চট্টগ্রাম বন্দরের সামনে চার চ্যালেঞ্জ
প্রকাশ : ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ
তামীম রহমান, চট্টগ্রাম

চট্টগ্রাম বন্দর সম্প্রতি রাজস্ব আয়ে রেকর্ড করেছে। প্রতিষ্ঠার ১৩৮ বছরের মধ্যে ২০২৫ সালে সর্বোচ্চ আয় করেছে চট্টগ্রাম বন্দর। রাজস্ব আয় ও রাজস্ব উদ্বৃত্ত উভয়ক্ষেত্রেই এবারে উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেছে দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর। সব খরচ বাদ দিয়ে এবারে প্রায় তিন হাজার কোটি টাকা উদ্বৃত্ত আছে তাদের। এত বেশি টাকা উদ্বৃত্ত ছিল না তাদের আগে কখনই।
তবে বন্দর ব্যবহারকারীরা বলছেন, অগ্রগতির এই ধারা ধরে রাখতে হলে নতুন বছরে চারটি চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে বন্দরকে। বে টার্মিনালের থমকে থাকা কাজ এগিয়ে নেওয়ার পাশাপাশি এনসিটি টার্মিনালের ব্যাপারেও দূরদর্শী সিদ্ধান্ত নিতে হবে। জাহাজের অপেক্ষমাণ সময় আরও কমিয়ে আনতে হবে। একই আমদানিকারকের পণ্যভর্তি এফসিএল (ফুল কনটেইনার লোডেড) কনটেইনার বন্দরের বাইরে নিয়ে নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরও সুরক্ষিত করতে হবে বন্দরকে। ২০২১ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত পাঁচ অর্থবছরে বন্দরের রাজস্ব আয়ে গড়ে ১৩ দশমিক শূন্য ৮ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছে। একই সময়ে রাজস্ব উদ্বৃত্তের প্রবৃদ্ধি হয়েছে গড়ে ১৮ দশমিক ৪২ শতাংশ। পাঁচ কারণে সর্বশেষ বছরে সর্বোচ্চ আয় করেছে বলে মনে করেন বন্দর ব্যবহারকারীরা।
ইন্টারন্যাশনাল বিজনেস ফোরাম চট্টগ্রামের সভাপতি এসএম আবু তৈয়ব বলেন, ‘বন্দর চ্যানেলের সীমা বৃদ্ধি পাওয়া, আগের চেয়ে বেশি গভীরতার জাহাজ নোঙর করানো, দেশে আমদানি-রপ্তানির চাহিদা বাড়া, অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতি যুক্ত হওয়া এবং কাস্টমসে নতুন লোকবল নিয়োগ হওয়ায় বন্দরের সার্বিক কাজে আগের চেয়ে গতি বেড়েছে। তবে নতুন বছর বন্দরের জন্য চ্যালেঞ্জিং হবে বলে মনে করেন এফবিসিসিআইর সাবেক পরিচালক আমিনুল হক। তিনি বলেন, ‘চট্টগ্রাম বন্দরের আয় বাড়লেও এখনও বেশির ভাগ সময়ে পণ্য নিয়ে দিনের পর দিন অপেক্ষা করতে হয় বিদেশি জাহাজকে। বে টার্মিনালের কাজ এগোলেও গতি অত্যন্ত মন্থর।
এনসিটি টার্মিনালকে পরিচালনা করবে, সে বিষয়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে হবে চলতি মাসেই। বন্দরে থাকা খালি কনটেইনারে করে বিদেশে মানুষ চলে যাওয়ার ঘটনা ঘটেছে গত বছরও। নিরাপত্তা ব্যবস্থাতে এখনও অনেক ঘাটতি আছে। এটা নিয়ে কাজ করতে হবে মন্ত্রণালয়কেও। তবে আগের তুলনায় সর্বশেষ অর্থবছরে বন্দর অনেক ভালো করেছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০২১ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত রাজস্ব ব্যয়ের গড় প্রবৃদ্ধি ৭ দশমিক ৫৯ শতাংশের মধ্যে সীমিত রাখতে সক্ষম হয়েছে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ। এ সময় ভ্যাট, ট্যাপ ও করবহির্ভূত আয় বাবদ সরকারকে জাতীয় কোষাগারে মোট ৭ হাজার ৫৮০ দশমিক ২০ কোটি টাকা জমা দিয়েছে সংস্থাটি। চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের গত পাঁচ বছরের আয়-ব্যয়ের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বন্দরের রাজস্ব আয় দাঁড়ায় ৫ হাজার ৪৬০ দশমিক ১৮ কোটি টাকা। একই বছরে রাজস্ব ব্যয় ছিল ২ হাজার ৩১৭ দশমিক ৫০ কোটি টাকা। ফলে ওই বছরে রাজস্ব উদ্বৃত্ত দাঁড়ায় ৩ হাজার ১৪২ দশমিক ৬৮ কোটি টাকা, যা গত পাঁচ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ।
২০২৪ সালে বন্দরের রাজস্ব আয় ছিল ৫ হাজার ৭৬ দশমিক ৭৫ কোটি টাকা। ব্যয় ছিল ২ হাজার ১৫৩ দশমিক ৫৮ কোটি টাকা। সেবার উদ্বৃত্ত ছিল ২ হাজার ৯২৩ দশমিক ১৭ কোটি টাকা। আর ২০২৩, ২০২২ ও ২০২১ সালে রাজস্ব উদ্বৃত্তের পরিমাণ ছিল যথাক্রমে ২ হাজার ১৪৩ দশমিক ১১ কোটি, ১ হাজার ৭৩৪ দশমিক ২০ কোটি এবং ১ হাজার ৬৩৩ দশমিক ২৬ কোটি টাকা।
চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল এসএম মনিরুজ্জামান বলেন, বন্দরের আয় থেকে প্রতিবছরই জাতীয় কোষাগারে বড় অঙ্কের অর্থ জমা দেওয়া হচ্ছে। ভ্যাট, কর ও করবহির্ভূত আয় হিসেবে গত পাঁচ অর্থবছরে মোট ৭ হাজার ৫৮০ দশমিক ২০ কোটি টাকা জমা দেওয়া হয়েছে। এটা ঠিক যে, বন্দরকে আরও গতিশীল করার সুযোগ রয়েছে। এ জন্য লালদিয়া টার্মিনাল নির্মাণ করে তা অপারেট করতে বিদেশি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি করা হয়েছে। বে টার্মিনালের কাজ দ্রুত শুরু করতে অনেক বৈঠক করা হয়েছে বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে। তারা ব্রেক ওয়াটারের নির্মাণকাজ দ্রুত শুরু করবে। এনসিটি টার্মিনাল নিয়েও সিদ্ধান্ত আসবে এ বছর। পতেঙ্গা টার্মিনাল সৌদি প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করছে। শুরুতে তাদের কিছু সীমাবদ্ধতা থাকলেও সর্বশেষ অর্থবছরের শেষ দিকে অনেক অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতি বহরে যুক্ত করেছে তারা। এ বছর আরও গতিশীল হবে তাদের কাজ। ব্যয় নিয়ন্ত্রণে আরও কঠোর নীতি অনুসরণ করতে হবে বন্দরকে, এমনটি মনে করেন মিউচুয়াল গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক পারভেজ আহমেদ।
তিনি বলেন, ‘গত দুই বছর রাজস্ব ব্যয়ের প্রবৃদ্ধি এক অঙ্কের ঘরে ধরে রাখতে পেরেছে বন্দর কর্তৃপক্ষ। কিন্তু ২০২৩ সালে ব্যয় প্রবৃদ্ধির দুই অঙ্কে পৌঁছে ১০ দশমিক ১৮ শতাংশে দাঁড়িয়েছিল। এটার লাগাম টানতে হবে তাদের। সেবা বাড়ানোর দিকে আরও মনোযোগী হতে হবে বন্দরকে।’
প্রসঙ্গত, চট্টগ্রাম বন্দরের যাত্রা শুরু হয়েছিল ১৮৮৭ সালের ২৫ এপ্রিল। ১৩৮ বছরে দেশের এই প্রধান সমুদ্রবন্দরের কার্যক্রম বিশ্বের ১১০টি দেশের সঙ্গে সংযুক্ত হয়েছে। চট্টগ্রাম বন্দরকে আন্তর্জাতিক মানের বন্দরে রূপান্তর করার লক্ষ্যে বিভিন্ন বিভাগকে অটোমেশনের আওতায় আনা হয়েছে। তৈরি করা হয়েছে ৫০টি সফটওয়্যার মডিউল, যার মাধ্যমে বন্দরকে ‘পেপারলেস প্রতিষ্ঠানে’ পরিণত করার চেষ্টা চলছে।
বন্দরের পরিচালক (প্রশাসন) মোহাম্মদ ওমর ফারুক বলেন, ‘বন্দরে জাহাজের গড় অবস্থানকাল বেশ গুরুত্বপূর্ণ একটি নির্দেশক। বর্তমানে কনটেইনারবাহী জাহাজ বহির্নোঙরে আসার এক থেকে দুই দিনের মধ্যে জেটিতে ভিড়ছে। অন-অ্যারাইভাল বার্থিংও প্রদান করতে পারছি আমরা।
চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ বিভিন্ন ধরনের অন্তর্বর্তীকালীন ব্যবস্থা গ্রহণ করায় বাংলাদেশের আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রমে গতি এসেছে। বন্দর কর্তৃপক্ষ জানায়, সম্প্রতি পোর্ট লিমিট ৭ নটিক্যাল মাইল থেকে ৬২ নটিক্যাল মাইলে উন্নীত করা হয়েছে। রপ্তানি কনটেইনার স্ক্যান করতে দুটি আধুনিক স্ক্যানার সংগ্রহ করা হয়েছে। আগের তুলনায় বেশি গভীরতার জাহাজ নোঙর করা যাচ্ছে। বন্দরের পাইলটদের দক্ষতা আরও বৃদ্ধির মাধ্যমে ভবিষ্যতে ২১০ মিটার লম্বা ও সাড়ে ১০ মিটার জাহাজ ভেড়ানো যাবে বন্দরে। বড় জাহাজ যত বেশি নোঙর করানো যাবে, তত বেশি আয় বাড়বে বন্দরের। বে-টার্মিনাল এবং কক্সবাজার জেলার মহেশখালী উপজেলায় ‘মাতারবাড়ী পোর্ট ডেভেলপমেন্ট’ শীর্ষক প্রকল্পগুলোর নির্মাণকাজ পুরোপুরি সম্পন্ন হলে চট্টগ্রাম বন্দরের বর্তমান সক্ষমতা বেড়ে যাবে প্রায় তিন থেকে চার গুণ।
চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ বলছে, কনটেইনারজাত পণ্যের স্টাফিং, আন-স্টাফিং ও ক্লিয়ারিং সহজীকরণের নিমিত্তে টিওএস (টার্মিনাল অপারেটিং সিস্টেম) এবং বার্থিং ও আনবার্থিং সংক্রান্ত দাপ্তরিক কার্যাবলি অনলাইনে সম্পাদন করা হচ্ছে। চট্টগ্রাম বন্দর থেকে আরএমজির রপ্তানি চালান সিঙ্গাপুর, কলম্বো, পোর্ট কেলাং, তানজুং পেলাপাস বন্দরের মাধ্যমে ইউরোপের বিভিন্ন গন্তব্যে পৌঁছাতে ২৮-৩০ দিন সময়ের প্রয়োজন হতো। খরচ হতো প্রায় ২০ হাজার মার্কিন ডলার। তৈরি পোশাক খাতকে সহায়তা প্রদানের জন্য চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের অনুরোধে বিভিন্ন শিপিং কোম্পানি চট্টগ্রাম থেকে ইউরোপের বেশ কয়েকটি বন্দরে সরাসরি শিপিং সার্ভিস চালু করেছে। এতে বেড়েছে কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ের পরিমাণ। প্রসঙ্গত, চট্টগ্রাম বন্দরে ১৯৭৭ সালে ছয়টি কনটেইনার দিয়ে কনটেইনার পরিবহন শুরু হয়। কিন্তু সর্বশেষ বছরে চট্টগ্রাম বন্দর ৩৪ লাখের বেশি কনটেইনার হ্যান্ডলিং করেছে। এটি ১৩৮ বছরের মধ্যে এক বছরে সর্বোচ্চ হ্যান্ডলিং।
