রোজা রাখার উপকারিতা

মাওলানা জাবের মাহমুদ

প্রকাশ : ০৯ মার্চ ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

রোজার বিধান স্বাস্থ্য সুরক্ষার দিকে লক্ষ্য রেখেই দেওয়া হয়েছে। যেমন- শিশু ও অতি বৃদ্ধের জন্য রোজা না রাখার অনুমতি রয়েছে। আবু হুরায়রা (রা.) বলেন, হজরত মুহাম্মদ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি ইমানের সঙ্গে ও সওয়াবের আশায় রমজান মাসে রোজা রাখে, তার আগের সব গোনাহ মাফ করা হয়।’ (বোখারি : ৩৮)। আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানও রোজার তাত্ত্বিক ব্যাখ্যা করেছে। তারা বলছে, রোজা বা উপবাস যাপন শরীরের বিষাক্ত পদার্থগুলোকে জ্বালিয়ে-পুড়িয়ে ফেলে। পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ মহামনীষী, দার্শনিক, গবেষক ও আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে- রোজা মানবদেহের জন্য মহাপ্রতিষেধক বা মহৌষধ। জগদ্বিখ্যাত সব বৈজ্ঞানিক ও বিশেষজ্ঞরা একমত পোষণ করেছেন, মুসলমানদের উপবাস থাকার পদ্ধতি বা রোজা রাখা শারীরিক অসুস্থতা ও রোগ-ব্যাধি থেকে রক্ষার জন্য এক মহাপ্রতিকারক। এ জন্যই রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমরা জিহাদ করো, গনিমত-প্রাচুর্য লাভ করবে। রোজা রাখ, সুস্থ থাকবে। সফর করো, ধন-সম্পদের অধিকারী হবে।’ (আল মুজামুল আওসাত, তাবরানি : ৮৩১২)। আমেরিকার আধুনিক চিকিৎসাবিদরা মনে করেন, বছরের কিছু সময় মানুষের জন্য এভাবে অতিবাহিত করা উচিত, যেন এটি ডায়েটিং করে হজম পদ্ধতি ব্যবস্থা কিছু সময়ের জন্য অবসর রাখে। আর রোজা রাখার মাধ্যমে চার থেকে ছয় ঘণ্টা পর্যন্ত বিশ্রাম পায়। রোজায় শুধু আধ্যাত্মিক উৎকর্ষতাই নয়, শারীরিক সুস্থতা আছে বলেই মানবজীবনে রোজার এত গুরুত্ব।

রোজা হৃদরোগ নিয়ন্ত্রণ করে : মানবদেহের রক্ত সংবহনতন্ত্রে চর্বি বা কোলেস্টেরল জমা হয়ে হৃৎপিণ্ডের ক্ষতি করে। শরীরের ধমনির হৃদগুলো থেকে বিশুদ্ধ রক্ত বহন করে টিস্যুর দিকে নিয়ে যায় এবং শিরাগুলো টিস্যু থেকে দূষিত রক্তবহন করে হৃৎপিণ্ডে নিয়ে যায়। এভাবে রক্ত অনবরত চলাচল করে। রক্ত সংবহনতন্ত্রে কোলেস্টেরল জমা হলে ধমনি, শিরা-উপশিরার ভেতরে লাইনিংয়ে জমা হয়ে ওইগুলোর প্রশস্ততা কমিয়ে দেয়। ফলে ধমনি ও শিরা পর্যাপ্ত রক্ত বহন করতে পারে না। এতে রক্তের প্রবাহ চাপ বৃদ্ধি পায়। এ অবস্থা চলতে থাকলে হৃৎপিণ্ডের ক্রিয়া ক্রমান্বয়ে বন্ধ হতে থাকে। তখন বুকে ব্যথা হয়ে বিভিন্ন সমস্যা দেখা দেয়। রোজা থাকার জন্য সারা দিন খাদ্য না খাওয়ায় এবং একমাস এভাবে দিনে অভুক্ত থাকায় দেহে নতুন করে কোলেস্টেরল জমতে পারে না এবং আগের জমাকৃত কোলেস্টেরলগুলো কমে যায়।

মেদভুঁড়ি হ্রাস করে : মেদভুঁড়ি নিয়ে আজকাল অনেকেই বিপাকে আছেন, তাদের প্রতি পরামর্শ হলো, রোজা রাখুন, রোজা রাখলে দেহে ক্ষয় হয়। ফলে দেহের চর্বি ভেঙে দেহের ক্ষয়পূরণের ব্যবস্থা হয়। এতে সারা দিন খাদ্য না খাওয়াতে নতুন করে চর্বি জমতে পারে না। এক মাস এভাবে দিনে অনাহারে থাকলে মেদভুঁড়ি অনেকাংশে নিয়ন্ত্রণ করা যায়।

কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করে : সারা দিন না খেয়ে রাতে অল্প সময়ের মধ্যে ঘনঘন খাওয়ার জন্য বিশেষ করে ছোলা, শরবত, খেজুর, শসাসহ বিভিন্ন রকম খাবার খাওয়াতে কোষ্ঠকাঠিন্য দূর হয়।

পেপটিক আলসার : খাওয়া-দাওয়া বেশি করলে পেপটিক আলসার বৃদ্ধি পায়। রোজা থাকলে সারা দিন না খেয়ে থাকায় খাদ্যনালি, পাকস্থলী, যকৃত, পিত্তথলি, ক্ষুদ্রান্ত, বৃহদান্ত্রের হজমে সহায়ক গ্রন্থিগুলো বিশ্রাম পায়। এতে পেপটিক আলসার রোগীর উপকার হয়।

ফুসফুসের রোগীদের ভালো : ধূমপান করার জন্য যাদের ফুসফুস সংক্রান্ত রোগ রয়েছে, তাদের জন্য রোজা খুব উপকারী। রোজা থাকায় ধূমপানে বিরত থাকে। এতে ফুসফুস নিকোটিনের বিষক্রিয়া থেকে মুক্তি পায়।

হজমে উপকার করে : যাদের হজম সমস্যা আছে তারা একমাস রোজা রাখলে হজম শক্তি বৃদ্ধি পায়। কারণ একটানা ১১ মাস সবসময়ে পাকস্থলী ও অন্যান্য গ্রন্থি হজমে ব্যস্ত থেকে ক্লান্ত হয়ে পড়ে। অপর দিকে রোজা থাকার জন্য প্রতিদিন ৬-৭ ঘণ্টা পাকস্থলী, খাদ্যনালি, যকৃত, পিত্তথলি, ক্ষুদ্রান্ত, বৃহদান্ত্র, ডিউডেনামসহ হজমে সহায়ক বিভিন্ন গ্রন্থির কোনো কাজ থাকে না। অর্থাৎ বিশ্রামে থাকে। বিশ্রামের পর সন্ধ্যায় ও রাতে পাকস্থলী খাদ্য পেয়ে নতুন উদ্যমে নতুন শক্তি নিয়ে হজম ক্রিয়ায় অংশগ্রহণ করে।

রক্ত বৃদ্ধি হয় : দেহে রক্তের প্রয়োজন হলে তখন এক প্রকার স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতিতে হাড়ের মজ্জাকে আন্দোলিত করে তোলে। অভুক্ত থাকাকালীন দেহে রক্তের পরিমাণ ও প্রবাহ কমে। ফলে হাড়ের মজ্জায় আন্দোলিত হয়ে রক্ত তৈরি হয়। রোজা থাকার জন্য পরে দেহে রক্তের পরিমাণ বাড়ে।

আমাশয় দূর করে : রোজা রাখার জন্য দিনে পেট খালি থাকে বলে যেসব ব্যাকটেরিয়া আমাশয় সৃষ্টি করে, সেসব ব্যাকটেরিয়া খাদ্যের অনুপস্থিতিতে কাজকর্ম করার সুযোগ পায় না। ফলে আমাশয় সেরে যায়। অপরদিকে ইফতারি ও সাহরিতে একটু ভালোমানের পুষ্টিসমৃদ্ধ খাবার যেমন, ছোলা, খেজুর, মুড়ি, নানান ফল, শরবত, দুধ, কলা, সালাদ ইত্যাদি খাওয়াতে দেহের পুষ্টির ঘাটতি পূরণ হয়। ড. লুটজানারের মতে, ‘খাবারের উপাদান থেকে সারা বছর ধরে মানুষের শরীরে জমে থাকা কতিপয় বিষাক্ত পদার্থ (টক্সিন), চর্বি ও আবর্জনা থেকে মুক্তি পাওয়ার একমাত্র সহজ ও স্বাভাবিক উপায় হচ্ছে উপবাস।