পড়াশোনার পাশাপাশি ব্যবসা, উদ্যোক্তা হওয়ার গল্প
প্রকাশ : ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ
ছাকিবুল ইসলাম আকিব, চবি

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের (চবি) ক্যাম্পাসে হাঁটতে গেলেই চোখে পড়ে ছোট ছোট নানা ধরনের স্টল। কোথাও পোশাক ও অ্যাকসেসরিজ, কোথাও খাবার, আবার কোথাও বিক্রি হচ্ছে শিক্ষার্থীদের নিজেদের তৈরি পণ্য। এসব উদ্যোগের বড় একটি অংশের উদ্যোক্তা বিশ্ববিদ্যালয়েরই শিক্ষার্থী। ক্লাস, পড়াশোনা ও অন্যান্য ব্যস্ততার ফাঁকে ক্যাম্পাসেই নিজেদের ছোট ব্যবসা পরিচালনা করছেন তারা।
একসময় পড়াশোনার পাশাপাশি আয়ের জন্য শিক্ষার্থীদের প্রধান ভরসা ছিল টিউশন। এখন সেই চিত্রে কিছুটা পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। টিউশনের পাশাপাশি কিংবা টিউশনের বিকল্প হিসেবে অনেক শিক্ষার্থী বেছে নিচ্ছেন ছোট পরিসরের ব্যবসা। এতে একদিকে যেমন আয় হচ্ছে, অন্যদিকে ব্যবসার বাস্তব অভিজ্ঞতাও অর্জন করছেন তারা।
চারুকলা বিভাগের শিক্ষার্থী ফারজান বিনতে মতিনের কাছে ব্যবসার সবচেয়ে বড় আকর্ষণ স্বাধীনতা। তিনি বলেন, টিউশনে সময়ের স্বাধীনতা কম থাকলেও ব্যবসায় নিজের সুবিধামতো সময় দেওয়া যায়। কখন কাজ করবেন, কতটা সময় দেবেন—অনেকটাই নিজের মতো করে ঠিক করা যায়। তার ভাষ্য, কখনও কখনও টিউশনের এক মাসের আয়ের সমান অর্থ এক দিনেই ব্যবসা থেকে আয় করা সম্ভব হয়।
শুধু আয় নয়, নিজের সিদ্ধান্তে কাজ করার সুযোগও শিক্ষার্থীদের ব্যবসার দিকে টানছে। আরবি বিভাগের শিক্ষার্থী সাকিব উল্লাহ বলেন, তিনি অন্যের খবরদারির মধ্যে কাজ করতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন না। স্বাধীনভাবে কাজ করতে পছন্দ করেন বলেই ব্যবসায় এসেছেন।
এই স্বাধীনতার পাশাপাশি রয়েছে নিজের ভবিষ্যৎ গড়ার স্বপ্ন। শিক্ষার্থীদের অনেকেই মনে করছেন, ক্যাম্পাসের ছোট উদ্যোগ একসময় বড় ব্যবসার ভিত্তি হতে পারে। এখন যে পণ্য কয়েকজন সহপাঠীর কাছে বিক্রি হচ্ছে, ভবিষ্যতে সেটিই হয়তো একটি প্রতিষ্ঠিত ব্র্যান্ডে রূপ নিতে পারে।
তবে ক্যাম্পাসে ব্যবসা পরিচালনা করতে গিয়ে নানা ধরনের সীমাবদ্ধতার কথাও বলছেন উদ্যোক্তারা। ইংরেজি বিভাগের শিক্ষার্থী আহমেদ সিদ্দিকী হাসনাত বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাছে ব্যবসায়ী শিক্ষার্থীদের জন্য একটি নির্দিষ্ট জায়গা বরাদ্দের দাবি জানান। তার মতে, নির্দিষ্ট জায়গা থাকলে শিক্ষার্থীরা আরও শান্তিপূর্ণ ও সুশৃঙ্খলভাবে ব্যবসা পরিচালনা করতে পারবেন এবং নিজেদের পায়ে দাঁড়ানোর সুযোগ পাবেন। ক্যাম্পাসের এসব ছোট উদ্যোগ শিক্ষার্থীদের শুধু আয় করার সুযোগই দিচ্ছে না, শেখাচ্ছে ব্যবসার নানা দিকও। পণ্য নির্বাচন থেকে শুরু করে ক্রেতার চাহিদা বোঝা, পণ্যের দাম নির্ধারণ, হিসাব রাখা, লাভ-ক্ষতি নির্ণয় এবং ক্রেতার সঙ্গে যোগাযোগ— সবকিছুই শিখছেন তারা বাস্তব অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে। ক্যাম্পাসের ক্রেতাদের কাছেও এসব স্টলের আলাদা আকর্ষণ রয়েছে। ইংরেজি বিভাগের শিক্ষার্থী মোহাম্মদ সাখাওয়াত হোসেন সৈকত বলেন, শিক্ষার্থীদের উদ্যোগে পরিচালিত স্টলগুলোতে বিভিন্ন ধরনের পণ্য পাওয়া যায়। বিশেষ করে কিছু খাবারের স্টল শিক্ষার্থীদের মধ্যে বেশ জনপ্রিয়। তাদের কাছ থেকে নিজেদের পছন্দের পণ্য পাওয়ার সুযোগ রয়েছে বলে জানান তিনি।
তবে সব উদ্যোগের অভিজ্ঞতা একরকম নয়। ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের শিক্ষার্থী সাদিয়া ইসলাম স্নিগ্ধার মতে, কিছু পণ্যের মান মোটামুটি ভালো হলেও কিছু খাবারের মান তার কাছে সন্তোষজনক নয়। এ ছাড়া কিছু পণ্যের দাম তুলনামূলক বেশি হওয়ায় শিক্ষার্থীদের জন্য তা কিছুটা ব্যয়বহুল হয়ে পড়ে। ফলে প্রয়োজনীয় কিছু পণ্যের জন্য এখনো শহরমুখী হতে হয় শিক্ষার্থীদের।
তারপরও ক্যাম্পাসে গড়ে ওঠা এসব ছোট ব্যবসা শিক্ষার্থীদের মধ্যে নতুন এক সম্ভাবনার দরজা খুলে দিচ্ছে। কেউ নিজের পড়াশোনার খরচ মেটাতে আয় করছেন, কেউ আবার ভবিষ্যতের বড় ব্যবসার জন্য অভিজ্ঞতা ও পুঁজি তৈরি করছেন। ছোট উদ্যোগের আয় থেকে একটি অংশ জমিয়ে ভবিষ্যতে ব্যবসার পরিধি বাড়ানোর পরিকল্পনাও করছেন কেউ কেউ। বিশ্ববিদ্যালয় শুধু শ্রেণিকক্ষের পাঠের জায়গা নয়— বাস্তব জীবন ও কর্মজগতের প্রস্তুতিরও জায়গা। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের এসব ছোট স্টল সেই বাস্তব শিক্ষারই এক ভিন্ন উদাহরণ। এখানে শিক্ষার্থীরা শুধু পণ্য বিক্রি করছেন না; শিখছেন উদ্যোক্তা হওয়ার কৌশল, নিজের সিদ্ধান্তে কাজ করার সাহস এবং ভবিষ্যতের জন্য স্বনির্ভর হওয়ার পথ।
ক্যাম্পাসের এক কোণে দাঁড়িয়ে থাকা ছোট একটি স্টল তাই নিছক কেনাবেচার জায়গা নয়। কারও কাছে এটি পড়াশোনার খরচ জোগানোর মাধ্যম, কারও কাছে স্বাধীনভাবে আয় করার সুযোগ, আবার কারও কাছে ভবিষ্যতের বড় স্বপ্নের প্রথম ধাপ। টিউশনের চেনা পথের বাইরে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের এই ছোট ছোট উদ্যোগই হয়তো একদিন তাদের বড় উদ্যোক্তা হওয়ার গল্পের সূচনা হয়ে থাকবে।
