প্রিন্ট সংস্করণ
০০:০০, ২০ জুন, ২০২২
বাংলা ভাষায় ধর্ম ছাড়া কোনো কবিতা ছিল না শুরুতে। রাধা আর কৃষ্ণ ছিলেন বৈষ্ণব পদাবলির মূল আলোচ্য। বৌদ্ধ দোহা ছিল চর্যাপদগুলো। দেবতারা ছিলেন কাব্যের মূল বিষয়। মানুষ ও মানবজীবন হতে পারেনি কবিতার বিষয়। তা প্রথমবার হলো মুসলিমদের হাত দিয়ে এবং এই হয়ে ওঠার প্রথম ও প্রধান রাজসাক্ষী হলো এক অমোঘ কাব্য; ইউসুফ-জুলেখা। এর লেখক শাহ মুহম্মদ সগীর। মানুষকে মুখ্য বিষয় হিসেবে উপস্থাপনের আধুনিক দৃষ্টিভঙ্গির প্রবর্তনের বহু আগে বাংলা কবিতায় মানুষের জীবন ও জগৎকে মূল উপজীব্য করে কাব্য নির্মাণের এই যে সূচনা হয়, এর গোড়ায় যাদের প্রভাব ছিল, তাদের অন্যতম হলেন মহাকবি আবদুর রহমান জামী।
শাহ মুহাম্মদ সগীরের গ্রন্থটি মূলত জামীর ইউসুফ ও জুলাইখা এর অনুবাদ। জামীর কাব্যে কোরআন-হাদিসের মর্মবস্তু লৌকিক কাহিনীর ওপর সওয়ার হয়ে পরিবেশিত হয়েছে। সেখানে মানবীয় সুখণ্ডদুঃখ, প্রেমণ্ডবিরহ, আলো-কালো তথা জীবনযাত্রার চিত্র ও চরিত্র হয়েছে বিবৃত। উদ্দাম রোমান্টিকতা রয়েছে, কল্পনার স্রোতময় বিহার ও স্বচ্ছন্দ পরিবেশনা রয়েছে। শাস্ত্র ও লোকঐতিহ্যের মিশ্রণে ফর্মের নবসৃষ্টি হয়েছে।
মাধুর্য ও সারল্য ছিল জামীর কবিতার ভূষণ। তার কবিতা কষ্টকল্পিত বা কৃত্রিম নয়। স্বতঃস্ফূর্ততা নদীতরঙ্গের মতো কল্লোলিত জামীকাব্যে। অনেকেই ফারসি কবিতায় জামীকে নিজামী গঞ্জবীর (১১৪১-১২০৯) সমান্তরাল কবি হিসেবে দেখেন। নিজামীর কবিতা বুঝতে ফারসি ভাষায় গভীর জ্ঞান দরকার। কিন্তু জামীর কবিতার জন্য ফারসি ভাষার সেরকম গভীর জ্ঞান দরকার হয় না। জামী অধিগ্রহণ করেছেন পূর্ববর্তী মহান কবিদের থেকে। শেখ সাদী (১২১০-১২৯১) হাফিজ সিরাজী (১৩২৫-১৩৯০) জালালুদ্দীন রুমীর (১২০৭-১২৭৩) কাব্য ঐতিহ্যকে আপন হৃদিরক্তের সঙ্গে একাকার করে পরিবেশন করেছেন তিনি। আমীর খসরু (১২৫৩ - ১৩২৫) ও নিজামীর কাব্যিক ছায়া ছিল জামীর ওপর। কাহিনি সৃষ্টির পারঙ্গমতা ও বয়ানের বয়নে তাদের সঙ্গে ছিল তার আত্মীয়তা। দুই মহাকবির প্রতি তার ঋণ স্বীকারে কুণ্ঠা দেখাননি জামী। আরবি কবিদের থেকেও গীতল তীব্রতা ধার করেছিলেন জামী। কবি মুতানাব্বী (৯১৫-৯৬৫) ও ইবনে আরাবির (১১৬৫-১২৪০) প্রভাবে তার কাব্যে যুক্ত হয় বিশেষ মাত্রা। সব মিলিয়ে ফারসি সাহিত্যে কাব্যরূপ, মাধুর্য ও সারল্যে জামী যে বিশিষ্টতা নিয়ে আসেন, তা মহান পূর্বসূরিদের থেকে তাকে আলাদা করেছে প্রবলভাবে।
জামীর ছন্দে সক্রিয় ছিল সাংগীতিক মোটিভ, মহাকাব্যিক প্রবাহ। যেখানে এক চরিত্র থেকে অন্য চরিত্রে, এক রীতি থেকে অন্য রীতিতে, এক প্রেক্ষিত থেকে অন্য প্রেক্ষিতে তিনি স্বচ্ছন্দ বিহার করেছেন। পাঠক পেয়েছেন প্রত্যাশার তৃপ্তি, আনন্দের অভিজ্ঞতা। বাংলার কবি মুহম্মদ সগীর কাব্যিক এই অনন্যতার দ্বারা ছিলেন পুলকিত, অনুপ্রাণিত। তিনি ও তার মতো অনেকেই একে করেছেন অনুসরণ। প্রধানত পয়ার ছন্দে ঘটেছে তাদের উদগতি। যে ছন্দরীতি বাংলা কবিতার আধুনিক উন্মোচনের প্রধান রাজসড়ক। পয়ারের পাশাপাশি ত্রিপদী ছন্দ রয়েছে সগীরের ইউসুফ-জুলেখায়। গ্রন্থটি ছোট ছোট ঘটনায় বিভক্ত। অনুচ্ছেদ শীর্ষে রাগ-তালের উল্লেখ থাকায় অনুমিত হয়, কাব্যটি গীতোপযোগী করে রচিত এবং এক সময় তা গীত হতো। কবির ভাষায় ও আঙ্গিক পরিচর্যায় নাগরিকতার ছাপ আছে।
জামীর কবিতা অনুবাদ করতে গিয়ে মুহম্মদ সগীর মূল রচনার নানা অংশ বাদ দিয়েছেন, নিজেদের তরফে নানা কিছুর সংযোজন করেছেন। জামী যেখানে এঁকেছেন মিশর-আরবের মরুভূমির চিত্র, বাংলাকবিরা সেখানে স্থাপন করেছেন শস্যশ্যামল নদীমেখলা বাংলাকে। বিদেশি চরিত্রগুলোকেও তারা পরিয়েছেন দেশি পোশাক। বদলিয়েছেন নাম, যুক্ত করেছেন বাংলার মেজাজ ও আবহমান জীবনচিত্র। ফলে অনুবাদ হয়েও তা আর অনুবাদ থাকেনি। নবসৃষ্টিতে পরিণত হয়েছে।
জামী তার ইউসুফ ও জুলেখা লিখেন আল কোরআন থেকে কাহিনি সংগ্রহ করে প্রেমের মাধ্যমে ধর্মের বাণী শোনাবার জন্য। দীর্ঘ এ আখ্যানকাব্য ছিল নানা রূপকতায় সমৃদ্ধ। কোরআনে ইউসুফ-জুলেখার প্রেমকাহিনির মাধ্যমে নীতিশিক্ষা ও আল্লাহর মহিমা প্রচার করা হয়েছে। জামী সেখানে কোরআনের গূঢ়ার্থে মনোনিবেশ করেছেন। বাইবেলেও এ প্রণয়োপাখ্যান বিবৃত আছে। ফারসি কাব্যে নিজামী গঞ্জবীর (১১৪১-১২০৯) এ নিয়ে রচনা করেন মহাকাব্য। বলখের আবুল মুয়াইদ, হিরাতের নাজিম এবং আহওয়াজের বখতিয়ারীও লেখেন কাব্যগ্রন্থ। কিন্তু সবচেয়ে সফল ও জনপ্রিয় কাব্যটি রচিত হয় জামীর হাত দিয়ে। ফারসি কবিরা কোরআনি কাহিনির কাঠামোয় রক্ত-মাংসজুড়ে দিয়ে উপাখ্যানকে করে তোলেন কল্পনাপ্রবণ। নানা চরিত্র যুক্ত হয় নানা নামে। জামীর রোমাঞ্চমুখর কবিমন সেই কল্পকাব্যকে করে অধিকতর বর্ণিল ও পরিণত।
জামী প্রধানত কাহিনির রূপকধর্মী ব্যাখ্যা উপস্থাপন করেছেন। জুলেখা হন আত্মার রূপক। তিনি মিশরের প্রধানমন্ত্রী আজিজে মিসরের স্ত্রী। তিনি প্রেমে পড়েন মহান ইউসুফের। নপুংসক ও স্ত্রীতে অমনোযোগী স্বামীর সংসারে জুলেখার অতৃপ্ত হৃদয় অগ্নিব্যাকুল হয় ইউসুফ সন্দর্শনে, যাকে তিনি স্বপ্নে দেখেছিলেন বহু আগে। যার ছবি অঙ্কিত ছিল তার হৃদয়মুকুরে। ইউসুফ দাস হিসেবে এলেন জুলেখার প্রাসাদে। ক্রমেই তিনি কৈশোর পেরিয়ে তারুণ্যে উপনীতি হন এবং জুলেখার প্রেমও হয় পরিণত। যে প্রেমে ছিল কামের আবেগ। জুলেখা নানাভাবে প্ররোচিত বা আকৃষ্ট করতে চাইলেও ইউসুফকে বশীভূত করতে পারেননি। এর পরবর্তী সময়ে বহু ঘটনার মধ্য দিয়ে মারা যান আজিজে মিসর। জুলেখার প্রণয়হীন জীবনের রিক্ততা ও হাহাকার ঘনীভূত হয়ে উঠে আজিজে মিসরের মৃত্যুর পর- যখন ইউসুফের নাম শোনামাত্রই তিনি অকাতরে অর্থব্যয় করতে লাগলেন এবং উদ্গত অশ্রুস্রোত তার দৃষ্টি হরণ করে নিল। ইউসুফ ততক্ষণে মিসরের অধিপতি হয়েছেন। বিরহের প্রবল তাপে জুলেখার মলিন আবেগ পরিশুদ্ধ হয়। জুলেখা প্রতিমাপূজা ত্যাগ করে ইসলামে দীক্ষা গ্রহণ করেন। তারপর ইউসুফ তার প্রতি আগ্রহী হলেও সাক্ষাতে জুলেখার অভূতপূর্ব সংযম তার চরিত্রকে করে তোলে মোহময়, অনিন্দ্য। প্রেমিকের মহিম মিলনের মধ্য দিয়ে রচিত হয় কাব্যের পরিণতি। দয়িতার প্রেম চিত্রায়ণে পরমের প্রেমদশা বর্ণনার যে ঐতিহ্য বাংলাকাব্যে, তার পথপ্রদর্শক ইউসুফ-জুলেখা। শাহ মুহম্মদ সগীরের রোমান্টিক প্রণয়কাব্য ইউসুফ-জুলেখা হয়ে উঠেছে বাংলা সাহিত্যের একটি নবযুগের মুকুট। ড. মুহম্মদ এনামুল হকের (১৯০২-১৯৮২) মতে, মুহম্মদ সগীর ছিলেন গৌড়ের সুলতান গিয়াসউদ্দীন আজম শাহের (১৩৮৯-১৪১০) সভাকবি। তার আদেশেই কাব্যটি রচনা করেন তিনি। কবি ছিলেন পঞ্চদশ শতকের মানুষ। সে বিচারে গ্রন্থটি জামীর অনুবাদ হওয়ার সুযোগ নেই। কিন্তু গবেষকদের অনেকেই শাহ মুহম্মদ সগীরকে ষোড়শ শতকের কবি হিসেবে চিহ্নিত করেন। গ্রন্থটিতে পৃষ্ঠপোষক সুলতান গিয়াসুদ্দিনকে বোঝাতে ‘গ্যেস’ শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে। কিন্তু কে এই গ্যেস? সেকালে পাঁচজন গিয়াসুদ্দিনের নাম পাওয়া যায়। তারা হলেন-
(১) গিয়াসুদ্দিন ইউজ (১২১১-১২২৬ )
(২) গিয়াসুদ্দিন আজমশাহ (১৩৮৯-১৪১০ )
(৩) গিয়াসুদ্দিন মাহমুদ শাহ ( ১৫৩৩-১৫৩৮)
(৪) গিয়াসুদ্দিন জালালশাহ (১৫৬১-১৫৬৩ )
(৫) তৃতীয় গিয়াসুদ্দিন (১৫৬৩-১৫৬৫)
ধারণা করা হয়, আজম শাহের পরবর্তী কোনো শাসকের আমলেই গ্রন্থটি রচিত হয়ে থাকবে, যার নাম গিয়াসউদ্দীন।
অধ্যাপক সুখময় চট্টোপাধ্যায় ঢাকায় যে পুঁথিটি পেয়েছিলেন, সেখানে দেখেন ‘গ্যেছ’ বা ‘গ্যেস’ নয়, শব্দটি আসলে ‘যেহ্ন’।
‘যেহ্ন’-পন্থি সমালোচকরা বলেন- জামীর কাব্যের সঙ্গে সাগীরের কাব্যের আত্মিক মিল সর্বাধিক। ঠিক জামীর অনুকরণে এ কাহিনিকাব্যে ধর্মভাবের পাশাপাশি মানবপ্রেমের আবেগ-উচ্ছ্বাস প্রকাশিত হয়েছে। এর সঙ্গে ইসলামের বিজয়গৌরবও কীর্তিত হয়েছে। গ্রন্থের শেষে রয়েছে ইউসুফের ভ্রাতা ইবন আমিন ও বিধুপ্রভার অলৌকিক প্রেমকথা, যা শাহ সগীরের সংযোজন।
সপ্তদশ শতকে লেখা আবদুল হাকিমের (১৬২০-১৬৯০) ইউসুফ-জুলেখা এ বিষয়ক দ্বিতীয় কাব্য। এরপর শায়ের গরিবুল্লাহ (আনু. ১৬৮০-১৭৭০) লেখেন তৃতীয় কাব্যটি। এ ধারা এত জনপ্রিয় হয় যে, সুকুমার সেন (১৮৯৮-১৯৬৩) বাঙ্গালা সাহিত্যের ইতিহাস এ (প্রথম খণ্ড, পৃ. ৯৪৪) জানান, উনিশ শতকেও এ ধারার কাব্য হিন্দু-মুসলিম সমাজে আদৃত ছিল। হরিমোহন কর্ম্মকার মূল ফারসি থেকে ইউসুফ-জুলেখার কাব্যানুবাদ করেন বাংলায়। এটি প্রকাশিত হয় ১৮৫৫ সালে। কাছাকাছি সময়ে গোলাম সফাতউল্লাহ, সাদেক আলী ও ফকির মোহাম্মদ ইউসুফ-জুলেখা কাব্য রচনা করেন। তাদের মধ্যে প্রথম দু’জন বাংলা এবং অন্যরা দোভাষী পুঁথির মিশ্র ভাষা ব্যবহার করেন। এ ধারা এমনকি উনিশ শতকের আধুনিক বাংলা কাব্যকেও সঞ্জীবিত রেখেছে। যার নজির হতে পারে বিগত শতকের পঞ্চাশ দশকের অগ্রগণ্য কবি মোহাম্মদ মাহফুজউল্লাহর (১৯৩৬-২০১৩) অনবদ্য কবিতাগ্রন্থ জুলেখার মন (১৯৫৯) । যেখানে কবির তন্ময় উচ্চারণ-
দক্ষিণের বাতায়নে আসে স্নিগ্ধ মালতীর ঘ্রাণ,
সুন্দরী জুলেখা জাগে একা রাত্রি নৈঃশব্দ্যের বুকে
.... ....
কে যেন একাকী এসে বলে তাকে একান্ত অস্ফূটে
অরণ্যের গন্ধ মেখে প্রেমিকের স্বপ্ন নিয়ে মনেঃ
‘প্রেমের অজগ্র ফ্রল তুলে নেবো আমরা দু’জন’
মালতীর সুরভিতে জেগে ওঠে জুলেখার মন !
এই যে মালতীর সুরভিতে জেগে ওঠা জুলেখার মন, বাংলা কাব্যে সেই সুরভি ও মনের কেন্দ্র ছিল জামীর ইউসুফ-জুলেখা এবং তার পূর্ববর্তী নিজামীর ইউসুফ জুলেখা। কিন্তু বহু শতকের ধারায় জামীর অনুকরণই হয়েছে বেশি।
জুলেখার প্রণয়ব্যাকুলতা, প্রণয়ীর কাছে আত্মসমর্পণ, প্রত্যাখ্যাত হৃদয়ের জ্বালা, প্রণয়পাত্রকে আঘাত করার প্রবৃত্তি এবং সেই আঘাতজনিত বেদনায় আত্মদহন, জামীর কাব্যে যে ভাবতরঙ্গ তৈরি করে, তা শত শত বছর ধরে বহু কবির মেধা বিনিয়োগের মধ্য দিয়ে বাংলা ভাষা ও বাঙালিকে অভিভূত ও ব্যাকুল করে রাখে। অন্যদিকে ইউসুফের স্বাভাবিক নীতিবোধ, সহানুভূতি, লিপ্সাদমন, আত্মনিয়ন্ত্রণ ও নিজের বিরুদ্ধে বিজয় মানবীয় পবিত্রতার যে স্বচ্ছ-উচ্চ চিত্র নির্মাণ করে, তা পরিশ্রুত জীবনের দিকে আহ্বান করেছে বাঙালিকে। অন্যদিকে কাহিনিদেহের অভ্যন্তরে খোদাই করা আছে ভাববাদী জীবনাবেদনের ছাপ, যার প্রভাব বাংলা সাহিত্যের গতিপ্রবাহে যুক্ত করেছে বিবিধ বৈশিষ্ট্যের জলবায়ু, যার কেন্দ্রে আছে মানুষ ও মানবীয় জীবন।