ঢাকা শুক্রবার, ১২ জুন ২০২৬, ২৯ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ | বেটা ভার্সন

বর্তমান প্রেক্ষাপট ও আলেম সমাজের করণীয়

ড. মওলানা মুহাম্মদ ঈসা শাহেদী
বর্তমান প্রেক্ষাপট ও আলেম সমাজের করণীয়

আরবি ওলামা শব্দের একবচন আলেম। আলেম মানে জ্ঞানী, প্রাজ্ঞব্যক্তি। যারা সরাসরি আরবি ভাষা পড়ে কোরআন-হাদিসের অর্থ ও মর্ম উদ্ঘাটন এবং বিশ্লেষণ করতে পারেন, তাদেরই সাধারণভাবে আলেম মনে করা হয়। একটু গভীরে গেলে বুঝতে পারব যে, শুধু আরবি ভাষাজ্ঞান বা কোরআন-হাদিসের সরাসরি ইলমের অধিকারী হলে আলেম হওয়া যায় না, বরং ইলমের সঙ্গে আমল থাকা একান্ত জরুরি। আমল মানে কোরআন-হাদিসের জ্ঞান ও শিক্ষা অনুযায়ী নিজের জীবন পরিচালনা করা। আমলের অপর নাম তাকওয়াপূর্ণ জীবনযাপন। তাকওয়া মানে আল্লাহর প্রতি ভালোবাসাপূর্ণ ভয়।

আমাদের দেশের মাদ্রাসাগুলোতে ইলম চর্চার সঙ্গে সঙ্গে আমলের বা তাকওয়ার অনুশীলন করার রেওয়াজ ছিল, এখনও অনেক জায়গায় আছে। মাদ্রাসার ছাত্ররা পবিত্রতা, নামাজ-রোজা, হালাল-হারাম বেছে চলা প্রভৃতি গুণের দীক্ষা পায় মাদ্রাসায় পাঠ্যজীবনে কঠোর অনুশীলনের মধ্য দিয়ে। একেই বলে শিক্ষার সঙ্গে দীক্ষা। কাজেই আমলবিহীন কোনো আরবি ভাষাজ্ঞানীকে আমাদের সমাজে আলেম বলা হয় না। কারণ পবিত্র কোরআনে আলেমের পরিচয় দিয়ে বলা হয়েছে, ‘তারা আল্লাহকে ভয় করে চলে।’ (সুরা ফাতির : ২৮)।

বিশ্ববিদ্যালয়ে আরবি বা ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগে কিংবা অন্যত্র আরবি ভাষা ও ইসলামি জ্ঞানে যারা শিক্ষিত হয়, তাদের আলেম বলা হয় না। তারা বড়জোর ইসলামি বিশেষজ্ঞ, ইসলামি চিন্তাবিদ বা স্কলার। ইসলামের কঠোর অনুশাসনে তাকওয়াধারী উস্তাদের সরাসরি তত্ত্বাবধানে শিক্ষা ও দীক্ষা লাভের পরিবেশ এসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে থাকে না। তাই তাদের আমাদের সমাজ ইসলামিক স্কলার হিসেবে গণ্য করলেও আলেম হিসেবে মান্য করে না এবং তা যথার্থ।

বস্তুত ওলামায়ে কেরাম সমাজে বিরাট সম্মানের দাবিদার। সমাজ তাদের সম্মান ও সমীহের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখে। আলেমদের এই সম্মান হজরত নবী করিম (সা.) এর পক্ষ থেকে পাওয়া মিরাছি সত্ত্ব। নবী করিম (সা.) এরশাদ করেছেন, ‘আলেমরা হলেন নবীদের ওয়ারিশ। ওয়ারিশ মানে উত্তরাধিকারী। কেউ মারা যাওয়ার পর তার পরিত্যক্ত সম্পত্তির মালিক যে বা যারা হয়, তাদেরই বলা হয় ওয়ারিশ। নবী করিম (সা.) পরিষ্কার করে দিয়েছেন নবীরা দ্বীনার দেরহাম বা বৈষয়িক সহায়-সম্পত্তি বলতে যা বুঝায় তা উত্তরাধিকারী সম্পদ হিসেবে রেখে যাননি। তারা রেখে গেছেন ইলম বা জ্ঞান। যে এই জ্ঞানকে ধারণ করেছে সে এক বিরাট হিসসা (সম্পদ) লাভ করেছে।’ (তিরমিজি, আবু দাউদ ও ইবনু মাজা, মিশকাত : কিতাবুল ইলম)।

হাদিসের ভাষ্য অনুযায়ী আলেমরা শুধু নবী করিম (সা.) এর ওয়ারিশ নন, সব নবীর ওয়ারিশ। তার মানে, যুগে যুগে আল্লাহর নবীরা দুনিয়াবাসীর হেদায়তের জন্য আসমানি ইলমের যে সম্পদ নিয়ে এসেছিলেন, যা কোরআন মজিদে ও হজরত নবী করিম (সা.) এর আচরিত জীবন প্রণালি সুন্নাহর মধ্যে ভাস্বর হয়ে আছে তার উত্তরাধিকার ওলামায়ে কেরামের কাছে। যুগে যুগে ওলামায়ে কেরাম সেই দায়িত্ব যথাযথ পালন করেছেন। তারা দুনিয়ার আরামকে হারাম করে দিবানিশি গবেষণা, ইলম ও আমলের চর্চার মাধ্যমে মানব জীবনের প্রতিটি দিক বিভাগের জন্য জ্ঞানভান্ডার রেখে গেছেন। দুনিয়ার গ্রন্থাগারগুলোতে সংরক্ষিত এবং এখনও মাদ্রাসা অঙ্গনে পাঠ্য হাজারো লাখো শিরোনামের কিতাব যুগে যুগে আলেমদের খেদমত ও অবদানের কালজয়ী সাক্ষী।

ইদানীং একটি শ্রেণি কোরআন-হাদিসের গবেষণা ও চর্চায় ওলামায়ে কেরামের এই অবদানকে অস্বীকার করার দুঃসাহস দেখাচ্ছেন। তাদের একটি পরিচয় যে কোনো হাদিসকে নিজেদের মতবাদের বিপরীত মনে হলে যয়িফ, মওজু, নকল প্রভৃতি নামে এবং কথায় কথায় বেদাত আখ্যায়িত করতে এদের রুচিতে বাধে না। তাদের বক্তব্য, আমাদের জন্য নাকি কোরআন-হাদিসই একমাত্র অনুসরণীয়। এ দুইয়ের বাইরে কারা কী বলল না বলল, তার কোনো গুরুত্ব নেই। কথাটি শ্রুতিমধুর এবং সত্য। তবে সত্য হলেও এর পেছনে মতলব খারাপ। এই বক্তব্যের মাধ্যমে তারা ফিকাহ, উসুলে ফিকাহ, ইসলামের ইতিহাস, সাহিত্য ও জ্ঞান মনীষার অন্যান্য ক্ষেত্রে মুসলিম মনীষীরা যে অবদান রেখেছেন, ঐতিহ্যের যে সৌধমালা গড়ে তুলেছেন তার গুরুত্ব অস্বীকার করতে চান। জিজ্ঞাসা করি, আপনারা যে কোরআন-হাদিসের কথা বলেন, যুগে যুগে ইমামরা, আলেমরা ও বুজর্গানে দ্বীনের মধ্যস্থতা না হলে চৌদ্দশ’ বছর পরে আমরা-আপনারা কোরআন-হাদিস কীভাবে লাভ করতাম। তাদের বদৌলতেই তো আমরা কোরআন-হাদিস ও ইসলামি জ্ঞানের ধারাবাহিকতা লাভ করেছি। এমনকি মুসলমান হিসেবে পরিচয় দিতে পারছি।

বনু তামিম গোত্রের সর্দার ওতারেদ ইবনে হাজেব ইবনে যুরারা তার গোত্রের একটি দল নিয়ে মদিনায় আসার ঘটনা ইতিহাসে প্রসিদ্ধ। এই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতেই সুরা হুজুরাত নাজিল হয়। ওতারেদ এক পর্যায়ে নবীজির প্রতি চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়ে বলে, আমাদের বক্তা ও আমাদের কবি আপনার চেয়ে শ্রেষ্ঠ। নবীজি (সা.) সেই চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করেন। বাগ্মী ওতারেদ নিজেই বক্তৃতা শুরু করে। নবী করিম (সা.) তার বক্তৃতার জবাব দিতে বলেন সাবেত ইবনে কায়স (রা.)-কে।

বক্তৃতা প্রতিযোগিতায় পরাস্ত হয়ে ওতারেদ তাদের জাতীয় কবি যেবেরকানকে তুলে দেয় কাব্যকলার সাহায্যে ইসলামের ওপর বনু তামিম গোত্রের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণের জন্য। কবি যেবেরকান তার কবিতা শেষ করলে নবীজি হাসসান ইবনে সাবেত (রা)-কে ডেকে পাঠান কবিতার মাধ্যমে তাদের জবাব দেয়ার জন্য। এই ঘটনা সিরাতে ইবনে হিসামসহ সব সিরাতগ্রন্থে উল্লেখিত আছে। কবিতার বিষয়বস্তু বা বিবরণ আমার উদ্দেশ্য নয়। আমি বলতে চাই, নবী করিম (সা.) সাহিত্য চর্চার জন্য অনুমতি দিয়েছেন ও বিভিন্নভাবে উৎসাহিত করেছেন। যারা কোরআন-হাদিস ছাড়া আর কিছুর চর্চা উচিত নয় বলেন, তারা এই ইতিহাসকে কীভাবে অস্বীকার করবেন। নবীজি (সা.) তো এমন কথা বলেননি যে, আমাদের কোরআন ও হাদিস আছে। সাহিত্য বা কবিতা চর্চার প্রয়োজন আমাদের নেই। ইসলামের শ্রেষ্ঠত্ব অনুধাবন করতে চাইলে তোমরা কোরআন-হাদিসই চর্চা কর। আমাদের বুঝতে হবে যে, যুগের চাহিদার পরিপ্রেক্ষিতে ইসলামের শ্রেষ্ঠত্ব তুলে ধরার জন্য যে কোনো মাধ্যম ব্যবহার করা নবীজির সুন্নত। সাহিত্য-সংস্কৃতি সাংবাদিকতা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির চর্চা এরই অন্তর্ভুক্ত।

বর্তমান সময়ে ঐতিহ্যগতভাবে দুটি ক্ষেত্রে আলেম সমাজের সরব উপস্থিতি রয়েছে। একটি ওয়াজের ময়দান। দ্বিতীয়টি জুমার খোতবার মিম্বর। প্রশ্ন হলো, আমরা কী এই দুটি প্ল্যাটফর্মকে ইসলামের সৌন্দর্য ও শ্রেষ্ঠত্ব তুলে ধরার জন্য ব্যবহার করতে পারছি? ওয়াজের মাঠে তো এখন ইসলামের সৌন্দর্য তুলে ধরার চেয়ে পারস্পরিক কাদা ছোড়াছুড়ি বেশি হয় বলে শোনা যায়। আমি বন্ধুদের পরামর্শ দিয়ে থাকি। আপনি যখন মসজিদের মিম্বরে দাঁড়ান তখন আপনি গোটা উম্মতের সামনে নবী করিম (সা.) এর প্রতিনিধি। আপনার রাজনৈতিক চিন্তা-চেতনা যাই থাকুক, মিম্বরে দাঁড়িয়ে গোটা জাতির কথা চিন্তা করে কথা বলতে হবে। কোরআন ও সুন্নাহ থেকে দিকনির্দেশনা থাকতে হবে সর্বস্তরের মানুষের হেদায়তের জন্য। কোনো অবস্থাতেই এমন সুরে কথা বলা যাবে না, এমন ভাষা বা শব্দ ব্যবহার করা যাবে না, যা সাধারণত রাজনীতির মাঠে ভিন্ন ভিন্ন দলের লোকেরা ব্যবহার করে থাকেন।

আলেমরা কি শুধু মসজিদের মিম্বর, ওয়াজের মাঠ বা মাদ্রাসার শিক্ষকতা নিয়ে সন্তুষ্ট থাকবেন? বর্তমান যুগটা হলো, প্রচার মাধ্যমের যুগ। শক্তিধর রাষ্ট্রগুলো যুদ্ধ বা অস্ত্রের জন্য যে অর্থ ব্যয় করে, তার চেয়ে বহুগুণ বেশি অর্থ ব্যয় করে প্রচার মাধ্যমের পেছনে। এ ক্ষেত্রে আলেম সমাজের ভূমিকা নিদারুণ হতাশাজনক। সাংবাদিকতা তো ইসলামের নির্দেশ। ‘ইন যা’আকুম ফাসেকুন বিনাবাইন ফাতাবাইয়ানু’ (সুরা হুজুরাত : ৬) দ্বারা যে আদেশটি দেয়া হয়েছে, সাংবাদিকতার মাধ্যমেই তার ওপর আমল করা সম্ভব। দেশের জনগণের চিন্তা ও চেতনা নিয়ন্ত্রিত হয় সংবাদপত্রের মাধ্যমে। আমরা কি সাংবাদিকতাকে ইবাদতের বা সওয়াবের কাজ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছি? একজন বক্তাকে যেভাবে সম্মান দিই, কবি-সাহিত্যিক, লেখক-সাংবাদিককে কি আমরা সেই চোখে দেখি? ফেইসবুক-ইউটিউবে আলেমদের উপস্থিতি আরও হতাশাপূর্ণ। আমার একটি চ্যানেল আছে, ছায়াপথ প্রকাশনী নামে। তাতে প্রধানত মওলানা রুমির মসনবী শরিফের আলোচনাগুলো আপলোড করি। তবে যথাযথ গুরুত্ব সহকারে তার পেছনে আমিও সময় দিতে পারি না। এটি আমার সীমাবদ্ধতা।

সাম্রাজ্যবাদী ইংরেজরা যখন ভারতবর্ষসহ সমগ্র বিশ্ব শাসন করত, তখন খ্রিষ্টানদের মাঝ থেকে আরবি ভাষা ও ইসলামি জ্ঞানে পণ্ডিত ও আলেম তৈরির জন্য লন্ডনে মাদ্রাসা পরিচালনার কথা আমরা শুনে আসছি। এখনও দেখবেন, ইন্টারনেটে এমন কতক ‘শায়খ’ বক্তব্য দিয়ে ইসলাম ও মুসলমানদের সম্পর্কে বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছেন, যাদের নামণ্ডপরিচয় আমরা জানি না। আমাদের আকাবেরিন অপরিচিত লোকদের কাছ থেকে রেওয়ায়েত গ্রহণ করেননি। অথচ নেট দুনিয়ায় কথিত শায়খদের বক্তব্য মানুষ গিলে খাচ্ছে এবং তা দ্বীনের জন্য কত জঘন্য ও ভয়ংকর বলার অপেক্ষা রাখে না। এ ক্ষেত্রে আমাদের অবস্থা : আমরা যারা নিজেদেরকে হক্কানি বা হকের ওপর আছি মনে করি, তারা ওদের জন্য ময়দান ছেড়ে দিয়েছি। আমাদের তরুণ সমাজ ইসলাম সম্পর্কে নানারূপ খারাপ ধারণা নিয়ে বিপথগামী হচ্ছে। কয়েক বছর আগে ঢাকার শাহবাগে ব্লগার নামে একটি গোষ্ঠীর উপদ্রবের কথা আমরা জানি। প্রশ্ন হলো, তাদের জিজ্ঞাসা বা অপপ্রচারের জবাবের জন্য আমাদের প্রস্তুতি কী আছে। কী ভূমিকা রাখতে পারছি, বা আদৌ কি বিষয়টি নিয়ে চিন্তা করি। আমার তো মনে হয়, ইসলাম প্রচারের জন্য সিনেমা তৈরির প্রয়োজনীয়তার বিষয়টি আলেম সমাজের ভেবে দেখা উচিত।

বর্তমানে আরেকটি ফেতনা সৃষ্টি হয়েছে হাদিস ও সুন্নতের মধ্যে বিরোধ ও বিভাজন তৈরি করে। নবী করিম (সা.) এরশাদ করেছেন, আমি তোমাদের মাঝে দুটি জিনিস রেখে যাচ্ছি, একটি আল্লাহর কিতাব অর্থাৎ কোরআন। অপরটি রাসুলের সুন্নত। হাদিসের শাব্দিক অর্থ কথা, উক্তি, বাণী। আর সুন্নতের অর্থ ইংরেজিতে ট্রেডিশন। রাসুলেপাকের আচরিত জীবন প্রণালির যে চিত্র সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত, সেটিই সুন্নত। নবীজি (সা.) একবার যে কথা বলেছেন তা হাদিস। সেই হাদিস বর্ণনা পরম্পরায় কোনো স্তরে একজন বর্ণনাকারী হলেও তা হাদিস হিসেবে গণ্য।

কিন্তু সুন্নাহ অনেক ব্যাপক। রাসুলে খোদার শুধু উক্তি বা বাণী নয়, তিনি যা পালন করেছেন বা নিজের জীবনে বাস্তবায়ন করে দেখিয়েছেন এবং মুতাওয়াতের বা বিপুল সংখ্যক বর্ণনাকারীর দ্বারা প্রত্যেক স্তরে বর্ণিত হয়ে উম্মতের কাছে এসেছে ও সবাই অনুসরণ করেছে সেটিই সুন্নত।

হাদিসের বাণী নিয়ে ব্যাখ্যায় ভিন্নতা থাকা স্বাভাবিক। কিন্তু সুন্নতে রাসুলেপাকের সুন্দর আচরিত জীবনচিত্র পাওয়া যায়। নবী করিম (সা.) বারবার সুন্নাহ অনুসরণের কথা বলেছেন। বলেছেন, ‘তোমাদের ওপর কর্তব্য হলো, আমার ও আমার সৎপথপ্রাপ্ত খলিফাদের সুন্নত অনুসরণ করা।’ সুন্নাহর অপর নাম আদর্শ। নবীজির (সা.) সুন্নাহ বা আদর্শকে দুনিয়ার মানুষের সামনে উপস্থাপন করা এবং তার আলোকে যুগজিজ্ঞাসার জবাব দানের ক্ষেত্রে পুনর্জাগরণ আনার মহান দায়িত্ব পালন করতে হবে আলেম সমাজকে।

সাধারণত ইসলাম ও মুসলমানদের যে কোনো সমস্যার জন্য আলেম সমাজের ওপর দোষ চাপানো হয়। কিন্তু ইসলাম কি শুধু আলেমদের ধর্ম। অন্যান্য ধর্মে পুরোহিতরা ধর্মকর্ম পালন করলে সাধারণ মানুষের পক্ষ থেকে পালন হয়ে যায়। খ্রিষ্টান সমাজে মানুষ পাপ করার পর পাদ্রির কাছে গিয়ে স্বীকারোক্তি বা কনফেশন করলে পাপ মোচন হয়ে যায়। ইসলাম কি এ ধরনের পৌরহিত্যের ধর্ম? নিশ্চয়ই না। ইসলামের বিধিবিধান সর্বস্তরের সব মানুষের জন্য। ইসলামে প্রত্যেকে আলাদা আলাদাভাবে আল্লাহ ও রাসুলের কাছে দায়বদ্ধ এবং ইসলামের বিধিবিধান প্রত্যেকের ওপর আলাদা আলাদাভাবে প্রজোয্য।

কোরআন মজিদে ওলামা বলতে যে পরিচয় দেয়া হয়েছে, তাতে অনেক ব্যাপকতা রয়েছে এবং তার আলোকে সুন্নাহর পুনর্জাগরণে নিজের দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ কোনো শিক্ষিত মুসলমানের নেই। ‘আল্লাহর বান্দাদের মধ্যে যারা জ্ঞানী (আলেম) তারাই তাঁকে ভয় করে।’ এ কথা যে আয়াতের শেষে বলা হয়েছে, সংশ্লিষ্ট দুটি আয়াতের মর্মার্থ অনুধাবন করলে বুঝা যাবে, প্রকৃতি বিজ্ঞানী, উদ্ভিদবিজ্ঞানী, নৃ-বিজ্ঞানী থেকে নিয়ে ভূতত্ত্ববিদ, ইতিহাসবিদ সবাই আল্লাহর ভয়ের গুণে সজ্জিত হওয়া সাপেক্ষে আলেমের কাতারে শামিল। এরশাদ হয়েছে- ‘আপনি কি দেখেন না, আল্লাহ আকাশ থেকে বৃষ্টিপাত করেন এবং আমি তা দ্বারা বিচিত্র বর্ণের ফলমূল উদ্গত করি। আর পাহাড়ের মধ্যে আছে বিচিত্র বর্ণের পথ- শুভ্র, লাল ও নিকষ কাল।

এইভাবে রংবেরঙের মানুষ, জন্তু ও আনআম (গবাদি পশু) রয়েছে। আল্লাহর বান্দাদের মধ্যে যারা জ্ঞানী (আলেম) তারাই তাঁকে ভয় করে। আল্লাহ পরাক্রমশালী।’ (সুরা ফাতির : ২৭, ২৮)।

মোটকথা, আমরা প্রত্যেকে দায়িত্বশীল এবং রাসুলেপাকের সুন্নতের জাগরণে প্রত্যেককে ভূমিকা পালন করতে হবে। এ শতাব্দীর শ্রেষ্ঠ ইসলামি চিন্তানায়ক ড. ইকবাল জওয়াবে শেকওয়া কাব্যের ইতি টেনেছেন একটি উক্তি দিয়ে। সেই উক্তিটি তার হলেও তিনি আল্লাহর পক্ষ থেকে কবিতার ভাষায় ব্যক্ত করেছেন-

কী মুহাম্মদ ছে ওয়াফা তো নে তো হাম তেরে হ্যাঁ

ইয়ে জাহাঁ চিজ হে কেয়া লৌহ ও কলম তেরে হ্যাঁ

‘তুমি যদি মুহাম্মদ (সা.) এর সঙ্গে বিশ্বস্ততার প্রমাণ দাও, তবে আমি খোদা তোমার হয়ে যাব

তখন এই জগৎ তো তুচ্ছ জিনিস, লৌহে মাহফুয ও ঊর্ধ্বলোকের কলমও তোমার মর্জির এখতিয়ারে এসে যাবে। ভাগ্যলিপির ফয়সালা তোমার ইচ্ছার অনুকুলে আসবে।’ (জওয়াবে শেকওয়া)।

পবিত্র হাদিসের একটি বাণী সামনে রাখলেই আল্লামা ইকবালের উপরোক্ত অভিব্যক্তির মর্ম অনুধাবন করা সহজ হবে। এরশাদ হয়েছে- ‘আমার উম্মত যখন ফেতনা ও বিচ্যুতির শিকার হবে, তখন যে ব্যক্তি আমার সুন্নতকে আঁকড়ে ধরবে, তার জন্য রয়েছে একশ শহীদের সমান সওয়াব।’ (তাবারানি)।

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত