ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬, ২১ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ | বেটা ভার্সন

মুসলমানদের আন্দালুস বিজয়

মুসলমানদের আন্দালুস বিজয়

উমাইয়া খলিফা ওয়ালিদ বিন আব্দুল মালিকের শাসনকাল। তার শাসনকাল মানেই মুসলমানদের বিজয় আর উত্থানের ইতিহাস। তার শাসনামলে এমন একঝাঁক দুঃসাহসী মুসলিম সেনাপতির আবির্ভাব ঘটে; যাদের ঘোড়ার পদধ্বনিতে কেঁপে উঠে পৃথিবীর বিশাল বিশাল রাজ্য ও রাজা। যাদের তলোয়ার ডগায় রচিত হয় মুসলমানদের নতুন ইতিহাস। নতুন মানচিত্র। তার শাসনামলে এমন এমন মহা মহা বিজয় অর্জিত হয়, যা অন্য কোনো খলিফার সময় হয়নি। তার ঝলমলে খেলাফতকালে একদিকে মুহাম্মাদ বিন কাসিম সিন্ধুতে বিজয়ের পতাকা ওড়ান। কাশগর, বুখারা ও সমরকন্দের অধিবাসীরা অবাক হয়ে দেখতে থাকে কুতাইবা বিন মুসলিমের বিজয়রথ। অন্যদিকে আন্দালুসে তারিক বিন যিয়াদ ও মুসা বিন নুসাইর একের পর রচনা করেন বিজয়ের মহাকাব্য।

৮৬ হিজরির কথা। মুসা বিন নুসাইর খলিফা ওয়ালিদের পক্ষ থেকে মাগরিবে গভর্নর নিযুক্ত হন। বারবার জনগোষ্ঠী তখন একের পর এক বিদ্রোহ করতে থাকে। মুসা বিন নুসাইর তাদের কে পরাজিত করে বশীভূত করেন। বারবার সেনাপতি তারিক বিন যিয়াদকে সঙ্গে নিয়ে বারবারদের সব অঞ্চলে নিজের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি তারিক বিন যিয়াদকে তাঞ্জিয়ার গভর্নর নিযুক্ত করেন। মুসা বিন নুসাইর তখন নৌ অভিযানের প্রস্তুতি গ্রহণ করেন। ৮৯ হিজরিতে মুসা বিন নুসাইরের ছেলে আব্দুল্লাহ মায়ুযকা ও মানুরকা দ্বীপ বিজয় করেন। (আল আবার ফি খাবারি মান গাবার ১/৩০৪)। তারপর মুসা বিন নুসাইর আন্দালুস বিজয় করার কথা ভাবতে থাকেন।

আন্দালুসে তখন গোথ জাতি শাসন করছিল। তাদেরর নেতৃত্বে ছিল রডারিক। রডারিকের অত্যাচারে অতিষ্ঠ ছিল আন্দালুসের মানুষ। রডারিকের মিত্র ছিল সিউটা রাজ্যের শাসক জুলিয়ান। সে ও ছিল রডারিক কর্তৃক নিগৃহীত। রডারিকের অত্যাচারে অতিষ্ঠ জুলিয়ান একপর্যায়ে বিদ্রোহ করে। সে তখন তাঞ্জিয়ার শাসক তারিক বিন যিয়াদের কাছে পত্র লিখে আন্দালুস আক্রমণের আমন্ত্রণ জানায়। মুসা বিন নুসাইর তখন খলিফা ওয়ালিদের সঙ্গে পরামর্শ করে ৫০০ সৈন্যের একটি দল ৯১ হিজরির রমজান মাসে তরিফ বিন মালিকের নেতৃত্বে আন্দালুস ( বৃহত্তর স্পেন) অভিমুখে প্রেরণ করেন। এই বাহিনী সাবতা থেকে খ্রিষ্টান গভর্নর জুলিয়ানের জাহাজ দিয়ে বালুমা দ্বীপে আক্রমণ করে দ্বীপটি জয় করে এবং স্পেন আক্রমণের জন্য প্রয়োজনীয় তথ্য নিয়ে আসে। (আল ফান্নুল আসকারিয়্যুল ইসলামি, ড. ইয়াসিন, ৩৩৪, ৩৩৫)। তারপর মুসা বিন নুসাইর তার অন্যতম সেনাপতি তারিক বিন যিয়াদকে সাত হাজারের একটি বাহিনী দিয়ে আন্দালুস বিজয় করতে প্রেরণ করেন। সিউটার শাসক সার্বিকভাবে মুসলমানদের সহযোগিতা করে।

ইবনুল আসির বলেন, তারিক যখন সমুদ্র পার হচ্ছিলেন, তখন তার তন্দ্রা এসে যায়। সে স্বপ্নে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে দেখতে পায়। রাসুলের সঙ্গে মুহাজির ও আনসার সাহাবিরা আছেন। তারা গলায় তরবারি আর কাঁধে তির-ধনুক ঝুলিয়ে রেখেছেন। তখন রাসুল তাকে বললেন, হে তারিক। তুমি বীরের মতো এগিয়ে যাও। তারপর তিনি তাকে মুসলমানদের সঙ্গে কোমল ব্যবহার ও ওয়াদা রক্ষার নির্দেশ দেন। তখন তারিক তাকিয়ে দেখেন রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও তার সাহাবিরা তার আগে আগে আন্দালুসে প্রবেশ করছেন।

তারিক ঘুম থেকে জেগে উঠে তার সাথিদের বিজয়ের সুসংবাদ দেন। তখন বিজয়ের ব্যাপারে তার আর কোনো সন্দেহ ছিল না। (আল কামিল ৩/২০৯)। তারিক বিন যিয়াদ সাগর পাড়ি দিয়ে যে স্থানে অবতরণ করেন, সেটি আজও জাবালে তারিক নামে পরিচিত আছে।

তারিক প্রথমে কারতাজানা বিজয় করেন এবং আশপাশের বিভিন্ন এলাকায় বিজয় পতাকা ওড়ান। ওদিকে আন্দালুসের (বৃহত্তর স্পেন) শাসক রডারিক যখন মুসলিম বাহিনীর গুরুত্ব অনুভব করতে পারে। তখন এক বিশাল বাহিনী নিয়ে তারিকের বিরুদ্ধে এগিয়ে আসে।

ওয়াদি লাক্কার যুদ্ধ : সেনাপতি তারিক ৭ হাজার সৈন্য নিয়ে আন্দালুসে এসেছিলেন। পরে মুসা বিন নুসাইর আরো ৫ হাজার সৈন্য তার সাহায্যে প্রেরণ করেন।

৯২ হিজরির ২৮ রমজান (রোববার) সেনাপতি তারিক বিন যিয়াদের নেতৃত্বে আন্দালুসের খ্রিষ্টান রাজা রডারিকের সঙ্গে ওয়াদি লাক্কার যুদ্ধ সংঘটিত হয়। লাগাতার ৮ দিন যুদ্ধ শেষে, মাত্র ১২ হাজারের ছোট্ট মুসলিম বাহিনীর হাতে প্রতিপক্ষের ১ লাখ সৈন্যের বিশাল বাহিনী শোচনীয়ভাবে পরাজয় বরণ করে। যুদ্ধে তিন হাজার মুসলমান শাহাদাত বরণ করেন। অপরপক্ষে খ্রিষ্টান সৈন্যদের অধিকাংশই রণাঙ্গনে প্রাণ হারায়। কারও মতে, স্বয়ং রাডিরিকও রণাঙ্গনে নিহত হয়। আবার কেউ বলেন, সে দূরে কোথাও পালিয়ে যায়। কারও মতে, সে পালানোর সময় নদীতে ডুবে মরে।

আল্লাহ তায়ালা মুসলমানদেরকে এক মহান বিজয় দান করেন। প্রচুর পরিমাণ গনিমত মুসলমানদের হাতে আসে। এই যুদ্ধে বিজয় লাভের মাধ্যমে মুসলমানদের জন্য সমগ্র আন্দালুস বিজয়ের পথ সুগম হয়। (আল কামিল ফিত তারিখ-৪/৫৬৩,৬৪, আল- বিদায়া ওয়ান নিহায়া ৯/৮৩, মায়ারিকুন ফাসিলাহ পৃ. ৬০, মায়ারিকুল মুসলিমিন ফি রমাদান ৪৩-৪৬)। প্রচলিত আছে, তারিক বিন যিয়াদ সমুদ্র অতিক্রম করার পর জাহাজগুলো জ্বালিয়ে দিয়েছিলেন। কিন্তু অধিকাংশ নির্ভরযোগ্য ঐতিহাসিকের মতে, এই ঘটনার কোনো সত্যতা নেই। (মায়ারিকুল মুসলিমিন ফি রমাদান পৃ. ৪৪)। এরপর তারিক বিন যিয়াদ একের পর এক শহর জয় করতে থাকেন। কোনো প্রতিপক্ষই আর তার সামনে দাঁড়াতে পারেনি।

এদিকে মহান সেনাপতি মুসা বিন নুসাইর স্বয়ং ৮ হাজার সৈন্য নিয়ে আন্দালুস বিজয়ে এগিয়ে আসেন। তারিক বিন যিয়াদ একদিকে আর মুসা বিন নুসাইর অন্যদিকে বিজয়ের ঢংকা বাজাতে থাকেন। এরপর তালীতালাহ নামক স্থানে উভয়ের মাঝে সাক্ষাৎ হয়। (আদ দালাতুল উমাবিয়্যা ড. ইউসুফ মাহমুদ, পৃ. ২৫০)। সেনাপতি তারিক ও মুসা একের পর এক শহর বিজয় করতে করতে পুরো আন্দালুস পদানত করেন। এমন সময় খলিফা ওয়ালিদ বিজয় অভিযান স্থগিত করার নির্দেশ দিলে মুসা ও তারিক বিজয় অভিযান স্থগিত রাখেন।

বই : খলিফাদের সোনালি ইতিহাস নূর হোসাইন উমর

অনূদিত ও সংকলিত

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত