চট্টগ্রাম বন্দরে বেড়েছে রাজস্ব আয়

প্রকাশ : ০৫ জুলাই ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  চট্টগ্রাম ব্যুরো

চট্টগ্রাম বন্দরে রাজস্ব আয় বেড়েছে। বন্দর সূত্র জানায়, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ ৬ হাজার ৬২৯ কোটি ১৭ লাখ টাকা রাজস্ব আয় করেছে। আগের অর্থবছরে আয় হয়েছিল ৫ হাজার ৩৬৬ কোটি ৪৯ লাখ টাকা। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে আয় ছিল ৪ হাজার ৮৩০ কোটি ৩৭ লাখ টাকা। শুধু যে আয় বেড়েছে তা নয়, এবার খরচও কমেছে বন্দর কর্তৃপক্ষের। সদ্যবিদায়ী অর্থবছরে রাজস্ব ব্যয় ২ হাজার ২৭৩ কোটি ৯৬ লাখ টাকা। যা ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ছিল ২ হাজার ৩৮৮ কোটি ৫৭ লাখ টাকা। এবার রাজস্ব উদ্বৃত্ত ৪ হাজার ৩৫৫ কোটি ২১ লাখ টাকা। সরকারকে বন্দর কর্তৃপক্ষ আয়কর দিয়েছে ৯৬০ কোটি ৪ লাখ টাকা। বন্দর সূত্রে জানা গেছে, চট্টগ্রাম বন্দরের আয়ের প্রধান খাত টার্মিনাল ম্যানেজারের দপ্তর। এখান থেকে এবার সরাসরি রাজস্ব আদায় হয়েছে ৪ হাজার ৫৭ কোটি ৯৭ লাখ ৭৭ হাজার ৭২৪ টাকা। যা ২০২৪-২৫ অর্থবছরের তুলনায় ২৭ দশমিক ৯০ শতাংশ বেশি। আগের বছরের তুলনায় এবার রাজস্ব ব্যয় ১৮ শতাংশ কমাতে পারায় বন্দর সম্প্রসারণ ও আধুনিকায়ন প্রকল্পে পুনর্বিনিয়োগের জন্য ৩ হাজার ৭১৭ কোটি ২০ লাখ টাকা আয়কর পরবর্তী উদ্বৃত্ত রয়েছে। ব্যয় কমানোর ক্ষেত্রে দারুণ ভূমিকা রেখেছে ড্রেজিং খাত। গত ছয় বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন প্রতি ঘনমিটারে ৩৭৫ টাকা ৬৭ পয়সা দরে ড্রেজিং করা হয়েছে। ৫ দশমিক ৩৫ লাখ ঘনমিটার ড্রেজিংয়ের জন্য মোট ব্যয় ২০ কোটি ১০ লাখ টাকায় নামিয়ে আনা সম্ভব হয়েছে। পরিকল্পিত ড্রেজিং কৌশলের কারণে কমপক্ষে ৪৩ কোটি ৮১ লাখ টাকা সাশ্রয় হয়েছে। বন্দরের অস্বাভাবিক ট্যারিফ বৃদ্ধির কারণে রাজস্ব আয় বেড়েছে উল্লেখ করে চিটাগাং চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি মোহাম্মদ আমিরুল হক জানান, বন্দরের প্রধান লক্ষ্য আয় বৃদ্ধি নয়। বন্দর ব্যবহারকারীদের চাহিদা অনুযায়ী সেবার মান বাড়ানো, কস্ট অব ডুয়িং বিজনেস সহনীয় রাখাই বন্দরের লক্ষ্য। শিল্পকারখানার কাঁচামাল যাতে দ্রুত আনলোড হয়, ডেলিভারি হয় এবং রপ্তানি পণ্য যাতে সঠিক সময়ে জাহাজে লোড করা যায় সেদিকে মনোযোগ বাড়াতে হবে। এক্ষেত্রে ট্যারিফ বৃদ্ধির বিষয়টি নির্বাচিত সরকার স্টেক হোল্ডারদের সঙ্গে আলোচনা করে পুননির্ধারণ করবে আশাকরি। শিল্পকারখানা সচল না থাকলে, বিনিয়োগ না বাড়লে কর্মসংস্থান বাড়বে না। বন্দরের পরিবহন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী ২০২৫-২৬ অর্থবছরে মোট কনটেইনার হ্যান্ডলিং হয়েছে ৩৫ লাখ ৩১ হাজার ১১৮ টিইইউ’স (২০ ফুট দীর্ঘ একক)। আগের অর্থবছরে যা ছিল ৩২ লাখ ৯৬ হাজার ৬৭ টিইইউস। ২ লাখ ৩৫ হাজার ৫১ টিইইউস বেড়ে এবার প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৭ দশমিক ১৩ শতাংশ।

এবার কার্গো হ্যান্ডলিং হয়েছে ১৩ কোটি ৮০ লাখ ৭২ হাজার ৮২৬ মেট্রিক টন। আগের বছর ছিল ১৩ কোটি ৭ লাখ ২৪ হাজার ৭৮৩ টন। প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৫ দশমিক ৬২ শতাংশ। জাহাজ হ্যান্ডলিং হয়েছে ৪ হাজার ৩৩৬টি। যা আগের অর্থবছরের চেয়ে ২৫৯টি বেশি। এ খাতে প্রবৃদ্ধি ৬ দশমিক ৩৫ শতাংশ। কনটেইনার জাহাজের টার্ন অ্যারাউন্ড টাইম ছিল এবার ২ দশমিক ৩৮ দিন। আগের অর্থবছরে ছিল ২ দশমিক ৫৮ দিন। কমার হার ৭ দশমিক ৭৫ শতাংশ। বন্দরের প্রবৃদ্ধির জন্য সরকার, মন্ত্রণালয় ও বন্দর ব্যবহারকারী এবং বন্দরের শ্রমিক কর্মচারীদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে বন্দর চেয়ারম্যান বলেন, বিগত দুই বছর অনেক সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়েছে। তারপরও বাজারে কিন্তু সরবরাহ নিশ্চিত করা হয়েছে। বিশেষ করে চারটি ঈদে পর্যাপ্ত সরবরাহের কারণে ইতিবাচক প্রভাব পড়েছে। চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে দেশের ৯২ শতাংশ আমদানি রপ্তানির পণ্য হ্যান্ডলিং করে। বন্দরটা মেইন গেটওয়ে। মন্ত্রণালয় থেকে শুরু করে সবাই সহযোগিতা করেছে। আমরা যুগান্তকারী সাফল্য অর্জন করতে পেরেছি। ডিজিটালাইজেশনে আমরা অনেক এগিয়ে গেছি। গত সপ্তাহে সাইবার সিকিউরিটি ট্রেনিং শুরু করছি। এটা আইএসপিএস কোডের রিকোয়ারমেন্ট। উন্নয়নের জন্য কাজগুলো করতে হচ্ছে। দেশবাসী সুফল পাচ্ছে। আমাদের গড়ে ১১ শতাংশ কার্গো গ্রোথ হচ্ছে। ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা রয়েছে প্রতিযোগী বন্দরের সঙ্গে লজিস্টিকসে কমপিটিটিভ হওয়া। আমাদের টার্গেট রিজিওনাল লজিস্টিকস হাব এবং রিজিওনাল ম্যানুফেকচারিং হাব হিসেবে আত্মপ্রকাশ করা। সেটার জন্য স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিয়েছি। তারই ধারাবাহিকতায় বে টার্মিনালের কাজ শুরু হয়েছে। বে টার্মিনাল হলে বড় শিপিং কোম্পানি বাংলাদেশে আসবে। লজিস্টিক কস্ট কমে যাবে। না হলে ফরেন ইনভেস্টমেন্ট আনা দুরূহ হয়ে পড়বে। তাই আমরা সমন্বিতভাবে কাজ করে যাচ্ছি। যার সুফল চার-পাঁচ বছরে দেখা যাবে। তিনি বলেন, আজই ন্যাশনাল সিঙ্গেল উইন্ডোর সঙ্গে পোর্ট সিঙ্গেল উইন্ডোর কানেকটেড হয়ে গেছি। এখন কাস্টমসের অ্যাসাইকুডা ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে টোটাল কানেকটেড হয়ে গেলে প্রি অ্যারাইভাল প্রসিসিউর করতে পারব। ডিপি ওয়ার্ল্ডকে এনসিটি ইজারা প্রসঙ্গে এক প্রশ্নের উত্তরে বন্দর চেয়ারম্যান বলেন, পোর্ট কোনো ব্যক্তি গোষ্ঠীর নয়। আমরা কিন্তু এখানে সার্ভিস প্রোভাইডার হিসেবে আসছি এবং বন্দরের যে আইন আছে আইনের ধারাতে বলা হয়েছে যে চেয়ারম্যান হলো জনসেবক। আমি এখানে সেবা দানকারী হিসেবে এখানে আছি আমার কাজ হলো যে জনসেবা করা। কাজেই দেশ এবং জনগণ এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য যেটা করা এটা রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত। আপনারা জানেন যে ডিপি ওয়ার্ল্ডের ব্যাপার তো আজকের বিষয় না। এটা আমি জয়েন করারও আরও অনেক আগে।

২০১৯ সাল থেকে এই কাজটা শুরু হয়েছে। ২০১৯ সালে যখন ডিপি ওয়ার্ল্ডের সাথে আমাদের প্লাটফর্ম মিটিং হয় আমরাই বলেছিলাম যে এনসিটি ডিপি ওয়ার্ল্ডকে নেওয়ার জন্য। এটি ইউএই গভর্মেন্টের ১০০ ভাগ নিজস্ব প্রতিষ্ঠান এবং আপনারা জানেন যে ইউএইতে আমাদের প্রায় ২৬ লাখ লোক কাজ করে। সেখান থেকে রেমিটেন্স আসে প্রতিবছর প্রায় মানে ৪ দশমিক ৫৬ বিলিয়ন ডলারের মতো। আমি আপনাদের শুধু এইটুকু বলতে চাই যে এই প্রজেক্টটা না হওয়ার কারণে আমাদের দুইটা দেশের মধ্যে যে একটা কমিটমেন্ট সেটাও আমরা মাঝেমধ্যে এটার ওপর একটা নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। বন্দরে আমাদের ক্রেন এবং ইকুইপমেন্ট সবই কিন্তু অলমোস্ট অবসলিড হয়ে গেছে এবং হয়ে যাচ্ছে। আপনি এই যে অর্জন দেখাচ্ছেন এই অর্জন বাধার সম্মুখীন হবে। আমরা যদি শুরু করি ইকুইপমেন্ট কিনতে তিন থেকে চার হাজার কোটি টাকা আমাদের লেগে যাবে। ফরেন কারেন্সি আউট হয়ে যাবে। নিজেরা করতে গেলে তিন চার বছর সময় লেগে যাবে। এর মধ্যে তো এনসিটি হুমকির মুখে পড়ে যাবে। এটা যদি এত সহজে হতো তাহলে কিন্তু অনেক আগে হয়ে যেত। ইন্টারিম গভর্মেন্টের সময় দেখছেন দুই বছর এটা নিয়ে অনেক হয়েছে কিন্তু তারপরেও কিন্তু সম্ভব হয় নি। কারণ কি আমরা কিন্তু নেগোসিয়েশনে আমাদের ইন্টারেস্ট ছাড় দেবো না। দেশের ইন্টারেস্ট সবার আগে।