১৪০ বছরের যাত্রায় চট্টগ্রাম সমুদ্র বন্দর
প্রকাশ : ২৬ এপ্রিল ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ
তামীম রহমান, চট্টগ্রাম

দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর চট্টগ্রাম বন্দরের ১৩৯তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী ও বন্দর দিবস গতকাল শনিবার পালিত হয়েছে। চট্টগ্রাম বন্দর বাংলাদেশের আমদানি ও রফতানির ৯২ শতাংশেরও অধিক পণ্য এবং ৯৮ শতাংশ কনটেইনারজাত পণ্য হ্যান্ডলিং করে থাকে।
বাংলাদেশের অর্থনীতির কর্ণদ্বার হিসেবে পরিচিত চট্টগ্রাম বন্দরের ইতিহাস সুপ্রাচীন। খ্রিষ্টপূর্ব চতুর্থ শতাব্দীতে চট্টগ্রাম হতে সমুদ্র পাড়ির কথা জানা যায়। পরবর্তীতে আরব ও ইয়েমেনি বণিকরা এবং তারপর ক্রমান্বয়ে চাইনিজ, পর্তুগিজ, ডাচ ও ব্রিটিশরাও এই বন্দর ব্যবহার করেছে।
তৎকালীন ব্রিটিশ-ইন্ডিয়া সরকার ১৮৮৭ সালের পোর্ট কমিশনার্স অ্যাক্ট প্রণয়ন করে, যা ১৮৮৮ সালের ২৫ এপ্রিল কার্যকর হয়। বস্তুত তখন থেকেই চট্টগ্রাম বন্দরের আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয়। তাই প্রতি বছর ২৫ এপ্রিল ‘বন্দর দিবস’ হিসেবে পালন করা হয়ে থাকে। দিবসটি উপলক্ষে প্রতি বছর নানা কর্মসূচি পালন করে থাকে বন্দর কর্তৃপক্ষ। বন্দর কর্তৃপক্ষ বলছে- ব্যবসাবান্ধব বন্দর ব্যবস্থাপনা, দ্রুতগতির নিরাপদ হ্যান্ডলিং, ডিজিটাল রূপান্তর, ব্যাপক অটোমেশন, সুশাসন প্রতিষ্ঠা, নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি, যন্ত্রপাতির আধুনিকায়ন, অবকাঠামো সম্প্রসারণ ও দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ; সব মিলিয়ে চট্টগ্রাম বন্দর বাস্তবায়ন করছে আধুনিকতার রোডম্যাপ। লক্ষ্য একটি নিরাপদ, রেকর্ড ভঙ্গ করে ৩.৪ মিলিয়ন টিইইউ কনটেইনার হ্যান্ডলিং করেছে বন্দর। দক্ষ ব্যবস্থাপনা ও প্রযুক্তিগত সংযোজন এই সাফল্যের মূল চালিকাশক্তি। টার্মিনাল অপারেটিং সিস্টেম, নিরবচ্ছিন্ন ৫জি নেটওয়ার্ক, ই-গেট পাস, ই-বিলিং ও ই-পেমেন্ট সিস্টেম বদলে দিয়েছে সেবা প্রদানের প্রচলিত ধারা। ‘সিপিএ স্কাই’ পোর্ট সিঙ্গেল উইন্ডো প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে এনবিআরসহ আমদানি-রপ্তানি সংশ্লিষ্ট সব সেবা এসেছে সমন্বিত ব্যবস্থাপনায়। প্রি-অ্যারাইভাল প্রসেস চালুর ফলে জাহাজ বন্দরে পৌঁছানোর আগেই পণ্যের শুল্কায়ন সম্পন্ন হচ্ছে। খালাসে সময় কমছে, সমতা বাড়ছে। জাহাজের অপেক্ষমাণ সময় এখন ‘শূন্যে’ নেমে এসেছে। নিরাপত্তাব্যবস্থায় আইএসপিএস কোড বাস্তবায়নে অর্জিত হয়েছে ‘জিরো অবজারভেশন’। ফলে লজিস্টিকস ব্যয় নেমেছে প্রায় অর্ধেকে। আমদানি-রপ্তানি গন্তব্যের দেশগুলোর সঙ্গে ডাইরেক্ট শিপিং চালু হলে ব্যয় আরও কমবে। আইএমও বাধ্যবাধকতা সামনে রেখে কর্তৃপক্ষ ‘গ্রিন পোর্ট’ উদ্যোগের যাত্রা শুরু করেছে, ফলে চট্টগ্রাম বন্দর তথা বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে কমপ্লয়েন্ট থাকবে। নবগঠিত সরকারের ইশতেহারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বন্দর কর্তৃপক্ষ নিয়েছে ব্যাপক কর্মপরিকল্পনা। বাণিজ্য সমতা বৃদ্ধি, বিনিয়োগ সম্প্রসারণ ও টেকসই অর্থনৈতিক রূপান্তরে চট্টগ্রাম বন্দর হয়ে উঠছে দেশের উন্নয়নের অনুঘটক। উন্নয়নের এ পথ ধরেই চট্টগ্রাম বন্দর দেশের অর্থনীতিকে নিয়ে যাবে অনন্য উচ্চতায় এমন প্রত্যাশা বন্দর সংশ্লিষ্টদের। চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সদস্য কমোডর আমিন আহমেদ আবদুল্লাহ বন্দরের গুরুত্ব তুলে ধরে বলেন, ‘যত পণ্য আমদানি-রপ্তানি হয় তার ৯৩ ভাগ সমুদ্রপথে আসছে এবং কনটেইনারে যে সমস্ত কার্গো আসছে তার প্রায় ৯৮ ভাগ বাংলাদেশের এই চট্টগ্রাম বন্দরের মাধ্যমে আমরা আনা-নেয়া করছি। বাংলাদেশের অর্থনীতিতে চট্টগ্রাম বন্দরের ভূমিকা অনস্বীকার্য এবং আমরা যদি এই টোটাল আমদানি-রপ্তানির হিসাব দেখি, আমাদের প্রবৃদ্ধির হিসাবটা দেখি, আমরা গত ২৫ বছরে যদি দেখি আমাদের আমদানি-রপ্তানি প্লাস কার্গো হ্যান্ডলিংয়ের কন্টেইনার হ্যান্ডলিংয়ের যে ধারা পুরোটাই ঊর্ধ্ব সূচকে রয়েছে। এবং এখন এই ২০২৬ সালের এই পর্যায়ে এসে দাঁড়িয়ে আমরা এখনও প্রবৃদ্ধিটা সূচক ঊর্ধ্বমুখী রেখেছি এবং এই বৈশ্বিক যে সমস্যাটা এখন চলছে সেই সমস্যার মধ্যেও কিন্তু চট্টগ্রাম বন্দর বাংলাদেশের অর্থনৈতিক চাকা সচল রাখার জন্য সর্বাত্মক চেষ্টা করছে এবং ব্যবসাবান্ধব ও জনবান্ধব একটা পরিবেশ সৃষ্টি করার এখানে চেষ্টা করছে।’ চট্টগ্রাম কাস্টম হাউজের তথ্যমতে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এই বন্দর দিয়ে ৪ থেকে ৫ লাখ কোটি টাকা মূল্যের পণ্য আনা-নেওয়া হচ্ছে। বছরে এখান থেকে রাজস্ব আদায় হচ্ছে ৭৫ থেকে ৮০ হাজার কোটি টাকা। শিল্পের কাঁচামাল, খাদ্যপণ্য ও জ্বালানি আমদানির পাশাপাশি রপ্তানির শীর্ষে রয়েছে তৈরি পোশাক। প্রসঙ্গত, ব্রিটিশ ম্যাগাজিন লয়েড’স লিস্ট অনুযায়ী, বিশ্বের ব্যস্ততম ১০০টি বন্দরের মধ্যে চট্টগ্রাম বন্দরের বর্তমান অবস্থান ৬৮তম। কন্টেইনার ও কার্গো হ্যান্ডলিং এবং জাহাজ বার্থিংয়ের মাধ্যমে চট্টগ্রাম বন্দরের নিজস্ব বার্ষিক আয় বর্তমানে ৫ হাজার কোটি টাকার বেশি।
