হজের ডাক : আত্মার প্রত্যাবর্তনের মহাযাত্রা
মুফতি হায়াত মাহমুদ জাকির
প্রকাশ : ১১ মে ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

মানুষের জীবনে কিছু মুহূর্ত আসে, যখন সে নিজের ভেতরকার মানুষটিকে নতুন করে আবিষ্কার করে। হজ সেই বিরল মুহূর্তগুলোর এক অনন্য সম্মিলন, যেখানে দুনিয়ার ব্যস্ততা, বিভাজন আর ভেদাভেদ পেরিয়ে মানুষ দাঁড়ায় এক অখণ্ড সত্যের সামনে। সাদা ইহরামের সরল পোশাকে ধনী-গরিব, রাজা-প্রজা, সাদা-কালো সবাই মিশে যায় এক অনন্য সমতায়। যেন মানবজাতি ফিরে যায় তার আদি পরিচয়ে এক স্রষ্টার বান্দা, এক কাতারে দাঁড়ানো এক বিশাল পরিবার।
হজ শুধু একটি আনুষ্ঠানিক ইবাদত নয়; এটি এক গভীর আত্মিক যাত্রা। মক্কার পথে পা বাড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে মানুষ যেন তার অহংকার, লোভ আর গুনাহের বোঝা ঝেড়ে ফেলে। প্রতিটি তাওয়াফ, প্রতিটি সাঈ, প্রতিটি দোয়া, সবই হয়ে ওঠে আত্মার পরিশুদ্ধির একেকটি ধাপ। কাবা ঘরকে ঘিরে ঘুরতে ঘুরতে মানুষ যেন অনুভব করে; তার জীবনও এক কেন্দ্রকে ঘিরেই আবর্তিত হওয়া উচিত, আর সেই কেন্দ্র হলো আল্লাহর সন্তুষ্টি।
আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আর মানুষের মধ্যে হজের ঘোষণা দাও; তারা তোমার কাছে আসবে পায়ে হেঁটে এবং সব প্রকার ক্ষীণকায় উটের পিঠে চড়ে, তারা আসবে দূর-দূরান্তের পথ অতিক্রম করে।’ (সুরা হজ, আয়াত: ২৭)।
এই আয়াত যেন যুগে যুগে প্রতিধ্বনিত হয়ে আজও মানুষের হৃদয়ে নাড়া দেয়। পৃথিবীর নানা প্রান্ত থেকে লাখো মানুষ ছুটে আসে সেই চিরন্তন আহ্বানে সাড়া দিয়ে। ভাষা আলাদা, সংস্কৃতি আলাদা, তবুও তাদের কণ্ঠে একই সুর ‘লাব্বাইক আল্লাহুম্মা লাব্বাইক।’ এই ধ্বনি শুধু ঠোঁটের উচ্চারণ নয়; এটি এক নিঃশর্ত আত্মসমর্পণের ঘোষণা।
হজের প্রতিটি আচার-অনুষ্ঠানের পেছনে রয়েছে গভীর তাৎপর্য। সাফা-মারওয়ার মাঝখানে সাঈ করতে গিয়ে মনে পড়ে যায় হজরত হাজেরা (আ.)-এর অবর্ণনীয় ত্যাগ ও ধৈর্যের কথা। আরাফাতের ময়দানে দাঁড়িয়ে মানুষ যেন কিয়ামতের দিনের এক ঝলক দেখতে পায়, যেখানে সবাই একত্রিত হবে, কোনো পরিচয় থাকবে না, থাকবে শুধু আমল আর আল্লাহর রহমতের প্রত্যাশা।
প্রিয় নবী মুহাম্মদ (সা.) হজের মাহাত্ম্য বর্ণনা করতে গিয়ে বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য হজ পালন করে এবং তাতে কোনো অশ্লীলতা বা পাপাচারে লিপ্ত হয় না, সে এমনভাবে ফিরে আসে, যেমনটি সে তার মায়ের গর্ভ থেকে জন্মগ্রহণ করেছিল।’ (সহিহ বোখারি)।
এই হাদিস হজের প্রকৃত সার্থকতাকে স্পষ্ট করে যে, এটি শুধু শরীরের ভ্রমণ নয়, এটি আত্মার পুনর্জন্ম। হজ থেকে ফিরে আসা মানুষটি যদি তার জীবনে পরিবর্তন আনতে পারে, যদি তার আচরণে, কথায় ও চরিত্রে ইসলামের সৌন্দর্য ফুটে ওঠে, তবেই তার হজ পূর্ণতা পায়।
আজকের পৃথিবী বিভক্তি, সংঘাত আর স্বার্থের দ্বন্দ্বে জর্জরিত। এই প্রেক্ষাপটে হজ আমাদের শেখায় ঐক্য, সহমর্মিতা এবং আত্মসমর্পণের শিক্ষা। লাখো মানুষের একসঙ্গে নামাজ আদায়, একসঙ্গে দোয়া, একসঙ্গে কাঁদা; এ যেন মানবতার এক জীবন্ত প্রতিচ্ছবি।
হজ আমাদের মনে করিয়ে দেয় আমরা ক্ষণস্থায়ী, আমাদের জীবনও একটি যাত্রা, যার শেষ গন্তব্য আল্লাহর দরবার। এই উপলব্ধিই মানুষকে সৎ পথে পরিচালিত করে, অন্যায় থেকে দূরে রাখে এবং মানবিকতার আলোয় আলোকিত করে।
হজের মৌসুমে তাই শুধু যারা সৌভাগ্যবান হয়ে পবিত্র ভূমিতে যেতে পারেন, তারাই নয়, পৃথিবীর প্রতিটি মুসলমানের হৃদয়ে জেগে ওঠে এক অন্যরকম আবেগ। কেউ চোখের জলে দোয়া করে, কেউ প্রতিজ্ঞা করে নিজেকে বদলে ফেলার। হজ যেন দূর থেকে ডেকে বলে, ‘ফিরে এসো, তোমার প্রভুর দিকে ফিরে এসো।’
এই আহ্বানই হজের সবচেয়ে বড় সৌন্দর্য : এটি মানুষকে তার আসল পরিচয়ে ফিরিয়ে দেয়, তার হৃদয়কে নরম করে, আর তাকে নতুন করে বাঁচতে শেখায়।
লেখক : মুহাদ্দিস, জামিয়া মাহমুদিয়া মাহমুদপুর, টিকরপুর, আগলা, নবাবগঞ্জ।
