মুসলিম উম্মাহর সংকট উত্তরণে হজের শিক্ষা ও দর্শন

ড. আ.ক.ম. আবদুল কাদের

প্রকাশ : ২৫ মে ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

মুসলিম উম্মাহর ওপর প্রবর্তিত সর্বশেষ ফরজ ইবাদত হজ। মদিনায় ইসলামি রাষ্ট্র মজবুত কাঠামোর ওপর প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর হুদাইবিয়ার সন্ধির মাধ্যমে যুদ্ধবিগ্রহ বন্ধ হয়ে সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত হলে এবং অষ্টম হিজরি সালে মক্কা বিজয়ের মাধ্যমে ইসলাম একটি অপ্রতিদ্বন্দ্বী আদর্শ হিসেবে সুসংহত হওয়ার পর নবম হিজরি সালে হজ ফরজ হয়। কিন্তু তখনও পর্যন্ত বায়তুল্লাহর চত্ব¡র অমুসলিমদের জন্য নিষিদ্ধ ঘোষিত না হওয়ার ফলে রাসুলুল্লাহ (সা.) এ বছর হজ সম্পাদন করেননি বলে বাহ্যত প্রতীয়মান হয়। আবু বকর (রা.)-এর নেতৃত্বে এ বছর হজ পরিপালনকালে পরবর্তী বছর থেকে কাবার চত্বর অমুসলিমদের জন্য নিষিদ্ধ ঘোষিত হয়। সুতরাং দশম হিজরি সালে মহানবী (সা.) তাঁর উল্লেখযোগ্যসংখ্যক সাহাবি নিয়ে ইসলামি পরিবশে হজ সম্পাদন করেন। এই হজে মুসলিম মিল্লাতের জন্য কোনো রাজনৈতিক প্রতিবন্ধকতা এবং সামাজিক নিরাপত্তার কোনো সংকট ছিল না। বর্তমান নানাবিধ সংকটের আবর্তে নিপতিত মুসলিম উম্মাহ হজের শিক্ষা ও দর্শনের আলোকে কীভাবে তাদের সংকট উত্তরণ করতে পারে এখানে তা তুলে ধরা হলো-

এক. বর্তমানে মুসলিম উম্মাহর সবচেয়ে বড় সংকট হলো আত্মপিরিচয়ের সংকট। পবিত্র হজের চেতনা হলো তাওহিদি চেতনা- যা আবহমানকাল ধরে তাদেরকে নবী রাসুলগণের আদর্শিক চেতনার সঙ্গে সম্পৃক্ত করে। মুসলমানদের আদি পিতা ইবরাহিম (আ.) আমাদেরকে মুসলিম উম্মাহর অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে ঘোষণা করেছেন। (সুরা হজ : ৭৮)। তা ছাড়া রাসুল (সা.) এবং তাঁর পূর্ববর্তী নবীগণ আরাফাতের ময়দানে যে দোয়া করেছিলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) একে সর্বশ্রেষ্ঠ দোয়া হিসেবে ঘোষণা করেছেন। (জামে তিরমিজি) এতে প্রমাণিত হয় যে, রাসুল (সা.) এবং তাঁর পূর্বের নবী-রাসুলরা আরাফাতের ময়দানে উপস্থিত হয়েছিলেন। মুসলিম উম্মাহর অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে বর্তমান মুসলিম উম্মাহ হজের বিধি-বিধান পালন করতে গিয়ে অতীত ইতিহাস-ঐতিহ্যের স্মৃতিচারণ করেন। ফলে তাঁরা আত্মপরিচয়ের সন্ধান লাভ করে নিজেদের মধ্যে বিদ্যমান হীনমন্যতা দূর করে সমৃদ্ধ অতীত ঐতিহ্যের ধারক হিসেবে মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর সুবর্ণ সুযোগ লাভ করেন।

দুই. মহাগ্রন্থ কুরআনে হজ ফরজ হওয়ার জন্য সামর্থ্যরে বিষয়টিকে অবশ্য বিবেচ্য বিষয় হিসেবে নির্ধারণ করা হয়েছে। (সুরা আলে ইমরান : ৯৭)। মুফাসসিররা সামর্থ্য হিসেবে দৈহিক সক্ষমতা এবং আর্থিক স্বচ্ছলতাকে নির্দেশ করেছেন। আর্থিক স্বচ্ছলতাকে ব্যক্তিগত পর্যায় থেকে সামষ্টিক পর্যায় পর্যন্ত প্রসারিত করার দীক্ষা হজের দর্শনে বিদ্যমান। বর্তমানে হাতে গোনা কয়েকটি দেশ ছাড়া অধিকাংশ মুসলিম রাষ্ট্র আর্থিকভাবে স্বচ্ছল নয়। অধিকন্তু অনেক দেশ দারিদ্র্যসীমার নিচে অবস্থান করছে।

হজ আমাদের শিক্ষা দেয় দরিদ্র দেশগুলোর আর্থিক সংকট নিরসনে এগিয়ে আসা ও মুসলিম উম্মাহর কল্যাণ সাধনে আত্মনিয়োগ করার জন্য। এই লক্ষ্যে মুসলিম উম্মাহ পৃথক মুদ্রা তহবিল, কমন মার্কেট, অভিন্ন মুদ্রাব্যবস্থা এবং সুদ বিবর্জিত অর্থব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারে।

তিন. বায়তুল্লাহ বিশ্বের প্রাচীনতম ঘর এবং ইবাদতের নিমিত্তে নির্মিত প্রথম ঘর। (সুরা আলে ইমরান : ৯৬)। এটি পবিত্র মক্কা নগরীতে অবস্থিত। যাকে মহান রাব্বুল আলামিন নিরাপদ নগরী হিসেবে ঘোষণা করেছেন। (সুরা তিন : ৩)। এখানে অবস্থিত কাবাগৃহে প্রবেশকারীদের নিরাপত্তার গ্যারান্টি প্রদান করা হয়েছে। (সুরা আলে ইমরান : ৯৭)। বর্তমান মুসলিম উম্মাহর একটি উল্লেখযোগ্য অংশ চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে। এ অবস্থায় হজের শিক্ষা ও দর্শনের আলোকে পবিত্র মক্কা নগরীর ন্যায় প্রতিটি মুসলিম জনপদকে শান্তি ও নিরাপদ নগরীতে প্রতিষ্ঠা করা সময়ের অপরিহার্য দাবি।

চার. মহান আল্লাহ, ফেরেশতা, আসমানি কিতাব এবং নবী-রাসুলদের ওপর বিশ্বাস স্থাপন ঈমানের অন্যতম অনুষঙ্গ। এর অনেকগুলো মানবগোচরের বাইরে হওয়ার কারণে একে ঈমান বিল-গায়ব বলা হয়। একজন হজযাত্রী আল্লাহর ঘর, এতদসন্নিহিত আয়াতে ‘বাইয়িনাত’ তথা মাকামে ইবরাহিম, সাফা-মারওয়া, আরাফাত, মুজদালিফা, মিনা, কুরআন নাজিলের স্থানসহ অনেক ঐতিহাসিক স্থান পরিদর্শন করে নিজের ঈমানকে ‘ঈমান বিশ শাহাদাত’ এর স্তরে উন্নীত করার সুযোগ লাভ করেন। এতে করে বিশ্বমুসলিমের ঈমানে শিরকসহ যেসব ঈমানবিধ্বংসী উপাদান যুক্ত হয়েছে, তারা তা বিদূরীত করার সুযোগ লাভ করে। আর একে আরও কার্যকর করে হজের স্লোগান- ‘লাব্বাইক, আল্লাহুম্মা লাব্বাইক...’, যাতে একাধিকবার লা-শারিকের ঘোষণা বিদ্যমান।

পাঁচ. হজ এমন এক ইবাদত- যা পালনের জন্য বিশ্বের প্রতিটি প্রান্তর থেকে আল্লাহপ্রেমী মানুষ একই সময়ে একই পোশাক পরে একই স্লোগান উচ্চারণ করে একই লক্ষ্যপানে ছুটতে থাকে। পরিবার-পরিজন, সহায়-সম্পদ সবকিছু পেছনে ফেলে আল্লাহপ্রেমী মানুষগুলো ঈমানি চেতনা এবং সাম্য ও ভ্রাতৃত্বের অনুপম আদর্শ অনুসরণের মহড়া দেয়। ভাষা, বর্ণ ও অঞ্চলের অর্গল ভেদ করে তারা উম্মাহর চেতনায় সমৃদ্ধ হয়, যাকে মহানবী (সা.) একটি দেহের সঙ্গে তুলনা করেছেন। (বোখারি : ৬০১১)। এই ঐক্য, সংহতি ও ভ্রাতৃত্বের বন্ধনকে টেকসই কাঠামোতে রূপদান করতে পারলে শতধা বিভক্ত মুসলিম উম্মাহ একটি মহীরূহে পরিণত হতে পারে।

ছয়. পবিত্র হজ পালন উপলক্ষে মুসলিম বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে পদস্থ কর্মকর্তা ও মুসলিম কমিউনিটির লিডারগণ পবিত্র মক্কা নগীতে সমবেত হন। আর সুনির্দিষ্ট দিনগুলোতে হজের বিধি-বিধান পালনের লক্ষ্যে তাঁরা পবিত্র স্থানসমূহে অবস্থান করেন। মুসলিম রাষ্ট্র সংঘের পৃষ্ঠপোষকতায় এ সময়ে মুসলিম উম্মাহর সংকট বিষয়ে মহাসম্মেলনের আয়োজন করা যেতে পারে। এতে কোনো রাষ্ট্রের কোনো ধরনের আর্থিক সংশ্লেষ থাকবে না। অথচ মুসলিম উম্মাহর আগামী দিনের চলার পথের ঐক্যবদ্ধ নির্দেশনার ঘোষণা ও পরিকল্পনা প্রণয়ন সহজতর হবে। আর এর মাধ্যমে প্রতিটি দেশ আন্তঃসহযোগিতার এক অপূর্ব সুযোগ লাভ করবে।

সাত. মুসলিম উম্মাহ বর্তমানে তথ্য সন্ত্রাসের শিকার। আর এটি আধুনিক মারণাস্ত্রের চেয়েও ভয়াবহ। হজ ইসলামের সুমহান বাণী বিশ্বব্যাপী প্রচারের অন্যতম মাধ্যম। আরাফাতের খুতবা সাধারণত ইলেক্ট্রনিক ও প্রিন্টিং মিডিয়ায় প্রচারের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়। এইভাবে ইসলামের প্রচার ও প্রসার এবং ইসলাম সম্পর্কে অপপ্রচার ও ভুল তথ্য উপস্থাপন বন্ধে মুসলিম উম্মাহ বিশ্বের প্রতিনিধিত্বশীল ভাষায় শক্তিশালী মিডিয়া প্রতিষ্ঠা করতে পারে।

আট. মহাগ্রন্থ কোরআন নাজিল হয়েছে মক্কা ও মদিনায়। হজ উপলক্ষে আগত হাজিরা সাধারণত হজের দিনগুলো ছাড়া কিছুদিন এই দুই নগরীতে অবস্থান করে থাকেন। বর্তমানে অধিকাংশ মুসলিম দেশে কুরআন বিবর্জিত রাষ্ট্রীয় আইন-কানুন প্রচলিত রয়েছে। অথচ কোরআন এক অবিকৃত গ্রন্থ হিসেবে আমাদের কাছে বিদ্যমান। মুসলিম বিশ্বের সকল রাষ্ট্রের আইনের উৎস হিসেবে কোরআনকে গ্রহণ ও বাস্তবায়নের উদ্যোগ গ্রহণ করা যেতে পারে। কারণ রাসুলুল্লাহ (সা.) ঝঞ্ঝা বিক্ষুব্ধ বিশ্বে শান্তি প্রতিষ্ঠার একমাত্র নিয়ামক শক্তি হিসেবে কোরআনের চর্চা ও অনুশীলনের তাগিদ দিয়েছেন।

নয়. মুসলিম বিশ্ব আজ অনৈক্যের আবর্তে ঘূর্ণায়মান। এই বিভক্তি বিশ্বের বুকে তাদের শৌর্য-বীর্যকে ম্লান করে দিয়েছে। ‘একতাই শক্তি’ এই স্লোগানবিস্মৃত মুসলিম জনপদ শুধু দেশে দেশে এবং জাতিতে জাতিতে বিভ্রক্ত হয়নি, আকিদা এবং মানহাজেও তাদের মধ্যকার অনৈক্য প্রকট। অথচ হজের শিক্ষা ও দর্শন সকল মত ও সকল মানহাজের লোকদের একই মোহনায় মিলিত করে। এই মিলনকে টেকসই ও স্থায়ী রূপ দানের ক্ষেত্রে হজের শিক্ষা কার্যকর ভূমিকা পালন করতে পারে।

দশ. হজ বিত্ত-বৈভবের অহংকার ভুলে সবাইকে এক কাতারে শামিল করে। কী রাজা, কী প্রজা, কী প্রভাব-প্রতিপত্তির মালিক সকলের দেহে একই পোশাক, সকলের পায়ে একই স্যান্ডেল, মাথা উশকো-খুশকো, দ্বীনহীন বেশে সবাই কখনও তাঁবুতে, কখনও উন্মুক্ত প্রান্তরে কখনও বায়তুল্লাহর চত্বরে, আবার কখনও সাফা পর্বত থেকে মারওয়া অভিমুখে, কখনো জামারাতে- এভাবে তাদের পরিভ্রমণ। এর মাধ্যমে তাদের মধ্যে বিদ্যমান অহংবোধ বিদূরীত হয় এবং আমিত্বের মনোবৃত্তি তিরোহিত হয়। ফলে একে অপরের আনন্দে উদ্বেলিত হয়, আবার একে অপরের দুঃখে সহযোগিতার হাত প্রসারিত করে দেয়।

এগারো. হজের একটি অন্যতম অনুষঙ্গ হলো পশু কোরবানি। পশু শুধু একটি প্রাণী নয়। এর মাধ্যমে হাজিরা জীবনের সকল চাওয়া-পাওয়ার গলায় ছুরি চালিয়ে থাকেন। সকল কামনা-বাসনার টুটি চেপে ধরে নিজের অভ্যন্তরে লুকিয়ে থাকা পশুত্ব ও আমিত্বকে কোরবান করে এক নতুন চেতনায় সমৃদ্ধ হয়ে নতুন মানবরূপে সমাজে প্রত্যাবর্তন করেন। এই নবরূপে আবির্ভূত মানুষটি চরিত্র, আদর্শ ও নৈতিকতায় একজন পরিপূর্ণ মানুষ হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করার দীক্ষা লাভ করেন। ফলে তিনি সমাজে অবস্থিত মানুষগুলোকে আধ্যাত্মিকতা ও নৈতিকতার গুণে গুণান্বিত করতে সচেষ্ট হন।

বারো. হাজিরা হজ পালন করতে গিয়ে ইসলামের অভ্যুদয় ও বিকাশের বিভিন্ন পথ পরিক্রমার ইতিহাসের একেকজন বাস্তব ও প্রত্যক্ষদর্শীর অবস্থানে উপনীত হন। বিভিন্ন ঐতিহাসিক নিদর্শনাবলি প্রত্যক্ষ করতে গিয়ে তাঁরা স্মৃতির মানসপটে ইতিহাসের ঘটনা প্রবাহ রোমন্থন করতে গিয়ে দেখতে পান, মক্কায় কীভাবে ইসলামের অভ্যুদয় ঘটেছে, আদর্শ প্রচার করতে গিয়ে মহানবী (সা.) ও সাহারিগণ কী পরিমাণ ত্যাগ ও কোরবানির নজরানা পেশ করেছেন, কোন প্রেক্ষাপটে তাঁরা আপনজন ও সহায়-সম্পদ ফেলে প্রিয়-মাতৃভূমি থেকে হিজরত করেছেন, কীভাবে তাঁরা চাপিয়ে দেওয়া অসম যুদ্ধে জীবন বাজি রেখে লড়াই করে শাহাদাত ও পঙ্গুত্ব বরণ করেছেন, দ্বীনের অস্তিত্ব রক্ষার স্বার্থে কীভাবে তাঁরা চরম শত্রুর সঙ্গে সন্ধি-চুক্তি স্থাপন করেছেন; আবার কীভাবে বিজয়ী বেশে মক্কায় প্রবেশ করেছেন। এসব ঘটনার সারনির্যাস থেকে তাঁরা চলার পথে স্বল্পমেয়াদি, মধ্যমেয়াদি ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করে বিশ্বমুসলিমের সংকট উত্তরণে অনবদ্য অবদান রাখতে পারেন।

তেরো. : বিদায় হজে ৯ জিলহজ মহানবী (সা.) আরাফাতের ময়দানে যেই ঐতিহাসিক খুতবা প্রদান করেছিলেন, এটি বিশ্বে মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার শ্রেষ্ঠ দলিল হিসেবে বিবেচিত। এতে রাসুলুল্লাহ (সা.) বিশ্বমানবতার জীবন, সম্পদ ও সম্ভ্রম সংরক্ষণের গ্যারান্টি প্রদান করেছেন, আমানত রক্ষার নির্দেশনা দিয়েছেন, সুদ প্রথা বিলুপ্ত করেছেন, নারীর অধিকার সুসংহত করেছেন, সর্বোপরি তিনি আদম সন্তান হিসেবে সাম্যের ধারণাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দান করেছেন। ১৯৪৮ সালে জাতিসংঘের উদ্যোগে টহরাবৎংধষ উবপষধৎধঃরড়হ ড়ভ ঐঁসধহ জরমযঃং তথা মানবাধিকারের সার্বজনীন যে ঘোষণা প্রদান করা হয়েছে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর ভাষণে তার সবগুলোই অত্যন্ত জোরালোভাবে উপস্থাপিত হয়েছে। বর্তমানে দেশে দেশে মানবাধিকার লঙ্ঘনের যে দৃষ্টান্ত দেখা যায়, মহানবী (সা.)-এর বিদায় হজের ভাষণ অনুসরণ করা হলে তা আর থাকবে না বলেই আমাদের বিশ্বাস।

চৌদ্দ. ইসলাম জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চা ফরজ করেছে। অথচ মুসলিম বিশ্ব জ্ঞান-বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি চর্চায় অন্যদের তুলনায় অনেক পিছিয়ে আছে। কোরআনে আল্লাহর শত্রু ও মুসলিমের শত্রুদের সঙ্গে মুকাবিলার জন্য শক্তি সঞ্চয়ের প্রতি তাগিদ প্রদান করা হয়েছে এবং সুসজ্জিত অশ্ব প্রস্তুত রাখতে বলা হয়েছে, যাতে শত্রুর হৃদয়ে ভীতি সঞ্চারিত হয়। (সুরা আনফাল : ৬০)।

এর জন্য প্রয়োজন উন্নত মানের সামরিক প্রশিক্ষণের। পবিত্র হজের বিধি-বিধান পালনে মূলত সামরিক প্রস্তুতির গুরুত্বের বিষয়টি প্রকটভাবে পরিলক্ষিত হয়। সামরিক প্রশিক্ষণের জন্য প্রথমেই প্রয়োজন নাম তালিকাভূক্তি, অতঃপর প্রশিক্ষণের নিমিত্তে তাঁবুতে অবস্থান, দৈহিক কসরত ও শত্রুর সঙ্গে সম্মুখ সমরে অবতীর্ণ হয়ে সমরাস্ত্রের ব্যবহার। পবিত্র হজে সামরিক প্রশিক্ষণের সবগুলো দিক এবং বিভাগই বিদ্যমান।

পরিশেষে বলতে পারি, বর্তমানে মুসলিম বিশ্ব সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, নৈতিক ও সাংস্কৃতিক দিক দিয়ে গভীর সংকটে নিমজ্জিত। আর এই সংকট থেকে উত্তরণের উপায় হলো, দক্ষ মানবসম্পদ উন্নয়ন, নিজেদের মধ্যকার ভেদাভেদ ভুলে গিয়ে ঐক্য ও সংহতি জোরদার, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন, উন্নত সামরিক শক্তিতে সমৃদ্ধিলাভ, শক্তিশালী গণমাধ্যম ও প্রচার মাধ্যমের বিকাশ, মানবাধিকার সুসংহত করণ; সর্বোপরি নিজেদের সোনালি অতীতে পুনরুদ্ধারকল্পে আত্মপরিচয়ে বলীয়ান হওয়া। আর পবিত্র হজের শিক্ষা ও দর্শনে এর সবগুলো অনুষঙ্গই বিদ্যমান। সুতরাং মুসলিম উম্মাহর সংকট উত্তরণে হজের শিক্ষা ও দর্শনের ভূমিকা অপরিসীম।

লেখক : প্রফেসর, আরবি বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়