শিক্ষা সংস্কারক খান বাহাদুর আহ্ছানউল্লা

আনোয়ারুল কাইয়ূম কাজল

প্রকাশ : ২৩ মে ২০২২, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

জাতিসত্তার প্রবক্তা, ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রখ্যাত শিক্ষাবিদ, শিক্ষা সংস্কারক, সমাজহিতৈষী, খানবাহাদুর আহ্ছানউল্লা (১৮৭৩-১৯৬৫) ছিলেন মুক্তবুদ্ধি ও অসাম্প্রদায়িক চিন্তা-চেতনার ধারক। ইংরেজ শাসনাধীন ভারতে মুসলমানদের ক্ষয়িষ্ণু অবস্থান, দৃষ্টিভঙ্গির পশ্চাৎপদতা, সাংস্কৃতিক অবক্ষয়ে তিনি নতুন জীবনদৃষ্টি ও বিশ্ববীক্ষা নির্মাণে পথিকৃতের ভূমিকা পালন করেন। একাধারে তিনি সাহিত্যিক, ধর্মবেত্তা, দেশবরেণ্য সমাজসেবক, মানবতাবাদী চেতনায় উজ্জীবিত সর্বজন শ্রদ্ধেয় সুফি সাধক। বাঙালি মুসলমানের অহংকার, বাংলার পুনর্জাগরণের সব্যসাচী কারিগর, ঘন ঘোর অন্ধকারে নিমজ্জিত বাঙালি জাতির আলোর দিশারি, চেতনার বাতিঘর। তিনি ছিলেন তার কালের আলোকিত মানুষ। এ জ্ঞানতাপস আপন উদ্যোগ, কর্মপ্রচেষ্টার মধ্য দিয়ে মুসলমান জীবন ও মানসে যে শ্রেয় চেতনা নির্মাণ করতে চেয়েছিলেন, তাতে পরিপূর্ণ সাফল্য অর্জন করেন। জীবনের প্রায় পুরোটা সময় তিনি অনগ্রসর মুসলমান জাতির উন্নতির জন্য ব্যয় করেছেন।

প্রাথমিক ও শিক্ষাজীবন

উপমহাদেশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ এ মনীষী ১৮৭৩ সালের ২৭ ডিসেম্বর সাতক্ষীরা জেলার কালীগঞ্জ উপজেলার নলতা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। শিক্ষাজীবন শুরু হয় নিজ গ্রামেই, মতিলাল ভঞ্জ চৌধুরী নামে একজন শিক্ষকের কাছে হাতেখড়ি। খানবাহাদুর আহ্ছানউল্লা ছিলেন পিতামহের একমাত্র পুত্রের জ্যেষ্ঠ সন্তান। ফলে তার শিক্ষার জন্য পিতা ও পিতামহের আপ্রাণ চেষ্টা এবং আগ্রহ ছিল। বয়স ৫ বছর পূর্ণ না হতেই প্রাথমিক শিক্ষা শুরু হয়। ১৮৮১ সালে তিনি দ্বিতীয় শ্রেণির সমমান পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে একটি রুপার মুদ্রা পুরস্কার পান। তিনি নলতার মধ্য ইংরেজি বিদ্যালয় খেবে তৃতীয়, চতুর্থ, পঞ্চম ও ষষ্ঠ ভাগ অধ্যয়ন করেন। এরপর তিনি টাকী গভর্নমেন্ট হাইস্কুলে চতুর্থ (বর্তমান সপ্তম) শ্রেণিতে ভর্তি হন। ১৮৮৮ সালের শেষভাগে কলকাতায় লন্ডন মিশন সোসাইটি ইনস্টিটিউশনে সেকেন্ড ক্লাসে (বর্তমানে নবম শ্রেণি) ভর্তি হন এবং এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে ১৮৯০ সালে কৃতিত্বের সঙ্গে এন্ট্রান্স (বর্তমানে এসএসসি) পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন ও বৃত্তি লাভ করেন। তিনি হুগলী কলেজ থেকে ১৮৯২ সালে এফএ (বর্তমানে এইচএসসি) এবং ১৮৯৪ সালে কলকাতা প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে সাফল্যের সঙ্গে বিএ পাস করেন। ১৮৯৫ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে দর্শন শাস্ত্রে এমএ ডিগ্রি লাভ করেন।

 

পারিবারিক জীবন

তার পিতা মুনশী মোহাম্মদ মুফিজউদ্দীন এবং মাতা আমেনা খাতুন। মাত্র ১৬ বছর বয়সে প্রপিতামহীর ইচ্ছা অনুসারে তিনি ফয়জুননেছা মহারানির সঙ্গে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। সংসার জীবনে তিনি এক কন্যা যিনি শৈশবে মারা যান ও আট পুত্র সন্তানের জনক ছিলেন। পুত্ররা যথাক্রমে- ব্যারিস্টার মো. সামছুজ্জোহা, মো. বদরুদ্দোজা, মো. নুরুল হুদা, মো. নাজমুল উলা, মো. জয়নুল ওয়ারা, মো. কামরুল হুদা, মো. মাজহারুস্ ছাফা ও মো. গাওছার রেজা।

চাকরি জীবন

খান বাহাদুর আহ্ছানউল্লা ১৮৯৬ সালের ১ আগস্ট রাজশাহী কলেজিয়েট স্কুলের ‘সুপার নিউমারারি’ টিচার হিসেবে যোগদান করেন। তিনি অক্টোবর ১৮৯৬ থেকে মার্চ ১৮৯৭ পর্যন্ত ফরিদপুর জেলার রাজবাড়ী মহকুমার স্কুল সাব-ইন্সপেক্টর পদে কর্মরত ছিলেন। ১৮৯৭ সালের ১ এপ্রিল তিনি ফরিদপুর জেলার অতিরিক্ত ডেপুটি ইন্সপেক্টর হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। এক বছরের মধ্যেই তিনি পদোন্নতি পান বাকেরগঞ্জ উপজেলার ডেপুটি ইন্সপেক্টর পদে। একাদিক্রমে ৭ বছর তিনি বরিশালে অবস্থান করেন। ১৯০৪ সালে Subordinate Educational Service তিনি Provincial Educational Service--এ প্রবেশ করেন। তিনিই প্রথম Inspecting Line থেকে Teaching Line- এর জন্য মনোনীত হন। ১৯০৭ সালে তিনি চট্টগ্রামের ডিভিশনাল ইন্সপেক্টর পদে নিযুক্ত হন। ১ এপ্রিল, ১৯১২ সালে প্রেসিডেন্সি এডিশনাল ইন্সপেক্টর পদে নিযুক্ত হন। ১৯১৯ সালে তিনি আবার চট্টগ্রাম বিভাগের বিভাগীয় ইন্সপেক্টর পদে বদলি হন। ১ জুলাই ১৯২৪ তারিখে তিনি Assistant Director of Public Instruction for

Muhammadan পদে নিযুক্ত হন। চট্টগ্রামে চাকরিকালে তৎকালীন অবিভক্ত বাংলার মুসলমানদের মধ্যে তিনিই সর্বপ্রথম ইন্ডিয়ান এডুকেশন সার্ভিসের অন্তর্ভুক্ত হন। অতঃপর তিনি শিক্ষা বিভাগের সহকারী ডিরেক্টর নিযুক্ত হন। তিনি কিছুদিন অবিভক্ত বাংলার শিক্ষা বিভাগের সর্বোচ্চ পদ ডিরেক্টর হিসেবেও কর্মরত ছিলেন। তিনি ১৯২৯ সালে সরকারি চাকরি থেকে অবসর নেন।

উপাধি, সাফল্য ও সম্মাননা

শিক্ষা সংস্কারক আহ্ছানউল্লা শিক্ষা ক্ষেত্রে তার অসামান্য অবদান এবং সততা ও নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালনের জন্য ব্রিটিশ সরকার তাকে ১৯১১ সালে ‘খান বাহাদুর’ উপাধিতে ভূষিত করে। ওই বছর ২৮ জুন শিক্ষার প্রসারে কৃতিত্বপূর্ণ অবদানের জন্য লন্ডনে Royal society for the encouragement of arts, manufactures & commerce- এর সদস্য পদ লাভ করেন। সদস্য নির্বাচিত হওয়ায় তিনি এম.আর.এস.এ উপাধি লাভ করেন এবং ‘হুজ হু ইন ইন্ডিয়া’ গ্রন্থে তার জীবনী প্রকাশিত হয়। ১৯১৯ সালে ইন্ডিয়ান মুসলমানদের মধ্যে তিনিই প্রথম আইইএস-ভুক্ত হন এবং কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম মুসলিম সিনেট ও সিন্ডিকেট সদস্য ছিলেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে এক দশকেরও বেশি সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কোটের (বর্তমান সিনেট) মেম্বার ছিলেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার প্রস্তুতি লগ্নে ড. নাথান সাহেবের অধীনে টিচিং কমিটির মেম্বার ছিলেন। বাংলা সাহিত্যে বিশিষ্ট ও বহুমুখী অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ বাংলা একাডেমি তাকে ১৯৬০ সালে সম্মানসূচক ‘ফেলোশিপ’ প্রদান করে। সমাজসেবা এবং সমাজ সংস্কৃতিতে বিশেষ করে দ্বীন প্রচারের কাজে অবদানের জন্য ইসলামী ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ তাকে ১৪০৪ হিজরিতে মরণোত্তর পুরস্কারে ভূষিত করে।

উল্লেখযোগ্য শিক্ষা সংস্কার

১. তখন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্যেক পরীক্ষার খাতায় পরীক্ষার্থীর নাম লেখার রীতি প্রচলিত ছিল। অনেকের মতে সাম্প্রদায়িকতা বিদ্যমান থাকায় হিন্দু ও মুসলিম পরীক্ষার্থীদের মধ্যে পক্ষপাতিত্ব হতো। খানবাহাদুর আহ্ছানউল্লার প্রচেষ্টায় প্রথমে অনার্স ও এমএ পরীক্ষার খাতায় নামের পরিবর্তে ক্রমিক নং (রোল নং) লেখার রীতি প্রবর্তিত হয়। পরবর্তী সময়ে আইএ এবং বিএ পরীক্ষার ক্ষেত্রে পরীক্ষার্থীর নাম লেখার রীতি রহিত করা হয়।

২. সে সময় হাই স্কুল ও Intermediate মাদ্রাসা থেকে পাস করে ছাত্ররা কলেজে ভর্তি হওয়ার সুযোগ পেত না। ওই মাদ্রাসাগুলোর শিক্ষার মানোন্নয়ন করেন। ফলে মাদ্রাসা থেকে পাস করা ছাত্রদের কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ সৃষ্টি হয়।

৩. তৎকালীন সব ল’ কলেজে তিনি মৌলভির পদ সৃষ্টি করেন এবং পণ্ডিত ও মৌলভির বেতনের বৈষম্য রহিত করেন।

৪. তখন উর্দুকে Classical Language হিসেবে গণ্য করা হতো না। ফলে পশ্চিমবঙ্গের উর্দুভাষী ছাত্রদের অসুবিধা হতো। তারই প্রচেষ্টায় উর্দু সংস্কৃতির স্থান অধিকার করে।

৫. ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার খসড়া বিল সিনেটে উপস্থাপিত হলে দারুণ বিরোধ সৃষ্টি হয়। পরে তা বিবেচনার জন্য একটি স্পেশাল কমিটি গঠিত হয়। খানবাহাদুর আহ্ছানউল্লা ওই কমিটির একজন সদস্য ছিলেন এবং তিনি এর আবশ্যকতা সমর্থন করেন।

৬. সরকার মুসলিম শিক্ষার ভার খানবাহাদুর আহ্ছানউল্লার হাতে ন্যস্ত করেন। ফলে বহু মক্তব, মাদ্রাসা, মুসলিম হাইস্কুল এবং কলেজ তারই তত্ত্বাবধানে প্রতিষ্ঠিত হয়। এছাড়া অমুসলিম স্কুলে মুসলিম শিক্ষকের নিযুক্তি এবং অন্যান্য সরকারি বিভাগের মুসলিম কর্মচারী নিয়োগও তার হাতেই ন্যস্ত ছিল।

৭. স্বতন্ত্র মক্তব পাঠ্য নির্বাচন ও মুসলিম ছাত্রদের শিক্ষার জন্য একমাত্র মুসলিম লেখকের প্রণীত পুস্তক প্রচলনের নিয়ম প্রবর্তন করেন এবং সরকারের অনুমতি নেন।

৮. মুসলিম ছাত্রদের জন্য বৃত্তির ধারা নির্দিষ্ট করেন। বিদ্যালয়ের সব শ্রেণির বৃত্তি বণ্টনের আগে তার মতামত গ্রহণ করা হতো।

৯. মুসলিম লেখকদের পাঠ্যপুস্তকে লেখার সুযোগ সৃষ্টি করেন। আগে যেসব লেখক ও পুস্তক ঘৃণিত বলে বিবেচিত হয় সরকারি ব্যবস্থায় তা সমাদৃত হতে থাকে। মুসলিম সাহিত্যের বিপুল প্রসার লাভ করে এবং মুসলিম সাহিত্যিকরা নতুন প্রেরণা লাভ করেন।

১০. তারই প্রচেষ্টায় মুসলিম ছাত্রদের জন্য বেকার হোস্টেল, টেলার হোস্টেল, কারমাইকেল হোস্টেল ও মুসলেম ইনস্টিটিউট কলকাতার বুকে প্রতিষ্ঠিত হয়।

১১. বৈদেশিক শিক্ষার জন্য মুসলিম ছাত্রছাত্রীদের সরকারি সাহায্য প্রদানের নিয়ম নির্ধারিত করেন।

১২. টেক্সবুক কমিটিতে মুসলিম সদস্য নিযুক্ত করেন, মুসলিম পাঠ্যে ইসলামি শব্দ প্রয়োগ করেন।

এছাড়া তিনি পরীক্ষক, শিক্ষা বিভাগীয় কর্মকর্তা-কর্মচারী, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ম্যানেজিং কমিটি প্রভৃতি স্থানে আনুপাতিক হারে মুসলমানদের আসন সংখ্যা নির্ধারণ, নিউ স্কিম মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা, হাইস্কুলে আরবিকে অধিকতরভাবে সেকেন্ড ল্যাংগুয়েজ করা, আরবি শিক্ষার মধ্যস্থতায় ইংরেজি শিক্ষার ব্যবস্থা করা, মুসলমান ছাত্রীদের উচ্চ শিক্ষার জন্য বিশেষ বিশেষ স্কুল-কলেজ প্রতিষ্ঠা করা, পিছিয়ে থাকা মুসলিম সমাজকে স্বমহিমায় উজ্জীবন ও প্রতিষ্ঠার জন্য এমন সব মহতি কর্মে তিনি ব্রতী ছিলেন।

শিক্ষা বিস্তার ও অনন্য অনুকরণীয় আদর্শ

খান বাহাদুর আহ্ছানউল্লার দীর্ঘ চাকরি জীবনের সম্পূর্ণটাই কেটেছে শিক্ষা বিভাগে। একজন সাধারণ শিক্ষক থেকে শিক্ষা বিভাগের সর্বোচ্চ পদে আসন গ্রহণ এই দীর্ঘ পথপরিক্রমা ছিল সত্যিই অনন্য। তিনি যখন যেখানে যে দায়িত্বে থাকতেন সে অঞ্চলের শিক্ষা প্রসারের জন্য সার্বিক প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখতেন। পাশাপাশি সমাজ সংস্কার তথা সমাজের সার্বিক উন্নয়নের প্রতিও তিনি ছিলেন সচেষ্ট।

তিনি রাজবাড়ীর অতিরিক্ত ডেপুটি ইন্সপেক্টর থাকাকালীন হেঁটে মফস্বলে স্কুল পরিদর্শন করতেন। কখনও কখনও তাকে রমজান মাসে ২০ মাইল পর্যন্ত হাঁটতে হয়েছে। তিনি রাজশাহীতে অবস্থানকালে মুসলমান ছাত্রদের শিক্ষার প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা সৃষ্টি করেন। তিনি নানা প্রতিবন্ধকতার মধ্যে দিয়ে সংগ্রামের মাধ্যমে মুসলমান ছাত্রদের জন্য দ্বিতল ছাত্রাবাস ‘ফুলার হোস্টেল’ প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হন।

খান বাহাদুর আহ্ছানউল্লার চাকরি জীবনের একটা বড় অধ্যায় কেটেছে চট্টগ্রাম বিভাগের বিভাগীয় ইন্সপেক্টর হিসেবে। চট্টগ্রাম বিভাগের শিক্ষা প্রসারের জন্য তিনি ছিলেন সদা সচেষ্ট ও আন্তরিক। কর্তৃপক্ষও ছিল তার প্রতি আস্থাশীল। তার প্রচেষ্টায় চট্টগ্রাম বিভাগে শিক্ষার উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি সাধিত হয়। তিনি শিক্ষা বিভাগের সহকারী পরিচালক হিসেবে যোগদানের পর পরিদর্শন বিভাগে দক্ষ ও নিষ্ঠাবান কর্মকর্তার অভাব পরিলক্ষিত হয়। এ প্রসঙ্গে এডুকেশন প্রসিডিংয়ে উল্লেখ করা হয়, ‘The work of the inspectorate Particularly of the Divisonal inspectorate is not satisfactory. The branches of the service requires radical improvement in both organization and efficiency. During the last year the inspectorate lost the services of two experience officers Mr. Stapleton and KhanBahadur Moulovi Ahsanullah’

 

বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে অবদান

বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে তার অগাধ পা-িত্য ছিল। তার লিখিত ‘বঙ্গভাষা ও মুসলমান সাহিত্য’ শীর্ষক গ্রন্থটি তার বিশেষ স্বাক্ষর বহন করে। এ গ্রন্থে আছে বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে প্রাজ্ঞতা ও সাহিত্য বিনির্মাণে মূল্যবান দিকনির্দেশনা। তার লেখা সব গ্রন্থে আছে ভাষাশৈলী বির্নিমাণে পা-িত্যের প্রমাণ। তিনি সমাজ, দেশ, বাংলা ভাষা, সাহিত্য-সংস্কৃতি, ইতিহাস, শিক্ষা, ধর্ম, তাসাউফ ও জীবন কথা প্রভৃতি বিষয় নিয়ে ৭৯টি অতি মূল্যবান গ্রন্থ রচনা করেন। এসব গ্রন্থ ‘খানবাহাদুর আহ্ছানউল্লা রচনাবলী’ নামে ১২ খণ্ডে প্রকাশ করা হয়েছে।

খান বাহাদুর আহ্ছানউল্লা ইসলাম ধর্ম প্রসার, সমাজসেবা, মানবকল্যাণ, বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের জন্য যেমন প্রভূত অবদান রেখেছেন, তেমনি তৎকালীন সাহিত্য আন্দোলনের সঙ্গেও নিজেকে সম্পৃক্ত রেখেছেন। তিনি একই সময়ে বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য সমিতি এবং বাংলা সাহিত্য সমিতির ১৯১৭-১৮ সালের নির্বাহী পরিষদের সহ-সভাপতি ছিলেন। বাংলা সাহিত্যে তার অবদানের স্বীকৃতি স্বরূপ ১৯৬০ সালে তিনি বাংলা একাডেমির ফেলো মনোনীত হন। তার নামে ঢাকাসহ দেশের নানা স্থানে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় ও বিশেষায়িত হাসপাতালসহ নানা প্রতিষ্ঠান।

আহ্ছানিয়া মিশনের প্রতিষ্ঠা

ধার্মিক পুরুষ খান বাহাদুর আহ্ছানউল্লা সুফি দর্শনের অন্যতম প্রবক্তা ছিলেন। আধ্যাত্মচর্চা ও আধ্যাত্মিক জীবনযাপনের প্রতি বাল্যকাল থেকেই তার প্রবল আকর্ষণ লক্ষ্যণীয়। তিনি ছিলেন অসাম্প্রদায়িক এবং একটি উদার মুসলিম জীবনবাদী দর্শনের প্রবক্তা। ‘সৃষ্টির সেবা’ তথা সমগ্র মানব সমাজের জাগতিক ও আধ্যাত্মিক সেবার মহান ব্রত নিয়ে খান বাহাদুর আহ্ছানউল্লা (রহ.) আজীবন আধাত্ম সাধনায় ইনসানই কামিল-এর পর্যায়ে উপনীত হন। তার মতে, শরীর মন ও আত্মা নিয়ে মানুষ গঠিত। শরীরের জন্য যেমন ব্যায়াম আবশ্যক, আত্মার জন্য তেমন আবশ্যক আধ্যাত্মিক শিক্ষা ও সাধনার। ‘প্রেম, ধর্ম ও মানবতাবাদ প্রতিষ্ঠার জন্য আত্মার উৎকর্ষতা সাধন জরুরি। সুফিতত্ত্বের এ মর্মবাণী উপলব্ধি করেই তিনি আধ্যাত্মিক সাধনায় সিদ্ধিলাভে আজীবন চেষ্টারত ছিলেন। শুধু আল্লাহর সাধনাই নয়, তার সৃষ্ট জীবকে ভালোবাসা, তাদের কল্যাণে আত্মনিবেদিত হওয়াই মানব জীবনের পূণর্তা- এই ছিল তার জীবন সাধনা। এই ভাবাদর্শের ভিত্তিতে ‘স্রষ্টার এবাদত ও সৃষ্টের সেবা’- এই মূলমন্ত্র নিয়ে ১৯৩৫ সালে প্রতিষ্ঠা করেন ‘নলতা কেন্দ্রীয় আহ্ছানিয়া মিশন’। তারই ধারাবাহিকতায় ১৯৫৮ সালে ঢাকা, চট্টগ্রামে ১৯৫৯ সালে, হবিগঞ্জে ১৯৬১ সালে আহ্ছানিয়া মিশনের কার্যক্রম বিস্তৃত হয়। বর্তমানে দেশে-বিদেশে আহ্ছানিয়া মিশনের তিন শতাধিক শাখা রয়েছে। ঢাকা আহ্ছানিয়া মিশন যার সামাজিক ও আত্মিক উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ড আজ বাংলাদেশের গণ্ডি পেরিয়ে বৃহত্তর পরিসরে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে পরিব্যাপ্ত।

মখদুমী লাইব্রেরি প্রতিষ্ঠা

খান বাহাদুর আহ্ছানউল্লা ছিলেন অসাম্প্রদায়িক এবং একটি উদার মুসলিম জীবনবাদী দর্শনের প্রবক্তা। ‘সষ্ট্রার এবাদত মুছলিম শিক্ষা ও সাহিত্য বিস্তারে তাঁর আর একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ’ মখদুমী লাইব্রেরি ও আহ্ছানউল্লা বুক হাউস লিমিটেড প্রতিষ্ঠা। মখদুমী লাইব্রেরির উৎসাহ ও উদ্দীপনায় অনেক মুসলমান লেখক সৃজনশীল লেখার প্রতি আগ্রহী হয়ে ওঠে। বহু সাহিত্যিক, লেখক, কবি এই লাইব্রেরির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট হন। তৎকালীন আলোড়ন সৃষ্টিকারী গ্রন্থ আনোয়ারা ও বিষাদ সিন্ধু এই লাইব্রেরি থেকে প্রকাশিত হয়। এছাড়া এই লাইব্রেরি থেকে কাজী নজরুল ইসলামের ‘জুলফিকার’, ‘বনগীতি’, ‘কাব্য আমপারা’, খ্যাতনামা কথাশিল্পী আবু জাফর শামসুদ্দিনের ‘পরিত্যক্ত স্বামী’, সৈয়দ আলী আহছানের ‘নজরুল ইসলাম’, শেখ হাবিবুর রহমানের ‘বাঁশরী’, ‘নিয়ামত’ প্রভৃতি বই প্রকাশিত হয়। এই লাইব্রেরি থেকে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শ্রেণির বহু গ্রন্থ প্রকাশিত হয়। শুধু তাই নয়, অনেক নতুন লেখকের লেখা গ্রন্থও এখান থেকে প্রকাশিত হয়। মখদুমী লাইব্রেরির কার্যক্রম তৎকালীন মুসলিম সমাজে সাহিত্য সৃষ্টি ও সাহিত্যের প্রসারের ক্ষেত্রে একটি দ্রুত ও মৌলিক পরিবর্তন আনতে সমর্থ হয়েছিল।

ইন্তেকাল

পরাধীনতার শৃঙ্খলে আবদ্ধ ঔপনিবেশিক শাসনে দিশেহারা বাঙালি জাতির ভাগ্যাকাশে প্রায় পুরো এক শতাব্দীকালের সূর্যস্নাত এ মহাপুরষ পরিণত হন শিক্ষার প্রসার, সংস্কার ও উন্নয়নের মহিরুহে। শতাব্দীর এ মহান নকিব তার কালজয়ী সংগ্রামী কর্মময় স্বর্ণালি আলোময় জীবন অধ্যায় প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম পরম শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করবে। এ মহান সাধক ১৯৬৫ সালের ৯ ফেব্রয়ারি ৯২ বছর বয়সে মহান রবের ডাকে সাড়া দিয়ে পাড়ি জমান মৃত্যু যবানিকার ওপারে।