
বিশ্বনবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) সমাজের পঙ্কিলতা দূর করত শান্তি ফিরিয়ে আনতে কাবার অদূরে হেরা গুহায় ভাবনারত থাকাকালীন আল্লাহর পক্ষ থেকে সর্বপ্রথম যে নির্দেশ আসে তা হলো জ্ঞানার্জনের তাগিদ। আল্লাহ কর্তৃক হজরত জিবরাইল (আ.) এর মাধ্যমে রাসুল (সা.)-এর ওপর নাজিলকৃত প্রথম আয়াত হলো, ‘পাঠ করুন আপনার পালনকর্তার নামে, যিনি সৃষ্টি করেছেন। সৃষ্টি করেছেন মানুষকে জমাট রক্ত থেকে। পাঠ করুন, আপনার পালনকর্তা মহা দয়ালু, যিনি কলমের সাহায্যে শিক্ষা দিয়েছেন, শিক্ষা দিয়েছেন মানুষকে যা সে জানত না।’ (সুরা আলাক : ১-৫)।
ইসলাম ধর্মের আগমনে পৃথিবীবাসী মানুষের জন্য জাগতিক ও পারলৌকিক সব ধরনের শিক্ষার দ্বার উন্মুক্ত হয়েছে। এখান থেকে অনুধাবন করা যায়, ইসলাম বিশ্বমানবতার জন্য জ্ঞানের দ্বার কীভাবে উন্মুক্ত করে দিয়েছে। আল্লাহ সর্বপ্রথম তার নবীকে কোনো কর্মের আদেশ দেননি তার কারণ হলো, না জেনে কোনো কর্ম করা যায় না। কর্ম করার আগে জানতে হয়। যারা না জেনে কর্ম করে, তারা অনেকাংশে ছেলেখেলারূপ কর্ম করে। তাই আমলের পূর্বশর্ত জ্ঞানার্জন। রাসুল (সা.) এরশাদ করেন, প্রতিটি মুসলিম পুরুষের উপর দ্বীনি ইলম শিক্ষা গ্রহণ করা ফরজ। অন্য রেওয়ায়েতে এসেছে প্রতিটি মুসলিম নর-নারীর ওপর দ্বীনি ইলম শিক্ষা করা ফরজ (ইবনে মাজাহ-২২৪)।
জ্ঞানার্জনকে যেমনিভাবে ফরজ করা হয়েছে, তেমনিভাবে জ্ঞানার্জনকারীকে সর্বোচ্চ সম্মান দেওয়া হয়েছে। আল্লাহ বলেন, ‘হে নবী আপনি বলে দিন, যে ব্যক্তি (কোরআন-সুন্নাহ তথা শরিয়তের বিধান) জানে আর যে জানে না, তারা কি উভয়ে সমান হতে পারে?’ (সুরা জুমার-৯)। বিশিষ্ট সাহাবি আবুদ্দারদাহ (রা.) বললেনÑ আমি রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে বলতে শুনেছি, তিনি বলেন, যে ব্যক্তি ইলম আন্বেষণ করার লক্ষ্যে কোনো পথ অবলন্বন করে, আল্লাহতায়ালা এর বিনিময়ে তাকে জন্নাতের পথগুলোর মধ্য থেকে একটি পথে পৌঁছে দেন এবং ফেরেস্তারা ইলম অন্বেষণকারীদের সন্তুষ্টির জন্য তাদের নিজেদের পাখা বিছিয়ে দেন। এতদ্ব্যতীত যারা আলেম, তাদের জন্য আকাশ ও পৃথিবীতে যারা আছেন, তারা সবাই আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা ও দোয়া করতে থাকেন। এমনকি পানির মধ্যে অবস্থিত মাছ তাদের জন্য দোয়া করে থাকে। আলেমের ফজিলাত সাধারণ আবেদের (ইবাদতকারী) ওপর এমন, যেমন পূর্ণিমার চাঁদের মর্যাদা অন্যান্য তারকারাজির ওপর। আর আলেমরা হচ্ছেন নবীদের ওয়ারিশ। নবীরা কোনো দিনার বা দিরহাম (টাকা-পয়সা ও ধনসম্পদ) রেখে যান না। তারা মিরাস হিসেবে রেখে যান শুধু ইলম। সুতরাং যে ব্যক্তি ইলম অর্জন করল সে সৌভাগ্যের পূর্ণ অংশগ্রহণ করল। (তিরমিজি : ২৬৮২, ইবনু মাজাহ : ২২৩)।
আফসোস যে, আমাদের বর্তমান মুসলিম সমাজে ধর্মীয় জ্ঞানার্জনের আগ্রহ অনেক কম। আমরা আল্লাহ ও ইসলাম সম্পর্কে না জেনেই অন্ধভাবে ইসলামকে গ্রহণ করেছি। আমরা আজ বংশগত মুসলিম। ভাবা উচিত, আমরা কি আদৌ মুসলিম হতে পেরেছি? আমরা মুসলিম পরিবারে জন্মেছি, তাই একত্ববাদে বিশ্বাসী। যারা কাফেরের ঘরে জন্মেছে তারাই কাফের নয়, যারা মুশরিকের ঘরে জন্মেছে তারাই মুশরিক নয় বরং জন্মসূত্রে সবাই মুসলিম। জন্মের পর পিতা-মাতাকে কেন্দ্র করেই ব্যক্তি ধর্মকর্ম পালন করে। কেউ মুসলিম, কেউ ইহুদি, কেউ হিন্দু, কেউ খ্রিষ্টান, কেউবা আবার কত কী রূপের পরিচয় বহন করে।
এখন কথা হলো, আমার বাপ-মা মুসলিম তাই বলেই কি আমি ইসলাম ধর্ম পালন করি? আমার বাপ-মা কাফের হলে আমি কি মুসলিম হতে পারতাম? এই প্রশ্নগুলোর দিকে নজর দিলে প্রায়ই অর্ধেক মুসলমানই সঠিক উত্তর দিতে পারবে না। আমরাও আজ জাহেলি যুগের মতো বাপ-দাদার ধর্ম পালন করছি। আমাদের ইসলাম জানতে হবে। ইসলাম জানার পরই ইসলাম মানতে হবে। যেমনিভাবে আইন না পড়ে আইনজীবী হওয়া যায় না, বিজ্ঞান না পড়ে বিজ্ঞানী হওয়া যায় না, ড্রাইভিং না শিখে গাড়ি চালানো যায় না, তেমনিভাবে ইসলাম না জেনে ইসলাম মানা যায় না। আমরা স্রষ্টার ওপর ঈমান এনেই আমাদের দায় শেষ করিনি বরং আমাদের দায়িত্ব শুরু করেছি মাত্র। কিন্তু আমরা মুসলমানরা ঈমান আনার পরই আমাদের ধর্মীয় দায়িত্ব শেষ করেছি। ফলে প্রকাশ্যে সোশ্যাল মিডিয়ায় এসে স্রষ্টার নামে কালেমা ও দোয়া-দুরুদ পড়ে আত্মহত্যা করতে দেখা যায়।
সম্প্রতি যে ব্যক্তিটি ফেইসবুক লাইভে আত্মহত্যা করেছেন, আল্লাহর প্রতি তার অগাধ বিশ্বাস ছিল; কিন্তু আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা ও ইসলামকে না জানার কারণে এবং ধর্মীয় মূল্যবোধের অভাবে তিনি আত্মহত্যা করেছেন। লোকটি ইসলাম ধর্মে আত্মহত্যার ভয়াবহ পরিণতি জানলে কখনও এভাবে আত্মহত্যা করতেন বলে মনে হয় না। ধর্মীয় জ্ঞানে গুণান্বিত ব্যক্তি নিজেকে নিজে জাহান্নামের দিকে ঠেলে দেয় না। গবেষণা বলছে, ইসলাম জানা প-িত কখনও আত্মহত্যা করে না। যে সব মুসলমান আত্মহত্যা করে, তারা প্রায় সবাই নামমাত্র মুসলমান হলেও তাদের মধ্যে ধর্মীয় তেমন কোনো জ্ঞান নেই। তাই তো আল্লাহ বলেছেন, যারা জানে আর যারা জানে না, তারা কখনও সমান হতে পারে না। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতায়ালা আমাদেরকে ধর্মীয় জ্ঞানার্জনের মধ্য দিয়ে ধর্মকে মানার তৌফিক দান করুন। আমিন।
লেখক : প্রাবন্ধিক ও কলামিস্ট