প্রিন্ট সংস্করণ
০০:০০, ২৩ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬
রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর জীবনের দিকে তাকালে আমরা দেখতে পাই, রমজানে তার জীবনে প্রধানত দুটি বিষয় খুব যত্নের সঙ্গে পালিত হতো। হাদিসে আছে, ‘রমজানের প্রতি রাতে জিবরাইল (আ.) রাসুল (সা.)-এর কাছে আসতেন এবং তাকে কোরআন পড়ে শোনাতেন।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ১৮০৩)। সাধারণত নবীজি (সা.) রাতের অধিকাংশ সময় তাহাজ্জুদ পড়ে কাটাতেন। তবে রমজান এলে তার তাহাজ্জুদের সঙ্গে সঙ্গে তেলাওয়াত ও নফল নামাজের মাত্রা আরও বেড়ে যেত।
সাহরি ও ইফতার : রাসুলুল্লাহ (সা.) অত্যন্ত আগ্রহ ও ব্যাকুলতার সঙ্গে সাহরি ও ইফতার গ্রহণ করতেন। তিনি সূর্যাস্তের সঙ্গে সঙ্গে দ্রুত ইফতার করতেন। (বোখারি : ১৯৫৭)। নবীজি (সা.) সাহরি করতেন দেরিতে, সুবহে সাদিকের কিছু আগে। (বোখারি : ১১৩৪)।
সাহরি-ইফতারে কী খেতেন নবীজি (সা.) : রাসুলুল্লাহ (সা.) ইফতার করতেন ভেজা বা শুকনো খেজুর অথবা পানি দিয়ে। ভেজা খেজুর দিয়ে সাহরি করা পছন্দ করতেন তিনি। (আবু দাউদ : ২৩৪৫)। তিনি সবসময় জাঁকজমকহীন স্বাভাবিক সাহরি ও ইফতার গ্রহণ করতেন। আনাস (রা.) বলেন, ‘রাসুল (সা.) নামাজ আদায়ের আগে কয়েকটি ভেজা খেজুর দিয়ে ইফতার করতেন, যদি ভেজা খেজুর না থাকত, তবে সাধারণ শুকনো খেজুরই গ্রহণ করতেন। যদি তা-ও না থাকত, তবে কয়েক ঢোক পানিই হতো তার ইফতার।’ (তিরমিজি : ৬৯৬)।
মিসওয়াক করা : রাসুল (সা.) রোজা রেখেও মিসওয়াক করতেন। আমের বিন রাবিয়া (রা.) বলেন, ‘আমি রাসুল (সা.)-কে অসংখ্যবার রোজাবস্থায় মিসওয়াক করতে দেখেছি।’ (সুনানে তিরমিজি, হাদিস : ৭২৫)। মিসওয়াকের প্রতি নবীজি (সা.) অশেষ গুরুত্বারোপ করেছেন। হাদিসে আছে, ‘মেসওয়াক মুখের জন্য পবিত্রকারী এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি নিয়ে আসে।’ (মুসনাদে আহমাদ : ৭)।
তাহাজ্জুদ নামাজ : রমজানে নবীজি (সা.)-এর আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ আমল ছিল তাহাজ্জুদ নামাজ। প্রথম রাতে তারাবি শেষ করে শেষ রাতে তাহাজ্জুদের জন্য দাঁড়িয়ে যেতেন। তাহাজ্জুদ নামাজের সৌন্দর্য বর্ণনা করতে গিয়ে আয়েশা (রা.) বলেন, ‘রাসুলুল্লাহ (সা.) চার রাকাত নামাজ পড়তেন। আর তুমি সেই নামাজের সৌন্দর্য ও দৈর্ঘ্যরে বিষয়ে জিজ্ঞাসা করো না (অর্থাৎ সেই নামাজ অত্যন্ত সুন্দর ও দীর্ঘ হতো)। এরপর তিনি চার রাকাত নামাজ পড়তেন। আর তুমি সেই নামাজের সৌন্দর্য ও দৈর্ঘ্যরে বিষয়ে জিজ্ঞাসা করো না। এরপর তিনি তিন রাকাত বিতরের নামাজ আদায় করতেন।’ (বোখারি : ১১৪৭)
কোরআন তেলাওয়াত : কোরআন নাজিলের মাস রমজান। রমজানে লওহে মাহফুজ থেকে মহান আল্লাহ কোরআন বায়তুল ইজ্জতে অবতরণ করেন। এ মাসেই কোরআন নাজিলের সূচনা হয়। শুধু কোরআন নয়, রমজানে অবতীর্ণ হয় অন্যান্য ঐশী গ্রন্থও। মহান আল্লাহ বলেন, ‘রমজান মাস, যাতে কোরআন নাজিল করা হয়েছে লোকদের পথ-প্রদর্শক এবং হেদায়েতের সুস্পষ্ট বর্ণনারূপে এবং সত্য-মিথ্যার পার্থক্যকারীরূপে।’ (সুরা বাকারা : ১৮৫)।
রমজানে রাসুলুল্লাহ (সা.) কোরআন চর্চার পরিমাণ বাড়িয়ে দিতেন। তিনি অধিক পরিমাণ তেলাওয়াত করতেন এবং ফজরের পর থেকে সূর্যোদয় পর্যন্ত মসজিদে নববিতে সাহাবিদের কোরআন শিক্ষা দিতেন। প্রতি রমজানে নবীজি (সা.) ও জিবরাইল (আ.) পরস্পরকে কোরআন শোনাতেন। ফাতেমা (রা.) বলেন, ‘তার পিতা তাকে বলেছেন, প্রতি রমজানে জিবরাইলকে (আ.) একবার কোরআন তেলাওয়াত করে শোনাতেন। কিন্তু মৃত্যুর বছর তিনি তাকে দুবার কোরআন শোনান।’ (ইবনে মাজাহ : ১৭৬৯)।
আরেক হাদিসে আছে, ‘রমজান মাসের প্রতি রাতে ফেরেশতা জিবরাইল (আ.) নবী (সা.)-এর খেদমতে হাজির হতেন এবং তারা উভয়েই কোরআন তেলাওয়াত করে একে অপরকে শোনাতেন।’ (বোখারি : ১৮০৩)।
দানশীলতা : রমজান মাসে নবীজি (সা.) দান-সদকার ওপর বেশ গুরুত্ব দিতেন। সাহাবিদেরও দান-সদকার প্রতি তাগিদ দিতেন। ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন, ‘আল্লাহর রাসুল (সা.) ছিলেন সর্বশ্রেষ্ঠ দানশীল। রমজানে তিনি আরও অধিক দানশীল হতেন, যখন জিবরাইল (আ.) তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতেন। রমজানের প্রতি রাতেই জিবরাইল (আ.) তার সঙ্গে দেখা করতেন এবং তারা একে অপরকে কোরআন তেলাওয়াত করে শোনাতেন। নিশ্চয়ই আল্লাহর রাসুল (সা.) রহমতের বায়ু অপেক্ষাও অধিক দানশীল ছিলেন।’ (বোখারি : ৬)।
শেষ দশকে ইতেকাফ : নবীজি (সা.)-এর জীবনে রমজান সাধনার আরেকটি উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, রমজানের শেষ দশকে অত্যন্ত যত্নের সঙ্গে তিনি ইতেকাফ করতেন। (বোখারি : ২০২৫)। ইতেকাফ পালনের ক্ষেত্রে তিনি যেমন যত্মবান হতেন, তার পরিবারের লোকজন এবং সাহাবিদেরও উৎসাহিত করতেন। তার ওপর রমজানের রোজা ফরজ হওয়ার পর মৃত্যু পর্যন্ত কখনও রমজানের শেষ দশকে ইতেকাফ ছাড়েননি।