উখিয়ায় স্বেচ্ছাশ্রমে পরিচ্ছন্নতা অভিযান

প্রকাশ : ২৬ জুলাই ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  সাঈদ মুহাম্মদ আনোয়ার, উখিয়া (কক্সবাজার)

পরিবেশ রক্ষা ও পরিচ্ছন্ন সমাজ গঠনের কথা প্রায়ই শোনা যায়। তবে সেই ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে নিয়মিত মাঠে কাজ করেন অল্প কয়েকজন। কক্সবাজারের উখিয়ায় গত এক বছরে এমনই একটি উদ্যোগের নাম বিডি ক্লিন উখিয়া টিম। স্বেচ্ছাশ্রমের ভিত্তিতে গড়ে ওঠা এই সংগঠনটি পরিচ্ছন্নতা অভিযান, জনসচেতনতামূলক কার্যক্রম এবং পরিবেশ সংরক্ষণে ধারাবাহিক উদ্যোগের মাধ্যমে স্থানীয় পর্যায়ে একটি ইতিবাচক পরিবর্তনের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। ‘পরিচ্ছন্নতা শুরু হোক আমার থেকে’- এই স্লোগানকে ধারণ করে ২০১৬ সালের ৩ জুন প্রতিষ্ঠিত হয় দেশের স্বেচ্ছাসেবী পরিবেশবাদী সংগঠন বিডি ক্লিন (BD Clean)। প্রতিষ্ঠাতা ফরিদ উদ্দিন। সম্পূর্ণ অরাজনৈতিক ও অলাভজনক এই সংগঠনটি পরিবেশ সংরক্ষণ, পরিচ্ছন্নতা এবং নাগরিক সচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে কাজ করে আসছে। বর্তমানে দেশের বিভিন্ন জেলায় সংগঠনটির সঙ্গে ৫৮ হাজারের বেশি স্বেচ্ছাসেবক যুক্ত রয়েছেন। জাতীয় এই আন্দোলনের অংশ হিসেবে ২০২৫ সালের ২৯ জুলাই উখিয়া প্রেস ক্লাবে আয়োজিত পরিচিতি সভার মাধ্যমে যাত্রা শুরু করে বিডি ক্লিন উখিয়া টিম। টিমটির প্রতিষ্ঠাতা ওমর ফারুক। উপদেষ্টা হিসেবে রয়েছেন উখিয়া প্রেস ক্লাবের সভাপতি সাঈদ মোহাম্মদ আনোয়ার এবং সিনিয়র সাংবাদিক ফারুক আহমেদ।

বর্তমানে টিমটির সক্রিয় সদস্য ৪০ জন। তাদের মধ্যে ৩৫ জন পুরুষ ও ৫ জন নারী। সদস্যদের মধ্যে আটজন চাকরিজীবী, দুজন শিক্ষক এবং বাকিরা বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী। পেশা ও বয়সে বৈচিত্র্য থাকলেও পরিচ্ছন্ন পরিবেশ গড়ে তোলার লক্ষ্যেই তারা স্বেচ্ছাশ্রমে যুক্ত হয়েছেন। বিডি ক্লিন উখিয়া টিমের প্রতিষ্ঠাতা ওমর ফারুক বলেন, আমরা শুধু পরিচ্ছন্নতা অভিযান পরিচালনা করতে চাই না। মানুষের মধ্যে পরিচ্ছন্নতার অভ্যাস গড়ে তোলাই আমাদের মূল লক্ষ্য। প্রত্যেকে নিজের জায়গা পরিষ্কার রাখলে একটি পরিচ্ছন্ন সমাজ গড়ে তোলা সম্ভব। প্রতিষ্ঠার এক বছরের মধ্যে টিমটি ১৫টি উল্লেখযোগ্য কর্মসূচি বাস্তবায়ন করেছে। এর মধ্যে রয়েছে ১২টি পরিচ্ছন্নতা অভিযান, একটি জনসচেতনতামূলক প্রচার, একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সচেতনতামূলক কার্যক্রম ও পরিচ্ছন্নতা অভিযান, বৃক্ষ বিতরণ কর্মসূচি, জাতীয় দিবস পালন, পরিচ্ছন্ন আড্ডা, ইফতার মাহফিল এবং সদস্যদের মতবিনিময় সভা। এই সময়ে উখিয়া কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার (দুইবার), বালুখালী কাশেমিয়া স্কুলসংলগ্ন হিন্দুপাড়া, উখিয়া ডাকঘর এলাকা, হাজীপাড়া সড়ক, ইনানী সমুদ্রসৈকত, কোর্টবাজার দক্ষিণ স্টেশনসহ বিভিন্ন স্থানে পরিচ্ছন্নতা অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে। এ ছাড়া বিডি ক্লিন কক্সবাজার জেলা টিমের সঙ্গে যৌথভাবে কক্সবাজার সরকারি কলেজের পুকুর পরিচ্ছন্নতা অভিযান, পরিবেশ অধিদপ্তরের সহযোগিতায় সমুদ্রসৈকত পরিচ্ছন্নতা কর্মসূচি এবং টেকনাফে প্রায় ৬০ জন স্বেচ্ছাসেবকের অংশগ্রহণে একটি পরিচ্ছন্নতা মেগা ইভেন্টেও অংশ নেয় টিমটি। এ ছাড়া প্রধানমন্ত্রীর সম্প্রতি কক্সবাজার সফর উপলক্ষে উপজেলা প্রশাসনের সহযোগিতায় রেলস্টেশন থেকে জেলগেট পর্যন্ত পরিচ্ছন্নতা ও বর্জ্য অপসারণ কর্মসূচিতেও অংশগ্রহণ করে তারা।

বিভিন্ন কর্মসূচির মাধ্যমে গত এক বছরে আনুমানিক ৮০ টন বর্জ্য অপসারণ করেছে বিডি ক্লিন উখিয়া টিম। সংগঠনটির সদস্যদের মতে, এসব অভিযানের ফলে স্থানীয় মানুষের মধ্যে পরিচ্ছন্নতা বিষয়ে সচেতনতা আগের তুলনায় বেড়েছে এবং অনেকেই নিজের আশপাশ পরিষ্কার রাখার বিষয়ে আগ্রহ দেখাচ্ছেন। কার্যক্রম বাস্তবায়নে উখিয়া উপজেলা প্রশাসন, জেলা প্রশাসন, পরিবেশ অধিদপ্তর, বিভিন্ন উন্নয়ন সংস্থা এবং বিডি ক্লিন কক্সবাজার জেলা টিমের সহযোগিতা পেয়েছে সংগঠনটি। প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয়ের কারণে বড় পরিসরে কয়েকটি কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়েছে। তবে এই পথচলা পুরোপুরি বাধাহীন ছিল না। উখিয়ার মতো দ্রুত বর্ধনশীল ও জনবহুল এলাকায় পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম পরিচালনায় সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে স্থায়ী ও পরিকল্পিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনার অভাব। পরিচ্ছন্নতা অভিযান শেষে সংগৃহীত বর্জ্য কোথায় ফেলা হবে, তা নিয়ে প্রায়ই সমস্যায় পড়তে হয় স্বেচ্ছাসেবকদের। ফলে একটি এলাকা পরিষ্কার করার পরও বর্জ্য ব্যবস্থাপনার সীমাবদ্ধতার কারণে সেই উদ্যোগের সুফল দীর্ঘস্থায়ী হয় না। সংগঠনের সদস্যদের ভাষ্য, উখিয়ায় একটি আধুনিক ডাম্পিং স্টেশন না থাকায় একই এলাকায় বারবার পরিচ্ছন্নতা অভিযান চালাতে হচ্ছে। নির্ধারিত স্থানে বর্জ্য ফেলার সুযোগ সীমিত হওয়ায় সংগ্রহ করা বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় অতিরিক্ত সময় ও শ্রম ব্যয় করতে হয়।

এ সমস্যা সমাধানের লক্ষ্যে স্থানীয় সংসদ সদস্য শাহজাহান চৌধুরীর কাছে একটি স্মারকলিপি দেওয়া হয়। পরে বিষয়টি তৎকালীন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রিফাত আসমার কাছেও পাঠানো হয়। তবে এখনও স্থায়ী ডাম্পিং স্টেশন বা সমন্বিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনার কোনো উদ্যোগ বাস্তবায়িত হয়নি। উখিয়ার কয়েকটি এলাকায় সীমিত পরিসরে বর্জ্য ফেলার ব্যবস্থা থাকলেও বাজার কর্তৃপক্ষ ও অনেক ব্যবসায়ী তা নিয়মিত ব্যবহার করেন না। ফলে বাজার, সড়কের পাশ, খাল-নালা ও উন্মুক্ত স্থানে যত্রতত্র বর্জ্য ফেলার প্রবণতা রয়ে গেছে। স্থানীয়দের মতে, নিয়মিত তদারকি ও কার্যকর ব্যবস্থাপনার অভাবে সমস্যাটি দীর্ঘদিন ধরে চলমান। একই চিত্র দেখা যায় অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও। পর্যাপ্ত ডাস্টবিনের অভাবে শিক্ষার্থীদের মধ্যে পরিচ্ছন্নতার অভ্যাস গড়ে তোলার ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধতা তৈরি হচ্ছে। সংগঠনের সদস্যরা মনে করেন, বিদ্যালয় পর্যায় থেকেই পরিচ্ছন্নতা ও পরিবেশ সচেতনতার চর্চা শুরু করা গেলে দীর্ঘমেয়াদে এর ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।

পরিবেশ সচেতন ব্যক্তিদের মতে, শুধু বর্জ্য সংগ্রহ করলেই সমস্যার সমাধান হয় না; প্রয়োজন পরিবেশসম্মত ব্যবস্থাপনা। কিন্তু উখিয়ার বিভিন্ন এলাকায় এখনো বর্জ্য আগুনে পুড়িয়ে অপসারণের প্রবণতা রয়েছে। এতে বায়ুদূষণের পাশাপাশি জনস্বাস্থ্যও ঝুঁকির মুখে পড়ে। তাই আধুনিক ও পরিবেশবান্ধব বর্জ্য ব্যবস্থাপনা চালুর ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন তারা। বিডি ক্লিন উখিয়া টিমের উপদেষ্টা ও উখিয়া প্রেস ক্লাবের সভাপতি সাঈদ মুহাম্মদ আনোয়ার বলেন, যুবসমাজকে জনকল্যাণমূলক কাজে সম্পৃক্ত করার একটি কার্যকর প্ল্যাটফর্ম হিসেবে বিডি ক্লিন কাজ করছে। স্বেচ্ছাশ্রমের মাধ্যমে সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তন আনা সম্ভব- গত এক বছরের কার্যক্রম তারই প্রমাণ। এই উদ্যোগকে আরও টেকসই করতে প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষের সহযোগিতা প্রয়োজন।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) পান্না আক্তার বলেন, পরিচ্ছন্নতা কোনো একদিনের কর্মসূচি নয়, এটি একটি নাগরিক দায়িত্ব। আমরা চাই মানুষ শুধু অভিযানে অংশ নেবে না, বরং নিজের বাসা, কর্মস্থল ও আশপাশের পরিবেশ পরিষ্কার রাখাকে দৈনন্দিন অভ্যাসে পরিণত করবে। গত এক বছরে পরিচালিত কার্যক্রমের মাধ্যমে বিডি ক্লিন উখিয়া টিম শুধু বর্জ্য অপসারণই করেনি, পরিচ্ছন্নতা বিষয়ে সামাজিক সচেতনতা তৈরিতেও ভূমিকা রেখেছে। বিভিন্ন অভিযানে স্থানীয় বাসিন্দা, শিক্ষার্থী, ব্যবসায়ী ও পথচারীদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ সংগঠনটির কার্যক্রমকে আরও উৎসাহিত করেছে।

বিডি ক্লিন উখিয়া টিমের সদস্যদের বিশ্বাস, পরিচ্ছন্ন বাংলাদেশ গড়ে তুলতে শুধু স্বেচ্ছাসেবীদের উদ্যোগ যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি, বাজার কমিটি, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, সামাজিক সংগঠন এবং সাধারণ মানুষের সম্মিলিত অংশগ্রহণ। প্রতিটি বাজার ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পর্যাপ্ত ডাস্টবিন স্থাপন, আধুনিক ডাম্পিং স্টেশন নির্মাণ, নিয়মিত বর্জ্য সংগ্রহ এবং পরিবেশসম্মত ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা গেলে উখিয়াকে আরও পরিচ্ছন্ন ও বাসযোগ্য জনপদে পরিণত করা সম্ভব। মাত্র এক বছরের পথচলায় বিডি ক্লিন উখিয়া টিম দেখিয়েছে, সামাজিক দায়বদ্ধতা ও স্বেচ্ছাশ্রমের সমন্বয়ে ছোট একটি উদ্যোগও জনসচেতনতা তৈরিতে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। পরিচ্ছন্নতার এই উদ্যোগ এখন ধীরে ধীরে একটি সামাজিক আন্দোলনের রূপ নিচ্ছে। সেই আন্দোলনকে আরও এগিয়ে নিতে প্রয়োজন নাগরিক সচেতনতা, পরিকল্পিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং প্রশাসনের ধারাবাহিক সহযোগিতা। তখনই ‘পরিচ্ছন্নতা শুরু হোক আমার থেকে’ স্লোগানটি শুধু প্রচারণায় নয়, মানুষের দৈনন্দিন আচরণেও প্রতিফলিত হবে।