পতেঙ্গা টার্মিনালে কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ে নতুন রেকর্ড
প্রকাশ : ২৫ অক্টোবর ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ
তামীম রহমান, চট্টগ্রাম

চট্টগ্রাম বন্দরের পতেঙ্গা কনটেইনার টার্মিনালে (পিসিটি) জাহাজ পরিচালনায় উৎপাদনশীলতার নতুন রেকর্ড গড়েছে সৌদি আরবভিত্তিক অপারেটর আরএসজিটি (রেড সি গেটওয়ে টার্মিনাল) বাংলাদেশ। পতেঙ্গা কনটেইনার টার্মিনালে সিএমএ সিজিএম-এর একটি জাহাজ থেকে কনটেইনার ওঠানামার সময় ঘণ্টায় সর্বোচ্চ ৫৮টি কনটেইনার এবং ৮২ টিইইউ (টোয়েন্টি-ফুট ইকুইভ্যালেন্ট ইউনিট) পরিমানের কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ের নতুন রেকর্ড গড়েছে আরএসজিটি বাংলাদেশ। ফরাসি জাহাজ পরিচালনা প্রতিষ্ঠান সিএমএ-সিজিএমের জাহাজ এমভি আমুরো (MV AMOUREUX) পরিচালনাকালে ঘণ্টায় সর্বোচ্চ ৭২ মুভ ও ১২২ টিইইউস হ্যান্ডলিংয়ের সক্ষমতা অর্জন করেছে প্রতিষ্ঠানটি। গত ১৮ অক্টোবরের জাহাজ পরিচালনা কার্যক্রমে মাত্র ২১ ঘণ্টায় ২ হাজার ৫৭১ টিইইউস কনটেইনার হ্যান্ডলিং করা হয়। প্রতিষ্ঠানটির মতে, এটি দেশের বন্দর উৎপাদনে এক নতুন মানদণ্ড স্থাপন করেছে।
গত ১০ সেপ্টেম্বর পতেঙ্গা টার্মিনালে প্রথমবারের মতো ক্রেনবিহীন জাহাজ (গিয়ারলেস ভেসেল) 'এমভি ওয়ানেন'-এ নতুন চালু হওয়া শিপ-টু-শোর (এসটিএস) ক্রেন ব্যবহার করে কনটেইনার ওঠানামার সময় এই উৎপাদনশীলতা অর্জিত হয় বলে জানিয়েছে আরএসজিটি বাংলাদেশ। প্রতিষ্ঠানটি জানায়, এই অর্জন চট্টগ্রাম বন্দরের অতীতের গড় উৎপাদনশীলতার প্রায় দ্বিগুণ। এর আগে, চট্টগ্রাম বন্দরে কনটেইনারবাহী জাহাজে ঘণ্টায় গড়ে প্রায় ৩০টি কনটেইনার বা ৪৮ টিইইউ ওঠানামা করা হতো। এই অর্জন টার্মিনালের আধুনিক সরঞ্জাম, দক্ষ পরিচালন দল এবং সমন্বিত টার্মিনাল ব্যবস্থাপনার ক্রমবর্ধমান সক্ষমতার প্রতিফলন বলে দাবি অপারেটর প্রতিষ্ঠান আরএসজিটির। এর আগে, ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর মাসে ঘণ্টায় ৫৮ মুভ ও ৮২ টিইইউ হ্যান্ডলিংয়ের রেকর্ড করেছিল প্রতিষ্ঠানটি। ২০২৬ সালের আগস্টে পিসিটিতে শিপ-টু-শোর (এসটিএস) ক্রেন কার্যক্রম চালুর পর এটিই ছিল আগের সর্বোচ্চ উৎপাদনশীলতার মাইলফলক। এমভি আমুরো পরিচালনাকালে আরএসজিটি বাংলাদেশের পরিচালনগত সাফল্যের প্রশংসা করেছে সিএমএ-সিজিএম কর্তৃপক্ষ।
এই সাফল্যের মধ্য দিয়ে পরিচালন দক্ষতা বৃদ্ধি, জাহাজের টার্নঅ্যারাউন্ড সময় কমানো এবং বাংলাদেশের মেরিটাইম খাতে আন্তর্জাতিক মানের কনটেইনার টার্মিনাল পরিচালনা নিশ্চিত করার প্রতি আরএসজিটি বাংলাদেশের ধারাবাহিক অঙ্গীকার আরও দৃঢ? হয়েছে বলে জানিয়েছে আরএসজিটি। আরএসজিটি বাংলাদেশের প্রধান পরিচালন কর্মকর্তা নাবিল ইউসুফ বলেন, বাংলাদেশের প্রথম আন্তর্জাতিক কনটেইনার টার্মিনাল অপারেটর হিসেবে আরএসজিটি বাংলাদেশ পরিচালনগত উৎকর্ষ নিশ্চিত করা, দেশের বন্দর অবকাঠামোর প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং বৈশ্বিক শিপিং লাইন ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ক্রমবর্ধমান চাহিদা পূরণে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
আমাদের প্রতি সংশ্লিষ্ট সবার আস্থা ও বিশ্বাসকে আরএসজিটি বাংলাদেশ গভীরভাবে মূল্যায়ন করে। তিনি আরও বলেন, পরিচালন দক্ষতার নতুন মানদণ্ড প্রতিষ্ঠা, সর্বোচ্চ বৈশ্বিক মান বজায় রাখা এবং টেকসই প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করার অঙ্গীকারে আমরা অবিচল। এর মাধ্যমে বৈশ্বিক মেরিটাইম শিল্পে বাংলাদেশের অবস্থান আরও শক্তিশালী করতে আমরা কাজ করে যাচ্ছি। এক বিবৃতিতে আরএসজিটি বাংলাদেশের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) এরউইন হাযে বলেন, ঘণ্টায় ৫৮টি মুভ বা ৮২ টিইইউ অর্জনের এই সাফল্য শুধু উৎপাদনশীলতার কোনো সাধারণ অর্জন নয়; এটি বাংলাদেশে আধুনিক বন্দর ব্যবস্থাপনার অপার সম্ভাবনাকে তুলে ধরে। তিনি আরও বলেন, প্রযুক্তির সংযোজন, আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা, সুশৃঙ্খল পরিচালন পদ্ধতি এবং একটি দক্ষ জনবলের যৌথ প্রয়াসেই এই মাইলফলক অর্জিত হয়েছে। হাযে বলেন, আমরা আমাদের পরিচালনাগত মানকে ক্রমাগত উন্নত করতে এবং গ্রাহক ও অংশীদারদের নিরাপদ, দক্ষ ও নির্ভরযোগ্য সেবা প্রদান অব্যাহত রাখতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। প্রতিষ্ঠানটি জানায়, এই উৎপাদনশীলতা অর্জনের পেছনে প্রধান ভূমিকা পালন করেছে নতুন এসটিএস ক্রেন স্থাপন। নিজের ক্রেন রয়েছে এমন জাহাজের (গিয়ার্ড ভেসেল) মতো নয়, বরং ক্রেনবিহীন কনটেইনার জাহাজগুলোতে পণ্য ওঠানামার জন্য পুরোপুরি বন্দরের তীরের ক্রেনের ওপর নির্ভর করতে হয়।
এই নতুন সরঞ্জাম ব্যবহারের ফলে টার্মিনালটি আগের চেয়ে অনেক বেশি দক্ষতার সঙ্গে বড় আকারের কনটেইনার হ্যান্ডেল করতে পারবে এবং জাহাজে থাকা নিজস্ব সরঞ্জামের ওপর নির্ভরতা কমাবে। দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর চট্টগ্রাম বন্দরের সক্ষমতা বাড়াতে এবং কার্যক্ষমতা উন্নত করার প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে নির্মিত পতেঙ্গা কনটেইনার টার্মিনাল পরিচালনা করছে আরএসজিটি বাংলাদেশ। এটি দেশের অন্যতম নতুন কনটেইনার হ্যান্ডলিং সুবিধাসম্পন্ন টার্মিনাল। তবে, সাম্প্রতিক এই পরিসংখ্যানটি নির্দিষ্ট একটি জাহাজে কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ের সময় অর্জিত হয়েছে। তাই এটিকে টার্মিনালটির ধারাবাহিক গড় পারফরম্যান্স হিসেবে বিবেচনা করা নাও যেতে পার। আরএসজিটি বাংলাদেশ জানিয়েছে, এই অর্জন পতেঙ্গা কনটেইনার টার্মিনালকে আরও দক্ষ ও বিশ্বজুড়ে সংযুক্ত একটি সামুদ্রিক প্রবেশদ্বার হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনার পথকে শক্তিশালী করেছে। বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান বাণিজ্যকে সহায়তা দিতে অবকাঠামো, প্রযুক্তি, পরিচালন পদ্ধতি এবং জনবল উন্নয়নে বিনিয়োগ অব্যাহত রাখবে প্রতিষ্ঠানটি।
