেন।
সবাই জানে, আমাদের দেশের সেক্যুলারিজমের উদ্দেশ্য কখনোই ‘ধর্মবিমুখিতা’ বা ‘ধর্মত্যাগ’ নয়। বরং উদ্দেশ্য হলো, সব ধর্মের সম্মান ও অধিকার দেওয়া। সেক্যুলারিজমের এমন চিত্রের যাত্রী হয়েই আমরা এতদিন পর্যন্ত চলে এসেছি। কিন্তু অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, আমরা শেষ প্রান্তে পৌঁছে গেছি! এখন সেক্যুলারিজমের চিত্র উল্টে দেওয়ার সর্বাত্মক চেষ্টা চলছে। এমন পরিস্থিতিতে সচেতন প্রতিটি হিন্দুস্তানির কর্তব্য, ‘বাঁচব ও বাঁচতে দেব’-এর নীতি অক্ষুণœ রাখতে আরেকবার সেক্যুলারিজমের পাঠ গ্রহণ করা, হিন্দুস্তানের সর্বজনীন সংস্কৃতি ধ্বংস করে ‘হিন্দুত্ববাদী’ রাষ্ট্রে পরিণত করতে ঔদ্ধত অপশক্তির দাঁত এখনই ভেঙে দেওয়া। নতুবা বড়ই দেরি হয়ে যাবে!
‘জাদিদ খবের’ প্রকাশিত প্রখ্যাত ভারতীয় সাংবাদিকের কলাম থেকে
অনুবাদ আমিরুল ইসলাম লুকমান