তারা মসজিদ
মোস্তফা কামাল গাজী
প্রকাশ : ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

রাজধানীর প্রাচীন মসজিদগুলো একেকটি যেনে জীবন্ত ইতিহাস। প্রতিটি মসজিদ নির্মাণের পেছনেই রয়েছে নতুন নতুন গল্প। আছে আবেগ, উচ্ছ্বাস আর সীমাহীন আশা। গল্পগুলোর মধ্যে অনেক গল্পই হারিয়ে গেছে কালের বিবর্তনে। তবে মসজিদগুলো আজও দাঁড়িয়ে আছে স্বমহিমায়। বাংলাদেশের দৃষ্টিনন্দন এসব মসজিদগুলোর পরিচিতিও আমাদের অনেকের অজানা। ঢাকার প্রাচীন ও বিখ্যাত মসজিদগুলোর মাঝে ‘তারা মসজিদ’ অন্যতম। এই মসজিদের সৌন্দর্যের কথা শোনেননি, এমন মানুষ খুব কমই আছে। মোঘল বা সুলতানি স্থাপত্যের নিদর্শন না হলেও দর্শনার্থীদের নজর কেড়েছে পুরান ঢাকার আরমানিটোলায় অবস্থিত এই তারা মসজিদ। ঢাকায় থাকা নান্দনিক মসজিদগুলোর একটি এটি। ঠিক কবে এটি নির্মাণ হয়েছে, তা সঠিক জানা যায়নি।
অনেকের মতে, মির্জা গোলাম পীর ওরফে মির্জা আহমেদ জান নামের এক ব্যবসায়ী এটির নির্মাতা। সাদা মার্বেল পাথরের ওপর ফুলদানি, ফুলের ঝাড়, গোলাপ ফুল, এক বৃন্তে একটি ফুল, চাঁদ, তারা, নক্ষত্র ও আরবি ক্যালিগ্রাফিক লিপি রয়েছে পুরো মসজিদজুড়ে। ঐতিহ্য আর আধুনিকতার মিশেলে ঝলমলে এক স্থাপনার নাম তারা মসজিদ। নির্মাণের পর থেকে মির্জা গোলাম পীরের মসজিদ বা সিতারা মসজিদ হিসেবে পরিচিতি থাকলেও এখন তারা মসজিদ হিসেবেই পরিচিত। দেয়ালের সাদা জমিনে নীল রঙের তারার নকশা বেশি থাকার কারণেই স্থানীয়রা মসজিদটির এমন নামকরণ করেছেন। নান্দনিক নকশায় আর অনুপম স্থাপত্যশৈলীতে নির্মিত মসজিদটি দেশের পুরোনো মসজিদগুলোর অন্যতম। কিন্তু চাকচিক্যে তা যেকোন পুরোনো মসজিদ থেকে ঝলমলে। প্রাচীনকাল থেকেই স্থানীয়দের কাছে ব্যাপক জনপ্রিয় মসজিদ এখন এক পর্যটক আকর্ষণ কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের অধীনে থাকা এ স্থাপনাটি দেখতে প্রতিদিন দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসেন শত শত মানুষ।
মসজিদটি পুরানো ঢাকার আরমানিটোলায় আবুল খয়রাত সড়কে অবস্থিত। সাদা মার্বেলের গম্বুজের ওপর নীলরঙা তারায় খচিত এ মসজিদ নির্মিত হয় ১৮ শতকের প্রথম দিকে। মসজিদের গায়ে এর নির্মাণ-তারিখ খোদাই করা ছিল না। জানা যায়, আঠারো শতকে ঢাকার ‘মহল্লা আলে আবু সাঈয়িদে’ (পরে যার নাম আরমানিটোলা হয়) আসেন জমিদার মির্জা গোলাম পীর (মির্জা আহমদ জান)। ঢাকার ধনাঢ্য ব্যক্তি মীর আবু সাঈয়িদের নাতি ছিলেন তিনি। মির্জা গোলাম পীর এ মসজিদ নির্মাণ করেন। মসজিদের আরও কিছু প্রচলিত নাম আছে, যেমন: মির্জা গোলাম পীরের মসজিদ বা সিতারা মসজিদ। ১৮৬০ সালে মারা যান মির্জা গোলাম পীর।
পরে ১৯২৬ সালে ঢাকার তৎকালীন স্থানীয় ব্যবসায়ী আল জান বেপারী মসজিদের সংস্কার করেন। সে সময় মসজিদের মোজাইক কারুকার্যে জাপানের রঙিন চিনি-টিকরি পদার্থ ব্যবহৃত হয়। মোঘল বা সুলতানি স্থাপত্যের নিদর্শন না হলেও মোঘল স্থাপত্য শৈলীর প্রভাব রয়েছে এ মসজিদে। ঢাকার কসাইটুলীর মসজিদেও এধরনের বৈশিষ্ট্য লক্ষ্য করা যায়। উল্লেখ্য, দিল্লি, আগ্রা ও লাহোরের সতের শতকে নির্মিত স্থাপত্যকর্মের ছাপ পড়ে মোঘল স্থাপত্য শৈলীতে।
প্রথম থেকেই মসজিদটি আয়তাকার ছিলে। মির্জা গোলাম পীর তৈরির আদি মসজিদটির পরিমাপ ছিল দৈর্ঘ্য ৩৩ ফুট (১০.০৬ মিটার) এবং প্রস্থে ১২ ফুট (৪.০৪ মিটার)। মসজিদটি ছিল তিন গম্বুজবিশিষ্ট। এর ভেতরের মাঝের গম্বুজটি ছিল অনেক বড়। সাদা মার্বেল পাথরের গম্বুজের উপর নীলরঙা তারার নকশাযুক্ত ছিল। সেই থেকে এই মসজিদ তারা মসজিদ নামে পরিচিত হয়ে উঠে। এর পূর্ব দিকে মসজিদে প্রবেশের জন্য তিনটি এবং উত্তর দিকে ১টি এবং দক্ষিণ দিকে ১টি দরজা ছিল।
১৯২৬ খ্রিস্টাব্দে ঢাকার তৎকালীন স্থানীয় ব্যবসায়ী আলি জান বেপারী মসজিদের সংস্কার করেন। তখন মসজিদের আকার বৃদ্ধি করা হয়। এর পূর্বদিকে একটি বারান্দা যুক্ত করা হয় এবং মসজিদের মেঝে মোজাইক করা হয়। চিনিটিকরি (Chinitikri) কৌশলের এই মোজাইকে ব্যবহার করা হয় জাপানি রঙিন চিনা মাটির টুকরা এবং রঙিন কাঁচের টুকরা। আলী জান বেপারী চিনামাটির প্লেট, পেয়ালা ও ছোট-বড় নানা রঙের কাঁচের টুকরার সমন্বয়ে এক বিশেষ পদ্ধতিতে মসজিদটি অলংকৃত করেন। কারুকার্যময় এই মসজিদের দেয়ালে ও ছাদে শোভা পেয়েছে নানা রঙের ফুল, পাতা ও চাঁদণ্ডতারা নকশা। এর গম্বুজগুলো তারাখচিত নকশা দ্বারা অলংকৃত। মসজিদের জুল্লায় প্রবেশের জন্য পাঁচটি খিলানবিশিষ্ট পথ নির্মাণ করা হয়েছে। এ খিলানগুলো বহু খাঁজবিশিষ্ট এবং চারটি অষ্টভুজাকৃতির স্তম্ভ হতে উত্থিত। বারান্দায় গাত্রালংকারে জাপানের বিখ্যাত ‘ফুজিসানে’র দৃশ্যসম্বলিত গ্লোস টাইল উল্লেখযোগ্য। ‘ফ্যাসাদ’ এর কেন্দ্রে আরবি লিপি সম্বলিত সূক্ষ্ম অর্ধচন্দ্র ও তারার অলংকরণ স্থান পেয়েছে। বৃত্তাকার শ্বেত-শুভ্র গম্বুজগুলোতে বসানো হয়েছে নীল রঙের অসংখ্য তারা বা নক্ষত্র। সমগ্র নকশায় সর্বাধিক প্রাধান্য পেয়েছে তারার ‘মোটিফ’, তাই মসজিদটি তারা মসজিদ নামে খ্যাত।
১৯৭৬ সালে বাংলাদেশ সরকার এই স্থাপনাটিকে কেন্দ্র করে ৫ থেকে ৫০০ টাকা সিরিজের ব্যাংক নোট মুদ্রণ করে। বর্তমানে প্রচলিত ১০০ টাকা মূল্যমানের নোটেও রয়েছে পুরান ঢাকার এ নয়নাভিরাম স্থাপত্যটি। এছাড়া ২০১৬ সালের ১০ ডিসেম্বর এই মসজিদের ডিজাইনকে খাদি কাপড়ে ফুটিয়ে তুলে রাজধানীর র্যাডিসন ব্লু হোটেলে ফ্যাশন ডিজাইন কাউন্সিল অব বাংলাদেশ আয়োজনে অনুষ্ঠিত হয় খাদি ফ্যাশন শো।
১৯৮৭ সালে সরকারি অর্থায়নে এই মসজিদ পুনরায় সংস্কার করা হয়। তখন পুরোনো মেহরাব ভেঙে দুটো গম্বুজ আর তিনটি নতুন মেহরাব বানানো হয়। সব মিলিয়ে বর্তমানে এর গম্বুজ সংখ্যা পাঁচটিতে দাঁড়িয়েছে। ফলে মসজিদের জায়গাও সম্প্রসারিত হয়েছে। মসজিদের বতর্মান দৈর্ঘ্য ৭০ ফুট (২১.৩৪ মিটার), প্রস্থ ২৬ ফুট (৭.৯৮ মিটার)। এছাড়া মসজিদের দেয়ালে ফুল, চাঁদ, তারা, আরবি ক্যালিওগ্রাফিক লিপি ইত্যাদি লিপিবদ্ধ করে শোভাবর্ধন করা হয়েছে। একই বছরের ৪ ডিসেম্বর এটিকে রাষ্ট্রীয়করণ করা হয়। ঝকঝকে সাদা মার্বেলের ওপর নীল তারারা ব্যতিক্রম করেছে মসজিদটিকে অন্য যেকোনো মসজিদ থেকে। বর্তমানে মসজিদটি বাংলাদেশ সরকারের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের তত্ত্বাবধানে রয়েছে। মসজিদটির পাশেই রয়েছে একটি মাদ্রাসা, যার দেখাশোনাও মসজিদ কর্তৃপক্ষ করে থাকেন। বর্তমানে মাদ্রাসার মক্তবে ২ বেলা ২৫০ জন ছাত্র, হেফজখানায় ৪০ জন ছাত্র পড়াশোনা করছে। নামাজ পরিচালনার জন্য ৬ জন কর্মরত আছেন। নামাজ পরিচালনার জন্য রয়েছেন একজন প্রধান ইমাম, পেশ ইমাম, খতিব, একজন মোয়াজ্জিন এবং তিনজন খাদেম। এছাড়া সকাল-বিকেল দুই শিফটে মসজিদভিত্তিক মক্তব পরিচালনার জন্য রয়েছেন পাঁচজন শিক্ষক। এই মক্তবে বিনা বেতনে শিক্ষার্থীদের নামাজসহ ইসলামের মূল বিষয়গুলো শেখানো হয়।
এছাড়া আর শিক্ষক হিসেবে মক্তবে ৫ জন ও হেফজখানায় ২ জন দায়িত্ব পালন করছেন। বর্তমানে মসজিদটির স্থানীয় লোকজনদের নিয়ে গঠিত কমিটিই এর পরিচালনা করছে। পদাধিকারবলে এই কমিটির সভাপতি ও তত্ত্বাবধায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন ঢাকার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক। মসজিদের উন্নয়ন ও বিভিন্ন খরচ বাবদ প্রতিবছর বাংলাদেশ সরকার তিন লাখ টাকা প্রদান করে। এদিকে প্রতি রমজানেই প্রতিদিন মসজিদ প্রাঙ্গণে গরিব এবং মুসাফিরদের জন্য এলাকাবাসী ও মসজিদ কমিটির পক্ষ থেকে ইফতারের আয়োজন করা হয়। সেখানে শত শত মানুষ একসঙ্গে ইফতার শেষে মাগরিবের নামাজ আদায় করেন।
২০১৫ সালে একবার নৌ-মন্ত্রণালয়ের প্রস্তাবের ফলে আরও ২১টি স্থাপনার সঙ্গে তারা মসজিদও ভেঙে ফেলার উদ্যোগ নেওয়া হয়। স্থানীয় ও বিভিন্ন মহলের আপত্তি থাকায় পরে আর সেটা বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি।
যদিও পুরান ঢাকার ঘিঞ্জি গলি আর কোলাহলের ভিড়ে দর্শনার্থীদের তারা মসজিদ খুঁজে পেতে একটু মুশকিলই হয়, তবে এর সামনে দাঁড়ালে মনের বিরক্তি ভাব কর্পূরের মতো উড়ে যাবে। মসজিদের সামনেই রয়েছে একটি তারা আকৃতির ফোয়ারা। মসজিদ ও ফোয়ারা মিলেমিশে একাকার। এ দৃশ্য দেখলে দর্শনার্থীর মনে ভর করে প্রশান্তির শ্যামল ছায়া। মসজিদের কারুকাজমণ্ডিত দেয়াল আর গম্বুজগুলো চোখের সামনে মুঘলদের সৌন্দর্যপিপাসু মনের কথাই ঘোষণা করে। মসজিদের ভেতরে প্রবেশ করতে গেলে সামনের খোলা মাঠে প্রথমেই তারা আকৃতির একটি ফোয়ারা রয়েছে। এর চারদিকে সবুজ ঘাসের ওপর মোজাইক টাইল দিয়ে নামাজিদের মসজিদে যাওয়ার রাস্তাও তৈরি করা হয়েছে। এগুলো এর সৌন্দর্য বহুগুণে বাড়িয়েছে। এর পাঁচটি গম্বুজের গায়ে ও ভেতরের ডিজাইনগুলো দেখে মুগ্ধ না হয়ে উপায় নেই। লতাপাতা আর বিভিন্ন ফুলের সমাহারে মন হারিয়ে যাবে মুঘল আমলে। মুগ্ধ নয়নে কারুকাজগুলো দেখতে দেখতে আপনার মনে হতে পারে, আপনি কোনো মুঘল বাদশাহর দরবারে দাঁড়িয়ে আছেন। প্রতিদিন ঢাকা ও এর আশপাশ এলাকার শতশত দর্শনার্থী এটির সৌন্দর্য অবলোকন করে মুগ্ধ হন। প্রতি ওয়াক্তেই এখানে প্রায় শতাধিক নামাজি নামাজে অংশগ্রহণ করেন।
যেভাবে যাওয়া যায় ঃ প্রাচীনকাল থেকেই স্থানীয়দের কাছে ব্যাপক জনপ্রিয় মসজিদ এখন এক পর্যটক আকর্ষণ কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের অধীনে থাকা এ স্থাপনাটি দেখতে প্রতিদিন শত শত মানুষ আসেন দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে। ঢাকা শহরের যেকোন জায়গা থেকে পুরান ঢাকার চানখাঁরপুল এলাকায় এসে রিকশা দিয়ে সহজেই আরমানিটোলা যেতে পারবেন। চানখাঁরপুল থেকে তারা মসজিদে যেতে ৩০ টাকার মতো রিকশা ভাড়া লাগতে পারে।
