চট্টগ্রাম বন্দরের সক্ষমতা বৃদ্ধিতে নতুন উদ্যোগ

প্রকাশ : ০২ আগস্ট ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  তামীম রহমান, চট্টগ্রাম

চট্টগ্রাম বন্দরে কন্টেইনার হ্যান্ডিলিংয়ে লক্ষ্য মাত্রা অর্জনে বন্দর কর্তৃপক্ষ রেকর্ড সৃষ্টি করেছে। কন্টেইনার হ্যান্ডেলিং এর এ লক্ষ্য মাত্রা সামনে আরও বৃদ্ধি পাবে। যার বেশিরভাগই বন্দরের অবকাঠামোগত সক্ষমতার বৃদ্ধির উপর নির্ভর করছে। তারই অংশ হিসেবে ও চট্টগ্রাম বন্দরের চাপ কমাতে খালি কনটেইনার বন্দর ও অফডকের মত বন্ডেড এরিয়া থেকে সরিয়ে ‘নন বন্ডেড’ এলাকায় সরিয়ে নিতে চায় বন্দর কর্তৃপক্ষ। এ বিষয়ে অনুমতি চেয়ে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড-এনবিআরকে চিঠি দিয়েছে বন্দর কর্তৃপক্ষ। এনবিআরের অনুমতি পেলে বন্দরের ইয়ার্ডগুলো থেকে খালি কনটেইনার সরিয়ে নেওয়া সম্ভব হবে। এতে বন্দর পরিচালনার কার্যক্রমে আরো গতি আসবে এবং ব্যবহারকারীদের সেবা দেওয়াও সহজ হবে বলে দাবি করছে বন্দর। তবে ধারণক্ষমতার তুলনায় এখনো অফডকগুলোতে কনটেইনার কম থাকার কথা তুলে ধরে অফডক মালিকরা বলছেন, বন্ডেড এরিয়ার’ বাইরে খালি কনটেইনার রাখার অনুমতি দিলে সেগুলোর ব্যবস্থাপনা ও রাজস্ব আদায়ে ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে।খালি কনটেইনার ‘বন্ডেড এরিয়ার’ (কাস্টমসের ব্যবস্থাপনায় থাকা সংরক্ষিত স্থান) বাইরে সরিয়ে নিতে গত ২৬ জুলাই এনবিআরকে চিঠি দিয়েছে চট্টগ্রাম বন্দর।বন্দরের জেটি এবং বেসরকারি অফডকগুলো ‘বন্ডেড এরিয়া’ হিসেবে চিহ্নিত। আর আমদানি পণ্যবাহী খালি কনটেইনার একটি বন্ডেড আইটেম (যেসব পণ্যের শুল্ক নির্দিষ্ট সময়সীমা পর্যন্ত স্থগিত থাকে)। এনবিআরকে দেওয়া চিঠিতে বলা হয়, চট্টগ্রাম বন্দরের অভ্যন্তরে আমদানিকৃত সকল এলসিএল কনটেইনার (একাধিক আমদানিকারকের পণ্য ভর্তি কনটেইনার) ‘আনস্টাফিং’সহ ৭০ শতাংশ এফসিএল (একক আমদানিকারকের পণ্য ভর্তি) কনটেইনার খুলে ডেলিভারি দেওয়া হয়। ফলে প্রতিদিনই বিপুল পরিমাণ কনটেইনার খালি হয়। এসব খালি কনটেইনার জাহাজে তোলার জন্য অথবা ডিপোগুলোতে পাঠানোর জন্য বন্দরে অপেক্ষমাণ থাকে। প্রতিদিন যে পরিমাণ কনটেইনার খালি হয় সে পরিমাণ জাহাজীকরণ বা ডিপোতে পাঠানো সম্ভব হয় না বলে বন্দরের অভ্যন্তরে স্তূপ হয়ে থাকে। এতে বন্দরের অপারেশনাল কাজে জটিলতা সৃষ্টি হয় এবং অফডকগুলোতেও এফসিএল কনটেইনার খালি হলে সেগুলোও সেখানে জমতে থাকে বলে চিঠিতে তুলে ধরে বন্দর কর্তৃপক্ষ। বৃহস্পতিবার (৩০ জুলাই) চট্টগ্রাম বন্দরের ওয়েবসাইটের তথ্যে দেখা যায়, ৫৯ হাজার কনটেইনার ধারণক্ষমতার বিপরীতে বন্দরের ইয়ার্ডগুলোতে জমা ছিল ৪৬ হাজার ২৩৮টি কনটেইনার। এর মধ্যে প্রায় ৩ হাজার খালি কনটেইনার বলে বন্দর সচিব সৈয়দ রেফায়েত হামিম জানিয়েছেন। তিনি জানান, খালি কনটেইনারগুলোতে যেহেতু কোনো পণ্য থাকে না, তাই যদি আমরা সেগুলো বন্ডেড এরিয়ার বাইরে রাখার অনুমতি পাই, তাহলে বন্দরের অভ্যন্তরে বন্ডেড এরিয়ার সক্ষমতা আরো বৃদ্ধি পাবে। ফলে বর্তমান ইয়ার্ড সুবিধা ব্যবহার করেই আরো বেশি পরিমাণ আমদানি-রপ্তানি পণ্যবাহী কনটেইনার বন্দরে সংরক্ষণ করতে পারব।প্রতিদিনই বন্দরের জেটিতে নতুন করে কিছু খালি কনটেইনার জমে এবং আগে থেকে থাকা কিছু খালি কনটেইনার ডিপোতে চলে যায়। সে হিসেবে দিনে গড়ে আড়াই থেকে ৩ হাজার খালি কনটেইনার বন্দরের জেটিতে থেকে যায়। ২৬ জুলাই এ বিষয়ে এনবিআরকে চিঠি দিয়েছি। এটি নীতিগত বিষয়। এখনো কোনো নির্দেশনা পাইনি। আশা করি নির্দেশনা পাব। একই দাবি তুলে ধরে বৃহস্পতিবার চিটাগাং চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি মোহাম্মদ আমিরুল হক অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীকে একটি চিঠি দিয়েছেন। ‘নন-বন্ডেড’ এলাকায় খালি কনটেইনার সংরক্ষণের অনুমতি দেওয়ার অনুরোধ করে আমিরুল হকের ওই চিঠিতে বলা হয়, “দেশের আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যের প্রায় ৯০ শতাংশ কার্যক্রম এই বন্দরের মাধ্যমে পরিচালিত হয়। কিন্তু বর্তমানে খালি কনটেইনার সংরক্ষণজনিত প্রচন্ড চাপের কারণে চট্টগ্রাম বন্দরের উৎপাদনশীলতা প্রত্যাশিত পর্যায়ে উন্নীত হচ্ছে না। অপ্রয়োজনীয়ভাবে বন্দর ও বেসরকারি ডিপোগুলোতে খালি কনটেইনার জমা হওয়ার কারণে ইয়ার্ডের ধারণক্ষমতার ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করছে। চিঠিতে বলা হয়, বাংলাদেশের আমদানি ও রপ্তানি বাণিজ্যের ‘কাঠামোগত ভারসাম্যহীনতার’ কারণে বিপুল খালি কনটেইনার দীর্ঘ সময় ধরে সংরক্ষণ করতে হয়। বিশেষ করে ২০ ফুট দৈর্ঘ্যের কনটেইনারের তুলনায় ৪০ ফুট দৈর্ঘ্যের কনটেইনারের চাহিদা বেশি থাকায় উল্লেখযোগ্য সংখ্যক ২০ ফুট খালি কনটেইনার দীর্ঘ সময় অব্যবহৃত অবস্থায় থাকে। এছাড়া প্রাকৃতিক দুর্যোগ, অতিবৃষ্টি, শ্রমিক কর্মবিরতি কিংবা অন্যান্য অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতিতে কনটেইনার ডেলিভারি ব্যাহত হলে বন্দরের উপর কনটেইনারের চাপ আরো বৃদ্ধি পায় এবং সার্বিক অপারেশনাল কার্যক্রম দারুণভাবে ব্যাহত হয়। আমিরুল হক বলেন, “বিশ্বের বিভিন্ন সমুদ্রবন্দর এমনকি প্রতিবেশী দেশের বন্দরগুলোতেও এ ধরনের ব্যবস্থা বিদ্যমান, যা বন্দর ব্যবস্থাপনায় ইতিবাচক হিসেবে প্রতীয়মান। তাই বাংলাদেশেও এরূপ অনুমোদন প্রদান করা হলে দেশের বৈদেশিক বাণিজ্যের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা আরো বৃদ্ধি পাবে এবং সামগ্রিক লজিস্টিক ব্যবস্থার উন্নয়ন ঘটবে বলে মনে করি। তবে এ বিষয়ে বাংলাদেশ ইনল্যান্ড কনটেইনার ডিপো অ্যাসোসিয়েশনের (বিকডা) মহাসচিব রুহুল আমিন শিকদার বলেছেন, এনবিআরকে চিঠি দেওয়ার আগে তাদের মতামত নেয়নি বন্দর কর্তৃপক্ষ। তিনি বলেন, অফডকগুলোতে কনটেইনার ধারণক্ষমতা মোট ১ লাখ ৬ হাজার। আজ (বৃহস্পতিবার) কনটেইনার আছে প্রায় ৭৮ হাজারের মত। তাহলে আমাদের ধারণক্ষমতার তুলনায় অনেক জায়গা খালি আছে। অফডকগুলোতে মোট খালি কনটেইনার আছে আজ ৫৬ হাজারের মত। আমরা বন্দরকে বলিনি যে, আমাদের স্থান সংকুলান হচ্ছে না। আমাদের সক্ষমতা অনুসারে এখনো যথেষ্ট খালি জায়গা আছে। তিনি বলেন, এটা ঠিক যে, বন্দরের ভেতরে থাকা খালি কনটেইনার সেখান থেকে সরিয়ে নিতে পারলে তাদের অপারেশনাল কার্যক্রমের জন্য সুবিধা হবে। কিন্তু নন বন্ডেড এরিয়াতে খালি কনটেইনার রাখা হলে সেই এরিয়াগুলোর নাম কী হবে? খালি কনটেইনার একটি বন্ডেড আইটেম। এমন না যে সেগুলোর কোনো শুল্ক নেই। শুল্ক আছে। যদি ১৮০ দিনের মধ্যে শিপিং লাইন বাংলাদেশ থেকে তাদের আনা কনটেইনার নিয়ে না যায়, সেক্ষেত্রে ধার্য শুল্ক কার্যকর হবে। এখন যদি নন বন্ডেড এরিয়াতে নিয়ে বন্ডেড আইটেম খালি কনটেইনারগুলো রাখি, তাহলে কাস্টমস কীভাবে ব্যবস্থাপনা করবে?” রুহুল আমিন শিকদার বলেন, কাস্টমসের নজরদারি না থাকলে কেউ যদি এসব কনটেইনার নিয়ে বিক্রি করে দেয় তাহলে সরকার রাজস্ব হারাবে। দেখা যাক এসব বিষয় বিবেচনায় নিয়ে এনবিআর কী নির্দেশনা দেয়। বর্তমানে খালি কনটেইনারের ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব মূলত শিপিং এজেন্ট বা মেইন লাইন অপারেটরদের। তবে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের বিধি অনুযায়ী, এসব খালি কনটেইনার দেশের ভেতরে বন্ড ফ্যাসিলিটি ছাড়া কোনো স্থানে স্থানান্তর বা সংরক্ষণের সুযোগ নেই। বিশ্বের বিভিন্ন দেশেও সংশ্লিষ্ট শিপিং এজেন্ট বা মেইন লাইন অপারেটররা খালি কনটেইনার বন্ড সুবিধা ছাড়া তাদের ব্যবস্থাপনায় যেকোনো উপযুক্ত স্থানে সংরক্ষণ করতে পারে বলে বন্দরের চিঠিতে তুলে ধরা হয়।