শাবান মাসের দোয়া, আমল ও ফজিলত

ফারহান হাসনাত

প্রকাশ : ০২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

চান্দ্রবর্ষের অষ্টম মাস শাবান। আরবিতে এ মাসের পূর্ণ নাম ‘আশ শাবানুল মুআজজম’। অর্থ মহান শাবান মাস। শাবান শব্দের অর্থ দূরে ও কাছে, মিলন ও বিচ্ছেদ। শাবানের আরেকটি অর্থ মধ্যবর্তী সুস্পষ্ট। এটি রজব ও রমজানের মধ্যবর্তী হওয়ায় তাকে শাবান মাস নামকরণ করা হয়। (লিসানুল আরব, ইবনে মানজুর রহ.)।

শাবান মাসের পরই রমজান। রমজানের আগমনী বার্তা নিয়ে বিশ্ব মুসলিমের কাছে হাজির হয় শাবান মাস। রাসুলুল্লাহ (সা.) শাবান মাসে সবচেয়ে বেশি নফল ইবাদত, নফল নামাজ ও নফল রোজা ইত্যাদি পালন করতেন। সাহাবিদেরও উৎসাহিত করতেন।

শাবান মাসের ফজিলত : কোরআনে আছে, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ নবীর প্রতি অনুগ্রহ করেন, তাঁর ফেরেশতারা নবীর জন্য অনুগ্রহ প্রার্থনা করেন। হে মুমিনগণ, তোমরাও নবীর জন্য অনুগ্রহ প্রার্থনা করো এবং যথাযথ শ্রদ্ধাভরে সালাম জানাও।’ (সুরা আহজাব : ৫৬)। নবীজি (সা.)-এর প্রতি দরুদ পাঠের নির্দেশনা সম্পর্কিত এ আয়াতটি শাবান মাসেই অবতীর্ণ হয়। এ মাস নবীজির প্রতি অগাধ শ্রদ্ধা, ভক্তি ও ভালোবাসার মাস। তাঁর প্রতি এসব জানানোর একমাত্র উপায় তাঁর নির্দেশনা মেনে জীবনযাপন করা।

কিবলা পরিবর্তন : মিরাজের রাতে মুসলমানদের ওপর পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ ফরজ হয়। নবীজি (সা.) সাহাবিদের নিয়ে বায়তুল মুকাদ্দাসের দিকে মুখ করে নামাজ আদায় করতেন। তিনি হৃদয় দিয়ে চাইতেন, কাবাঘর হোক মুসলিমদের কিবলা। পিতা ইবরাহিম (আ.)-এর বানানো ঘর হোক সেজদার নিদর্শন। এজন্য নবীজি (সা.) নামাজে দাঁড়িয়ে বারবার আকাশের দিকে তাকাতেন। ১৬ মাস পর কাবাঘর মুসলিমদের কিবলা হিসেবে ঘোষিত ও নির্ধারিত হয় শাবান মাসে। আল্লাহ বলেন, ‘নিশ্চয়ই আমি তোমার আকাশের দিকে মুখ ফিরিয়ে দেখা লক্ষ্য করেছি, যে কিবলা তুমি পছন্দ কর, আমি তোমাকে সেদিকে ফিরে যেতে আদেশ করছি। তুমি মসজিদুল হারামের দিকে মুখ ফিরাও এবং তোমরা যেখানেই থাক, ওরই দিকে মুখ ফিরাও। যাদের কিতাব দেওয়া হয়েছে তাদের জানা আছে যে, কিবলার পরিবর্তন তাদের প্রতিপালকের পক্ষ থেকে প্রকৃতই সত্য এবং তারা যা করে আল্লাহ সে সম্পর্কে মোটেই অমনোযোগী নন।’ (সুরা বাকারা : ১৪৪)

নফল রোজা : রমজান ছাড়া অন্য মাসে ফরজ রোজা নেই। তবে অন্য মাসে ও বিশেষ দিনে নফল রোজা রাখায় সওয়াব রয়েছে। মুহাম্মদ (সা.) সেসব নফল রোজা রাখতেন। সাহাবিদের উদ্বুদ্ধ করতেন। তিনি শাবান মাসে সবচেয়ে বেশি রোজা রাখতেন। আয়েশা (রা.) বলেন, ‘নবী (সা.) শাবান মাসের চেয়ে বেশি (নফল) রোজা কোনো মাসে রাখতেন না। তিনি (প্রায়) পুরা শাবান মাসই রোজা রাখতেন। তিনি বলতেন, তোমাদের মধ্যে যতটুকু সামর্থ্য আছে ততটুকু (নফল) আমল কর, কারণ তোমরা (আমল করতে করতে) পরিশ্রান্ত হয়ে না পড়া পর্যন্ত আল্লাহ তায়ালা (সাওয়াব দান) বন্ধ করেন না।’ (বোখারি : ১৯৭০)।

দোয়া করা : মুহাম্মদ (সা.) শাবান মাসে বেশি বেশি বরকত হাসিলের দোয়া করতেন। রমজানে মাসে ইবাদত করার সুযোগ প্রার্থনা করতেন। তিনি এ দোয়া বেশি বেশি পড়তেন- বাংলা উচ্চারণ : আল্লাহুম্মা বারিক লানা ফি রজবা ওয়া শাবান, ওয়া বাল্লিগনা রমাদান’। বাংলা অর্থ : হে আল্লাহ, রজব ও শাবান মাস আমাদের জন্য বরকতময় করুন; রমজান আমাদের নসিব করুন।’ (মুসনাদে আহমাদ : ২৫৯)।

মুক্তির রজনী : শাবান মাসের মধ্য দিবসের রজনী হলো শবেবরাত। শবেবরাত মানে মুক্তির রাত। জাহান্নাম থেকে মুক্তির রাত। এ রাতে বান্দার গুনাহ মাফ করা হয়। অভাবীকে রিজিক দেওয়া হয়। বিপন্মুক্ত করা হয় বিপদগ্রস্তকে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যখন মধ্য শাবানের রাত আসে তখন তোমরা এ রাতে দাঁড়িয়ে নামাজ পড়ো এবং এর দিনে রোজা রাখো। কেননা এ দিন সূর্য অস্তমিত হওয়ার পর আল্লাহ পৃথিবীর নিকটতম আকাশে নেমে এসে বলেন, কে আছ আমার কাছে ক্ষমাপ্রার্থী, আমি তাকে ক্ষমা করব। কে আছ রিজিকপ্রার্থী, আমি তাকে রিজিক দেব। কে আছ রোগমুক্তি প্রার্থনাকারী, আমি তাকে নিরাময় দান করব। কে আছ এই প্রার্থনাকারী। ফজরের সময় হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত (তিনি এভাবে আহ্বান করেন)।’ (ইবনে মাজাহ : ১৩৮৮)।

আল্লাহতায়ালা শবেবরাতে অসংখ্য মুসলিমকে ক্ষমা করে দেন। আয়েশা (রা.) বলেন, ‘একরাতে রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে না পেয়ে খুঁজতে বের হলাম। জান্নাতুল বাকিতে তাকে দেখতে পেলাম। তিনি বললেন, কী ব্যাপার আয়েশা? তোমার কি মনে হয়, আল্লাহ এবং তার রাসুল তোমার ওপর অবিচার করবেন? আয়েশা (রা.) বললেন, আমার ধারণা হয়েছিল আপনি অন্য স্ত্রীর ঘরে গিয়েছেন। তিনি বললেন, যখন শাবান মাসের অর্ধেকের রাত আসে, আল্লাহ পৃথিবীর আসমানে নেমে আসেন। তারপর বনু কালব গোত্রের বকরির পশমের চেয়ে বেশিসংখ্যক বান্দাদের ক্ষমা করে দেন।’ (তিরমিজি : ৭৩৯)।

কাজা রোজা আদায় : অসুবিধা কিংবা প্রয়োজনবশত শাবান মাসে রোজা রাখতে না পারলে রমজানের পর রোজা রাখা যাবে। তবে পরে এ রোজা পালন আবশ্যকীয় নয়। ইমরান ইবনে হোসাইন (সা.) বলেন, ‘নবী (সা.) এক ব্যক্তিকে জিজ্ঞেস করলেন, তুমি কি এ মাসের মধ্যভাগে কিছুদিন রোজা রেখেছিলে? সে বলল, না। তিনি বললেন, তুমি এর পরে রমজানের রোজা শেষ করে দুদিন রোজা রাখবে।’ (মুসলিম : ২৬৪২)।

রমজানের কয়েক দিন আগে রোজা রাখার বিধান : রমজান মাস শুরু হওয়ার কয়েক দিন আগে থেকে রোজা রাখার প্রয়োজন নেই। ১৫ দিন আগে বা কয়েক দিন আগে থেকে বন্ধ করে দেওয়া ভালো। সেসব দিনে রমজানের প্রস্তুতি নেবে। তবে কারও যদি সপ্তাহের সুন্নত রোজা (প্রতি বৃহস্পতি ও সোমবার) কিংবা দাউদ (আ.)-এর মতো রোজা (এক দিন রোজা রাখা ও পরদিন না রাখা) পালনের অভ্যাস থাকে, তাহলে সে ধারাবাহিকতা রক্ষা করতে পারবে। রাসুল (সা.) বলেন, ‘শাবান মাসের অর্ধেক অতিবাহিত হলে তোমরা রোজা রাখবে না।’ (আবু দাউদ : ২৩৩৭)।

অন্য হাদিসে রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘তোমরা রমজানের এক দিন অথবা দুদিন আগে রোজা রাখবে না। অবশ্য কেউ প্রতি মাসে ওই তারিখে রোজা পালনে অভ্যস্ত হলে রাখতে পারবে।’ (আবু দাউদ : ১৩৩৫)।

রমজান মাসের প্রস্তুতি হিসেবে শাবান মাসের তারিখের হিসাব রাখা সুন্নত। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমরা রমজানের জন্য শাবানের চাঁদের হিসাব রাখ।’ (সিলসিলাতুস সহিহাহ, খণ্ড : ২, পৃষ্ঠা : ১০৩)।