সন্দ্বীপে হাতমেশিনে সেমাই তৈরিতে ব্যস্ত গৃহিণীরা

প্রকাশ : ০১ মার্চ ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  আলী হোসেন, সন্দ্বীপ (চট্টগ্রাম)

মুসলমানদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব পবিত্র ঈদুল ফিতর। ঈদ উপলক্ষে গ্রামীণ ঐতিহ্যবাহী হাত মেশিন দিয়ে তৈরি সেমাই ও বিভিন্ন রকমের সিরিঞ্জ পিঠা বানানোয় ব্যস্ত সময় পার করছে সন্দ্বীপের বিভিন্ন ইউনিয়নের নারীরা। ঈদের দিন সকালে অতিথি আপ্যায়নে কিংবা আত্মীস্বজনের বাড়িতে ঈদ উপহার হিসেবে হাতে তৈরি সেমাই ও বিভিন্ন ধরনের নকশি পিঠা ছাড়া চলেই না। ঈদ কাছে আসলেই বাড়ির মেয়েরা ব্যস্ত হয়ে পড়তেন চাল-গমের আটার সেমাই তৈরিতে। হাতে তৈরি এ সেমাইয়ের কদর ছিলো বেশ। গ্রাম-বাংলার ঐতিহ্যবাহী খাবার এটি। এমন সেমাই ছাড়া ঈদের উৎসব যেনো মানাতো না। কিন্তু এখন এমন চিত্র তেমন দেখা যায় না।

দেড়যুগ আগেও গ্রামের ঘরে ঘরে চালের বা গমের আটা দিয়ে হাতে তৈরি সেমাইয়ের দেখা প্রায় বাড়িতেই মিলতো। বাণিজ্যিক কোম্পানিগুলোর সেমাইয়ের কারণে হাত মেশিনে তৈরি সেমাই হারিয়ে যেতে বসেছে। নতুন প্রজন্মের অনেকেই জানেন না এ সেমাইয়ের কথা। পিতলের তৈরি আঁকাণ্ডবাঁকা সেমাই তৈরির মেশিন টেবিল অথবা চেয়ারের সঙ্গে নাট-বোল্ট দিয়ে আটকে একসঙ্গে ৫ থেকে ১০ জন গৃহিণী ঘানির মতো ঘুরিয়ে চাল বা গমের আটার সেমাই তৈরি করতেন। বানানো সেমাই এক দুই দিন রোদে শুকিয়ে নেওয়ার পর নারিকেল দিয়ে রান্না করা হতো।

শুধু নিজেরা রান্নায় করতে না, হাতে তৈরি সেমাই মেয়ের জামাইয়ের বাড়িতে না পাঠালে গ্রামের ভাষায় ‘জামাই সাজন’ তৈরিতে খুঁত থেকে যায়। এমন রীতি প্রচলিত ছিল সন্দ্বীপের অনেক জায়গায়। যুগের সঙ্গে সঙ্গে হারিয়ে যাওয়া হাতের মেশিনে সেমাই এখনও দ্বীপ উপজেলা সন্দ্বীপের বেশ কয়েকটি গ্রামে গৃহবধূরা এ সেমাই তৈরি করে থাকে। তবে, আগে ব্যাপকভাবে তৈরি হলেও এখন খুব সীমিতভাবে তৈরি হয়। গত বৃহস্পতিবার হাতে তৈরি চালের সেমাই বানাতে দেখা মিলল সন্দ্বীপ আজিমপুর এলাকার একটি বাড়িতে। কয়েকজন গৃহবধূ বাড়ির আঙ্গিনায় বসে পিতলের তৈরি আঁকাণ্ডবাঁকা সেমাই তৈরির মেশিন সামনাসামনি চেয়ারের সঙ্গে চেয়ার লাগিয়ে নাট-বোল্ট দিয়ে আটকে ঘানির মতো ঘুরিয়ে চাল বা গমের আটার সেমাই তৈরি করছে।

কলি বেগম নামের এক গৃহবধূ জানান, ঈদের উৎসব হাতে তৈরি সেমাই ছাড়া অসম্পূর্ণ থেকে যায়। আগে পিতলের মেশিন সন্দ্বীপের প্রত্যেক বাড়িতে পাওয়া গেলেও বর্তমানে তেমন নেই বললেই চলে, গ্রামের ঐতিহ্য ধরে রাখতে প্রায় ১০ কিমি দূরের আত্মীয়ের বাড়ি থেকে মেশিন এনে সেমাই তৈরি করতে বসেছি। বাজারের সেমাইয়ের পাশাপাশি নিজেদের তৈরি সেমাই দিয়ে ঈদ উপভোগ করার মজাই আলাদা।

সেমাই বানাতে সহযোগিতা করছিলেন অষ্টম শ্রেণিতে পড়ুয়া প্রিমা ও ছোট ছেলে ইমতিয়াজ। প্রিমা বলেন, সেমাই তৈরি করতে, বিশেষ করে সেমাইর কল ঘুরানো আনন্দ অন্য রকম। বিলাসিতার কারণে অনেকে গ্রামের ঐতিহ্য ভুলে গিয়ে সেমাই বানাতে অনিহা প্রকাশ করছে। এগুলো আমাদের গ্রামীণ ইতিহাসের অংশ। এই ছাড়া আমাদের ঈদ আনন্দ জমে উঠে না। আজিমপুর গ্রামের আরেক গৃহবধূ নুসরাত জাহান সাথী বলেন, আগে ঘরে ঘরে এ হাতের তৈরি সেমাই বানানো হলেও বর্তমান যুগে বাজারে হরেক রকম নামিদামি কোম্পানির সেমাই আসায় মানুষ সেগুলোতে ঝুঁকেছে।

তিনি আরও বলেন, হাতের তৈরি সেমাই ভেজালমুক্ত। গুড়, দুধ ও নারিকেল দিয়ে হাতে তৈরি সেমাই খেতেও মজা। এছাড়া সিরিঞ্জ পিঠা কাঁচা রোদে শুকানো হয়। এগুলো ঈদের দিন সকালে গরম তেলে ভেঁজে চিনি অথবা গুড়ের শিরার ডুবিয়ে খাওয়ার জন্য পরিবেশন করা হয়। অনেক পরিবার মেয়ের জামাই বাড়ি সেমাই পাঠান। আমার মেয়ে তো ছোট, না হয় আমিও জামাইবাড়িতে পাঠাতাম।