চট্টগ্রাম ওয়াসার ‘ভাণ্ডালঝুড়ি’ প্রকল্পের সেবা পাবে নগরবাসী

প্রকাশ : ২১ জুন ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  চট্টগ্রাম ব্যুরো

আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে কোনো ধরনের সমীক্ষা ছাড়াই দক্ষিণ চট্টগ্রামের বোয়ালখালীতে কর্ণফুলী নদীর ওপারে গড়ে তোলা হয় ভাণ্ডালঝুড়ি পানি শোধনাগার প্রকল্প। প্রায় দুই হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত এই শোধনাগারটির দৈনিক ছয় কোটি লিটার পানি উৎপাদনের সক্ষমতা রয়েছে। কিন্তু পুরোপুরি চালু হওয়ার দুই বছরেও কাঙ্ক্ষিত গ্রাহক পায়নি প্রতিষ্ঠানটি। এই প্রেক্ষাপটে ছয় কোটি লিটার পানি উৎপাদনের সক্ষমতা থাকলেও ব্যবহার না হওয়ায় ক্যাপাসিটি কমিয়ে মাত্র ২৫ লাখ লিটার পানি উৎপাদন করে শোধনাগারটি। অথচ নগরীতে পানির সংকট তীব্র রয়েছে। নদীর ওপারে শোধনাগার হওয়ায় ওই পানি এতদিন নগরীতে আনা সম্ভব হয়নি। ফলে ভাণ্ডালঝুড়ি শোধনাগারের সক্ষমতার ৯৫ শতাংশই অব্যবহৃত ছিল এতদিন। সম্প্রতি কর্ণফুলী টানেলের ইউটিলিটি ডাক্ট ব্যবহার করে নদীর ওপারের পানি নগরীতে আনার উদ্যোগ নিয়েছে চট্টগ্রাম ওয়াসা। এতে একদিকে যেমন বিপুল বিনিয়োগে প্রতিষ্ঠিত প্রকল্পের সক্ষমতাকে ব্যবহার করা সম্ভব হবে, অন্যদিকে নগরীর বড় একটি অংশ বিশুদ্ধ সাপ্লাই পানির আওতায় আসবে। সূত্র জানায়, ২০১৬ সালে এক হাজার ৩৬ কোটি টাকা ব্যয়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরে কর্ণফুলী নদীর পানি পরিশোধনের জন্য ভাণ্ডালঝুড়ি পানি শোধনাগার প্রকল্প বাস্তবায়ন শুরু করে চট্টগ্রাম ওয়াসা। কয়েক দফায় খরচ বাড়িয়ে ২০২৩ সালে অপারেশনে আসার আগ পর্যন্ত এক হাজার ৯৯৪ কোটি টাকা ব্যয় করে ওয়াসা। বড় এই মেগা প্রকল্পটির উদ্দেশ্য ছিল দক্ষিণ চট্টগ্রামের বোয়ালখালী, পটিয়া, আনোয়ারা ও কর্ণফুলী এলাকায় ১০ হাজার আবাসিক সংযোগের পাশাপাশি সিইউএফএল, কাফকো, কোরিয়ান ইপিজেড ও আনোয়ারা ইকোনমিক জোনসহ ১৩টি বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠানের পানির চাহিদা মেটানো হবে এখান থেকেই। কিন্তু প্রকল্প বাস্তবায়ন হওয়ার পর টার্গেট গ্রাহকরা আর ওয়াসার পানি নেওয়ার আগ্রহ দেখায়নি। হাতে গোনা কয়েকজন আবাসিক গ্রাহক আর শিল্প প্রতিষ্ঠানের মধ্যে শুধু সিইউএফএল ছাড়া আর কেউ ওয়াসার পানি নিতে উৎসাহী হয়নি। এর মধ্যে আনোয়ারা ইকোনমিক জোনকে বড় গ্রাহক হিসেবে বিবেচনা করলেও ওই ইকোনমিক জোনটি এখরও অপারেশনেই আসেনি। ফলে দৈনিক ছয় কোটি লিটার পানি উৎপাদনের সক্ষমতা থাকলেও ২৫ লাখ লিটারের বেশি পানি বিক্রি করতে পারছে না ওয়াসা। ফলে ক্যাপাসিটি কমিয়ে উৎপাদন চালিয়ে যেতে বাধ্য হচ্ছে প্রতিষ্ঠানটি। এতে মেইনটেনেন্স ব্যয় বাড়ার পাশাপাশি প্রকল্পের সুফল পাচ্ছে না ওয়াসা।

ওয়াসা সূত্র জানিয়েছে, আওয়ামী লীগ সরকার পতনের প্রায় দুই বছরের মাথায় নতুন ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পান ইঞ্জিনিয়ার সেলিম মোহাম্মদ জানে আলম। নতুন এমডি দায়িত্ব গ্রহণের তিনদিনের মাথায় ভাণ্ডালঝুড়ি প্রকল্পের পানি নগরে আনার উদ্যোগ নেন। এক্ষেত্রে কর্ণফুলী টানেলের ইউটিলিটি ডাক্ট ব্যবহার করতে চায় ওয়াসা। এরইমধ্যে টানেলের ইউটিলিটি ডাক্ট ব্যবহার করে পাইপ লাইন স্থাপনের অনুমতি চেয়ে সড়ক বিভাগ, সেতু বিভাগ ও স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠিয়েছে চট্টগ্রাম ওয়াসা। ওয়াসার প্রধান প্রকৌশলী মাকসুদ আলম জানান, ওয়াসা, বিদ্যুৎ, টিঅ্যান্ডটির মতো সেবা সংস্থাগুলোর জন্য কর্ণফুলী টানেলের পাটাতনের নিচে ইউটিলিটি ডাক্ট প্রস্তুত করা আছে। কিন্তু সেটি এখনও ব্যবহার হয়নি। প্রথমবারের মতো চট্টগ্রাম ওয়াসা টানেলের ডাক্ট ব্যবহার করে ওপারের পানি এপারে আনার উদ্যোগ নিয়েছে। কর্ণফুলী নদীর ওপারে আনোয়ারার সিইউএফএল পর্যন্ত ভাণ্ডালঝুড়ি প্রকল্পের পাইপলাইন প্রস্তুত আছে। সেখান থেকে মাত্র কয়েকশ মিটারের মধ্যে টানেলের মুখ। তাই এই রুটটি ব্যবহার করে নগরীতে পানি আনা সবচেয়ে সহজ মাধ্যম। আর তাই এই মাধ্যমটি ব্যবহার করার উদ্যোগ নিয়েছে ওয়াসা। চট্টগ্রাম ওয়াসার এমডি ইঞ্জিনিয়ার সেলিম মোহাম্মদ জানে আলম জানান, পতেঙ্গা এলাকা চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের (চসিক) আওতায় হলেও এলাকাটিতে ওয়াসার পানি সাপ্লাই নিশ্চিত করা হয়নি এখনও। এলাকাটিতে সিটি কর্পোরেশনের ৩৯, ৪০ ও ৪১ নম্বর ওয়ার্ড রয়েছে। ৩৯ ও ৪০ নম্বর ওয়ার্ডের অর্ধেক এলাকায় ওয়াসার লাইন থাকলেও পানি স্বল্পতার কারণে সেখানে রেশনিং করে পানি দিতে হচ্ছে এখন। ৪১ নম্বর ওয়ার্ডে ওয়াসার কোনো কার্যক্রমই নেই। তিনটি ওয়ার্ড মিলে দৈনিক ৯ কোটি লিটার পানির চাহিদা রয়েছে। নগর থেকে দৈনিক চার কোটি লিটার পানি ওই এলাকার জন্য বরাদ্দ করা সম্ভব। কিন্তু কর্ণফুলী টানেলের ডাক্ট ব্যবহার করে ভাণ্ডালঝুড়ি প্রকল্পের পানি আনা গেলে আরো তিন কোটি লিটার পানির যোগান নিশ্চিত করা সম্ভব। ৯ কোটি লিটার চাহিদার বিপরীতে সাত কোটি লিটার পানির যোগান দিতে পারলেও মানুষের দুর্ভোগ মোটামুটি লাঘব হবে। সেতু মন্ত্রণালয়ের অনুমতি পেলে এক বছরের মধ্যে পুরো পতেঙ্গা এলাকা ওয়াসার পানি সাপ্লাইয়ের আওতায় নিয়ে আসা সম্ভব। এরই মধ্যে ওই এলাকাকে ঘিরে আরেকটি এমওডি (মেইটেনেন্স অপারেশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন) সেন্টার তৈরির পরিকল্পনাও আছে ওয়াসার। এটি বাস্তবায়ন হলে এতদিন অবহেলিত থাকা এলাকাটিতে পানি সরবরাহ নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।