তারাবি নামাজ ৮ রাকাত নাকি ২০ রাকাত?
রায়হান রাশেদ
প্রকাশ : ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

পবিত্র রমজানে গুরুত্বপূর্ণ একটি আমল তারাবির নামাজ। মুসলিম নারী-পুরুষ সবার জন্য তারাবির নামাজ সুন্নতে মুয়াক্কাদা। আবু হুরায়রা (রা.) বলেন, ‘আল্লাহর রাসুল (সা.) রমজানে নামাজের বিষয়ে উৎসাহিত করতেন; কিন্তু তিনি বাধ্যতামূলকভাবে আদেশ দিতেন না। তিনি বলতেন, ‘যে ইমান রেখে সওয়াবের আশায় রমজানের কিয়াম (তারাবির নামাজ) আদায় করবে, তার আগের সব পাপ মাফ হয়ে যাবে।’ (বোখারি : ২০০৯)।
তারাবি নামাজের প্রচলন যেভাবে : আয়েশা (রা.) বলেন, ‘একদিন রাসুল (সা.) মসজিদে নামাজ পড়লেন। তার অনুসরণ করে অনেক লোক নামাজ পড়ল। এর পরের রাতে নামাজ পড়লে আরও বেশি লোক হলো। তৃতীয় রাতে লোকেরা জমায়েত হলে তিনি বাসা থেকে বের হলেন না। ফজরের সময় তিনি তাদের উদ্দেশে বললেন, আমি তোমাদের আগ্রহ লক্ষ্য করেছি। তোমাদের কাছে (নামাজের জন্য) বের হতে আমার কোনো বাধা ছিল না। কিন্তু আমি শঙ্কা করলাম, ওই নামাজ তোমাদের জন্য ফরজ করে দেওয়া হবে। আর এ ঘটনা হলো রমজানের।’ (বোখারি : ২০১২)। এভাবেই মূলত তারাবির নামাজের প্রচলন ঘটেছে।
নবীজি (সা.) কত রাকাত তারাবি পড়তেন : রাসুলুল্লাহ (সা.) কত রাকাত তারাবির নামাজ পড়েছেন, এ বিষয়ে হজরত আয়েশা (রা.) বলেন, ‘রাসুলুল্লাহ (সা.) চার রাকাত নামাজ পড়তেন। আর তুমি সেই নামাজের সৌন্দর্য ও দৈর্ঘ্যের বিষয়ে জিজ্ঞাসা করো না (অর্থাৎ সেই নামাজ অত্যন্ত সুন্দর ও দীর্ঘ হতো)। এরপর তিনি চার রাকাত নামাজ পড়তেন। আর তুমি সেই নামাজের সৌন্দর্য ও দৈর্ঘ্যরে বিষয়ে জিজ্ঞাসা করো না। এরপর তিনি তিন রাকাত বিতরের নামাজ আদায় করতেন।’ (বোখারি : ১১৪৭)।
এ হাদিসের ব্যাখ্যায় মুহাদ্দিসরা বলেছেন, রাসুল (সা.) দুই রাকাত দুই রাকাত করে চার রাকাত একটানা পড়তেন। প্রথম দুই রাকাত পড়ে সালাম ফিরিয়ে সঙ্গে সঙ্গে উঠে দুই রাকাত পড়তেন। এরপর বসে বিরতি নিতেন। তারপর আবার দুই রাকাত পড়ে সালাম ফিরিয়ে সঙ্গে সঙ্গে উঠে দুই রাকাত পড়তেন। তারপর আবার একটু বসে জিরিয়ে নিয়ে তিন রাকাত বিতর পড়ে নামাজ শেষ করতেন। হাদিসে আছে, আয়েশা (রা.)-কে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, ‘রমজানের রাতে রাসুল (সা.) কত রাকাত নামাজ পড়তেন? তিনি বললেন, তিনি রমজানে এবং অন্যান্য মাসেও ১১ রাকাত অপেক্ষা বেশি নামাজ পড়তেন না।’
বিশ রাকাত তারাবি নামাজের শুরু যেভাবে : সাইব ইবনে ইয়াজিদ (রা.) বলেন, ‘ওমর (রা.) রমজানের রাতে লোকদের একত্রিত করলেন। এরপর উবাই ইবনে কাব এবং তামিম আদণ্ডদারিকে ইমাম করে ২১ রাকাত নামাজ পড়লেন। নামাজে তারা প্রায় একশর মতো আয়াত তেলাওয়াত করতেন এবং ভোর হওয়ার আগে তারা নামাজ শেষ করতেন। (আল ফাওয়াজিদ, পৃষ্ঠা : ১৭-১৯)।
সাইব ইবনে ইয়াজিদ (রা.) বলেন, ‘তারা ওমর (রা.)-এর যুগে রমজানে বিশ রাকাত তারাবি পড়তেন এবং দীর্ঘ সুরা তিলাওয়াত করতেন।’ উসমান (রা.)-এর সময়ে দীর্ঘ নামাজের কারণে মুসল্লিরা লাঠি ব্যবহার করতেন। (আস-সুনানুল কুবরা, খণ্ড : ২, পৃষ্ঠা : ৪৯৬)। এতে বোঝা যায়, ওমর (রা.)-এর আমলে ২০ রাকাত করে জামাতে তারাবি নামাজ পড়ার প্রচলন শুরু হয়।
ওমর (রা.) কেন বিশ রাকাত পড়লেন? : শায়খুল ইসলাম ইমাম ইবনে তাইমিয়া (রহ.) বলেছেন, ‘ওমর (রা.) যখন উবাই ইবনে কাবের ইমামতিতে একটি জামাতে লোকদের নিয়ে নামাজ পড়তেন, তখন লোকেরা এত লম্বা সময় টানা দাঁড়িয়ে থাকতে পারত না। ফলে তিনি রাকাত সংখ্যা বাড়িয়ে দেন (যাতে প্রতি রাকাতে কম সংখ্যক আয়াত তেলাওয়াত করা যায় এবং লোকদের পক্ষে দাঁড়িয়ে নামাজ পড়াটাও সহজ হয়)। প্রথমে তারা ১১ বা ১৩ রাকাত নামাজই পড়তেন, কিন্তু লোকদের জন্য এত লম্বা সময় দাঁড়িয়ে থাকাটা কঠিন হয়ে পড়ার কারণে তিনি রাকাত সংখ্যা বাড়িয়ে দেন। (মুজামু আল-ফতোয়া, খণ্ড : ২৩, পৃষ্ঠা : ১১৩)। ইমাম ইবনে তাইমিয়া (রহ.) বলেন, ‘যদি কেউ মনে করেন যে, রাসুল (সা.) তারাবির নামাজের রাকাত সংখ্যা নির্দিষ্ট করে দিয়ে গেছেন, আর সে তার থেকে বাড়াতে বা কমাতে পারবে না—তাহলে তার এই ধারণা ভুল।’ (মুজামু আল-ফতোয়া, খণ্ড : ২২, পৃষ্ঠা : ২৭২)।
সাহাবি ও তাবেয়িদের আমল : মুহাম্মাদ বিন কাব কুরজি (রহ.) বলেন, ‘ওমর (রা.)-এর সময়ে লোকেরা ২০ রাকাত তারাবি এবং তিন রাকাত বিতর পড়তেন।’ (মুসান্নাফ ইবনে আবি শাইবা, খণ্ড : ৫, পৃষ্ঠা : ২২৩)। ইয়াজিদ বিন রুমান বলেন, ‘ওমরের শাসনামলে রমজানে ২০ রাকাত তারাবি এবং তিন রাকাত বিতর আদায় করা হতো।’ (মারিফাতুস সুনান ওয়াল আসার : ১৪৪৩)
চার মাজহাবের মতামত : ইমাম সারখাসি (রহ.) বলেন, ‘আমাদের মতে বিতর ছাড়া তারাবি ২০ রাকাত।’ (আলমাবসুত, খণ্ড : ২, পৃষ্ঠা : ১৪৫)। ইবনে কুদামা (রহ.) বলেন, ‘ইমাম আহমদ (রহ.)-এর কাছে পছন্দনীয় মত হলো, তারাবি ২০ রাকাত। ইমাম সাওরি, ইমাম আবু হানিফা এবং ইমাম শাফি (রহ.)ও এ মতের পক্ষে। তবে ইমাম মালেক ৩৬ রাকাতের পক্ষে মত দিয়েছেন।’ (আল-মুগনি, খণ্ড : ১, পৃষ্ঠা : ৪৫৭)। ইমাম নববি বলেন, ‘তারাবি সুন্নত। আমাদের মাজহাবে এটি ২০ রাকাত এবং ১০ সালামে আদায় করা হয়। একাকি বা জামাতে পড়া উভয়ই জায়েজ।’ (আলমাজমু, খণ্ড : ৪, পৃষ্ঠা : ৩১)।
মনে রাখা প্রয়োজন, তারাবি নামাজ সুন্নত। এটি ওয়াজিব বা ফরজ নয়। যেহেতু এ নামাজ সুন্নত, তাই কমবেশি পড়লে অসুবিধে নেই। বিশ রাকাত বা আট রাকাত পড়ার মধ্যে কোনো জায়েজ-নাজায়েজের বিষয় নেই। যাদের শারীরিক শক্তি-সামর্থ আছে, তাদের জন্য বিশ রাকাত পড়া উত্তম। কারণ, রমজানে রাতের নামাজের বিষয়ে নবীজি (সা.) বেশ গুরুত্ব দিয়েছেন। তিনি দীর্ঘ সময় ধরে নামাজ পড়েছেন। অত্যন্ত বিনয়ের সঙ্গে একাগ্রচিত্তে লম্বা কিরাতে নামাজ পড়েছেন। যারা দশ রাকাত, আট রাকাত পড়তে চান, তারা দীর্ঘ কিরাতে পড়তে পারেন। তবে চার ইমাম ও বেশিরভাগ ইসলামি স্কলার বিশ রাকাত তারাবির পক্ষে মতামত দিয়েছেন। তারাবি নামাজের রাকাতসংখ্যা নিয়ে বিতর্ক করা উচিত নয়।
