চসিককে বছরে ২২৪ কোটি টাকা গৃহকর দেবে বন্দর

প্রকাশ : ০৮ নভেম্বর ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  তামীম রহমান, চট্টগ্রাম

চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের (চসিক) কোষাগারে বছরে ২২৪ কোটি ৭০ লাখ ৫৩ হাজার ৯৩৭ টাকা গৃহকর দিতে হবে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষকে (চবক)। গৃহকর নির্ধারণ নিয়ে দুই প্রতিষ্ঠানের দীর্ঘদিনের বিরোধের অবসান ঘটিয়ে গত সোমবার আপিলের চূড়ান্ত রায় দিয়েছেন বিভাগীয় কমিশনার কার্যালয়ের স্থানীয় সরকার বিভাগের পরিচালক মনোয়ারা বেগম।

রায় অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছর থেকে এ হারে গৃহকর পরিশোধ করতে হবে বন্দর কর্তৃপক্ষকে। এর আগে যৌথ জরিপের ভিত্তিতে চসিক বন্দরের বার্ষিক গৃহকর ২৬৪ কোটি ৩৫ লাখ ৯২ হাজার ৮৬৮ টাকা নির্ধারণ করেছিল। আপিল নিষ্পত্তির পর নির্ধারিত গৃহকরের পরিমাণ প্রায় ১৫ শতাংশ কমিয়ে ২২৪ কোটি ৭০ লাখ টাকা করা হয়েছে। চসিক প্রশাসক ডা. শাহাদাত হোসেন বলেন, বন্দরের কাছ থেকে এই রাজস্ব আদায় চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের জন্য বড় অর্জন। দায়িত্ব নেওয়ার সময় সংস্থাটির ৫১৩ কোটি টাকা ঋণ ছিল। বিভিন্ন ঋণ পরিশোধ ও অন্যান্য ব্যয় মেটানোর পর বর্তমানে চসিকের কোষাগারে শতকোটি টাকার বেশি উদ্বৃত্ত রয়েছে।

তিনি আরও বলেন, চট্টগ্রামের ইতিহাসে একক কোনো প্রতিষ্ঠান থেকে এত বড় অঙ্কের রাজস্ব পাওয়ার ঘটনা উল্লেখযোগ্য।

দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই বন্দরের কাছ থেকে ন্যায্য গৃহকর আদায়ে কাজ করছি। পুনর্মূল্যায়নের মাধ্যমে বন্দরের সব স্থাপনা বিবেচনায় নিয়ে ২৬৪ কোটি টাকা গৃহকর নির্ধারণ করা হয়। বন্দর কর্তৃপক্ষ আপিল করার পর বিভাগীয় কমিশনারের আদালত ১৫ শতাংশ কমিয়ে ২২৪ কোটি টাকা নির্ধারণ করেছেন। তিনি বলেন, দুই বছর আগে দায়িত্ব নেওয়ার সময় চসিকের ৫১৩ কোটি টাকা ঋণ ছিল। এখন বিভিন্ন ঋণ পরিশোধ এবং অন্যান্য ব্যয় মেটানোর পর আমাদের শতকোটি টাকার বেশি উদ্বৃত্ত রয়েছে। এটি আমাদের বড় অর্জন। বন্দরের কাছ থেকে পাওয়া গৃহকর শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সড়ক নির্মাণ ও সংস্কার, সড়কবাতি এবং পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রমে ব্যয় করার পরিকল্পনা রয়েছে জানিয়ে প্রশাসক বলেন, 'নগরের সেবা বাড়াতে আধুনিক যন্ত্রপাতি ও সরঞ্জামও কেনা হবে। তিনি বলেন, 'চসিকের অধীনে প্রায় ১০০টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের অনেক শিক্ষকের মাসিক বেতন এখনো ১০ থেকে ১২ হাজার টাকা। তাদের বেতন বাড়ানো এবং শিক্ষক-কর্মচারীর সংকট দূর করা প্রয়োজন। এ ছাড়া প্রায় ১ হাজার ৫০০ থেকে ২ হাজার কর্মচারীকে স্থায়ী করা হয়েছে। তাদের বেতন-ভাতার ব্যয়ও বেড়েছে। এসব ব্যয় নিজস্ব রাজস্ব থেকে বহন করতে হয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, মন্ত্রণালয় থেকে প্রয়োজন অনুযায়ী সব অর্থ পাওয়া যায় না। ফলে নগর পরিচালনা ও সেবার মান বাড়াতে নিজস্ব রাজস্ব আয় গুরুত্বপূর্ণ। বন্দরের ভারী যানবাহনে নগরের সড়কের ক্ষতি প্রসঙ্গে ডা. শাহাদাত হোসেন বলেন, 'চসিকের অনেক সড়ক ১০ টন ধারণক্ষমতা বিবেচনায় নির্মাণ করা হলেও বন্দরের ৪০ টন বা তার বেশি ওজনের যানবাহন চলাচল করে। ফলে আট থেকে ১০ বছর টেকসই হওয়ার কথা এমন সড়ক এক-দুই বছরের মধ্যেই নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।' এতে প্রতিবছর ৪০০ থেকে ৫০০ কোটি টাকার ক্ষতি হচ্ছে বলে দাবি করেন তিনি।

তার ভাষ্য, বন্দরের কাছে এ ক্ষতির ক্ষতিপূরণ চাওয়ার বিষয়ও রয়েছে। তবে আপাতত তাদের কাছ থেকে ন্যায্য গৃহকর আদায়ের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এদিকে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সচিব (অতিরিক্ত দায়িত্ব) সৈয়দ রেফায়েত হামিম টিবিএসকে বলেন, 'গৃহকর নিয়ে বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়ে শুনানি হয়েছে। তবে আমরা এখনও পূর্ণাঙ্গ রায়ের কপি হাতে পাইনি। রায়ের কপি পাওয়ার পর সেটি পর্যালোচনা করে এ বিষয়ে মন্তব্য করতে পারব। গৃহকর নির্ধারণের যৌক্তিকতা এবং রায়ের বিরুদ্ধে বন্দরের কোনো অবস্থান আছে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, 'রায়ের কপি হাতে পাওয়ার পর সেটি বিচার-বিশ্লেষণ করে আমাদের অবস্থান জানাতে পারব। এর আগে এ বিষয়ে মন্তব্য করা সম্ভব নয়। চসিকের তথ্য অনুযায়ী, যৌথ জরিপে বন্দরের মোট ১ কোটি ৭৩ লাখ ৪৬ হাজার ৪৯১ বর্গফুট স্থাপনা চিহ্নিত করা হয়। এর মধ্যে ১৭ লাখ ২৪ হাজার ১০৬ বর্গফুট আবাসিক, ১৬ লাখ ৩৫ হাজার ৩৭৯ বর্গফুট অনাবাসিক এবং ১ কোটি ৩৯ লাখ ৮৭ হাজার ৬ বর্গফুট ইয়ার্ড ও স্টোরেজ স্থাপনা রয়েছে।

এসব স্থাপনার পাশাপাশি কনটেইনার হ্যান্ডলিং, পোর্ট ডিউটি, বার্থিং-আনবার্থিং, পাইলটেজ, টাগবোট ও লেট ফিসহ বিভিন্ন খাতের আয় এবং বন্দরের সক্ষমতা বিবেচনায় নিয়ে গৃহকর নির্ধারণ করে চসিক। ২০২৫ সালের ১০ জুলাই বকেয়াসহ ১৭৭ কোটি ৬০ লাখ টাকা গৃহকর পরিশোধের জন্য বন্দর কর্তৃপক্ষকে বিল পাঠায় চসিক। এর মধ্যে ওই অর্থবছরের নির্ধারিত গৃহকর ছিল ১৬০ কোটি ১৬ লাখ ৪১ হাজার টাকা। তবে বিল নিয়ে আপত্তি জানায় বন্দর কর্তৃপক্ষ। পরে দুই প্রতিষ্ঠানের যৌথ জরিপে নতুন করে কর নির্ধারণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। যৌথ জরিপের পর গত ২৪ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত সংশ্লিষ্ট কমিটির সভায় বন্দরের পক্ষ থেকে ৫০ কোটি টাকা গৃহকর দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়। তবে চসিক তা প্রত্যাখ্যান করে।

পরে বিষয়টি নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়কে জানানো হয়। ২০ এপ্রিল মন্ত্রণালয় জানায়, কর নির্ধারণ ও পরিশোধের বিষয়টি আইন ও বিধি অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের এখতিয়ারভুক্ত। এরপর গত ২৯ জুন ২০২৫ু২৬ অর্থবছরের গৃহকর বাবদ ১৯৮ কোটি ২৬ লাখ ৯৪ হাজার ৬৫১ টাকা পরিশোধ করে বন্দর কর্তৃপক্ষ। এটি চসিকের প্রস্তাবিত করের ৭৫ শতাংশ। তবে নির্ধারিত কর নিয়ে আপত্তি জানিয়ে বিভাগীয় কমিশনারের আদালতে আপিল করে বন্দর। সোমবার সেই আপিলের চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হয়।

চসিকের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৭ সালে বন্দরের বার্ষিক গৃহকর ১৬০ কোটি ১৬ লাখ ৪১ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হলেও তৎকালীন মেয়র তা কমিয়ে ৫০ কোটি টাকা করেন। বন্দর কর্তৃপক্ষ শেষ পর্যন্ত ১০ শতাংশ সারচার্জ মওকুফের সুবিধা নিয়ে প্রায় ৪০ কোটি ৫০ লাখ টাকা পরিশোধ করে। দায়িত্ব নেওয়ার পর বন্দর থেকে নির্ধারিত গৃহকর আদায়ে উদ্যোগ নেন বর্তমান প্রশাসক ডা. শাহাদাত হোসেন। ২০২৪ সালের ১৫ ডিসেম্বর বন্দর চেয়ারম্যানকে চিঠি দিয়ে ২০২৪ু২৫ অর্থবছরের গৃহকর বাবদ বকেয়া ১১৫ কোটি ১৬ লাখ ৪১ হাজার টাকা পরিশোধের অনুরোধ জানান তিনি। এর আগে ওই অর্থবছর থেকে বন্দরের গৃহকর ১৬০ কোটি ১৬ লাখ ৪১ হাজার টাকা নির্ধারণ করেছিল চসিক। এরপর ২০২৫ সালের ২২ জানুয়ারি নৌপরিবহন সচিবকেও চিঠি দেয় চসিক। এর পরিপ্রেক্ষিতে একই বছরের ৬ এপ্রিল বন্দর কর্তৃপক্ষকে আপাতত ১০০ কোটি টাকা পরিশোধের নির্দেশনা দেয় নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়। এর আগে ১৯৯৪-৯৫ অর্থবছরে চসিক ৩৯ কোটি ৮০ লাখ টাকা গৃহকর দাবি করলেও বন্দর পরিশোধ করেছিল ৫ কোটি টাকা। ২০০১-০২ অর্থবছরে বকেয়া বাবদ ১৯৭ কোটি ৭৩ লাখ টাকা দাবি করে চসিক। দুই প্রতিষ্ঠানের বিরোধের পর ২০১২ সালে সমঝোতার ভিত্তিতে ১১২ কোটি ৩০ লাখ টাকা পরিশোধ করে বন্দর কর্তৃপক্ষ।