জাকাত নিয়ে যা না জানলেই নয়

রায়হান রাশেদ

প্রকাশ : ০৯ মার্চ ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

জাকাত ইসলামের ফরজ ইবাদত ও মূল স্তম্ভ। কোরআনের ১৯টি সুরায় ৩২ বার জাকাতের কথা এসেছে। ইসলামে নামাজের পরই জাকাতের ওপর সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ধনীর অর্থবৈভবে গরিবের অধিকার নিশ্চিত করে জাকাত। ধনী-গরিবের মধ্যে তৈরি করে সম্প্রীতির সেতুবন্ধন। সমাজে তৈরি করে সাম্যের চিত্র। হাসি ফুটে গরিবের মুখে। সে সমাজে বুকটান দিয়ে দাঁড়াতে সাহস পায়। জাকাত সম্পদকে পবিত্র করে। পরিচ্ছন্ন করে ব্যক্তির মননকে। অন্তরের কলুষ দূর করে তাকে মহীয়ান করে দুনিয়া এবং আখেরাতে।

জাকাত শব্দটিই পবিত্রতার পাঠ দেয়। জাকাত অর্থ পবিত্রতা, ক্রমবৃদ্ধি ইত্যাদি। সম্পদশালী মুসলিম নারী-পুরুষের সম্পদ থেকে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য উপযুক্ত ব্যক্তিকে সম্পদের ২ দশমিক ৫ শতাংশ দেওয়াকে জাকাত বলে। জাকাতকে পবিত্রতার বাহক হিসেবে ঘোষণা করে আল্লাহ বলেন, ‘তাদের ধনসম্পদ থেকে সদকা গ্রহণ করো, যার সাহায্যে তুমি তাদের গুনাহমুক্ত করবে এবং তাদের পবিত্র করে দেবে।’ (সুরা তওবা : ১০৩)।

আল্লাহ আরও বলেন, ‘তোমরা নামাজ কায়েম করো, জাকাত দাও এবং রুকুকারীদের সঙ্গে রুকু করো।’ (সুরা বাকারা : ৪৩)।

জাকাত ইসলামের পাঁচ স্তম্ভের একটি। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘ইসলামের স্তম্ভ পাঁচটি- এক. আল্লাহ ছাড়া প্রকৃত কোনো উপাস্য নেই এবং নিশ্চয় মুহাম্মদ (সা.) আল্লাহর রাসুল; এ কথার সাক্ষ্য প্রদান করা। দুই. নামাজ কায়েম করা। তিন. জাকাত আদায় করা। চার. হজ কর। পাঁচ. রমজানে রোজা রাখা।’ (বোখারি : ৮)।

আল্লাহ জাকাত আদায় না করাকে মুশরিকদের বৈশিষ্ট্য বলে ঘোষণা করেছেন। কোরআনে আছে, ‘যেসব মুশরিক জাকাত দেয় না, যারা আখেরাত অস্বীকার করে, তাদের ধ্বংস অনিবার্য।’ (সুরা হামিম সিজদা : ৬-৭)।

জাকাত ধনীর সম্পদে গরিবের অধিকার। তাই গরিবের কাছে নিজ দায়িত্বে জাকাত পৌঁছে দেওয়া ইমানি দায়িত্ব। জাকাত ফরজ হওয়ার নির্ধারিত সময়ে সবাই জাকাত দিলে, গরিবরা সারা বছরই আর্থিক সহযোগিতা পাবে। কারণ সারা বছরই কারও না কারও ওপর জাকাত ফরজ হয়। সবার ওপর তো আর একই সময়ে বা রমজান মাসে জাকাত ফরজ হয় না।

জাকাত দিয়ে ব্যক্তিকে স্বাবলম্বী করা উত্তম। পাঁচশ’ বা হাজার টাকায় কারও অভাব দূর হয় না। অল্প টাকায় স্বাবলম্বী হওয়া যায় না। সমাজে এমন বহু লোক আছে, যারা ১৫ থেকে ২০ বছর ধরে জাকাত গ্রহণ করছে। তাদের অবস্থার পরিবর্তন হচ্ছে না। কারণ তাদের অল্প পরিমাণ দেওয়া হচ্ছে। সেক্ষেত্রে যদি তাদের দক্ষতার ওপর ভিত্তি করে বা তাদের সঙ্গে আলাপ করে দোকান, ব্যবসা, নৌকা, অটোরিকশা বা সেলাই মেশিন কিনে দেওয়া যায়, তাহলে জাকাতের ভালো সুফল পাওয়া যাবে। সমাজে জাকাতগ্রহীতার সংখ্যা কমবে।

যাদের ওপর জাকাত ফরজ : প্রাপ্তবয়স্ক মুসলিম, স্বাধীন, সুস্থ মস্তিষ্ক, ঋণের অতিরিক্ত নিসাব পরিমাণ সম্পদের মালিকের ওপর জাকাত ফরজ। সাড়ে সাত ভরি (৮৭ দশমিক ৪৫ গ্রাম) সোনা বা সাড়ে বায়ান্ন ভরি (৬১২ দশমিক ১৫ গ্রাম) রুপা বা সমমূল্যের নগদ অর্থ, বন্ড, সঞ্চয়পত্র, শেয়ার, ব্যাংকে জমাকৃত টাকা, ফিক্সড ডিপোজিট হলে জমাকৃত মূল টাকা অথবা সমমূল্যের ব্যবসার পণ্য থাকলে জাকাত আদায় করতে হবে। সম্পদের ওপর এক বছর অতিবাহিত হওয়া জরুরি। এসব সম্পদ বর্ধনশীল হওয়া শর্ত।

যেসব সম্পদে জাকাত দিতে হয় : এক. সোনা-রুপা, টাকা-পয়সা, পালিত পশু (নির্ধারিত নিয়ম অনুযায়ী) এবং ব্যবসার পণ্যে জাকাত ফরজ হয়। (সুনানে আবু দাউদ, খণ্ড: ১, পৃষ্ঠা: ২৫৫)।

দুই. মৌলিক প্রয়োজন থেকে উদ্বৃত্ত টাকা-পয়সা নিসাব পরিমাণ হলে জাকাত ফরজ। (মুসান্নাফে আবদুর রাজ্জাক : ৭০৯১)

তিন. টাকা-পয়সা ব্যবসায় না খাটিয়ে এমনি রেখে দিলেও তাতে জাকাত আসে। (আদ্দুররুল মুখতার, খণ্ড: ২, পৃষ্ঠা: ২৬৭)।

চার. সঞ্চিত অর্থ পৃথকভাবে কিংবা অন্যান্য জাকাতযোগ্য সম্পদের সঙ্গে যুক্ত হয়ে নিসাব পরিমাণ হলে জাকাত দিতে হবে। (মুসান্নাফে আবদুর রাজ্জাক : ৭০৩২)।

পাঁচ. ব্যবসার জন্য দোকানে রাখা পণ্য। (আবু দাউদ : ১/২১৮)।

ছয়. ব্যবসার নিয়তে কোনো কিছু ক্রয় করলে তা স্থাবর সম্পত্তি হোক যেমন জমি-জমা, ফ্ল্যাট কিংবা অস্থাবর যেমন : মুদিসামগ্রী, কাপড়-চোপড়, অলংকার, নির্মাণসামগ্রী, গাড়ি, ফার্নিচার, ইলেকট্রনিকসামগ্রী, হার্ডওয়ার সামগ্রী, বইপুস্তক ইত্যাদি বাণিজ্য-দ্রব্য বলে গণ্য হবে এবং মূল্য নিসাব পরিমাণ হলে জাকাত দিতে হবে। (মুসান্নাফে আবদুর রাজ্জাক : ৭১০৩)।

সাত. নিসাবের অতিরিক্ত সোনা-রুপা, টাকা-পয়সা ও বাণিজ্যদ্রব্যের জাকাত আনুপাতিক হারে দিতে হবে। (মুসান্নাফে আবদুর রাজ্জাক : ৭০৩২-৭০৭৪)।

আট. আগের সম্পদের সঙ্গে বছরের মাঝে সম্পদ পাওয়া গেলে নতুন প্রাপ্ত সম্পদ পুরাতন সম্পদের সঙ্গে যোগ হবে এবং পুরাতন সম্পদের বছর পূর্ণ হওয়ার পর সমুদয় সম্পদের জাকাত দিতে হবে। (মুসান্নাফে আবদুর রাজ্জাক : ৬৮৭২)।

যাদের জাকাত দেওয়া যাবে

আল্লাহতায়ালা সুরা তওবার ৬০ নম্বর আয়াতে যাদের জাকাত দেওয়া যাবে, তাদের নাম উল্লেখ করেছেন। যথা-

গরিব- যার নেসাব পরিমাণ সম্পদ নেই।

মিসকিন- যার মালিকানায় কোনো সম্পদ নেই।

ইসলামি সরকারের পক্ষ থেকে জাকাত সংগ্রহে নিয়োজিত ব্যক্তি।

ইসলামের দিকে চিত্ত আকর্ষণের জন্য জাকাত দেওয়া।

ঋণগ্রস্ত ব্যক্তি।

নির্দিষ্ট পরিমাণ সম্পদের বিনিময়ে স্বাধীন হওয়ার চুক্তিতে আবদ্ধ দাস-দাসী।

আল্লাহর রাস্তায় জিহাদকারী।

মুসাফির- সফর অবস্থায় অভাবগ্রস্ত মানুষ।

যাদের জাকাত দেয়া উত্তম

দ্বীনি জ্ঞান চর্চাকারী ছাত্র ও শিক্ষক।

আত্মীয়স্বজন।

বন্ধু-বান্ধব ও প্রতিবেশী।

জাকাতের অন্যান্য প্রকার হকদাররা।

যে খাতে জাকাত দেওয়া যায় না

যার কাছে নেসাব পরিমাণ অর্থসম্পদ আছে।

সাইয়েদ অর্থাৎ যারা রাসুল (সা.)-এর বংশধর।

জাকাতদাতার মা-বাবা, দাদা-দাদি, পরদাদা-পরদাদি, পরনানা, পরনানি- এভাবে ওপরের কাউকে জাকাত দেওয়া যাবে না।

জাকাতদাতার সন্তান, নাতি, নাতির ছেলে- এভাবে নিচের কাউকে জাকাত দেওয়া যাবে না।

জাকাতদাতার স্বামী বা স্ত্রী।

অমুসলিম।

সম্পদশালী লোকের অপ্রাপ্তবয়স্ক সন্তান।

মসজিদ, মাদরাসা বা স্কুল, কলেজ, হাসপাতাল প্রভৃতি নির্মাণ কাজের জন্য।

মৃত ব্যক্তির দাফন-কাফনের জন্য বা মৃত ব্যক্তির ঋণ ইত্যাদি আদায়ের জন্য।

রাস্তা ঘাট, পুল ইত্যাদি নির্মাণ ও স্থাপন কাজে- যেখানে নির্দিষ্ট কাউকে মালিক বানানো হয় না।