ইসলামে বিয়ে ও সংসার
মীযান মুহাম্মদ হাসান
প্রকাশ : ০৫ জানুয়ারি ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

ইসলাম সব যুগে সমস্যার সমাধানে অনন্য এবং অতুলনীয়। ভারসাম্যপূর্ণ ও জীবনঘনিষ্ঠ ইসলামের এক একটি বিধান। তাই ইসলামে নেই কোনো বৈরাগ্যবাদ। ধর্ম ও সংসার ত্যাগ করে সন্নাসী জীবন যাপন করারও কোনো অনুমতি নেই ইসলামে। আর ইসলাম দাম্পত্যজীবনকে উপভোগ করতে শেখায়। বিয়ের মাধ্যমে অচেনা-অজানা দুজন নারী ও পুরুষের মধ্যে বৈধ সম্পর্ক তৈরি করে। যার মাধ্যমে পারস্পরিক সম্পর্ক, শ্রদ্ধাবোধ ও ভালোবাসা তৈরি হয়। একে অপরের সঙ্গী ও সহযোগী হবার উপলক্ষ তৈরি হয়। আল্লাহ বলেন, ‘আর আমি তোমাদের সৃষ্টি করেছি জোড়াবদ্ধ করে।’ (সুরা নাবা : ৮)।
সাহাবি হজরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আল্লাহর রাসুল (সা.) বলেন, হে যুবকের দল! তোমাদের মধ্যে যার বিয়ের সামর্থ্য আছে। সে যেন বিয়ে করে নেয়। কারণ তা দৃষ্টিকে সংযত করে এবং লজ্জাস্থান সুরক্ষিত করে। আর যার সামর্থ্য নেই। সে যেন রোজা রাখে। কারণ রোজা প্রবৃত্তির চাহিদা দমন করে। (বোখারি)।
এই হাদিসের গুরুত্বপূর্ণ একটি শিক্ষা হচ্ছে, বিশেষ করে যুবকদের প্রতি নবীজির উপদেশ হচ্ছে- তারা যেন বিয়ে করে নেয়। সত্যিকার অর্থে যা তাদের গোনাহমুক্ত জীবন যাপনে সাহায্য করবে। আজকাল আমাদের সমাজে এক শ্রেণির মানুষ বিয়ে ভীতি লালন করেন। কেউবা বিয়ে বহির্ভূত সম্পর্ক করলেও বিয়ে করতে ভয় করেন। সংসার জীবনের দায়িত্ব গ্রহণ করতে রাজি হন না। বিয়ে, সংসার ও সন্তান ইত্যাদি তাদের কাছে বোরিং ফিল হয়। অথচ মুসলিমের বর্ণনায় এসেছে, নবীজি (সা.) বলেন, ‘ধার্মিক সতী নারী হচ্ছে পৃথিবীর সবচেয়ে দামি সম্পদ। আর কোরআনে এসেছে, আল্লাহর অনন্য একটি নিদর্শন হচ্ছে, নারী জাতির সৃষ্টি। যার মাধ্যমে একজন পুরুষ লাভ করতে পারেন- মানসিক প্রশান্তি ও ভালোবাসা।’ (সুরা রুম : ২১)।
হাদিসে ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণনা এসেছে, রাসুল (সা.) বলেন, ‘বিয়ে বন্ধনে আবদ্ধ নারী-পুরুষ যুগলের মতো মহব্বত ভালোবাসা তুমি আর কোথাও দেখতে পাবে না।’ (ইবনে মাজাহ)।
মনে রাখা দরকার, বৈধ বিয়ে বন্ধনে আবদ্ধ দম্পত্তির মাধ্যমেই মানব বংশ বিস্তার ঘটে। এমনকি সুস্থ ও মেধাবী সন্তান জন্ম লাভ করে। যা অপর কোনো মাধ্যমে অর্জিত হতে পারে না। সুস্থ মানব সমাজে এ রকম উদাহরণও আর নেই।
কাজেই বিয়ে বহির্ভূত সম্পর্ক একটি অবৈধ ও অবৈজ্ঞানিক সম্পর্ক মাত্র। যাতে নেই দায়িত্ব ও দায়বোধ। রয়েছে শুধু প্রবৃত্তির চাহিদাই। কিন্তু অত্যন্ত আফসোস ও পরিতাপের বিষয় হচ্ছে, এই পবিত্র বিয়ে বন্ধনের মতো গুরুত্বপূর্ণ মানবজীবনের একটি অধ্যায়কে আমরা সীমাহীন অবজ্ঞা ও অবহেলার দৃষ্টিতে দেখছি। কেউবা বিলম্বে বিয়ে করে দাম্পত্য জীবনকে উপভোগ করতে পারছেন না। আবার কেউ অর্থের অভাবে যথাসময়ে বিয়ে করে সংসারী হতে পারছেন না। কেউবা চাইছেন না সংসারী হতে। অনেকেই বিয়ের অনুষ্ঠানে বিভিন্ন বাড়তি খরচকেই বিয়ের মূল অনুষঙ্গ হিসেবে গণ্য করছেন। ফলে অর্থের অপচয় ও কুসংস্কারই ব্যাপক আকার ধারণ করছে এই সমাজে। যা কখনোই ইসলাম অনুমোদিত নয়! আয়েশা (রা.) বলেন, রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘নিশ্চয়ই কম ব্যয়-খরচের বিয়ে অধিক বরকতময়।’ (বাইহাকি)।
অথচ আজকাল আমাদের বিয়ে-শাদির উপলক্ষ বা অনুষ্ঠানে শত কুসংস্কারের ছড়াছড়ি। একটি উদাহরণ পেশ করছি- নব বিবাহিতা কন্যার শ্বশুরবাড়ি বিয়ের পরদিন মেয়ের বাবা কর্তৃক বড় একটা মাছ, পান-সুপাড়ি, দুধ ইত্যাদি নিতে হবে।
কিংবা জোরজবরদস্তি করে কন্যার বাড়িতে লোকসমাগম করা, খাবার খাওয়া। অথচ হাদিসে কেবল অলিমা অনুষ্ঠান তথা ছেলের বাড়িতে দাওয়াতের আয়োজন করতে বলা হয়েছে। এভাবে আমরা বিয়ের আয়োজনকে কঠিন ব্যয়সাধ্য এবং কষ্টসাধ্য লোক দেখানো অনুষ্ঠানে পরিণত করছি। যা পরিহার যোগ্য। এমন অনুষ্ঠান পরিহার করতে বলা হয়েছে হাদিসে।
বোখারি ও মুসলিমের হাদিসে এসেছে, একবার তিন ব্যক্তি নবীজির স্ত্রীদের ঘরে এলেন। জানতে চাইলেন, নবীজি কীভাবে ইবাদত পালন করেন? তাদের এক ব্যক্তি বিয়ে ও স্ত্রী সংসার জীবন ত্যাগের কথা জানালে, নবীজি (সা.) বলেন, ‘আল্লাহর শপথ! আমি নামাজ আদায় করি। রোজা পালন করি। আবার ভেঙে ফেলি। বিয়ে-শাদিও করি। আর যে আমার এ সুন্নত পালন করবে না সে আমার দলভুক্ত নয়!’
এ হাদিসের শিক্ষাও হলো, বিয়ে বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে সংসার জীবনযাপন করা একটি গুরুত্বপূর্ণ সুন্নত। তাই আমাদের জন্যও আবশ্যক হলো, ইসলামি রীতিনীতি ও সংস্কৃতি মেনে বিয়ের আয়োজন করা। কোরআন হাদিস অনুযায়ী সুন্নাহসম্মত দাম্পত্য জীবনযাপন করা।
লেখক : খতিব, ভবানীপুর মাইজপাড়া হক্কানি জামে মসজিদ, সদর, গাজীপুর
