পর্যটকদের দৃষ্টি কাড়ছে লোহাগাড়ার চাম্বি লেক
প্রকাশ : ১৯ এপ্রিল ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ
লোহাগাড়া (চট্টগ্রাম) প্রতিনিধি

চট্টগ্রামের লোহাগাড়া উপজেলায় জ্ঞানী-গুণী, সুফী-সাধক ও পীর-আউলিয়ার চারণভূমি চুনতি ইউনিয়ন খুব পরিচিত। বন-জঙ্গল ও খরস্রোতা ডলু নদী বিধৌত ইউনিয়নের পানত্রিশা গ্রাম। গ্রামের এক পাশে রয়েছে ডলু নদীর মানসকন্যা খরস্রোতা চাম্বি খাল। সুদূরপ্রসারী স্বপ্ন নিয়ে এলাকার সমাজহিতেষী কয়েকজন লোক এগিয়ে আসেন চাম্বি খালের ওপর রাবার ড্যাম নির্মাণে, মৎস্য চাষ ও কৃষি বিপ্লব ঘটিয়ে পর্যটন স্পট হিসেবে গড়ে তুলতে। হারিয়ে গেছে লোহাগাড়ার জনপদ থেকে অনেক প্রাচীন ঐতিহ্য। সময়ের আবর্তন ও আধুনিকতার ছোঁয়ায় হারিয়ে যাওয়া স্মৃতির অনেক বিস্মৃত স্মৃতি মানুষের মন-মানসিকতার দুয়ারে প্রতিনিয়ত আঘাত হানছে। কিন্তু প্রকৃতিপ্রেমিকরা হারিয়ে যাওয়া স্মৃতির নৈপথ্যে লুকিয়ে থাকা সংস্কৃতির উৎস খুঁজে বের করে আধুনিকতার রূপ, রস, গন্ধ মিশ্রিত পর্যটন স্পট জনসম্মুখে তুলে ধরছেন। অত্র উপজেলার চুনতি ইউনিয়নের জনপদে গড়ে ওঠা প্রাকৃতিক ঐশ্বর্যমণ্ডিত চাম্বি লেক অন্যতম। এই চাম্বি লেক বর্তমানে এলাকার অন্যতম দর্শনীয় পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছে। চুনতি ইউনিয়নের চাম্বি এলাকা একটি জনপদ। অপরূপ শোভামণ্ডিত নৈসর্গিক সৌন্দর্যের সবুজ-শ্যামল এ বনভূমিতে বন্যপ্রাণীর বিচরণ, পাখির কলতান, পাতার মর্মর ধ্বনি, বনভূমির নিঃসঙ্গতা সব যেন জনপদের প্রকৃতির আড়ালে লুকিয়ে থাকা অদৃশ্য এক লুকোচুরি খেলা। চাম্বি এলাকার ওপর দিয়ে বয়ে গেছে খরস্রোতা চাম্বি খাল। উৎপত্তিস্থল গহীন অরণ্যের পাদদেশে। এলাকার অসংখ্য খেটে খাওয়া মানুষ কৃষিনির্ভরশীল। চাম্বি খালে জয়নগর এলাকায় একটি রাবার ড্যাম নির্মাণ করে কৃষি ও মৎস্যসম্পদ উন্নয়নের পাশাপাশি চিত্তবিনোদন স্পট হিসেবে গড়ে তোলার সুদূরপ্রসারী স্বপ্ন নিয়ে এগিয়ে আসেন প্রকৃতিপ্রেমিকরা।
চুনতি ইউনিয়নের পানত্রিশা একটি গ্রাম। গ্রাম-সংলগ্ন রয়েছে বনাঞ্চলের অফুরন্ত প্রাকৃতিক রত্নভাণ্ডার। বয়ে গেছে খরস্রোতা চাম্বি খাল। উঁচু-নিচু, আঁকাবাঁকা পথ পেরিয়ে মিলিত হয় গ্রামের পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া খরস্রোতা ডলু নদীর সঙ্গে। পানত্রিশা গ্রামের জয়নগর এলাকায় একটি রাবার ড্যাম স্থাপন করার স্বপ্ন দেখেন তৎকালীন ইউপি চেয়ারম্যান এবং পার্শ্ববর্তী পানত্রিশা গ্রামের বাসিন্দা আলহাজ সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী। ১৯৯৮ সালে রাবার ড্যাম স্থাপনে তার চিন্তাধারা ক্রমশ গতিশীল হতে থাকে। ওই সময় সরকারের সহযোগিতায় রাবার ড্যাম স্থাপন প্রক্রিয়ার প্রাথমিক কাজ শুরু হয়। ফলে জনগণের উৎসাহ-উদ্দীপনায় উদ্যোক্তারা এ স্থানকে চাম্বি লেক নাম দিয়ে এলাকার অন্যতম পর্যটন স্পট হিসেবে গড়ে তোলার সিদ্ধান্ত নেন। ২০১৫ সালে রাবার ড্যাম স্থাপনের কাজ পুরোপুরি শুরু হয়। এলাকার উৎসাহী কৃষকদের নিয়ে গঠিত হয় ‘চাম্বি খাল পানি ব্যবস্থাপনা সমবায় সমিতি’। পানিসম্পদ সেক্টরের অধীনে উক্ত স্থানে উত্তর-দক্ষিণ ২৫ মিটার দৈর্ঘ্যরে একটি রাবার ড্যাম স্থাপিত হয়। ২০১৮ সালের ২০ জানুয়ারি এ রাবার ড্যাম আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন হয়। এছাড়া রাবার ড্যামের ওপর নির্মিত হয়েছে সুন্দর ও দৃষ্টিনন্দন একটি ফুট ব্রিজ। উপজেলায় কোনো চিত্তবিনোদন স্পট না থাকায় জ্ঞানপিপাসুরা অবকাশ যাপনে আত্মতৃপ্তি লাভ থেকে বঞ্চিত ছিল। ফলে চাম্বি লেক কর্তৃপক্ষ জ্ঞানপিপাসু দর্শনার্থীদের আনন্দদানে নতুন আঙ্গিকে গড়ে তোলেন চাম্বি লেক পর্যটন স্পট। রাবার ড্যামের উপরিভাগে প্রায় ২ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে রয়েছে জমে থাকা পানির স্তর। এতে বিভিন্ন এলাকার কৃষক যেভাবে উপকৃত হয়েছেন এবং পাশাপাশি অসংখ্য চাষাবাদের জমি চাষের আওতাভুক্ত হয়েছে। উপকৃত হয়েছেন চাষিরা এবং ক্ষেত-খামার করতে পানি সেচের সুবিধা পাচ্ছেন উপর ও নিচের অংশের-সংশ্লিষ্ট কৃষকরা। চুনতির এই চাম্বি লেক বর্তমানে অত্র উপজেলার একমাত্র চিত্তবিনোদন স্পট।
এমনকি এক প্রকার গ্রামীণ এলাকার মিনি পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছে। প্রকৃতির সবুজ-শ্যামল পরিবেশে এ চাম্বি লেক সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত সারাক্ষণ মুখরিত অসংখ্য দর্শনার্থীর পদচারণায়। আবাল-বৃদ্ধ-বণিতা সব বয়সের মানুষের আসা-যাওয়ার এ বিনোদন স্পট অত্যাধিক জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। চারদিকে রয়েছে কর্মব্যস্ত মানুষের কোলাহল। সবুজ পাহাড়ঘেরা প্রাকৃতিক পরিবেশে গড়ে ওঠা এ চিত্তবিনোদন কেন্দ্রে রয়েছে কৃত্রিম পানির ফোয়ারা, বন্য পশু-পাখির ভাস্কর্য, বিভিন্ন শ্রেণির বানর, পানির ওপর ভাসমান স্পিডবোট, প্যাডেল বোট, লাইফ বোট, ইঞ্জিনচালিত নৌকা ও ফ্যামিলি ট্রেন, বাচ্চাদের খেলার উড়োজাহাজ, ভূতের গুহাসহ বিভিন্ন প্রকার দর্শনীয় জিনিসপত্র। লেক চত্বরে রয়েছে রেস্টুরেন্ট, বিশ্রামাগার ও পিকনিক স্পট। লেকের মাঝখানে শোভা পাচ্ছে ‘মায়া দ্বীপ’। যাতায়াতের সুবিধায় রয়েছে দর্শনার্থীদের জন্য ড্রাম ভেলা। পর্যটকদের অবকাশ যাপনের জন্য কর্তৃপক্ষ একটি অত্যাধুনিক রিসোর্ট সেন্টার নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছেন। প্রকৃতির সবুজ মেলায় নৈসর্গিক শোভামণ্ডিত চুনতির এই চাম্বি লেক বর্তমানে প্রকৃতিপ্রেমিক ও উৎসুক জনতার আনাগোনায় মুখরিত। দক্ষিণ চট্টলার অন্যতম ব্যস্ততম উপ-শহর তথা লোহাগাড়া উপজেলা সদর বটতলী মোটর স্টেশন সংযুক্ত দরবেশহাট ডিসি সড়ক দিয়ে সোজা দক্ষিণে পুঁটিবিলা এমচর হাট পেরিয়ে সামান্য দক্ষিণে এ চাম্বি লেকের অবস্থান। চাম্বি খাল পানি ব্যবস্থাপনা সমবায় সমিতির সদস্য রেজাউল বাহার রাজা জানান, ‘চাম্বি লেক পর্যটনকেন্দ্র চুনতি চাম্বি লেক চিত্তবিনোদন স্পট। বর্তমানে এ চাম্বি লেক মিনি পর্যটনকেন্দ্রের সমতুল্য। গ্রামীণ পরিবেশে এ চাম্বি লেক গড়ে ওঠে রূপ-রস ও আনন্দদানে মুগ্ধ করছে দর্শনার্থীদের। দূর-দূরান্তের এলাকা থেকে আগত দর্শনার্থীরা এই চাম্বি লেকে এসে আনন্দ উপভোগ করছেন।’
তার ধারণা, সরকারের পৃষ্ঠপোষকতা পেলে এর সুযোগ-সুবিধা, সুনাম ও প্রচার আরও ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়বে। তাই এ লেকটি পূর্ণ পর্যটনকেন্দ্রে পরিণত করতে সরকারের শুভদৃষ্টি দাবি করেছেন তিনি। চাম্বি খাল পানি ব্যবস্থাপনা সমবায় সমিতির সভাপতি শিক্ষাবিদ মাহবুবুর রহমান চৌধুরী জানান, ‘চুনতির পানত্রিশা একটি স্বনামধন্য গ্রাম। চাম্বি খালকে কেন্দ্র করে এ গ্রামের পরিচিতি আরও ছড়িয়ে পড়েছে। ত্রিমুখী পরিকল্পনা নিয়ে এলাকার জয়নগরস্থ খরস্রোতা চাম্বি খালের ওপর রাবার ড্যাম স্থাপিত হয়।
চিত্তবিনোদনে আনন্দ পাচ্ছেন দর্শনার্থীরা। পানি সেচ ব্যবস্থায় কৃষিপণ্য উৎপাদন এবং মৎস্য চাষে মৎস্যসম্পদ বৃদ্ধিকরণ প্রভৃতি মহৎ উদ্যোগ নিয়ে গড়ে উঠেছে এ চাম্বি লেক প্রকল্প বা পর্যটন কেন্দ্র।’ তিনি আরও বলেন, ‘এ পর্যটন স্পট চাম্বি লেক সংস্কারের কাজ চলছে সরকারের আর্থিক সহযোগিতায়। উক্ত সংস্কারের কাজ সম্পন্ন হলে চাম্বি লেকের নান্দনিক শোভা ও সুনাম আরও ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়বে এবং তাতে দর্শনার্থীর সংখ্যা বহুগুণে বৃদ্ধি পাবে। এটি পর্যটন শিল্পের নতুন এক সম্ভাবনা হয়ে উঠবে বলে তিনও আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
