চট্টগ্রামে মেগা প্রকল্পগুলোতে বাড়ছে দীর্ঘসূত্রতা

প্রকাশ : ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  চট্টগ্রাম ব্যুরো

বন্দর নগরীর গৃহীত মেগা প্রকল্পগুলো নগরীবাসীর জীননমান উন্নয়নের কথা চিন্তা করেই বাস্তবায়নের লক্ষ্যে কাজ করে আসছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। একদিকে, রাজনৈতিক পটপরিবর্তন প্রকল্পগুলোর গতি মন্থর করে দিয়েছে অন্যদিকে তা প্রকল্প ব্যায় বৃদ্ধিতেও প্রভাব ফেলেছে লক্ষণীয়ভাবে। জানা যায়, প্রায় ২৩ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে চট্টগ্রামের ছয়টি বৃহৎ উন্নয়ন প্রকল্প দীর্ঘসূত্রতা ও অস্বাভাবিক ব্যয় বৃদ্ধির মুখে পড়েছে। ভূমি অধিগ্রহণ-সংক্রান্ত জটিলতা, প্রশাসনিক দীর্ঘসূত্রতা ও বারবার পরিকল্পনা সংশোধনের কারণে স্থবির হয়ে আছে এসব প্রকল্পের গতি।

গত চার থেকে প্রায় ১৫ বছর ধরে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন (চসিক) ও চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ) যৌথভাবে এই ছয়টি প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। বর্তমানে প্রকল্পগুলোর গড় অগ্রগতি ৮১ শতাংশ। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ করতে না পারায় বারবার মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে। প্রকল্পগুলোর প্রাথমিক অনুমোদিত ব্যয় ছিল প্রায় ১৪ হাজার ৮৪৮ কোটি টাকা, কিন্তু মূল হিসাবের বাইরে এখন অতিরিক্ত ৮ হাজার ৪৭ কোটি টাকা ব্যয় হচ্ছে। প্রশাসনিক জটিলতা, ভূমি-সংক্রান্ত বিরোধ, পরিবেশ ও প্রকৌশলগত চ্যালেঞ্জ এবং প্রযুক্তি ও সরঞ্জাম সংগ্রহে বিলম্ব সবমিলিয়ে কাজের গতি মন্থর হয়েছে। প্রকল্পগুলোতে ঘন ঘন বাজেট পুনর্বিন্যাস ও সময় বৃদ্ধির প্রয়োজনীয়তা দেখা দেওয়ায় আর্থিক বোঝা বেড়েছে বহুগুণে।

জলাবদ্ধতা নিরসনে ২০১৪ সালে বহদ্দারহাট বাড়ইপাড়া থেকে কর্ণফুলী নদী পর্যন্ত ২.৯ কিলোমিটার দীর্ঘ নতুন খাল খনন প্রকল্প হাতে নিয়েছিল চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন (চসিক)। কিন্তু ১২ বছর পেরিয়ে গেলেও এখনও কাজ শেষ হয়নি। অর্থ বরাদ্দ ও জমি অধিগ্রহণ-সংক্রান্ত জটিলতার কারণে প্রকল্পটি দীর্ঘদিন থমকে ছিল। ২০১১ সালের ডিসেম্বরে এ প্রকল্পের প্রস্তাবনা স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে পাঠায় চসিক। ৩২৬.৮৪ কোটি টাকা ব্যয়ে অনুমোদিত এই প্রকল্পের মেয়াদ ছিল ২০১৬ সালের জুন পর্যন্ত। ২০১৭ সালে ব্যয় বেড়ে হয় ১ হাজার ২৫৬ কোটি টাকা ও ২০২২ সালে দ্বিতীয় সংশোধনে তা বেড়ে হয় ১ হাজার ৩৬২.৬২ কোটি টাকা। ব্যয় বৃদ্ধির একটা বড় অংশই গেছে ভূমি অধিগ্রহণে, যার ফলে মোট খরচ বেড়েছে প্রায় ৩০৪ শতাংশ। কাজের ভৌত অগ্রগতি বর্তমানে ৮৯ শতাংশ। এখন পর্যন্ত ২.৯ কিলোমিটার খালের মধ্যে ২ কিলোমিটারের বেশি খননকাজ শেষ হয়েছে। সর্বশেষ মেয়াদ বাড়ানো হয়েছিল ২০২৪ সালের জুন পর্যন্ত। তবে চসিক এখন ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত মেয়াদ বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছে।

এই দীর্ঘসূত্রতার কারণে নগরবাসী জলাবদ্ধতা নামক ভয়ঙ্কর অভিশাপ থেকে এখনও মুক্তি পাচ্ছে না। প্রকল্প পরিচালক ও চসিকের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মো. ফরহাদুল আলম জানান, প্রকল্পের প্রায় ৯০ শতাংশ ব্যয় হয়েছে ভূমি অধিগ্রহণে। আমাদের খননকাজ শুরু হয়েছে মূলত ২০২১ সাল থেকে। প্রকল্পের কাজ প্রায় ৮৯ শতাংশ শেষ হয়েছে। চসিকের আরেকটি বড় উদ্যোগ হলো বিমানবন্দর সড়কসহ বিভিন্ন সড়ক ও অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্প। গুরুত্বপূর্ণ এই প্রকল্পও দীর্ঘসূত্রতায় আটকে আছে। ২ হাজার ৪৯০.৯৬ কোটি টাকা ব্যয়ের এই প্রকল্পটি ২০২২ সালের মার্চে অনুমোদিত হলেও এর ভৌত অগ্রগতি মাত্র ৫২.৫৪ শতাংশ। এ প্রকল্পের মেয়াদ ধরা হয়েছিল ২০২১ সালের জুলাই থেকে ২০২৪ সালের জুন পর্যন্ত। কিন্তু রাস্তাঘাটের মাটির সমস্যা, তীব্র যানজট ও স্থানীয় অবকাঠামোর সঙ্গে সমন্বয়ের জটিলতার মতো বাধার কারণে কাজের গতি ধীর হয়ে পড়ে। দফায় মেয়াদ শেষ হওয়ায় সম্প্রতি আরও দুই বছর সময় বাড়ানো হয়েছে।

সিসিসি প্রথম ২০১৯ সালে ৩ হাজার ১৬৯.৯৯ কোটি টাকা প্রাক্কলিত ব্যয় ধরে এই প্রকল্পের প্রস্তাব করে। পরে ২০২০ সালে প্রকল্প যাচাই কমিটির সভায় ডিপিপি সংশোধনের নির্দেশনা দেওয়া হয়। কয়েক দফা যাচাই-বাছাই ও সম্ভাব্যতা সমীক্ষাসহ প্রতিবেদনসহ প্রকল্পটি সংশোধন করে ২০২১ সালের মার্চ মাসে মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়। তখন প্রাক্কলিত ব্যয় কমিয়ে ২ হাজার ৪৯৯ কোটি টাকা করা হয়। শেষপর্যন্ত পরিকল্পনা কমিশন কিছু সমন্বয় করে ২ হাজার ৪৯১ কোটি টাকা ব্যয়ে প্রকল্পটির অনুমোদন দেয়। চুয়েটের অধ্যাপক মো. আফতাবুর রহমান বলেন, ‘প্রকল্প নেওয়ার ক্ষেত্রে ফিজিবিটিলি স্টাডি যথাযথভাবে করতে হবে। শুধু কথার কথা বা ডকুমেন্টশনের জন্য করলে কাজের দীর্ঘসূত্রিতা বা সমস্যাগুলো এড়ানো যাবে না। ফিজিবিটিলি স্টাডিতে থাকতে হবে প্রকল্পে কী কী ঝামেলা হবে এবং সেগুলোর সমাধান কী। এই বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জোর দিতে হবে। জলাবদ্ধতা নিরসনে সিডিএর নেওয়া অন্যতম বৃহৎ উদ্যোগ ‘খাল পুনঃখনন, সম্প্রসারণ, সংস্কার ও উন্নয়ন প্রকল্প’, যা বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ৩৪ ইঞ্জিনিয়ার কনস্ট্রাকশন ব্রিগেড বাস্তবায়ন করছে।

বর্তমানে এ প্রকল্পও বারবার বিলম্বের মুখে পড়েছে। এই প্রকল্পটি নগরীর ৩৬টি খালকে ঘিরে বাস্তবায়িত হচ্ছে। ২০১৭ সালে অনুমোদিত প্রকল্পটির ব্যয় ধরা হয়েছিল ৫ হাজার ৬১৬ কোটি টাকা। কিন্তু ব্যয় বেড়ে বর্তমানে তা দাঁড়িয়েছে ৮ হাজার ৬২৬ কোটি টাকা। তিন বছর মেয়াদি এই প্রকল্প বাস্তবায়নের সময় শেষ হয় ২০২০ সালের জুনে। পরে দফায় দফায় মেয়াদ বাড়িয়ে তা ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত করা হয়েছে। প্রকল্পের বর্তমান ভৌত অগ্রগতি ৮৫ শতাংশ এবং আর্থিক অগ্রগতি ৫৮ শতাংশ। ৩৬টি খালের মধ্যে ১৯টির কাজ সম্পন্ন শেষ হয়েছে এবং আরও পাঁচটির কাজ শেষের পথে। এই প্রকল্পের আওতায় ১৭৬ কিলোমিটার প্রতিরক্ষা দেয়াল নির্মাণ, ৪৫টি সেতু, ৬টি কালভার্ট, ৪২টি সিল্ট ট্র্যাপ, পাঁচটি রেগুলেটর, ১০.৭৭ কিলোমিটার নতুন নালা নির্মাণের কাজ চলছে। তবে বর্ষাকাল এলেই এ স্থানে প্রচুর পলি জমে যায়, যা এখন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। শুরুতে ২৭টি সিল্ট ট্র্যাপ (বালু আটকানোর ফাঁদ) নির্মাণের পরিকল্পনা থাকলেও প্রকল্পের বর্ধিত ব্যয়ের কিছু অংশ সিডিএকে বহন করতে বলায় ১২টি বাদ দিতে যাচ্ছে।

এর ফলে প্রকল্পের দীর্ঘমেয়াদি সুফল এবং কর্ণফুলীর প্রবাহ ও চট্টগ্রাম বন্দরের নাব্যতায় নেতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে সংশ্লিষ্টরা আশঙ্কা করছেন। লালখান বাজার থেকে বিমানবন্দর পর্যন্ত এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে প্রকল্পটিও একই ধরনের বাধার মুখে পড়েছে। ২০১৭ সালের জুলাইয়ে ৩ হাজার ২৫০ কোটি টাকা ব্যয় ও তিন বছর মেয়াদে অনুমোদিত এই প্রকল্পটির ব্যয় দুই দফা সংশোধনের পর বেড়ে ৪ হাজার ৩১৪.৮৫ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। ভূমি অধিগ্রহণ জটিলতা ও আইনি বিরোধের কারণে ২০২২ সালের জুনের নির্ধারিত মেয়াদে কাজ শেষ করা যায়নি।

তিন দফা সময় বাড়ানোর পর প্রকল্পটির মেয়াদ বাড়িয়ে এখন ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত করা হয়েছে। বর্তমানে এর ভৌত অগ্রগতি ৯১ শতাংশ। এক্সপ্রেসওয়েতে ওঠাণ্ডনামার জন্য শুরুতে ১৫টি র‌্যাম্প নির্মাণের পরিকল্পনা ছিল। তবে পরে ছয়টি র‌্যাম্প বাদ দেওয়া হয়। বাকি ৯টি র‌্যাম্পের কাজ এখনও শেষ হয়নি, ফলে এক্সপ্রেসওয়ের করে এক্সপ্রেসওয়ের কানেক্টিভিটি কমেছে। সম্ভাব্যতা সমীক্ষা প্রতিবেদনে প্রাক্কলন করা হয়েছিল, এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে দিয়ে ২০২৫ সালে প্রতিদিন গড়ে চলাচল করবে ৩৯ হাজার ৩৮৮টি গাড়ি। কিন্তু সিডিএর তথ্য অনুযায়ী, প্রতিদিন প্রত্যাশিত ৩৯ হাজার গাড়ির বদলে গড়ে চলছে মাত্র ৮ হাজারের একটু বেশি, যা সম্ভাব্যতা যাছাইয়ের মাত্র ২০ শতাংশ। উড়াল সড়কটি ২০২৩ সালের ১৪ নভেম্বর উদ্বোধন করা হলেও, পরীক্ষামূলক যান চলাচল শুরু হয় ২০২৪ সালের আগস্টে। সর্বশেষ ২০২৫ সালের ৩ জানুয়ারি থেকে সড়কটিতে টোল আদায় শুরু হয়েছে। সিডিএর আওতাধীন আরও বেশ কয়েকটি বড় প্রকল্পও বিলম্ব, ব্যয় বৃদ্ধি ও বারবার মেয়াদ বাড়ানোর কবলে পড়েছে।

এর মধ্যে অন্যতম উল্লেখযোগ্য হলো পতেঙ্গা থেকে সাগরিকা পর্যন্ত আউটার রিং রোড প্রকল্প।২০১১ সালে চার বছর মেয়াদে ৮৫৬ কোটি টাকা ব্যয়ে প্রকল্পটি অনুমোদিত হয়েছিল। এরপর একাধিকবার সংশোধনের মাধ্যমে ব্যয় বাড়ানো হয়েছে। প্রথম সংশোধনে ব্যয় বেড়ে ১ হাজার ৪৯৬ কোটি টাকা, দ্বিতীয় দফায় ২ হাজার ৪২৬ কোটি, তৃতীয় দফায় ২ হাজার ৬৭৫ কোটি ও চতুর্থ দফায় ৩ হাজার ৩২৪ কোটি টাকায় পৌঁছায়। অর্থাৎ প্রকল্প ব্যয় বেড়েছে প্রায় ২৮৮ শতাংশ। বর্তমানে প্রকল্পের ভৌত অগ্রগতি ৯১.৬০ শতাংশ এবং সর্বশেষ মেয়াদ বাড়িয়ে নির্ধারণ করা হয়েছে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত। এ প্রকল্পের উদ্দেশ জলোচ্ছ্বাস থেকে শহর রক্ষা, বাইপাস সড়ক তৈরি, উপকূলের সঙ্গে কর্ণফুলী টানেলের সংযোগ স্থাপন এবং পর্যটন, আবাসন ও শিল্পের জন্য জমি প্রস্তুত করা।

সিডিএর আরেকটি বিলম্বিত উদ্যোগ হলো ‘কালুরঘাট থেকে চাক্তাই পর্যন্ত সড়ক ও বাঁধ নির্মাণ প্রকল্প’। ২০১৭ সালে ২ হাজার ৩১০ কোটি টাকায় অনুমোদিত হলেও বর্তমানে এর ব্যয় বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ৭৭৯ কোটি টাকায়। ৯ কিলোমিটার দীর্ঘ এই প্রকল্পের কাজ ২০১৮ সালে শুরু হয় এবং এ পর্যন্ত ৮২ শতাংশ কাজ সম্পন্ন হয়েছে। এর মেয়াদ ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত। এই প্রকল্পের আওতায়ই কর্ণফুলী নদীর তীরে প্রায় ১৫০ কোটি টাকা ব্যয়ে ৫.৫ কিলোমিটার দীর্ঘ একটি পর্যটন কেন্দ্র গড়ে তুলছে সিডিএ। সিডিএর প্রধান প্রকৌশলী আহমেদ আনোয়ারুল নজরুল জানান, এই বছরের মধ্যেই প্রকল্পটির কাজ শেষ করার জন্য আমরা কাজ করছি। কাজ শেষ করতেই হবে। আগে সংশোধনের মাধ্যমে প্রকল্প ব্যয় বাড়ানো হলেও এবার সেই সুযোগ নেই। কোনো কারণে কাজ শেষ করতে না পারলে আমরা কাজের মেয়াদ বাড়াব, কিন্তু ব্যয় বাড়ানো হবে না।