সাম্প্রতিককালে শহিদের প্রাসঙ্গিকতা
জামান শামস
প্রকাশ : ১৯ জানুয়ারি ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

শহিদ আরবি শব্দ, এতে তিনটি আরবি অক্ষর আছে, ‘শিন, হা, দাল’- অর্থ সাক্ষ্য দেওয়া, উপস্থিত থাকা। আরবি ভাষার গভীরতা একটি শব্দকে একাধিক অর্থ (মূল শব্দ থেকে উদ্ভূত) বোঝাতে সাহায্য করে, যা প্রতিটি শব্দকে অনন্য করে তোলে, এমনকি অন্যান্য প্রতিশব্দের বিপরীতেও। যখন আল্লাহ ‘আশ-শহিদ’ শব্দকে নিজের জন্য আরোপ করেছেন, তখন এর অর্থ ‘যিনি সর্বদা উপস্থিত এবং জ্ঞাত ও অজানা সবকিছুর ওপর সাক্ষী।’
ইসলামে শহিদ শব্দটি কেন শহিদদের জন্য প্রয়োগ করা হয় সে সম্পর্কে আমাদের পণ্ডিতদের বিভিন্ন মতামত রয়েছে। এখানে তিনটি মতামত উল্লেখ করা হলো-
১. আল্লাহতায়ালা এবং রাসুলুল্লাহ (সা.) শহিদকে জান্নাতে প্রবেশের জন্য সাক্ষ্য দেবেন।
২. শহিদ তার মৃত্যুর সময় জান্নাত প্রত্যক্ষ করেন।
৩. শহিদের আত্মা অন্যদের সামনে জান্নাত প্রত্যক্ষ করেন। কারণ যাই হোক না কেন, কোরআন শহিদদের বোঝাতে ‘শহিদ’ শব্দটি ব্যবহার করেছে। আল্লাহ বলেন, ‘আর যারা আল্লাহ ও রাসুলের আনুগত্য করে তারা তাদের সঙ্গে থাকবে, আল্লাহ যাদের ওপর অনুগ্রহ করেছেন নবী, সিদ্দিক, শহিদ ও সৎকর্মশীলদের মধ্য থেকে। আর সাথি হিসেবে তারা হবে উত্তম।’ (সুরা নিসা : ৬৯)।
শহিদ বা শাহাদাত, আমাদের ধর্মে একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা। দুর্ভাগ্যবশত, যারা ইসলাম বা আরবি ভাষার সঙ্গে পরিচিত নন, তাদের জন্য শহিদ শব্দটি অতীতে সহিংস চরমপন্থিদের একত্রিত করার জন্য এশটি নেতিবাচক শব্দ হিসেবে প্রচার করা হয়েছে।
শাহাদাত ও ত্যাগের সংজ্ঞা : ইসলামে শহিদ বা শাহাদাত বলতে তাদের বোঝায় যারা আল্লাহর পথে মারা গেছেন। প্রায়শই, ‘আল্লাহর উদ্দেশ্য’ তাদের সঙ্গে সম্পর্কিত যারা সামরিক সংগ্রামের সময় তাদের দেশকে রক্ষা করে। তবে, আল্লাহর উদ্দেশ্য এমন যেকোনো সম্মানজনক উদ্দেশ্যও হতে পারে যা আন্তরিকভাবে আল্লাহতায়ালার সন্তুষ্টি অর্জন করে। সুতরাং, ইসলামে, শাহাদাত শুধু তাদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয় যারা ন্যায্য যুদ্ধে মারা যান বরং সেই ব্যক্তিদেরও অন্তর্ভুক্ত করে যারা বিশ্বের কল্যাণ আনতে বা অন্যদের জীবন বাঁচাতে আন্তরিক প্রচেষ্টায় চূড়ান্ত ত্যাগ স্বীকার করেছেন, প্রাণ বিসর্জন দিয়েছেন। একজন শহিদের ত্যাগকে আল্লাহর প্রতি তাদের নিবেদন এবং তাদের ঈমানের জন্য কষ্ট সহ্য করার ইচ্ছার প্রমাণ হিসেবে দেখা হয়।
আল্লাহর রহমতের মাধ্যমে, ইসলামে শাহাদাতের আরেকটি শ্রেণিবিভাগে দুঃখজনক দুর্ঘটনা বা পরিস্থিতিতে মারা যাওয়া নিরপরাধ ব্যক্তিদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। ইসলামে শাহাদাতের উপরোক্ত কারণগুলো আমাদের নবী (সা.)-এর বর্ণনায় দেখা যায়। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘আল্লাহর পথে নিহত ব্যক্তি ছাড়াও সাতজন শহিদ আছেন- প্লেগে আক্রান্ত ব্যক্তি শহিদ, ডুবে মারা যাওয়া ব্যক্তি শহিদ, বুকে ব্যথায় মারা যাওয়া ব্যক্তি শহিদ, পেটের সংক্রমণে মারা যাওয়া ব্যক্তি শহিদ, পুড়ে মারা যাওয়া ব্যক্তি শহিদ, ধ্বংসস্তূপের নিচে মারা যাওয়া ব্যক্তি শহিদ এবং প্রসবকালীন অবস্থায় মারা যাওয়া গর্ভবতী নারী শহিদ।’ (আবু দাউদ)।
আবু হুরায়রা (রা.) নবী (সা.) এবং কিছু সাহাবির মধ্যে কথোপকথন বর্ণনা করেছেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) জিজ্ঞেস করলেন, তোমাদের মধ্যে কাকে শহিদ মনে কর? তারা বলল, যে আল্লাহর পথে নিহত হয়। তিনি বললেন, নিশ্চয়ই যদি তাই হয়, তবে আমার উম্মতের মধ্যে শহিদের সংখ্যা কম। তারা জিজ্ঞেস করল, ও রাসুলুল্লাহ, তাহলে শহি কারা? তিনি বললেন, যে ব্যক্তি আল্লাহর পথে নিহত হয় সে শহিদ, আর যে ব্যক্তি আল্লাহর পথে (গাজি হয়ে) মারা যায় সে শহিদ, আর যে ব্যক্তি প্লেগে মারা যায় সে শহিদ, আর যে পেটের রোগে মারা যায় সে শহিদ, আর যে ডুবে মারা যায় সে শহিদ।’ (মুসলিম : ৩৫৩৯)। লক্ষ্যণীয়, যে হাদিসে বলা হয়েছে, যে ব্যক্তি জিহাদের ময়দান থেকে ফিরে এসে স্বাভাবিক মৃত্যুবরণ করে সেও আল্লাহর রহমতে শহিদ হতে পারে।
শাহাদাতের পুরস্কার : ইসলামে একজন শহিদকে সম্মান করা হয়। মুহাম্মাদ (সা.)-এর নারী সাহাবি সুমাইয়া (রা.)-কে ইসলামে প্রথম শহিদ হিসেবে সম্মান করা হয়। সুমাইয়া (রা.) কিন্ত কোনো যুদ্ধে যাননি। ঈমানের দৃঢ়তার কারণে তাকে নির্যাতন করা হয়েছিল। পরিস্থিতি এতটাই তীব্র হয়ে ওঠে যে তাকে শহিদ করা হয়।
আল্লাহ শহিদদের মর্যাদা এতটাই উচ্চতর করেন যে, তাদের সর্বোচ্চ মর্যাদার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয় জান্নাতের। এর অর্থ হলো হিসাবের কঠিন অবস্থার সম্মুখীন হওয়া ছাড়া স্বয়ংক্রিয়ভাবে জান্নাতে অবিলম্বে প্রবেশ, আল্লাহর ক্ষমা লাভ এবং পরকালের পরীক্ষা এবং জাহান্নামের শাস্তি থেকে পরিত্রাণ। আল্লাহ বলেন, যারা আল্লাহর পথে (জিহাদে) নিহত হয়েছে তাদেরকে কখনই মৃত মনে করো না, বরং তারা তাদের প্রতিপালকের কাছে জীবিত ও তারা জীবিকা প্রাপ্ত হয়ে থাকে। আল্লাহ নিজ অনুগ্রহে তাদের যা দিয়েছেন তাতে তারা আনন্দিত। আর তাদের পেছনের যারা এখনো তাদের সঙ্গে মিলিত হয়নি। তাদের জন্য আপসে আনন্দ প্রকাশ করে এই নিয়ে যে, তাদের ভয় নেই এবং তারা দুঃখিতও হবে না। আল্লাহর নিয়ামত ও অনুগ্রহ পেয়ে তা আপসে আনন্দ প্রকাশ করে। আর নিশ্চয় আল্লাহ মোমিনদের শ্রমণ্ডফল নষ্ট করেন না।’ (সুরা আলে ইমরান : ১৬৯-১৭১)।
এখানে আল্লাহতায়ালা শহিদদের জীবিত বলে বর্ণনা করেছেন, স্পষ্টতই মৃতের সঙ্গে সম্পর্ক ত্যাগ করেছেন। ঈমানের এই দিকটি ধার্মিকতার সন্ধানে যারা প্রাণ হারিয়েছেন তাদের পরিবার এবং সম্প্রদায়ের জন্য সান্ত¡না এবং সান্ত¡নার উৎস হিসেবেও কাজ করে। শহিদের প্রতি এই ধরনের গুণাবলি শুধু এতটাই আকর্ষণীয় হতে পারে। তবে, এর অর্থ এই নয় যে আমাদের নিজেদেরকে এমন পরিস্থিতিতে ফেলতে হবে যা আমাদের মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিতে পারে।
মৃত্যুকে আলিঙ্গন করা : ইসলামে, যদিও আধ্যাত্মিক প্রতিফলন এবং পরকালের প্রস্তুতির উপায় হিসেবে মৃত্যুর চিন্তাভাবনার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে, তবুও ইচ্ছাকৃতভাবে নিজের মৃত্যু কামনা করা বা অন্যদের হত্যা করা, যেমন আত্মঘাতী বোমা হামলা, স্পষ্টতই নিন্দিত। ইসলাম জীবনের পবিত্রতার ওপর অত্যন্ত গুরুত্ব দেয় এবং যেকোনো ধরনের আত্মক্ষতি বা অন্যদের ক্ষতি করা নিষিদ্ধ করে। আত্মঘাতী বোমা হামলা এবং অনুরূপ সহিংসতা শুধু অগ্রহণযোগ্যই নয় বরং ইসলামের মৌলিক নীতিগুলির পরিপন্থি বলে বিবেচিত হয়, যা করুণা, ন্যায়বিচার এবং জীবন রক্ষার ওপর জোর দেয়। আল্লাহ বলেন, ‘নিজের হাতে নিজেকে ধ্বংসের মধ্যে নিক্ষেপ করবেন না। (সুরা বাকারা : ১৯৫)।
ইসলামি ঐতিহ্যের অনেক গল্প যুদ্ধক্ষেত্রে অহংকারের ওপর অন্তরের চেতনা এবং ধার্মিকতার ওপর জোর দেয়। উদাহরণস্বরূপ, আলি ইবনে আবি তালিব (রা.) একবার এক যুদ্ধে ছিলেন যেখানে তিনি তার শত্রুকে মাটিতে ফেলে দিয়েছিলেন। যখন তিনি তাকে হত্যা করার জন্য তার তরবারি তুলেছিলেন, তখন লোকটি আলি (রা.)-এর মুখে থুথু মারেন। আলি (রা.) তৎক্ষণাৎ থেমে যান, তার তরবারি ফেলে দেন এবং লোকটিকে ছেড়ে দেন। আলি (রা.) ভীত হয়ে পড়েন যে তার হৃদয় ন্যায়বিচারের চেয়ে রাগ এবং প্রতিশোধের দ্বারা অপবিত্র হয়ে যেতে পারে। আল্লাহতায়ালা যাকে ইচ্ছা তাকে শাহাদাত দান করেন। তবে শাহাদাতের তামান্না অন্তরে পোষণ করতে হবে। সাহল ইবনে হুনায়ফ (রা.) থেকে বর্ণিত যে, নবী (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি আন্তরিকতার সঙ্গে আল্লাহর কাছে শাহাদাত প্রার্থনা করে আল্লাহতায়ালা তাকে শহিদের মর্যাদায় অভিষিক্ত করবেন, যদিও বা সে আপন শয্যায় মৃত্যুবরণ করে। (মুসলিম : ৪৭৭৭)।
শহিদের ধারণাটি বিশেষভাবে সেই অঞ্চলে অর্থবহ যেখানে ব্যক্তি বা সম্প্রদায় তাদের ধর্মীয় বিশ্বাসের কারণে নিপীড়নের সম্মুখীন হয়। শহিদের মর্যাদা প্রতিকূলতার সঙ্গে লড়াই করা ব্যক্তিদের শক্তি এবং স্থিতিস্থাপকতার আলোকবর্তিকা হিসেবে কাজ করে, অকল্পনীয় কষ্টের মুখে উদ্দেশ্য এবং অর্থের অনুভূতি প্রদান করে।
শহিদ সাংস্কৃতিক, ধর্মীয় এবং ঐতিহাসিক তাৎপর্যকে ধারণ করে- যা বিশ্বাস, ত্যাগ এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের স্থায়ী মূল্যবোধের প্রতিনিধিত্ব করে। এটি এমন এক মর্যাদা ও বৈশিষ্ট্য ধারণমূলক শব্দ- যা ছাড়া অন্যায় ও অন্যায্যতার বিরুদ্ধে ন্যায় ও ইনসাফ প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে জীবন উৎসর্গকারী ব্যক্তির মূল্যায়ন সম্ভব নয়। দুনিয়ার আর কোনো ভাষায় আর কোনো শব্দ দিয়ে এটি প্রকাশ করা যায় না। তাই আমরা দেশের জন্য, ভাষার জন্য, হক ও ইনসাফের জন্য প্রাণ বিসর্জনকারীদেরও শহিদ বলি।
