ইউরোপে শিল্প ও নগরজীবনের উন্মেষে মুসলিম সভ্যতার প্রভাব
মুসা আল হাফিজ
প্রকাশ : ২১ নভেম্বর ২০২২, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

মুসলিম সান্নিধ্যের আগে স্নানাগার কী জিনিস, জানা ছিল না ইউরোপের। এ সান্নিধ্য তাদের দিল ঘুম থেকে উঠে হাত-মুখ ধোয়ার ধারণা, খাবারের আগে হাত ধোয়া, দিনে-রাতে বার কয়েক হাত-পা-নাক-মুখ পরিষ্কার করার ধারণা, পুকুরের প্রয়োজনীয়তার অনুভব, হাউজের ধারণা ও নমুনা, ফোয়ারা, কলের সাহায্যে পানির ব্যবহার ইত্যাদির ধারণা। প্রস্রাব-পায়খানা করে পানি ইত্যাদি ব্যবহারের ধারণা অপ্রচলিত ছিল ইউরোপে। মুসলিম সান্নিধ্য থেকে ধীরে ধীরে এর প্রচলন হতে থাকে। গৃহাস্থলি আসবাব থেকে নিয়ে নাগরিক জীবনের অসংখ্য উপাদান তাদের দিল এ সান্নিধ্য। বিচিত্র রংয়ের কারুকাজ, ছাদ থেকে ঝুলন্ত বাতির ঝাড়, উন্মুক্ত বেস্টনি চত্বর, খিলানের ব্যবহার, পাথর কেটে নকশা তৈরি, পানি নিষ্কাষণের উন্নত ব্যবস্থা পশ্চিমা নগরজীবনে প্রবেশ লাভ করে। উন্নত স্থাপত্যরীতি সরবরাহ করে প্রধানত স্পেন ও সিরিয়া। সামগ্রিকভাবে মুসলিম প্রভাব থেকে জন্ম নেয় পাশ্চাত্যের গথিক স্থাপত্য, যা দ্বাদশ থেকে ষোড়শ- চার শত বছর ইউরোপের স্থাপত্য শিল্পের শ্রেষ্ঠ আদর্শ হিসেবে পরিগণিত ছিল। ই, টি রিচমন্ড এ সত্যের বিবরণ দেন- অন্ধকার যুগের শেষে ইউরোপে যেসব উন্নত স্থাপত্য নির্মিত হয়, তাতে স্পষ্ট দেখা যায় মুসলিম প্রভাব।
ত্রয়োদশ শতাব্দীতে নির্মিত ফ্রান্সের বিখ্যাত লা সুতেরা গীর্জা ও চতুর্দশ শতকে নির্মিত নরফকের ক্লো গীর্জা সুস্পষ্টভাবে নবম শতকে নির্মিত কর্ডোভার বড় মসজিদের পবিত্র স্থানের অনুকরণে গঠিত। ৮৪৫ খ্রিস্টাব্দে নির্মিত সামারা বড় মসজিদের স্থাপত্যরীতির অনুসরণ দেখা যায় বিখ্যাত ওয়েলস ও সলসবারীর প্রধান গীর্জার প্রবেশদ্বারে। ১০৮৭ সালে নির্মিত কায়রুর বাব আন নসরের অনুকরণ দেখা যায় চতুর্দশ শতকে নির্মিত ভিলেনেভ লা- এভিংগন দুর্ঘে, ৯৩৬ খ্রিস্টাব্দে নির্মিত আযযাহরা প্রাসাদের বিভিন্ন স্থাপনার সাদৃশ্য দেখা যায় পঞ্চদশ শতকে নির্মিত প্যারিস, লন্ডন, ভিয়েনা, লিসবন ইত্যাদির সেরা সব স্থাপনায়। ১১৭২ সালে নির্মিত সেভিলের জিরাল্ড মিনারের কারুকার্য খচিত বুরুজের সম্পূর্ণ অনুকরণ দেখা যায় ১৫৩৩ সালে নির্মিত ইভেশামের বেল টাওয়ারে। ১৪৩১ সালে নির্মিত ভেনিসের ক্য দ্য ওরা প্লাজা, পঞ্চদশ শতকে নির্মিত নরফকের ক্রোমার গীর্জা, ষোড়শ শতকে নির্মিত অক্সফোর্ডের খ্রিস্টীয় গীর্জার বিভিন্ন অংশে সুস্পষ্ট ছাপ রয়েছে ৮৬৮ সালে নির্মিত কায়রোর ইবনে তুলুন মসজিদের, ৯৭০ সালে নির্মিত আল আজহার মসজিদের পারস্য খিলানের, ১২৯৮ সালে নির্মিত কায়রোর জয়নুদ্দীন ইউসুফ টাওয়ারের। মিনারকে অনুসরণ করেই ইউরোপে তৈরি হয় ঘণ্টা ঘর। ১১৭২ সালে তৈরি ভেরেনার ডেল কমিউন বুরুজ, ১৩৯৭ সালে তৈরি দক্ষিণ ইটালির সলেটো বুরুজ, ১৬৬১ সালে তৈরি দক্ষিণ ইটালির লিকসী গম্বুজ, কিংবা ১৬৭১ সালে তৈরি লন্ডনের সেন্ট মেরিলি বার্ড সুস্পষ্টভাবে মিনারের প্রতিকৃতি। ইটালির রেনেসা ক্যাম্পনিলি কিংবা রেন এর সুদর্শন সিটি স্টাপল স্থাপত্যেরই দূরবর্তী দলিল।
মার্টিন এস ব্রিগস তার ‘মহামেডান আর্কিচেকচার এটস্টেরা’ প্রকাশ : ১৯২৪, অক্সফোর্ড এ লিখেন- ‘মুসলমানরা অট্টালিকা ও মসজিদের সৌন্দর্য বর্ধনের জন্য স্বর্ণ, রুপা, হাতির দাঁত ও মূল্যবান পাথর খচিত কাঠের তৈরি অপরূপ দরোজা-জানালা তৈরি করতেন। তৈরি করতেন বাক্স ও বিভিন্ন আসবাবপত্র। তাদের কাঠের কাজের সেরা নিদর্শনের একটি হলো কর্ডোভা মসজিদের ছাদ। এ তাদের সুক্ষ্মতা ও শিল্পনৈপুণ্যের জীবন্ত উদাহরণ। প্রাচ্যের শিল্পদক্ষতার একটি উদাহরণ প্রথম আবদুর রুমোনের শাসনামলে নির্মিত এবং পরবর্তীকালে দশম শতকে অন্য সাতটি গীর্জার মূল অংশে কাঠের তৈরি ছাদে শিল্পীদের জ্যামিতিক চিত্রাঙ্কণ। কাঠের কাজের আরেকটি সেরা উদাহরণ কর্ডোভা মসজিদের নয় ধাপ বিশিষ্ট মিম্বর। মূল্যবান পাথরে আবৃত, স্বর্ণ ও রুপার পেরেক দ্বারা যুক্ত, আবলুস কাঠ, বাক্স কাঠ এবং সুগন্ধি কৃতকুমারী কাঠ দ্বারা তা নির্মিত হয়েছিল। ষোড়শ শতকে কাঠ দ্বারা কর্ডোভা গীর্জার বেদী নির্মিত হয়েছিল। চর্ম ও অন্যান্য ধাতব শিল্প ইউরোপে বহন করে নেন মুসলিমরা।
ই. টি রিচমন্ড তার মুসলিম ‘আর্কিটেকচার’ (প্রকাশ : ১৯২৬ লন্ডন) এ লিখেন- ‘একাদশ শতকের ফরাসী নথিপত্রে জুতা তৈরির শিল্পীরা কর্ডোনিয়ার্স এবং চামড়াশিল্প কর্ডোনান নামে পরিচিতি পায়। এখনও কর্ডোয়ান, কউউইন, স্পেন ও চামড়া এবং কউউইনার্স (জুতা তৈরির শিল্পী) ফরাসী শব্দ ইঙ্গিত করে যে ইংল্যান্ড ও ফ্রান্স চামড়া পাকা ও খোদাই করার কৌশল স্পেনের আরবরা প্রচণ্ড শীতের প্রকোপ থেকে বাঁচতে শুধু চামড়ার জ্যাকেটই তৈরি করতেন না, তারা আইভরি ও রুপার পাতে ঢাকা বাক্স, কোমর বন্ধনী, তরবারির খাপ, ঢাল ইত্যাদি ও তৈরি করত। কর্ডোভা, মুর্সিয়া এবং মেডিনাসেলির কারখানাগুলোতে তৈরি হতো উন্নতমানের ধাতব পণ্য। নূরুল আমীন লিখেন- ধাতু ব্যবহারের উৎকর্ষ সেলজুক আমলের কিছু নিদর্শন থেকে জানা যেতে পারে। এ সময় এক ধাতুর পাত্রের গায়ে খোদাই করে অন্য ধাতু বসিয়ে নকশার কাজে যথেষ্ট উন্নতি হয়। সাধারণত কাসা ও পিতল দিয়ে এক ধরনের পাত্র তৈরি হতো। এসব ধাতু পাত্রের গায়ে নকশা করে তার মধ্যে তামা ও রুপার তার পিটিয়ে বসানো হতো। অনেক সময় দামি পাথর ও এ কাজে ব্যবহৃত হতো। ১৫ ‘মুসলিম স্পেনীয় স্বর্ণকাররাও সুখ্যাতি অর্জন করেন। এসব চারুশিল্পী অন্যান্য ধাতব পদার্থের ওপর কারুকার্যেও কম দক্ষতার পরিচয় দেননি। দৃষ্টান্ত স্বরূপ মিনা করা ও খোদাই করা তরবারির বাঁট এবং দৈনন্দিন কাজে ব্যবহৃত লোহার তালা-চাবি ইত্যাদির উল্লেখ করা যেতে পারে। শেষোক্ত ক্ষেত্রে তালার রেপের ওপর বর্গাকৃতির কুফী হস্তলিপির অনুরূপ লেখা খোদাই করা হতো।
সিরামিক শিল্প মুসলিমদের হাতে বিশেষ মাত্রা লাভ করে। বাগদাদ ও আশপাশের কারিগররা সিরামিক শিল্পের জন্য প্রয়োজনীয় চিনামাটি পেতেন না। এর বিকল্প হিসেবে কাচ উৎপাদক বস্তুর সঙ্গে টিন অক্সাইড মিশিয়ে গ্লেজ করতেন। এ গ্লেজ করাকে এনামেল বলা হয়। এখানকার কারিগররা গ্লেজ করা পাত্রের উপর ধাতুর দীপ্তি দিতে জানত। একে বলা হয় চমক পদ্ধতি (lustre Technigue) এরা রুপা ও তামার অক্সাইড রজনের সঙ্গে মিশিয়ে তপ্ত করত। এভাবে তপ্ত করলে ধাতব যৌগিক ও রোজিন যৌগিক মিলে রজন যৌগিক সৃষ্টি হয়। এই যৌগিক তারপিন জাতীয় তেলে গুলে পাত্রের গায়ে লাগালে সোনালি প্রলেপ সৃষ্টি হয়। এ রকম পাত্রে অঙ্কন করা হতো লিপি ও নকশা। সেলযুক আমলে এ শিল্প আরও উন্নত হয়। সিরামিককে উন্নত করার জন্য বিভিন্ন ধাতু ও রসায়নিক পদার্থ ব্যবহৃত হয়। কোয়ার্টজ, সোডা, পটাশ, লবণ, বালি, সীসা, সিলিকা ধাতব অক্সাইড, তামা, কপার, ফেরিক আইরন ইত্যাদির বহুমাত্রিক ব্যবহার হতে থাকে। উন্নত শিল্পজ্ঞান ও সুনিপুণ কারিগর দক্ষতার কল্যাণে মুসলিম সিরামিক পণ্য সারা বিশ্বে একক মনোপলি অর্জন করে। শহরে-নগরে গড়ে উঠে এ শিল্পের ব্যাপক বাজার। লাখ লাখ নাগরিক যুক্ত হন এর সঙ্গে। মুসলিমরা আবিষ্কার করেন টিন অক্সাইডের প্রলেপ পদ্ধতি। এ কৌশল থেকেই ইউরোপের বহুল প্রচলিত ‘মেজোলিকা’ এবং ‘ডেলকট’ নামক অলংকরণ শিল্পের উদ্ভব হয়।
কাচ শিল্প এ সময়ে লাভ করে অসামান্য বিকাশ। প্যারিস, লন্ডন ও বার্লিনের জাদুঘরে রয়েছে-এর নিদর্শন, যা আজও বিস্ময় জাগায় দর্শকের চোখে। ইরাকের সামারা, মসুল, নাজাফ, বাগদাদ, সিরিয়ার আলেপা, রাক্কা, আরমানাজ, টাইর, সিডন, আকরি, হেবরন, রাসাফা, মিসরের কায়রো, আলেকজান্দ্রিয়া, মরক্কোর বিভিন্ন শহর ও স্পেনের শিল্পকেন্দ্রগুলো ছিল কাচ তৈরির প্রধানকেন্দ্র। ইউরোপ উন্নত কাচ তৈরির প্রযুক্তি লাভ করে মুসলিম বিশ্ব থেকে। ১২৭৭ সালের জুন মাসে সপ্তম বোহেমিয়ানের সঙ্গে এন্টিয়কের রাজপুত্র এবং ভেনিসের শাসকের মাঝে প্রযুক্তি বিনিময় চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এই চুক্তি অনুসারে কাচ নির্মাণের গোপন প্রযুক্তি ও জরুরি যন্ত্রপাতি সিরিয়া থেকে ভেনিসে আনতে হবে। প্রয়োজনে নিয়ে আসতে হবে আরব কারিগরদের। তিন শাসকের এ গোপন চুক্তির উদ্দেশ্য ছিল বাকি ইউরোপের অজ্ঞাতসারে কাচশিল্পের একচেটিয়া বাজার নিজেদের করে নেয়া। ১৭ শতকে ভেনিসের প্রযুক্তি থেকে ফ্রান্সে কাচশিল্পের নতুন যুগ শুরু হয়। মুসলিমরা স্ফটিকের সামগ্রী ব্যবহারে উৎসাহ দিতেন। ইবনে ফিরনাস প্রবর্তন করেন কাচ ব্যবহারের নতুন কৌশল। স্পেনের আলমেরিয়া, মুর্সিয়া ও মালাগাতে গড়ে উঠে কাচশিল্পের বিশাল বাজার। কয়েক শতাব্দী ধরে ইউরোপ ছিলো সেই বাজারের ভোক্তামাত্র।
কর্ডোভার বস্ত্রকলে কার্পেট, কারুকার্যময় বস্ত্রাদি, বিচিত্র পোশাক ও সম্মানসূচক লেবাস তৈরি করা হতো। নবম শতাব্দীর মধ্যভাগে স্পেনের বস্ত্রশিল্প ইউরোপকে আকর্ষণ করে। রেশমী ও অন্যান্য কাপড় বুনন ও বাণিজ্যে তাদের অবস্থান ছিল সবার ওপরে। আলমেরিয়ার হুলাল দিবাজ, ইসকালাতুন, ইসকাহানী জুরজানী প্রভৃতি বস্ত্র, সর্বোৎকৃষ্ট মানের পর্দা, চিনচিল্লা ও কুয়েঙ্কা-এর পশমী কম্বল ও কার্পেট ছিল অত্যন্ত জনপ্রিয়। কর্ডোভা, আলমেরিয়া, সারাগোসা, ভ্যালেন্সিয়া, গুয়াডিক্স, বাজা, মুর্সিয়া আলিকান্টে, ক্যাসিলিয় দ্য পেড্রো, চিনচিল্লা কুয়েঙ্কা, শাশিন, এলচি মালাগা, বেজা, মেয়রটোলা, সান্টারেন, প্রভৃতি প্রসিদ্ধ হয়ে উঠে শিল্পনগরী হিসেবে। এক আলমেরিয়াতেই ছিলো ৪৮০০ তাঁতকেন্দ্র। রেশমি ও লিনেন বস্ত্রের মধ্যে বিশেষ উল্লেখযোগ্য ছিল তীরায, (যাতে কুফিক লিপিতে থাকত ব্যক্তিত্বের নাম), দীবায (অংকন ও অলঙ্করণ দ্বারা সৌন্দর্যমণ্ডিত). আালওয়াশী (বর্ণিল বস্ত্র), আতাবী (বাগদাদী প্যাটার্নের পোশাক), ইসকালাতুন (সুক্ষ্ম রেশমী টিস্যু), আল মাথাজির (অত্যন্ত সুন্দর উজ্জ্বল, ছোট মস্তকাবরণী), গিফরাহ (বিশেষ পাগড়ী), নাশীজ, হুলাল, জুরজানী, ইসফাহানী এবং জিন আল মুলাব্বাদ উচ্চ ও মনোমুগ্ধকর রঙের এক ধরনের গাউন।
গ্রানাডা থেকে রেশমী কাপড় ইউরোপীয় অঞ্চলে প্রেরণ করা হতো। মুসলিম দেশগুলো থেকে ইউরোপীয় অঞ্চলে রেশমী কাপড়ের রপ্তানি বেড়ে যাওয়ায় ব্যবসায়ীরা এ শিল্পকে লাভজনক মনে করে ফ্রান্স ও ইতালির বিভিন্ন জায়গায় বস্ত্রকল স্থাপন করেন। এ সব কারখানা মুসলিম বিশেষজ্ঞদের অধীনে পরিচালিত হত।
চর্তুদশ ও ষোড়শ শতাব্দীতে ইউরোপীয় বস্ত্রশিল্পে ইসলামি প্রভাবের বহু চিহ্ন খুঁজে পাওয়া যায়। ধাতু, কাচ, মৃৎশিল্প, স্থাপত্য এবং সাজসজ্জার অনেক ক্ষেত্রেও মুসলিম প্রভাব বিদ্যমান ছিল। ইউরোপের তাত শিল্পে ইসলামি নকশার ব্যবহার শুরু হয় প্রকৃতপক্ষে দ্বাদশ শতাব্দী থেকে।
কাগজ শিল্প দ্বারা মুসলিমরা সূচনা করেছিলেন নতুন যুগের। পি. কে. হিট্রির ভাষায়- ‘স্পেনে স্থানীয়ভাবে লেখার কাগজ উৎপাদন না হলে সেখানে বইয়ের বিপুল সমাবেশ তৈরি হতো না। সেখানে এই কাগজের উৎপাদন ছিল ইউরোপীয় সভ্যতায় ইসলামের মহোত্তম অবদানগুলোর অন্যতম। (৫৬৪) ৭১২ খ্রিস্টাব্দে সমরকন্দ দখলের পর মুসলমানরা চীনাদের কাছ থেকে কাগজ তৈরির পদ্ধতি আয়ত্ব করেন। স্পেনের মুসলমানরা কাগজ তৈরির কারখানা স্থাপন করেন ৯৫০ সালে। এর আগে, ৭৯৪ সালে বাগদাদে কাগজ কারখানা তৈরি হওয়ার পর মুসলিম বিশ্বজুড়ে-এর প্রসার ও ব্যাপকতা ছড়িয়ে পড়েছিল। এর এক হাজার বছর পরে, ১৭৯৮ সালে ইউরোপে তৈরি হয় প্রথম কাগজকল। তৈরি করেন ফ্রান্সের রবার্ট লুই। স্পেনের ‘শাতেবা’ নগরী ছিল কাগজশিল্পের প্রাণকেন্দ্র। হাজার হাজার শ্রমিক এই শিল্পের সঙ্গে জড়িয়ে ছিলেন নানাভাবে। ইউরোপ দাবি করে জার্মানির গুটেনবার্গ ছাপাখানার উদ্ভাবন করে সভ্যতার জন্য নতুন দরোজা খুলে দিয়েছেন। অথচ এর চারশত বছর আগে স্পেনীয় আরবরা ছাপাখানার প্রচলন ঘটান। হিজরী চতুর্দশ শতকের সুলতান নাসিরের প্রধানমন্ত্রী আবদুর রহমান বিন বদর রাষ্ট্রীয় ফরমান লিখে ছাপানোর জন্য পাঠাতেন এবং মূদ্রিত কপি প্রেরণ করতেন বিভিন্ন অঞ্চলে।
কাগজ শিল্পের জন্য বিখ্যাত ছিল স্পেনের শাহদানজ শহর। সেখান থেকে কাগজ রপ্তানি হতো ফ্রান্স, ইটালি ও ব্রিটেন অবধি। ক্যাস্টাইলে এ প্রযুক্তি যায় ত্রয়োদশ শতকে, বিজ্ঞ আলকন্সো কর্তৃক। ফ্রান্সে কাগজ কল তৈরি হয় ১২৭০ সালে। তবে কাগজ ও মুদ্রণশিল্প প্রতিষ্ঠা পায় আরও কয়েক শত বছর পরে।
অস্ত্রনির্মাণ কারখানা ছিল প্রচুর। প্রায় প্রত্যেকটি শহরে ছিল ধাতুশিল্পের কারখানা এবং সামরিক গুরুত্বসম্পন্ন প্রতিটি সুরক্ষিত নগরে অস্ত্রশস্ত্র ও যুদ্ধের সাজসরঞ্চাম নির্মাণের শিল্প ছিল সুপ্রতিষ্ঠিত। কামান, গোলাবারুদ, ঢাল, তরবারি, বর্শা, শিরস্ত্রান ইত্যাদি তৈরি হতো শহরে শহরে। বিখ্যাত কারখানাগুলো ছিল কর্ডোভা, মুর্সিয়া, সারাগোসা, মেদি-নাসেলী, সেভিল, টলেডো, আলমেরিয়া, গ্রানাডা ইত্যাদিতে। অস্ত্রশাস্ত্রের মধ্যে অতি উৎকৃষ্ট তরবারি ও ইস্পাতের বর্ম স্পেনে তৈরি হত। লোহা ও ইস্পাতের সর্বাধুনিক ব্যবহার প্রণালী উদ্ভাবন করে এসব শহর। শহরের সুরক্ষার জন্য লোহার দরোজা তৈরি হত। বাসনপত্র প্রবেশদ্বার ইত্যাদি নির্মাণে ব্যবহৃত হতো লোহা। ব্রোঞ্জ শিল্পের উন্নতি লাভ করেছিল বিশেষমাত্রা। এক যাহরা প্রাসাদ সাজাতে ১২টি ধাতব সিংহ নির্মাণ করা হয়েছিল। প্রতিটি সিংহের মুখ থেকে বের হত পানির ফোয়ারা। ব্রোঞ্চে গাছপালা- ইত্যাদি আজ ও কর্ডোভার জাদুঘরে তৎকালীন শিল্পের জয় ঘোষণা করছে।
সীসা-তামা ও পাথর দ্বারা বিভিন্ন সামগ্রী তৈরির কারখানা গড়ে উঠেছিল। লোহা ও ইস্পাত দ্বারা কৃষিশিল্পের ও গৃহাস্থলি যন্ত্রপাতি এবং যুদ্ধাস্ত্র তৈরি হত। লম্বা সীসার পাইপ তৈরি করা হত পানি সরবরাহের জন্য। ডক্টর এম আবদুল কাদির লিখেছেন- সাত মাইল দূরত্বের এক অত্যুচ্চ পয়ঃপ্রণালী দিয়ে সুদূর সিয়েরার জলধারা থেকে শহরে পানি আসত। সীসা নির্মিত নলের দ্বারা তা বিভিন্ন মহল্লার পৌঁছে যেত। বহু ঘটনাবহুল যুগের বিপর্যয় এবং ৯টি শতাব্দি ধরে অবিরাম ব্যবহারজনিত ক্ষয়প্রাপ্তির পরেও খলিফা দ্বিতীয় হাকিমের জলযন্ত্রগুলো আজও প্রায় সম্পূর্ণ অক্ষত রয়ে গেছে। তার নির্মিত মর্মরের চৌবাচ্চাগুলো এখন ও খ্রিষ্টানদের পানি যোগাচ্ছে। আসকার ইবনে শায়খের ভাষায়- ‘মাটি খুঁেড় উত্তোলন করা হত স্বর্ণ-রুপা-লোহা-পারদণ্ডসুর্মা-গন্ধক- অংশুল খনিজ পদার্থ এবং মার্বেল ও বহুমূল্য পাথর। ডুবুরিরা মুক্তা তুলে আনত পারস্য উপসাগর হতে। যান্ত্রিক উদ্ভাবনী ক্ষমতায় আরবরা তখন সুনাম অর্জন করেছে রাজতন্ত্রীয় শাসনের প্রাথমিক পর্যায়ে। জলঘড়ি নির্মাণ তার প্রকৃষ্ট প্রমাণ। ফরাসী সম্রাট শার্লেমেনের কাছে এক জলঘড়ি উপটোকন পাঠিয়েছিলেন খলিফা হারুন অর রশিদ।’
মানুষের আকাশে উড়ার প্রথম বিশেষ ধরনের পাখা আবিষ্কার করেন স্পেনের হাকিম আব্বাস বিন ফিরনাস। বাহুতে এ পাখা লাগিয়ে মানুষ সহজেই শূন্যে উড়ে যেতো। ঘর্ষণ ও পালিশ শিল্পের সঙ্গে স্পেনীয় আরবদের নাম জড়িয়ে আছে। তারাই হালকা ও গাঢ় রং আবিষ্কার করেন ও জাহাজে করে তা বিদেশে রপ্তানি করেন। টেলিগ্রাম, দিগদর্শন যন্ত্র, ৩২ ফুট ঊর্ধ্বে পানি তোলার উপযোগী নলকূপ তাদেরই আবিষ্কার।’ ৪২৪ এগুলোকে কেন্দ্র করে নতুন শিল্পব্যবস্থা বিকশিত হয়।
