নাগরিকসেবা থেকে বঞ্চিত পাহাড়ের দুই শতাধিক পরিবার
প্রকাশ : ০৮ নভেম্বর ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ
এস.এম.জাকির, চন্দনাইশ (চট্টগ্রাম)

চন্দনাইশে পাহাড়ি এলাকায় ত্রিপুরা, চাকমা, মারমা, তঞ্চঙ্গ্যা নৃ-গোষ্ঠীর লোক বসবাস করে। তাদের জীবন স্বাভাবিক নয়, শত প্রতিকূলতার মাঝে অতিবাহিত করছে বছরের পর বছর। নেই কোনো সরকারি সুযোগ-সুবিধা। শুরু থেকে বিদ্যুৎ না থাকার কারণে নেটওয়ার্কের আওতায় নেই এ অঞ্চলটি। নেই শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার সুযোগ।
সম্প্রতি ত্রিপুরা পাড়া পরিদর্শনে যান ইউএনও আবদুর রহমান। তিনি লিখেছেন, সন্ধ্যা নামলেই পাহাড়ের কোলঘেঁষা ঘরের মানুষগুলো নিঃশব্দে ঘুমিয়ে পড়ে। সূর্য ডোবার সঙ্গে সঙ্গেই যেন জীবন ঢেকে যায় নিবিড় অন্ধকারে। কিন্তু জ্ঞানের আলোর সন্ধানে প্রতিদিন শিক্ষার্থীদের হাঁটতে হয় প্রায় ২ ঘণ্টা। পাহাড়ি পথ, ভেজা মাটি, কখনো কাঁটাঝোপ—সব পেরিয়ে তারা স্কুলে যায়। বইয়ের পাতায় আলো খোঁজে তারা, যেখানে ঘরে ঘরে আলো জ্বালানোর সাধ্য নেই। রাতের পড়াশোনা তাদের কাছে দুঃস্বপ্ন। নিত্য ব্যবহারের পানির জন্য যেতে হয় অনেক দূর। পাহাড়ি ছড়াই তাদের একমাত্র ভরসা। শিশুদের কাঁধে, মায়েদের কোমরে জলের পাত্র—এই দৃশ্য সেখানে নিত্যদিনের। তবু এই জীবনে আছে একটু আনন্দের দিন—প্রতিটি বৃহস্পতিবার। কেননা এই দিনেই তারা সংগৃহীত ফসল বাজারে বিক্রির উদ্দেশ্যে নিয়ে যায়। এমন বাস্তবতার মধ্যে সময়ের স্রোতে বয়ে চলেছে ধোপাছড়ি ত্রিপুরা পল্লী। আলো নেই, পানি নেই, যোগাযোগ নেই—তবু মানুষের বেঁচে থাকার সংগ্রাম আছে, আছে স্বপ্ন দেখার সাহস। অন্ধকার যত গভীরই হোক, জ্ঞানের আলো, পানির স্রোত আর একটি বৃহস্পতিবার তাদের জীবনের ক্ষীণ প্রদীপ। সরেজমিনে দেখা যায়, চন্দনাইশের প্রত্যন্ত দুর্গম পাহাড়ি এলাকা ধোপাছড়ির পূর্ব ও উত্তর সীমানায় বসবাস করে ত্রিপুরা, চাকমা, মারমা, তঞ্চঙ্গ্যা আদিবাসীরা। ত্রিপুরা পল্লীর নেতা (হেডম্যান) যোসেফ ত্রিপুরা (৫৫) জানালেন, তার প্রয়াত বাবা বিক্রম মণি ত্রিপুরা সরকারের পক্ষে কাজ করতে গিয়ে বিপদের সম্মুখীন হন। ১৯৮৬ সালে তার বাবা সরকার নিরাপত্তার জন্য রাঙামাটি থেকে ধোপাছড়ির এ পাহাড়ে বসবাসের সুযোগ দেন। তিনি সেখানে ৩০ পরিবার নিয়ে বসবাস শুরু করেন। ১৯৯৪ সালে হাতির আক্রমণে তাঁর পিতা মারা যান। তাদের সঙ্গে চাকমা, মারমা, তঞ্চঙ্গ্যাসহ ৪টি পাহাড়ি সম্প্রদায়ের ২১০ পরিবারের সহস্রাধিক লোকজন বসবাস করে। দীর্ঘ ৪০ বছরে এ অঞ্চলে বসবাসকারীরা কোনো ধরনের নাগরিক সুবিধা পায়নি, তাদের নেই কোনো নাগরিক সনদ। তাছাড়া এ বিশাল জনগোষ্ঠীর জন্য ৮ বর্গ কিলোমিটারের মধ্যে নেই বিদ্যুৎ ব্যবস্থা, নেই কোনো ধরনের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র, পানীয় জলের সুব্যবস্থা, যোগাযোগ ব্যবস্থা। এক কথায় তাদের জীবন চলছে প্রকৃতি নির্ভর। প্রকৃতির লীলাভূমি আমাদের প্রিয় স্বদেশ, যা সকলের কাছে অপরূপ এবং বৈচিত্র্যময়। এখানে রয়েছে হাজারো শীতল ছায়াঘেরা গ্রাম, বৃক্ষরাজি, নদ-নদী, পশু-পাখি, জীব-জন্তু ও সংখ্যাগরিষ্ঠ সম্প্রদায়ের পাশাপাশি বিভিন্ন সংখ্যালঘু ১১টি সম্প্রদায়ের মধ্যে ত্রিপুরা, চাকমা, মারমা, তঞ্চঙ্গ্যারা। যাদের নিজস্ব ধর্ম, আচার-অনুষ্ঠান, সংস্কৃতি, ভাষা, সাহিত্য, কৃষ্টিগত ঐতিহ্য রয়েছে, যার ফলে বাঙালি সংস্কৃতি আরও সমৃদ্ধ হয়েছে। বাংলাদেশের সংবিধানের ২৩(ক) ধারায় যাদের উপজাতি, ক্ষুদ্র জাতিসত্তা, নৃগোষ্ঠী নামে অভিহিত করা হয়েছে। তবে, উপ-জাতিরা নিজেদের 'আদিবাসী' পরিচয় দিতে অধিকতর পছন্দ করে থাকেন। তাই উপ-জাতি, ক্ষুদ্র জাতিসত্তা, নৃগোষ্ঠী শব্দগুলো ব্যবহার না করে তারা সরাসরি আদিবাসী শব্দ ব্যবহার করে থাকেন। যারা প্রাচীন কাল থেকে তাদের পূর্ব পুরুষদের নিকট থেকে পাওয়া ভূমিতে উত্তরাধিকার সূত্রে বসবাস করে আসছে। এরা নিজেদের সামাজিক ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি রক্ষায় রক্ষণশীল, যাদের নিজস্ব ভাষা ও অন্যান্য কিছু বৈশিষ্ট্য ও সত্তা রয়েছে যা তাদের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠী থেকে পৃথক চিহ্নিত করেছে। আদিবাসীরা বাঙালি নয়, তবে বাংলাদেশি। সরকারি গেজেটে বাংলাদেশে প্রায় ৫০টি ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী সম্প্রদায়ের কথা উল্লেখ রয়েছে। আদিবাসী গ্রামগুলোতে শুধু আদিবাসীদের বসতভিটা চোখে পড়বে। আদিবাসীদের সামাজিক প্রশাসনিক কাঠামোগুলো প্রাচীনকাল থেকেই গোত্রভিত্তিক। এজন্য আদিবাসীরা তাদের সমস্যাগুলোর বেশিরভাগ সমাধান পায় গোত্রের হেডম্যানদের মাধ্যমে। আদিবাসীদের সরলতা, অজ্ঞতা, অক্ষরজ্ঞানের অভাবে জমিজমা তাঁদের নামে অদ্যাবধি হয়নি। আদিবাসীদের রয়েছে নিজস্ব ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান। ভাষা একটি জাতি বা সংস্কৃতির জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আদিবাসীদেরও নিজস্ব মাতৃভাষা রয়েছে। মাতৃভাষায় প্রাক-প্রাথমিক পর্যায়ে ৫টি সম্প্রদায়ের আদিবাসীদের শিক্ষার জন্য সরকার চমৎকার একটি উদ্যোগ নিয়েছিল। তা এখনো এতদ অঞ্চলে মাঠ পর্যায়ে বাস্তবায়ন হয়নি।
আদিবাসীদের রয়েছে নিজস্ব সংস্কৃতি, ঐতিহ্য, আচার-অনুষ্ঠান। যা তারা হাজার বছর ধরে লালন করে আসছে। জাতিভেদে প্রতিটি সম্প্রদায়ের রয়েছে আলাদা পোশাক পরিচ্ছদ। সাথে রয়েছে বিভিন্ন ধরনের অলংকার ব্যবহারের ইতিহাস, নিজস্ব ভাষায় নৃত্য, গীত, যা মনকে প্রসন্ন ও অবসাদমুক্ত করে। একই সাথে রয়েছে বিভিন্ন ধরনের বাদ্যযন্ত্র ও বাজনার চমৎকার শৈলী। তারা তাদের পূজাপার্বণ, বিয়ে বা সামাজিক অনুষ্ঠানে ব্যবহার করে থাকে। দারিদ্র্যতার কারণে ভালো বাসস্থান নেই, নেই কোন স্বাস্থ্য সচেতনতা। এখনো অনেকেই অসুস্থ হলে চিকিৎসকের স্মরণাপন্ন না হয়ে কবিরাজের কাছে যায়। অনেক আদিবাসীদের ভালো স্যানিটেশন সম্পর্কে সচেতন নয়, তাই তারা উন্মুক্ত স্থানে মলমূত্র ত্যাগ করে। অভাব-অনটনের কারণে ছেলেমেয়েদের ভালো জামাকাপড় পরতে পারে না। শিক্ষার হার অনেক কম, ঝরে পড়ার সংখ্যা বেশি।
