প্রিন্ট সংস্করণ
০০:০০, ২৪ জানুয়ারি, ২০২২
অন্যান্য সভ্যতার মতো ইসলামি সভ্যতার ইতিহাসেও এমন কিছু ব্যক্তি ছিলেন, যারা এই সভ্যতাকে সাফল্যের শীর্ষে পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে মুখ্য ভূমিকা পালন করেছেন। ইসলামি সভ্যতার বিকাশে তাদের ভূমিকা ছিল মৌলিক, চাই সে বিকাশ বৈজ্ঞানিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক বা সামরিকÑ যে কোনোভাবেই হোক না কেন। আর নিজামুল মুলক ছিলেন তাদেরই একজন, চলুন জেনে আসি ‘কলমের ভাষায়’ সেই মনীষীর গল্প।
নিজামুল মুলক আত তুসী এই মনীষীদেরই একজন, যিনি কিনা পরপর দু’জন সেলজুক সুলতান, আল্প আরসালান এবং তার পুত্র মালিক শাহের অধীনে পূর্ণ ৩০ বছর মন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেছেন। তার মতো রাষ্ট্রীয় দক্ষতা ও যোগ্যতার অধিকারী ব্যক্তি ইসলামি রাষ্ট্রপরিচালনার ইতিহাসে প্রায় বিরল। তাছাড়া তিনি তার গুরুতর প্রশাসনিক দায়িত্বের বাইরে ছিলেন একজন বিদ্বান ও সংস্কৃতিমনা পুরুষ। তিনি ইসলামের মধ্যযুগীয় ইতিহাসে রাজনৈতিক ধারা ও রাষ্ট্রীয় নীতিমালার একটি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উৎসগ্রন্থ রচনা করতে সক্ষম হন। কে এই নিজামুল মুলক তুসী? কী সেই গুরুত্বপূর্ণ অবদান, যার জন্য তিনি আজও ইতিহাসের পাতায় একটি বিশেষ স্থানের অধিকারী? কীভাবে তার অসাধারণ সাফল্যগুলো শেষ পর্যন্ত একটি অভিনব উপসংহারে রূপ নিল?
দারিদ্র্য থেকে মন্ত্রিত্ব : আবু আলী আল-হাসান ইবনে আলী ইবনে ইসহাক আত-তুসি ৪০৮ হিজরি মোতাবেক ১০১৭ খ্রিস্টাব্দে তুর্কমেনিস্তান সীমান্তের কাছে, বর্তমান ইরানের পূর্বদিকে, একেবারে শেষ প্রান্তে তুস বা মাশহাদ আল রেজা শহরে জন্মগ্রহণ করেন। গজনী সম্রাটদের শাসনামলে তার বাবা ছিলেন তুস শহরের নেতা। অর্থাৎ তিনি ছিলেন গজনী প্রশাসনের মাঝারি পর্যায়ের দায়িত্বশীল। তবে এই পদ থেকে অর্জিত আয় এবং মাসিক বেতন তার ও নিজামুল মুলকসহ অন্যান্য পুত্রদের জন্য যথেষ্ট ছিল না।
দুধপানের বয়সে নিজামুল মুলকের মায়ের মৃত্যু ছিল তার জীবনে সবচেয়ে দুঃখজনক ঘটনা। তার বাবা ছিলেন দরিদ্র। পারিশ্রমিকের বিনিময়ে ছেলেকে দুধ পান করানোর মতো সামর্থ্য তার ছিল না। যে নারীরা শুধু আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য বাচ্চাদের দুধপান করাত, নিজামুল মুলকের পিতা তাকে সে নারীদের কাছে দুধপানের জন্য নিয়ে যেতেন। ফলে তখন থেকেই অর্থসংকটের প্রতি নিজামুল মুলকের দৃষ্টি খুলে যায়। দারিদ্র?্যরে এই অনুভূতিই তাকে প্রচ- আশাবাদী করে তুলেছিল এবং তাকে শিক্ষার হাতেখড়ি ও কোরআনুল কারিম মুখস্থ করতে উদ্বুদ্ধ করেছিল। প্রখ্যাত ঐতিহাসিক ‘ইবনুল আসির’ তার বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেন, ‘তিনি দারিদ্র?্য ও অর্থসংকটের মাঝে বেড়ে উঠেছিলেন, যা তাকে উদ্দীপ্ত করেছিল উচ্চ মনোবল ও জ্ঞানের স্রোতধারায় ডুবে থাকতে। ফলে তিনি দীনচর্চায় প্রভূত দক্ষতা হাসিল করেন এবং মহান ব্যক্তিত্বে পরিণত হন।
শিক্ষা ও কর্মজীবন : তার জন্মশহর নওকানে তিনি ফারসির পাশাপাশি আরবি ভাষার শিক্ষা গ্রহণ করেন এবং কোরআন, হাদিস, ভাষা ও ব্যাকরণের জ্ঞান লাভ করেন। তিনি শাফেয়ি মাজহাবের ফিকাহ শাস্ত্র ও আশআরি মাসলাকের আকিদা শাস্ত্র অধ্যয়ন করেন। হাদিসে নববির প্রতি তার প্রবল আকর্ষণ থাকায় তিনি তার অন্যান্য ইলম অন্বেষী সহপাঠীদের মতোই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, প্রবীণ শায়েখদের কাছ থেকে জ্ঞান অন্বেষণ এবং হাদিস শ্রবণের জন্য ইরাক, খোরাসান, রাই, ইস্পাহান, নিশাপুর ইত্যাদি শহর সফর করেন। অবশেষে তিনি এই শাস্ত্রে এমন উচ্চতর দক্ষতা অর্জন করেছিলেন, যা তাকে রাই (বর্তমান তেহরান) শহরের হাদিস-শিক্ষার্থীদের শিক্ষকের আসনে বসিয়েছিল।
তার বাবা যে প্রশাসনিক কাজে নিরত থাকতেন, সে কাজের প্রতি তুসী নিজে যথেষ্ট অনুরাগী ছিলেন। এরই ধারাবাহিকতায় তিনি লেখালেখি ও রচনার জ্ঞান লাভ করেন এবং হিসাববিজ্ঞানসহ সংশ্লিষ্ট বিষয়ে গভীর পা-িত্য অর্জন করেন। এগুলো তখনকার মুসলিম বিশ্বের সব অঞ্চলে স্থানীয় সরকারের কার্যালয়ে নিযুক্তির মূল বিষয় ছিল। অবশেষে তিনি আফগানিস্তানের রাজধানী গজনীতে গজনী সাম্রাজ্যের প্রশাসনিক কাজকর্মে যুক্ত হন। এভাবেই ধীরে ধীরে তার অভিজ্ঞতা বৃদ্ধি পায় এবং তিনি সহকর্মীদের তুলনায় শ্রেষ্ঠত্বের স্থান দখল করে নেন। এ কারণেই হয়তোবা ‘ইমাম যাহাবী’ তার সম্পর্কে বলতে বাধ্য হয়েছিলেন, গজনীতে যাওয়ার পর তিনি হয়ে ওঠেন একজন কীর্তিমান হিসাবরক্ষক। তার কাছেই চূড়ান্ত হিসাবের দায়িত্ব ছিল। তিনি রচনায়ও দক্ষতা অর্জন করেন। সঙ্গে সঙ্গে তিনি ছিলেন একজন মেধাবী, বুদ্ধিমান ও পূর্ণ নেতৃত্বের অধিকারী।
সেলজুক সাম্রাজ্যে তার পদার্পণ : সে-সময় সেলজুক শাসকদের রাজনৈতিক উত্থান ঘটছিল এবং তারা এরই মধ্যে মা’ওরাআন-নাহার অঞ্চলগুলোতেও নিজেদের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়েছিল। ধীরে ধীরে তারা গজনীদের হটিয়ে খোরাসানের অঞ্চলগুলোতে (যা বর্তমানের আফগানিস্তান, তুর্কমেনিস্তান ও ইরাকের পূর্বাঞ্চলজুড়ে বিস্তৃত) নিজেদের ক্ষমতার প্রসার ঘটাতে থাকে। হাসান তুসী সেলজুকদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে সক্ষম হন। তার দক্ষতা, জ্ঞান এবং বুদ্ধি বাদশাহ আল্প আরসালানের মন্ত্রী আবু আলী বিন শাযানকে আকৃষ্ট করেছিল। ফলে তুসী সেলজুক আমিরদের বিশ্বাসভাজনে পরিণত হন। ইবনে শাযানের মৃত্যু-পরবর্তী রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব লাভের আগেই তিনি একজন মন্ত্রীর সহকারী পদ থেকে সেলজুকী বাদশাহ আলপ আরসালানের ‘কাতেবে’র পদে উন্নীত হন।
আল্প আরসালান যখন সবচেয়ে বিখ্যাত সেলজুক সুলতানরূপে আবির্ভূত হলেন এবং ঐতিহাসিক ‘মানযিকার্ট’-এর যুদ্ধে বিজয়ী হলেন, তখন ৪৫৫ হিজরিতে তিনি তার কাতেব আবু আলী আত-তুসিকে সেলজুক রাজ্যের মন্ত্রী বানাবার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। অর্থসংকটে বেড়ে ওঠা মন্ত্রীর জীবনে এটাই ছিল অন্যতম মুহূর্ত। তার চেষ্টা ও অধ্যবসায় এবং শিক্ষা উপরন্তু তার বুদ্ধিমত্তা তাকে মধ্যযুগীয় মুসলিম বিশ্বের সর্বাধিক ক্ষমতাশালী রাষ্ট্রের দ্বিতীয় ব্যক্তির স্থানে নিয়ে গিয়েছিল। এই পদটি তাকে সেই সময়ের সেরা রাজনীতিবিদ হিসাবে যোগ্য করে তোলে, যেমনটির স্বীকারোক্তি দিয়েছেন প্রখ্যাত ইতিহাসবিদ হুসাইন গোলাম।
নিজামুল মুলকের রাষ্ট্রনীতি : আল্প আরসালান ও তার পুত্র মালিকশাহ, এই দুই সেলজুক শাসকের অধীনে নিজামুল মুলক দীর্ঘ তিরিশ বছর মন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। দুই-দুইজন সেলজুক শাসকের সময়ে মন্ত্রী থাকার কারণে তাকে ‘তাজুল হাযরাতাইন’ লকব দেওয়া হয়। নিজামুল মুলকই একমাত্র ব্যক্তি, যিনি আব্বাসি ও সেলজুকদের পারস্পরিক সম্পর্ক উন্নয়নের ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখার জন্য তাকে আব্বাসি খলিফার পক্ষ থেকে ‘রাদিয়্যু আমিরিল মুমিনিন’ উপাধি দেওয়া হয়। রাষ্ট্রীয় অন্যান্য কাজকর্মেও নিজামুল মুলক অংশ নিতেন। সৈন্যবাহিনীকে ঢেলে সাজানো ও অধিক শক্তিশালী করার ব্যাপারেও তিনি যথেষ্ট তৎপর ছিলেন। এমনকি তিনি যুদ্ধের ময়দানে সৈন্যদের অগ্রভাগে থেকে লড়াই করতেন।
নিজামুল মুলকের প্রকৃত নাম আবু আলী আল হাসান আত তুসী। সেলজুক সাম্রাজ্যকে উন্নত ও শক্তিশালী করার ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখার কারণে তাকে ‘নিজামুল মুলক’ বলে ডাকা হতো। রাষ্ট্র পরিচালনায় তার অনুপম দক্ষতার মাধ্যমে তিনি ইসলামি ইতিহাসের অন্যতম শ্রেষ্ঠ রাজনীতিবিদ হয়ে ওঠেন। তার রাজনৈতিক কৌশলের সাহায্যে তিনি একটি কেন্দ্রীয় শাসনব্যবস্থা কায়েম করতে সক্ষম হন। এই শাসনব্যবস্থা খোরাসান, ইরান ও ইর অঞ্চলে বিস্তৃত সেলজুক সাম্রাজ্যকে নিয়ন্ত্রণ করত। ইসলামে নবদীক্ষিত সেলজুকদের ইসলামের দিকনির্দেশনার প্রতি মনোযোগী করে তোলেন নিজামুল মুলক। একই সঙ্গে পারস্য বা অন্যান্য অঞ্চলের সফল শাসকদের রাষ্ট্র পরিচালনার নানান নীতি ও কৌশল সম্পর্কে অবহিত করেন।
তার মহানুভবতা : সাধারণ মানুষের প্রতি নিজামুল মুলক খুবই আন্তরিক ছিলেন। তারা যাতে জুলুম বা অত্যাচারের শিকার না হয়, সেদিকে লক্ষ্য রাখতেন। ইনসাফ কায়েমের ব্যাপারে সচেষ্ট ছিলেন। আল্লামা সুবকি তার গ্রন্থে উল্লেখ করেন, নিজামুল মুলকের কাছে কোনো অনিয়ম বা অত্যাচারের অভিযোগ এলে তিনি কোরআন ও হাদিসের আলোকে বিচার করতেন। জালেম ও সীমালঙ্ঘনকারীদের আল্লাহর ভয় দেখাতেন। যার ফলে মানুষ তখন নিশ্চিন্তে বসবাস করতে পারত। সুলতানের আশপাশের প্রভাবশালী ব্যক্তিদের থেকেও তারা ইনসাফের আশা করত।
সাধারণ মানুষ, মজলুম ও অধিকারবঞ্চিত লোকদের আলাদা গুরুত্ব দিতেন নিজামুল মুলক। মানুষের অভিযোগ-অনুযোগ শোনার জন্য বিশেষ দিনগুলোতে মজলিস হতো। একবার এমন এক মজলিসে খোদ ইমামুল হারামাইন উপস্থিত ছিলেন। অভিযোগকারী এক ব্যক্তি এসে নিজামুল মুলকের দিকে একটা চিরকুট ছুড়ে মারল। নিজামুল মুলকের সামনে দোয়াত রাখা ছিল। চিরকুট গিয়ে পড়ল দোয়াতের কালিতে। প্রচুর পরিমাণে কালি থাকার কারণে কালি ছিটকে এসে নিজামুল মুলকের পোশাক কালো করে দিল। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, নিজামুল মুলক ছিলেন খুবই শান্ত। তিনি একটুও রাগান্বিত হননি। তার চেহারাও মলিন হয়নি। অথচ তিনি ছিলেন চীন থেকে নিয়ে আনাতোলিয়া হয়ে শাম পর্যন্ত বিস্তৃত সাম্রাজ্যের সবচেয়ে প্রভাবশালী মন্ত্রী।
তিনি হাত বাড়িয়ে চিরকুটটি নিয়ে অভিযোগকারীর অভিযোগ পড়তে লাগলেন। কীভাবে সমাধান দেওয়া যায়, এই নিয়ে ভাবতে লাগলেন। উপস্থিত ব্যক্তিরা তার মতো একজন প্রভাবশালী ব্যক্তির এমন ধৈর্য আর সহনশীলতা দেখে অবাক হয়ে গেল। প্রজাদের ওপর যাতে জুলুম না হয়, এজন্য তিনি বিভিন্ন অঞ্চলে এ ধরনের মজলিস কায়েম করতেন। এর মধ্যে প্রধান অঞ্চল ছিল আব্বাসি খেলাফতের রাজধানী বাগদাদ। বাগদাদে তিনি মানুষের যাবতীয় প্রয়োজন মেটানোর চেষ্টা করতেন, যারা বাস্তবেই হকদার তাদেরকে বিপুল পরিমাণ সম্পদ দান করতেন।
তার পা-িত্যের গভীরতা : রাষ্ট্র পরিচালনা করতে গিয়ে নিজামুল মুলক দীর্ঘ অভিজ্ঞতা অর্জন করেছিলেন। একসময় তিনি চাইলেন, রাষ্ট্রসংক্রান্ত তার এই অভিজ্ঞতাগুলো নিয়ে একটা গ্রন্থ লিখবেন। যে গ্রন্থটি রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও রাষ্ট্রনীতি সম্পর্কে মানুষকে সুস্পষ্ট ধারণা দেবে। এ কারণে রাষ্ট্রনীতি বিষয়ে লিখিত তার ‘সিয়াসাতনামা’ গ্রন্থটি তার রাষ্ট্রপরিচালনার দীর্ঘ অভিজ্ঞতার বর্ণনা বলে গণ্য করা হয়। নিজামুল মুলক শেষ জীবনে সুলতান মালিক শাহর অধীনে মন্ত্রী থাকার সময় সুলতানের ইচ্ছায় ‘সিয়াসাত’ নামা গ্রন্থটি লেখেন।
৪৭৯ হিজরিতে সুলতান মালিকশাহ রাজ্যের বিশিষ্ট ব্যক্তিদেরকে সেলজুক সাম্রাজ্যের নানা অসঙ্গতি ও তা থেকে উত্তরণের উপায় এবং রাষ্ট্র পরিচালনার সঠিক পদ্ধতি সুলতানকে অবহিত করার দায়িত্ব দিয়েছিলেন। বিশিষ্ট ব্যক্তিদের মতামতকে সামনে রেখে সুলতান রাজ্যের সংবিধান তৈরি করবেন। তখন রাজ্যের বিশিষ্ট ব্যক্তিরা মেধা ও প্রজ্ঞার সাহায্যে নিজেদের মতামত সুলতানের সামনে পেশ করে। সম্রাট সেসব থেকে শুধু নিজামুল মুলকের লিখিত সিয়াসাতনামা গ্রন্থটিই সংবিধান হিসেবে বেছে নেন। তিনি সিয়াসাতনামার দিকনির্দেশনা অনুযায়ী রাজ্যপরিচালনার ঘোষণা দেন।
সন্দেহ নেই, এর পরপরই নিজামুল মুলক মন্ত্রী থেকে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ প্রভাবশালী ব্যক্তিতে পরিণত হন। রাষ্ট্রীয় নানা সমস্যার সমাধান, রাষ্ট্রীয় চুক্তি ও সমঝোতা, বিভিন্ন খাতে সম্পদ ব্যয় করা, যে কোনো বিধান জারি করার একচ্ছত্র অধিকার লাভ করেন। কোনো জবাবদিহিতা ছাড়াই এসব ক্ষেত্রে তিনি স্বাধীনভাবে হস্তক্ষেপ করতে পারতেন। রাষ্ট্রীয় নীতি ও নৈতিকতা, সাধারণ মানুষের সঙ্গে রাষ্ট্রের সম্পর্ক নির্ণয়, যুদ্ধকৌশল ও তার মৌলিক উদ্দেশ্য সব ক্ষেত্রেই নিজামুল মুলকের পরামর্শ সিদ্ধান্ত বলে বিবেচিত হতো।
সে সময় সংবাদ পৌঁছানোর জন্য একটা দক্ষ ও শক্তিশালী বাহিনী ছিল। যারা মানুষের মাঝে মিশে থেকে বিভিন্ন ধরনের তথ্য সংগ্রহ করত। জুলুম-নির্যাতন কিংবা কোনো ষড়যন্ত্র অথবা প্রাকৃতিক কোনো দুর্যোগের সংবাদ স্থানীয় প্রশাসকের কাছে খুব দ্রুতই পৌঁছিয়ে দিত। নিজামুল মুলক সংবাদ পৌঁছানোর ব্যবস্থাকে আরও উন্নত ও দ্রুততর করার জন্য বিভিন্ন স্থানে ডাককেন্দ্র স্থাপনের পরামর্শ দেন। যে ডাককেন্দ্রগুলো এশিয়ায় বিস্তৃত সেলজুক সাম্রাজ্যের অঞ্চলগুলোতে দীর্ঘ দূরত্ব থাকার পরও খুব দ্রুতই সংবাদ পৌঁছানোর ক্ষেত্রে কার্যকর ভূমিকা রাখবে।
সৈন্যবাহিনীকে বিভিন্ন ব্যাটালিয়নে ভাগ করার ক্ষেত্রে জাতিগত সম্পর্ক প্রধান না হওয়া গুরুত্বপূর্ণ। তুর্কি বাহিনী বা আরব বাহিনী কিংবা পারস্যবাহিনী এভাবে যাতে ব্যাটালিয়ন ভাগ না করা হয়, সে পরামর্শ নিজামুল মুলক তার সিয়াসাতনামা গ্রন্থে সুলতানকে দিয়েছিলেন। এটাই ছিল নিজামুল মুলকের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ। বিভিন্ন জাতির সৈন্য দিয়ে ব্যাটালিয়ন সাজানোর অন্যতম ফায়েদা হলো, শাসক শ্রেণি কোনো ধরনের সম্মিলিত বিদ্রোহ অথবা অবাধ্যতা ভয় থেকে মুক্ত থাকেন। নিজামুল মুলক খুবই সতর্ক মানুষ ছিলেন। গজনীরা জাতিগত সম্পর্কের ভিত্তিতে সৈন্যবাহিনীকে বিভিন্ন ব্যাটালিয়নে ভাগ করত। এই গজনীদের পরপরই সেলজুকদের শাসন শুরু হয়। এই শক্তিশালী কৌশলটি সেলজুকরা গ্রহণ করে। তাদের পরবর্তী যিনকি, আইয়ুবি, দাস ও রোমের সেলজুক এবং উসমানিরাও এই কৌশল অবলম্বন করেন।
সূত্র : কলমের ভাষায়